চিরকুট অক্টোবর ২০২২



উজ্জ্বল একঝাঁক পায়রা প্রকাশ করল দেবাশিস ঘোষের একগুচ্ছ কবিতা। দেবাশিস ঘোষের কবিতায় আত্মমগ্নতা আছে, আছে ব্যক্তিজীবনের গভীর অনুভূতির কথা, এবং তার সাথে সাথে ক্ষয়িষ্ণু সমাজ ও তার অন্যায় অবিচারের উল্লেখ। কবিতাগুলি সময় নিয়ে পড়লে পাঠকরা নিরাশ হবেন না।   

দেবাশিস ঘোষের একগুচ্ছ কবিতা


 

দেবাশিস ঘোষের একগুচ্ছ কবিতা

 

১. বিস্ময়

 

তোমার শ্রাবণজলে যা কিছু বিস্ময়

আমি তার গাঢ় অক্ষদণ্ড

এ ফোঁড় ও ফোঁড় করি পৃথিবীকে 

                   দু'পাশে শূন্যতা

           ধুলো জমে চাঁদের সোনায়

অপেক্ষা ভেসে যায় গাঙুড়ের জলে

যেখানে তোমার জন্য আলো পুলকিত লেজ নাড়ে 

সেখানেই শুরু হয় মন্দিরের সিঁড়ি

 

অথচ এইসব ভেজা বিস্ময়

সমুদ্র সরে গেলে

টনটন ব্যথার পাতন

 

তোমাকে ছোঁয়ার মতো বিদ্যুৎ

কখনও বোঝেনি এই বোকা আঙুলেরা

যাদের জন্ম হয় বিস্ময় ঘেঁটে দেখে নিতে

 

নৈশকালীন চাঁদ সোনা ঢালে ধানভরা মাঠে

বিস্ময় ভাসে ডোবে জোয়ারের জলে

 

২. জন্মবীজ

 

যা কিছু স্বর্গ আছে তারা থাকে অন্ধকারে মাথার ভিতর

দুধসাদা তাজমহলের সব দ্যুতি

জন্মেছে অন্ধকারে যেভাবে পাঁপড়ি মেলে অগোচরে ফুল

যা কিছু নরক

তাদেরও ঠিকানা সেই অন্ধকার স্মৃতির কুঠুরি

আরব সাগর পারে অন্য এক তাজ রক্তাক্ত ছাব্বিশ

 

দুটি তাজ চুম্বকের বিপরীত মেরু

অথচ স্বর্গ ও নরক এই দুটি বিভ্রান্ত চকলেট

অন্ধকার মাথার ভিতরে বিদ্যুতের দুই জন্মকথা

 

৩ . যতটুকু পাখি আর নদী ...

 

যে সকাল পাখিদের জন্য

সেটাই তো তোমার আমার

 

যে দুপুর রোদ্দুরের ব্লেডে ডালপাতা এঁকে দেয় ছায়া 

সেটুকুই তোমার আমার

 

যেখানে তোমার কাছে নদী এসে বলে যায়

তার সব লাল নীল  সুখ দুখের কথা 

সেখানেই আমাদের বাঁশের মাচায় তৈরি চায়ের দোকান

 

দূরে দূরে পাখিহীন, পাতাহীন, নদীর কবরে

অশ্লীল জ্যামিতিক মৌচাক কুঠি

ঝাঁকে ঝাঁকে শুষে নেয় মাটি বালি পাহাড়ের রস

এইসব তুমি নও, আমি নই, 

আমাদের নগ্ন কঙ্কাল

 

৪. দৃশ্যচোর

 

স্বপ্নে নদীর মতো ভোর নামে, স্বপ্নে নদীর মতো ভোর

ছবিতে উড়ান ধরে শহরের, তুমিতো বাউল ক্ষেপা আমি দৃশ্যচোর

চুরি করি শিশু হাসি, চুরি করি সন্তানস্নেহ

চুরি করি শোক তাপ, চুরি করি খ্যাতি পাওয়া দেহ

রাখি না কিছুই আমি বেচে দিই ভরাট বাজারে

সকলেরই দাম আছে কৌশলে বেচি তাই দু'দশ হাজারে

প্রথমে দুঃখ বেচি, মৃতদেহ ফেরি করি প্রত্যেক ঘরে

এরপর প্রতিবাদ, আগুন ও অবরোধ বেচি থরে থরে

কখনও কি ভেবেছিলে বেচা যাবে জল কিংবা রোদ?

