মে ২০২৬-এর কবি সৌমাল্য গরাই-য়ের কবিতাগুচ্ছ

 


সৌমাল্য গরাই কবিতাগুচ্ছ

 

রমণীয়

 

স্নেহকলসের পাশে রেখেছি আনত

মুঠি, যদি ছুঁতে পারি আমিও শিশুর

সঙ্গ পাব। আমি হব একাধারে পিতা সন্তান

ঘুম থেকে উঠে ফিরে যাব গর্ভগৃহে

লেখা নেই শরীরের যেসব অজ্ঞাত গুপ্তধন

উত্তপ্ত নিঃশ্বাসে খুঁজব প্রতিক্রিয়াশীল

সেইসব গোপনতা, চরম জাগাব

শরীরের উপর শরীর, মেঘে মেঘে ভেঙে দেব

সমস্ত দুয়ার। মুহুর্মুহু বৃষ্টি আর ক্ষণিক তফাতে

ঠোঁটের নৌকাটি দুলবে সংশয়ের ভারে

স্পর্শের মুহূর্তকাল আগে মনে হবে

 স্তন নয়, কাঁপে তার হৃদয়ের কালো দুটি চোখ...

 

মীনকেতন

 

 যাও দ্রুতগামী মীন। জল যেরকম যায়

পুচ্ছবীণায়, রেখো হে বেগম আলাজ্বিন

নেভানো আগুন আজ গুণগুণিয়ে এসেছে

ধোঁয়াকে ধরিতে চায় পুড়ে যাওয়া ছাই

করকমলালেবুর পেলব খেয়াল থেকে

উঠে এসে বসেছে সুরামাছি,

কী রোগ ছড়াবে ছড়াও, পেতেছি আসন

 

স্বগত কার্বন কপি, যতদূরেই সরাও

হেলানো মুখের পাশে তোমার ত্রিকোণমিতি

দেখেছি বিকল জাহাজের সফেদ ডানায়

স্যাঁতসেঁতে আর্তস্বাদ ছুঁয়ে আছে নাভিধূপ

তার- গন্ধ পেয়ে আমিও এসেছি

তোমার  প্রতিটি কোষে নিখুঁত যাতনা হয়ে...

 

 

দূত

 

আত্মা অতীত, তোমাকে পেয়েছি আমি সূর্যাস্ত বেলায় 

যেভাবে জলেরা ফেরে সন্তরণ শেষে

যেন সেও এক মাঝি নিজের ভেতর

ডুবো জাল ফেলে দেখে প্রকৃত বন্দর

এমনই অতল দেশে আলো নিভে গেলে

 সীমানা পেরিয়ে জাহাজেরা ডুবে যায় সমুদ্র প্রবাহে

 

 

সেইসব সুষুপ্তি পেরিয়ে মনে পড়ে 

ছিলাম সূর্যের দেশে, লক্ষ লক্ষ জীবাশ্ম কণায় 

আকাশের অমূল্য শূন্যতা চুরি করে  

স্বয়ং ব্রহ্ম আমি

অন্ধকার লোভে পালিয়ে এসেছি

যুগ যুগ ধরে তাই সূর্যকণাদূত হন্যে হয়ে খোঁজে

প্রতিটি অনন্তে আমাদের- লুপ্ত পদছাপ

সৌরকণাদের এই অন্বেষণ  হেতু

সূর্যের আলোক এসে পৃথিবীতে পড়ে...

 

ম্যাটিনি শো

 

একটা যেকোনো বই তার জন্মের অনেক আগেই

আরেকটা অন্যরকমের জন্মদিন দেখতে পায়

তবু আয়না যেরকম আয়নাকে দেখতে পায় না

তেমন করেই একটা  বইয়ের ভিন্ন ভিন্ন লেখকেরা

একদিন রেসকোর্সের মাঠে গিয়ে দাঁড়ায়

ফ্ল্যাশব্যাকে তখন একটিই ঘোড়া

 সাদা কালো বাদামী ইত্যাদি রঙে রূপান্তরিত হয়ে ছুটে চলে

যেন কেউ আগে থেকে ঘটে চলা তুমুল স্বপ্নকে

জীবনের পর্দায় সাজিয়ে

  সিনেমার মতো করে চালিয়ে দিয়েছে

 

 

দর্শন

 

চোখ হল সেই বোধি প্রবেশের আগে

সারারাত অন্ধকার জ্বেলে

দুদিকেই খুলতে হয় আয়না পারা

 

দু'রকম দরজায় দু'রকম মানুষ

গোলাকার শূন্যদ্বয় জন্ম- মৃত্যুর পর্দায়

লুফে নিয়ে ঢুকে পড়লো

একে অপরের  জন্মের ভিতর...

