এপ্রিল ২০২৬-এর কবি অনুপম মুখোপাধ্যায় - একগুচ্ছ কবিতা

 



অনুপম মুখোপাধ্যায় – একগুচ্ছ কবিতা

 

 

তুমি খাও

 

মস্তিষ্কের কোন পেশি দিয়ে তোমার সমগ্র প্রেমজাল আমি ছিঁড়ে

দেখাবো বলোযে বালক বৃত্ত বোঝে না সেও যৌনাঙ্গ

বোঝেতারও কামজ্বর হয়রাস্তার ধারে উলটে থাকা লরির

দৃশ্য দেখে ব্যথিত বালিকারা অজ্ঞান হয়ে যায় 

 

সাদা পায়রা পুষলে তার নিরাপত্তা নিয়ে তোমাকে চিন্তিত

হতে হয়আমাকে নিয়ে কি তুমি ততটাও ভাববে না

 

রোদের মধ্যকার গাঢ় মধু আমার কুড়িয়ে পাওয়া ঝিনুকে

জমে আছেতুমি খাও

 

কালো শাড়ি

 

তোমার মেলে রাখা কালো শাড়ি সূর্যকে আড়াল করছেআমার মুখে

রোদ পড়ছে নাসরাওতোমার বিপুল শাড়ির মধ্যে খাঁখাঁ করছে

শূন্যতাসরাও

 

আর কত শীতকাল তুমি আমাকে দেবেমলাট ছিঁড়ে গেলে

ভূতুড়ে বইয়ের মধ্যেও ঢুকে যায় সূর্যের আয়ুখড়ের চালে

যেমন রোদ্দুর হয়ে শুয়ে থাকে গ্রীষ্মকালীন হলদে বাস্তবতা

 

আমি সরবত ভালোবাসিমিছরি ভালোবাসিতার চেয়েও

ভালবাসি বিস্মৃত সকালের স্বপ্নবরফের জন্য অপেক্ষা করতে করতে

বরফের বাক্সে যেমন জল জমে যায়

 

সরাও

 

হাতল

 

আমার আত্মপরিচয়ে কোনো হাতল রাখা নেইএই দ্রুত জীবনে

তুমি কী ধরে এগোবেপ্রত্যেকটা ভালোবাসার গল্পে দিশাহীন আকাশ

থাকেআর অসীম উদ্ভাসতুমি কোন কম্পাস ধরে এগোবে

 

একটা বাক্যের মধ্যে যদি তুমি থাকো- আমার কাছে সেই বাক্য

অসম্পূর্ণব্যাকরণহীন

 

প্রেমিকার আর্কেটাইপ ভাঙার আওয়াজ

 

ঠিকানাকে ফেলে রেখে গবাদি পশুরা ঘাসের জঙ্গলের দিকে যাচ্ছেজলের

ভিতর থেকে উঠে এসেছে বিস্ময়ের অস্থির আঙুলসাফাইকর্মীরা

ফিরে আসছেন মেধাবী প্রেমিকের সমাধিফলক মুছে

 

তুমি কী ধরে এগোবে

 

যাবজ্জীবন

 

কয়েদিকে চাবি ধরিয়ে দিলেও সে তালা খুলতে পারে না- এই তো

জীবনচেতনার পালক ছুঁয়ে কেঁদে ওঠে পাখি

 

কাজের শেষে ঘরে ফিরলে তবেই তো কাজ

 

তুমি ঘাসের আভার মধ্যে ঢেউ হয়ে ধুয়ে দিচ্ছ আমার শরীরের

ধুলোশান্ত ঢেউকথোপকথনের ঢেউএই তো

প্রেমএই তো জীবন

 

শুধু আগুন নেই বলেই একটা অগ্নিকুণ্ডের আজীবন আগুন পাওয়া

হল না

 

শূন্যতার দাঁত

 

বেলুনওয়ালার নিঃশ্বাসে বায়ুমণ্ডল ভরে আছেশূন্যতার দাঁতেই

শূন্যতাকে কামড়ে ধরে গরম টিনের চালে দাঁড়িয়েছে বিড়ালযেমন

কবরখানার একটা কোণে পৌঁছে মানুষ নিজের জন্য অপেক্ষা করে

 

জলে কারো ছায়া পড়লেই জলছবি হয় কিজলের নিজস্ব শর্ত থাকে

 

পৃথিবীতে কোনো ছবিই শেষ হয় না- শিল্পী যখন চান তখন ছবি শেষ

 

বাঁশির ছিদ্র যেহেতু নৌকোয় বসাতে নেই 

 

গল্পসারাই

 

কাহিনির বিফলতা দেখে কাহিনিকারের চোখে জল চলে এলকুয়াশার

আড়ালে তখন হাতিটা রেললাইন পেরোচ্ছেহাতির নাম সরস্বতীনামটা

লক্ষ্মীও হতে পারতো

 

দৈববাণীর সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে কিশোর তার ঘুড়ি ওড়াচ্ছেছায়া ফাটিয়ে

ঢুকে আসছে রৌদ্রতৃষ্ণার্ত মানুষ যেমন তার তৃপ্তির অবশেষ

জলে ডুবিয়ে দ্যায়

 

প্রচুর শব্দ করছে বাতাস- এখনই মাস্তুল থেকে নাবিক পড়ে যাবে- লেফাফা

ছিঁড়ে উড়ে বেরিয়ে যাবে চিঠিএসব কাহিনিজলের উপর আঁকা হচ্ছে

জলপোকাদের আস্থা

 