অথবা বিরহ প্রেম ডেবিট ক্রেডিট মিলে পুরোটাই শোধ

আমার দোকান আছে তোমাদের অবারিত ঘরে

তাই দিয়ে রাজপাত্র তোমরা সবাই দিও ভরে

আমি তো স্বপ্ন আঁকি তোমাদের তুলে দেব সুন্দর ভোর 

তুমি তো বাউলক্ষেপা আর আমি জাদুকর এক দৃশ্যচোর

 

৫. উত্তর প্রজন্ম

 

সব দৃশ্য আক্ষেপের

কান্না থেকে জন্মেছে সমুদ্র

 

সব হত্যা নিরামিষ

ইতিহাস ভর্তি ধুলো-প্রাণ

 

সব নগ্ন পায়ে যত শতাব্দীর ধুলো কাদা অজস্র ফাটল

আমি তার চাবুক লাঞ্ছিত এক উত্তর প্রজন্ম

মাথায় কাঁটার মুকুট, পিঠে ভারী ক্রুশ

হাতুড়ি ও পেরেক এনেছে যারা

তাদের ঘরেও আজ রান্না হয় শোক

 

কান্না থেকে সমুদ্র

শোক জমে সুবিশাল হিমালয়

 

৬. ভাঙন

 

স্টেশন পেরোল মেঘ

গাছেরা আনত

 

উচ্চতার খোঁজে বহুদূর

সূর্য-বাতাসা ক্ষয়ে যায়

প্রোলেতারিয়েত পিঁপড়ের শ্রমে

 

মুখগুলো ক্রমশই লোহালক্করের কারখানা

বিচ্ছিরি হয়ে আসা রং-চটা, ভাঙা

 

স্টেশন পেরোচ্ছে নদী, 

স্টেশন পেরোচ্ছে কালো মোষের বাহিনী

 

উঁচুরাও নেমে আসছে নিচে

আলপনা মুছে যাচ্ছে ঝড় জলে

কারখানা জেগে আছে কবরের মতো

 

৭. আয়রনি

 

জেগে ওঠা লোহার পাঁজর

খেয়েছে মাইলের পর মাইল

আলো মানে রোদ, জ্যোৎস্না, তারা নয়;

এল ই ডি বা হেডলাইট।

 

ঘরভরা নিঃসঙ্গতা,

খোপে খোপে হিসেব নিকেশ।

গাছেরা নিষিদ্ধ এই মারিচ কংক্রিটে,

শর্তাবলী প্রযোজ্য প্রেমে।

 

যা কিছু হারিয়ে যায় কিছুদিন তার আলো

ছেঁড়াছেঁড়া ছুঁয়ে যায় এলিয়েন এই দ্বীপ।

 

অর্থহীন দীপাবলী সরে যায় জ্যোৎস্নার দিকে ...

 

৮. কথাজন্ম

 

যেভাবে মানুষ জন্ম সেভাবেই জন্ম নেয় কথা

কাঁচা ভীরু অসহায় সতত রক্ষা করে যেতে হয় তাকে

ধীরে ধীরে বড় করা, তেল জল সাবান সংস্কৃতি

এভাবেই বড় হতে হতে শিবাজি বা আফজল খাঁ

হাজার তুচ্ছ কথা ঝাঁট দিয়ে প্রতিদিন ফেলে দেওয়া হয়

চায়ের দোকানে কোনও যুধিষ্ঠির দাস

অশ্বত্থামা হত বলে ছেড়ে দিত যদি 

বিড়ির ধোঁয়ায় চড়ে শূন্যে মিলিয়ে যেত কথা

হিরের কৌটোয় যদি রাখা হয় দু'চামচ ছাই

তবে সে মহার্ঘ্য হবে, জন্ম নেবে হাজার কথার

হাজারো ঝিলিক কথা জন্মায় প্রতিদিন

রাস্তার ম্লান ঠোঁটে ধুলোতে বালিতে

পদপিষ্ট হয়ে তারা মরে যায়, ডুবে যায় বাতাসের সমুদ্রে

আর কিছু কথা অতি দ্রুত চড়ে বসে মিনারের পর

এরপর নক্ষত্রের মতো জ্বলে থাকে হাজার বছর

 

 

 

৯. সেইসব জাদু রোদ

 

মা, তোমার মেঘ খেদানো দুপুর ফিরে এসেছে আবার 

জলের ওপর হেঁটে বেড়ানো চুলের মতো পা-ওয়ালা মাকড়শাও

এখনও অবাক হয়ে ভাবি কিভাবে যে ওরা জলের ওপর

অনায়াসে হেঁটে বেড়ায় ! জলের ওপর তলে কোনও খাঁজ নেই

তীক্ষ্ণ কোনোকিছু ডুবে যায় জলে। 

মা, তুমি ট্রাংকের কাপড়চোপড় আর তোমার পুরোনো খাতা বই

আশ্বিনের রোদে মেলে দিলে আমি সব উল্টে পাল্টে দেখতাম

গন্ধ শুঁকতাম। কেমন একটা ভালো লাগা ঘিরে থাকত সেই দুপুর রোদে।

এখনও আশ্বিন আসে, রোদ ঢালে। তুমি কি আরো একবার রোদে দেবে কাপড়চোপড়?