 

 

 

ওরাকল-

 

ঘড়িগুলি ঘুমাতে থাকবে

  সমুদ্রের তলদেশে,মাছেদের সন্তানকামনায়

এমনই এক রূপকথা চেয়েছিল জন্মাতে।

 

তারাদের অবস্থান পালটে

তারপর

একে একে এলো

অণুকোষ, সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম গুঁড়ো,  প্রত্নবিভীষিকা

আর ক্রমাগত আত্মপ্রবঞ্চনার সামনে 

মানুষের দীর্ঘশ্বাসে ঘড়িগুলি ভয়ে, দৌড়াতে শুরু করলো।

মে ২০২৬-এর কবি অর্ণব সামন্তের কবিতাগুচ্ছ

 


অর্ণব সামন্ত কবিতাগুচ্ছ

 

  

সৃজনের পথে

 

সংস্কার খুলে খুলে যায় তবু কিছু কাঁচ 

ঘিরে রাখে আলো আত্মাভিমানের মতন

কিছু খেদ, কিছু খিদে শরীর মন জ্বালায় 

ভুলে যাই শিখরে আমার ঘর , সিংহবিক্রম 

সময়ের চোখে জমা হয় কুয়াশা , তুষার , মেঘের আস্তরণ 

তুমি বসে থাকো খিড়কি হাট করে খুলে 

টের পাওনি কখন ঘূর্ণবাত্যা ভেঙেছে তোমার ঘর 

নিয়ে গেছে নিত্যনতুন শিল্পিত সৃজনের পথে !

 

  

 বৃত্ত

 

 

বৃত্ত সম্পূর্ণ হতে কতটা পরিধি পরিক্রমা বাকি ?

পরিব্রাজক জীবনে তা' বোঝার আগেই 

খসে পড়বো, মায়া চাদর মোহমুদ্গরের এক ধাক্কায়

বর্তির বিলে ডুবে যাচ্ছে হংসহংসিনী ডুবসাঁতারে

আবার ভেসে উঠছে ভুস করে জানালার পালকে হীরেকুচি জল নিয়ে 

ভালোবেসে ভালোবেসে প্রথম জলজ প্রাণী হবার চেষ্টা করছে 

স্থলপদ্মের মতন ফুটে থাকছে রঙ বদলে মুহূর্তে মুহূর্তে 

ফুরসত পেলেই অ্যালবাট্রসের ডানায় সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছে 

কখন যে সমুদ্র হয়ে যাচ্ছে কখন পাহাড় পর্বত মালভূমি 

মন্দারমনি ছুঁয়ে চলে যাচ্ছে মোহনার গভীর থেকে আরও গভীরে

বৃত্ত সম্পূর্ণ হতে আর কত আকাশ পেরোতে হবে সুব্রতা ?

আর কত সময়কে স্বাধীনতা , সংস্কারবিহীন করে দিতে হবে ?

 মুক্তির আবেগ আশ্লেষ লেগে যাবে শরীরে মনে সত্তায় 

পরিব্রাজক জীবন আজ একা নয় অনিবার্য মাধুকরী

এইভাবে কবিতাময় গানময় নৃত্যময় হয়ে 

যুগল নিশ্চয়ই উড়ে যাবে শুন্যপুরের দিকে 

বুকে এক জগতপ্লাবিত ঢেউ নিয়ে একক সহজ গানের মুর্চ্ছনায় ... !

 

 

 

গহনের মেঘমল্লারে

 

গহন মেঘের সংঘর্ষ থেকে এত যে গহীন উঠে আসে

ধারাপাতে ঝরতে থাকে রূপ, লাবণ্য , কামনাবাসনা অহং, লিবিডো 

হাওয়া ডাকে ভেতরের মাতঙ্গকে বীজ বপন করতে

সেই প্রাগৈতিহাসিক থেকে নদীভিত্তিক সভ্যতা‌ এগোচ্ছে 

শিকারভিত্তিক, কৃষিভিত্তিক সেই সঙ্গে জাল বিছাচ্ছে 

সৃষ্টির আদিতে ফিরে মানব মানবী সমস্ত কমপ্লেক্স ফেলে 

সমুদ্র জলে, আগ্নেয়গিরির লাভায় বাষ্পে, সহজ সরল 

জীবন জেগে উঠছে বিদ্যুচ্চমকের যাপনে যাপনে

সংঘর্ষ দ্বন্দ্ব ঝগড়া ভূমিকম্প ভেঙ্গে ভেঙ্গে খুশির তুফান 

ভাসিয়ে দিচ্ছে সমস্ত কফির ক্যাফেতে , ঘাসের বিছানায় 

নদীর জলের গভীরে যেতে চাইছে ঘূর্ণিজল

 

ডুবসাঁতারে ডুবসাঁতারে অমল ভাসানের গান গাইতে

বিপর্যয়ে বিপর্যয়ে কখন যে সমস্ত সহজিয়া গান হয়ে উঠছে 

মেঘযুবক মেঘযুবতী দীপকে মেঘমল্লারে দহনে দহনে

গহীন তুলে আনছে অনুপম কবিতার মতো ... !

