অনুপম
মুখোপাধ্যায় – একগুচ্ছ কবিতা
তুমি খাও
মস্তিষ্কের কোন পেশি দিয়ে তোমার সমগ্র প্রেমজাল আমি ছিঁড়ে
দেখাবো বলো। যে বালক বৃত্ত বোঝে না সেও যৌনাঙ্গ
বোঝে। তারও কামজ্বর হয়। রাস্তার ধারে উলটে থাকা লরির
দৃশ্য দেখে ব্যথিত বালিকারা অজ্ঞান হয়ে যায়।
সাদা পায়রা পুষলে তার নিরাপত্তা নিয়ে তোমাকে চিন্তিত
হতে হয়। আমাকে নিয়ে কি তুমি ততটাও ভাববে না।
রোদের মধ্যকার গাঢ় মধু আমার কুড়িয়ে পাওয়া ঝিনুকে
জমে আছে। তুমি খাও।
কালো
শাড়ি
তোমার মেলে রাখা কালো শাড়ি সূর্যকে আড়াল করছে। আমার মুখে
রোদ পড়ছে না। সরাও। তোমার বিপুল শাড়ির মধ্যে খাঁখাঁ করছে
শূন্যতা। সরাও।
আর কত শীতকাল তুমি আমাকে দেবে। মলাট ছিঁড়ে গেলে
ভূতুড়ে
বইয়ের মধ্যেও ঢুকে যায় সূর্যের আয়ু। খড়ের চালে
যেমন রোদ্দুর হয়ে শুয়ে থাকে গ্রীষ্মকালীন হলদে বাস্তবতা।
আমি সরবত ভালোবাসি। মিছরি ভালোবাসি। তার চেয়েও
ভালবাসি বিস্মৃত সকালের স্বপ্ন। বরফের জন্য অপেক্ষা করতে করতে
বরফের বাক্সে যেমন জল জমে যায়।
সরাও।
হাতল
আমার আত্মপরিচয়ে কোনো হাতল রাখা নেই। এই দ্রুত জীবনে
তুমি কী ধরে এগোবে। প্রত্যেকটা ভালোবাসার গল্পে দিশাহীন আকাশ
থাকে। আর অসীম উদ্ভাস। তুমি কোন কম্পাস ধরে এগোবে।
একটা বাক্যের মধ্যে যদি তুমি থাকো- আমার কাছে সেই বাক্য
অসম্পূর্ণ। ব্যাকরণহীন।
প্রেমিকার আর্কেটাইপ ভাঙার আওয়াজ…
ঠিকানাকে ফেলে রেখে গবাদি পশুরা ঘাসের জঙ্গলের দিকে যাচ্ছে। জলের
ভিতর থেকে উঠে এসেছে বিস্ময়ের অস্থির আঙুল। সাফাইকর্মীরা
ফিরে আসছেন মেধাবী প্রেমিকের সমাধিফলক মুছে।
তুমি কী ধরে এগোবে।
যাবজ্জীবন
কয়েদিকে চাবি ধরিয়ে দিলেও সে তালা খুলতে পারে না- এই তো
জীবন। চেতনার পালক ছুঁয়ে কেঁদে ওঠে পাখি।
কাজের শেষে ঘরে ফিরলে তবেই তো কাজ।
তুমি ঘাসের আভার মধ্যে ঢেউ হয়ে ধুয়ে দিচ্ছ আমার শরীরের
ধুলো। শান্ত ঢেউ। কথোপকথনের ঢেউ। এই তো
প্রেম। এই তো জীবন।
শুধু আগুন নেই বলেই একটা অগ্নিকুণ্ডের আজীবন আগুন পাওয়া
হল না।
শূন্যতার দাঁত
বেলুনওয়ালার নিঃশ্বাসে বায়ুমণ্ডল ভরে আছে। শূন্যতার দাঁতেই
শূন্যতাকে কামড়ে ধরে গরম টিনের চালে দাঁড়িয়েছে বিড়াল। যেমন
কবরখানার একটা কোণে পৌঁছে মানুষ নিজের জন্য অপেক্ষা করে।
জলে কারো ছায়া পড়লেই জলছবি হয় কি। জলের নিজস্ব শর্ত থাকে।
পৃথিবীতে কোনো ছবিই শেষ হয় না- শিল্পী যখন চান তখন ছবি শেষ।
বাঁশির ছিদ্র যেহেতু নৌকোয় বসাতে নেই।
গল্পসারাই
কাহিনির বিফলতা দেখে কাহিনিকারের চোখে জল চলে এল। কুয়াশার
আড়ালে তখন হাতিটা রেললাইন পেরোচ্ছে। হাতির নাম সরস্বতী। নামটা
লক্ষ্মীও হতে পারতো।
দৈববাণীর সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে কিশোর তার ঘুড়ি ওড়াচ্ছে। ছায়া ফাটিয়ে
ঢুকে আসছে রৌদ্র। তৃষ্ণার্ত মানুষ যেমন তার তৃপ্তির অবশেষ
জলে ডুবিয়ে দ্যায়।
প্রচুর শব্দ করছে বাতাস- এখনই মাস্তুল থেকে নাবিক পড়ে যাবে- লেফাফা
ছিঁড়ে উড়ে বেরিয়ে যাবে চিঠি। এসব কাহিনি। জলের উপর আঁকা হচ্ছে
জলপোকাদের আস্থা।
লেখকের ডাক শুনে রাজমিস্ত্রিরা দল বেঁধে আসছেন। এখনই