ফিরিয়ে এনে দেবে সেই আশ্বিনের রোদ!

সেইসব রোদে অন্য এক রং ছিল। খোলামেলা চারপাশে লেগে থাকা মায়া

ছুঁয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলতাম অজানা জগতে।

মা, এখন অন্যরকম ভুবন, হয়তো তাকে ভুবন বলাও যায় না, বরং বলি গ্লোব ।

আকাশ, গাছপালা, আর রোদের সেই জাদু ভ্যানিশ

এখন বিস্ময়গুলো আর কোনও শিহরণ জাগায় না।

ছিপি খোলা লেমোনেড বোতলের সবটুকু গ্যাস উধাও।

 

 

১০. গাছ কিংবা করোটি বিষয়ে

 

একটা গাছের কথা বলতে গিয়ে

চোরাচাউনির কথা মনে পড়ে।

সমস্ত ব্যস্ত প্রহর ছবির মতো থেমে যায়।

সব উদযাপনে নোনা ধরে

শহরের সকল ক্লাউনের ভিড় পাঁউরুটির দোকানে ।

একটা চোরা চাউনির বুলেট তাড়া করে ট্রাউজার

তাড়া করে প্রবণ কিশোরকে

যতদূর পৌঁছে যায় ঘোড়ার দল

ততদূর ফাগুন ও ক্যাডবেরি

একটা গাছে হাজার গল্পরা উঠে পড়ে 

আসে পাখি, পক্ষীশিকারী, লগা হাতে বুড়ো

 

একটি গাছের নিচে চোরা চাউনি পাঁপড়ি মেলে ধরে

পিছনে দীর্ঘ ছায়া এসে পড়ে করাত-মানুষ

গাছের তো জিভ নেই

একটি গাছের সব যাবতীয় গল্প লতাপাতা

শেষ করে বিদ্রুপরঙা একটি করোটি 

 

১১. সমস্তই ঠিকঠাক

 

সব উলগুলান শোয়ানো,

ঠোঁটে জিভে আগুন একদম নয়।

হ্যাঁ, সবকিছুই চমৎকার! দ্যাখো উন্নতির উড়ান সোপান

 

কোনো জটলা নয়, জমায়েত নয়,

এসব বিশৃঙ্খলা দেশদ্রোহিতা।

 

কিসে অসুবিধা তোমাদের?

ট্রেন নেই না বাস নেই! বিদ্যুৎ, হাসপাতাল স্টেডিয়াম নেই!

তাহলে কিসের জন্য এই ভ্রমরবৃত্তি!

যখন বলছি আমি চোখ বুজে শোনো :

এই ভূমি তোমাদের, তোমাদের নিজস্ব শাসক,

তোমাদের ভীষণ আপন ।

তাহলে ভিন্ন কেন স্বর!

তাহলে ভিন্ন কেন সুর!

সবকিছু ঠিকঠাক 

দু'একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা 

ওরকম ঘটতেই পারে! 

ওসব কিচ্ছু নয় হিমশৈলের চূড়ো ...

ডুবে গেছে টাইটানিক।

তাই জলের তলায় কোনো বরফ জমতে দেওয়া

একদম নয়। কোনওদিন ডুববে না এ জাহাজ।

কান দিও না শত্রুর কথায়। 

 

১২. নীরবতা

 

কী দেব তোমাকে শুধু নীরবতা ছাড়া! 

হাওয়ায় ভাসছে মেঘ, 

         চরাচর রূপসজ্জায়।

টি-শার্টের গায়ে লেখা পদাবলীর মতো

          মোলায়েম নীরবতা

     এটুকুই তোমাকে দিলাম।

     গাছেদের দুঃখবোধ ছুঁয়ে 

   নদীর প্রান্তিকতা কাঁধে বয়ে

     যেটুকু শিখেছি নীরবতা

সেটুকুই অধিকার, সেটুকুই পরম মৌলিক

 

সমুদ্র কল্লোল জানে, হাওয়া জানে সব বিপ্লব

      আলোকবর্ষ দূর থেকে ঢেউ আসে 

         ভূখন্ডে ও পাতায় পাতায়

হাতের তালুতে নীরবতা নিয়ে জলে ছেড়ে দিই

সাঁতরে বেড়ায় খুব। সাঁতরে বেড়ায় যত অক্ষমতা

আপাত বিপদহীন জলে।