                                                                          

 

সাক্ষাৎকার , একটি দুপুরের সঙ্গে

 

পাওয়া গেল এমন এক রাজকন্যার মুখশ্রী 

যার জন্য অনেক জাহাজ ধ্বংস হয়েছে যুদ্ধের অনুপ্রেরণায় 

জ্যোৎস্নার মতন নেমে এসেছে আফ্রোদিতি পৃথিবীর বুকে 

রহস্যময়ী নীহারিকা চোখে দাঁড়িয়েছে ক্লিওপেট্রা 

ভূমিকম্পের আগে কবুতর জোড়া উড়েছে অবিরাম 

কোনো আড়ালে থাকা পদ্মবুকে তখনো লেগেছিল শিশির

দমকা হওয়ার মতন দীর্ঘশ্বাস পুকুরের বুকে কাঁপুনি তুলেছে 

অতীত ভবিষ্যতের সুতো টেনে বর্তমান হাস্যমুখে উদ্ভাসিত 

নৈঃশব্দে হারানোর আগে মিষ্টি কথকতা উঠে এসেছে 

টুকরো টুকরো শব্দের শরীর , আদরে আদরে আদুরে স্বরবর্ণ স্থাপন

ওগো দুপুর তোমার মন নেই , মন নেই ,

একটি সত্তা ভালোবাসা মাখামাখি হয়ে পড়ে আছে আরেক সত্তার বুকে 

ঘুঘু জোড়া তখনো মোৎসার্ট সিম্ফনি তুলছে ব্যালকনিতে , গাছের শাখা-প্রশাখায়

একটি ঠোঁট জোড়া আকুলতার সঙ্গে অপেক্ষমান আরেক ঠোঁট জোড়ার পুষ্টির জন্য !

                                                                          

 

 

 সহজ গানের কিসসা

 

সহজ গান হয়ে বসে আছো অগ্নি নদীবুকে, সমুদ্রসৈকতে 

আগ্নেয় লাভার মতন শব্দগুলি দমকে দমকে ছন্দে ছোঁড়ো 

দুবুকে অজন্তা ইলোরা কারুবাসনার কারুকার্যে উজ্বল 

মোহনায় উত্তাল অরণ্য ভয় দিয়ে অভয়ের ঘরে ঠ্যালে 

ভাটিয়ালি ভাওয়াইয়া হয়ে সেই পথ ঘুরে গ্যাছে জলের গভীরে 

জল আবার যেতে চায় জলের আরও গভীরে গহীনে 

পাললিক হয়ে যায় আগ্নেয়শিলার মাতনে মাতনে দীপক মল্লার মারিয়ানার 

বিদ্যুচ্চমকে বিদ্যুচ্চমকে বিদ্যুৎ নিজেই জানে না কখন সে অপত্যের আলো !

এভাবে সহজ গান হয়ে এসো , কড়ি কোমলে গড়ো স্বরবিতান গীতবিতান 

এভাবে আগুন জ্বালালে দীর্ঘশ্বাস দীর্ঘতর ঢেউগুলি ফুলেফেঁপে ওঠে 

সহজ গান হয়ে বসো গানের মুখেই ঝালায় ঝালায় রবিশঙ্কর 

হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া ভেসে আসে মনপবনের নোয়ার নৌকায় 

গানে গান মিশে হয়ে যায় চানঘরে সহজতম গানের সঞ্চারী !

 

             

 জ্যোৎস্নার ঋণ

 

বারংবার ছুটে গেছি জ্যোৎস্নার ঋণে স্বরবর্ণ স্থাপনে

অরণ্য আদিম ডেকেছে তার গুহাপথে অজন্তা ইলোরায় 

দুরন্ত বাইসন ছুটে গেছে আলতামিরার সৌন্দর্যে , লাবণ্যে 

আবেগে আশ্লেষে দীর্ঘশ্বাসে নদী সহজাতভাবে 

সহজ গানের সহজিয়া সুর নিয়ে উচ্ছল হয়েছে

পাহাড় পর্বত উপত্যকা মালভূমি সমভূমি পেরিয়ে 

ঝপাং পড়েছে মোহনার মারিয়ানা খাতে

অকথ্য হর্ষে জীবন পেয়েছে সাফল্যের এভারেস্ট তুষারশুভ্রতা নীলিমাসমেত 

বারংবার ছুটে গেছি জ্যোৎস্নার ঋণে জ্যোৎস্না সম্প্রপাতে 

রক্তমেদমজ্জাস্নায়ু সম্ভারে জ্বলেছে আলো অমলিন

জীবনকে করেছে উজ্জীবিত, মরণকে করেছে জীবনের চেয়েও বেশি জীবন্ত 

তুমি এসে হাত ধরো, আরশিতে দেখতে দাও আমিকে আমার মতন 

আমাকে আরশি করে তুমি তোমাকে দ্যাখো তোমার মতন 

ঘুরেফিরে সেই অমল জ্যোৎস্নার স্নিগ্ধতা দীপ্যমানতা বহমান ....