সারাই হবে গল্পের ক্ষত।
সম্পর্ক যেভাবে শেষ হল
সুন্দরীর সামনে দাঁড়িয়ে বুঝে নিই নশ্বরতার সীমা। যেমন
লরির টায়ারের তলায় ঘুমিয়ে থাকে মরু-গিরগিটি। অথচ
আমি বালি। আমি নীল আকাশ। আমিই তোমার মুক্তাভ
ঝকঝকে দাঁত।
আকাশ থেকে খসে পড়া সাদা হাড় দেখে ভেবেছিলাম
সাদা
পায়রা। আর তুমি দেখেছিলে সাঁজোয়া গাড়ির মতো
মেঘ।
ভেবেছিলে আমাকে গিলে নিচ্ছে আমারই আয়না।
সাবটেরানিয়ান
বাগানের ময়লা দেখে তোমার চোখের কথা মনে পড়ল। যেমন
প্রবাসের শীতকালে ঘরের জানালার আলো উঠে আসে আর নিজের
অস্তিত্বকে ধীর লাগে। শান্ত লাগে। মুগ্ধকর লাগে।
আবর্জনাকে ক্ষমা করার মধ্যে প্রেমের সার্থকতা আছে। তোমার স্তনবৃন্ত
শক্ত হয় আমার কথা ভাবলে।
আমি জানি।
তবু
বিরাট একটা কালো গ্লোবে লাল একটা পিঁপড়ে। কিংবা
বিরাট একটা লাল গ্লোবে কালো একটা পিঁপড়ে।
চোখের জল আড়াল করতে ভূগর্ভস্থ নদীর কাছে যাবো।
কাগজফুল
বোঝাই যাচ্ছে না ইয়ার্কিগুলো উড়ে বেড়াচ্ছে বাতাসে। ওরা প্রজ্ঞাকে
ছুঁয়ে দিচ্ছে। অভিজ্ঞতাকে ছুঁয়ে দিচ্ছে। রং পেনসিল গায়ে লাগলেই
‘উহ্!’ করে উঠছে।
তুমি আমাকে চুমু খাওয়ার আগে আমি সবকিছু জানতাম। তোমাকে
চুমু খেয়ে আমি সবকিছুই জেনেছি।
তবু বন্দরে জাহাজ দেখে মনে হল পুঞ্জিভূত মৌচাক জলে ভেসে যাবে।
একটা মৈথুন মালগাড়ির চেয়েও ধীর হতে পারে। যেমন লক্ষ বছর
আগেকার আলো নক্ষত্র হয়ে আমাদের চোখে ভাসে।
যেমন
একটা ঝিঁঝিঁপোকার মরণ কাগজফুল ফোটার চেয়েও
নিঃশব্দে ঘটে যেতে পারে।
সবুজ লাঠি
একটা সবুজ লাঠি আমাকে পৃথিবী সম্পর্কে সবকিছু বুঝিয়ে দিয়েছে। কুকুর
সম্পর্কে সবকিছু বুঝিয়ে দিয়েছে।
কুকুর। সোনালি কুকুর। পৃথিবীর পিউবিক হেয়ার সোনালি রঙের নয়।
পৃথিবীতে কোনোকিছুই নেই যা পৃথিবীর চেয়ে আলাদা। প্রেম নেই। ভালোবাসা
নেই। তীব্র ঘৃণা নেই। বিমূর্ততা নেই।
পৃথিবীর কথা শুনলেই যাঁরা হাই তোলেন- আমার কাছে নেই তাঁদের
প্রাসাদের চাবি।
ভ্রমরের সঙ্গে কিছুক্ষণ
ভ্রমরের সঙ্গে তুমি কতদূর যাবে। বাতাসে হাত ঘুরিয়ে আমি
বানাতে চেয়েছিলাম কুসুমের আদল। তার মধ্যে তর্জনী দিলে
সিক্ততার প্রশ্রয় পাওয়া যায়। যেমন রোদের মধ্যে রেনকোট
নরম হয়ে আসে।
রেনকোট। হলুদ রেনকোট। বৃষ্টির মধ্যে বিক্রি হয় না। উড়ে
যাওয়া পাখিদের হলুদ চিৎকার- বৃষ্টির মধ্যে বিক্রি হয় না।
ডিমসেদ্ধ ভেঙে দিলে ধোঁয়া বেরোয়। উত্তাপ বেরোয়। জনমতকে
অগ্রাহ্য করে কেউ কেউ উঠে যায় পাহাড়ের চূড়োয়।
ভাঙা জীবন। অজানা প্রোটিন। ভ্রমরকে ঘিরে তুমি উড়ে বেড়াতে
চাইছো। ফুলের রক্তপাত তোমারই হাসিমুখ বহন করুক।
কফিনের ছেলেমেয়ে
ভেড়ার চোখে আঙুল রেখে বাতাস নিজের ধার পরীক্ষা করছে। যেমন
রাস্তা ভুলে যাওয়া কোনো বেহালার সুর। কিংবা কফিনের ছেলেমেয়েরা
গোরস্থানে নিজেদের ছায়া চুরি করছে।
জীবনের একটা কাঠামো হয়। না-জীবনেরও একটা কাঠামো হয়। স্মৃতিসৌধ
তৈরি হয় শবের আদলে।
ভাবছি একটু রাত হলে মানুষ কেন মানুষের দিকে যায়। ঘরের পিছনে
স্নান করতে আসে আঁধারঝুঁটি পাখিদের দল।
জলে পালক ভিজলে পৃথিবীতে মৃত্যু থাকবে না। হত্যা থাকবে না।