লেখকের ডাক শুনে রাজমিস্ত্রিরা দল বেঁধে আসছেনএখনই

সারাই হবে গল্পের ক্ষত

 

সম্পর্ক যেভাবে শেষ

 

সুন্দরীর সামনে দাঁড়িয়ে বুঝে নিই নশ্বরতার সীমাযেমন

লরির টায়ারের তলায় ঘুমিয়ে থাকে মরু-গিরগিটিঅথচ

আমি বালিআমি নীল আকাশআমিই তোমার মুক্তাভ

ঝকঝকে দাঁত

 

আকাশ থেকে খসে পড়া সাদা হাড় দেখে ভেবেছিলাম

সাদা পায়রাআর তুমি দেখেছিলে সাঁজোয়া গাড়ির মতো

মেঘ

 

ভেবেছিলে আমাকে গিলে নিচ্ছে আমারই আয়না

 

সাবটেরানিয়ান

 

বাগানের ময়লা দেখে তোমার চোখের কথা মনে পড়লযেমন

প্রবাসের শীতকালে ঘরের জানালার আলো উঠে আসে আর নিজের

অস্তিত্বকে ধীর লাগেশান্ত লাগেমুগ্ধকর লাগে

 

আবর্জনাকে ক্ষমা করার মধ্যে প্রেমের সার্থকতা আছেতোমার স্তনবৃন্ত

শক্ত হয় আমার কথা ভাবলে

 

আমি জানি

 

তবু বিরাট একটা কালো গ্লোবে লাল একটা পিঁপড়েকিংবা

বিরাট একটা লাল গ্লোবে কালো একটা পিঁপড়ে

 

চোখের জল আড়াল করতে ভূগর্ভস্থ নদীর কাছে যাবো

 

কাগজফুল

 

বোঝাই যাচ্ছে না ইয়ার্কিগুলো উড়ে বেড়াচ্ছে বাতাসেওরা প্রজ্ঞাকে

ছুঁয়ে দিচ্ছেঅভিজ্ঞতাকে ছুঁয়ে দিচ্ছেরং পেনসিল গায়ে লাগলেই

উহ্‌!’ করে উঠছে

 

তুমি আমাকে চুমু খাওয়ার আগে আমি সবকিছু জানতামতোমাকে

চুমু খেয়ে আমি সবকিছুই জেনেছি

 

তবু বন্দরে জাহাজ দেখে মনে হল পুঞ্জিভূত মৌচাক জলে ভেসে যাবে

 

একটা মৈথুন মালগাড়ির চেয়েও ধীর হতে পারেযেমন লক্ষ বছর

আগেকার আলো নক্ষত্র হয়ে আমাদের চোখে ভাসে

 

যেমন একটা ঝিঁঝিঁপোকার মরণ কাগজফুল ফোটার চেয়েও

নিঃশব্দে ঘটে যেতে পারে

 

সবুজ লাঠি

 

একটা সবুজ লাঠি আমাকে পৃথিবী সম্পর্কে সবকিছু বুঝিয়ে দিয়েছেকুকুর

সম্পর্কে সবকিছু বুঝিয়ে দিয়েছে

 

কুকুরসোনালি কুকুরপৃথিবীর পিউবিক হেয়ার সোনালি রঙের নয়

 

পৃথিবীতে কোনোকিছুই নেই যা পৃথিবীর চেয়ে আলাদাপ্রেম নেইভালোবাসা

নেইতীব্র ঘৃণা নেইবিমূর্ততা নেই

 

পৃথিবীর কথা শুনলেই যাঁরা হাই তোলেন- আমার কাছে নেই তাঁদের

প্রাসাদের চাবি 

 

ভ্রমরের সঙ্গে কিছুক্ষণ

 

ভ্রমরের সঙ্গে তুমি কতদূর যাবেবাতাসে হাত ঘুরিয়ে আমি

বানাতে চেয়েছিলাম কুসুমের আদলতার মধ্যে তর্জনী দিলে

সিক্ততার প্রশ্রয় পাওয়া যায়যেমন রোদের মধ্যে রেনকোট

নরম হয়ে আসে

 

রেনকোটহলুদ রেনকোটবৃষ্টির মধ্যে বিক্রি হয় নাউড়ে

যাওয়া পাখিদের হলুদ চিৎকার- বৃষ্টির মধ্যে বিক্রি হয় না

 

ডিমসেদ্ধ ভেঙে দিলে ধোঁয়া বেরোয়উত্তাপ বেরোয়জনমতকে

অগ্রাহ্য করে কেউ কেউ উঠে যায় পাহাড়ের চূড়োয়

 

ভাঙা জীবনঅজানা প্রোটিনভ্রমরকে ঘিরে তুমি উড়ে বেড়াতে

চাইছোফুলের রক্তপাত তোমারই হাসিমুখ বহন করুক

 

কফিনের ছেলেমেয়ে

 

ভেড়ার চোখে আঙুল রেখে বাতাস নিজের ধার পরীক্ষা করছেযেমন

রাস্তা ভুলে যাওয়া কোনো বেহালার সুরকিংবা কফিনের ছেলেমেয়েরা

গোরস্থানে নিজেদের ছায়া চুরি করছে

 

জীবনের একটা কাঠামো হয়না-জীবনেরও একটা কাঠামো হয়স্মৃতিসৌধ

তৈরি হয় শবের আদলে

 

ভাবছি একটু রাত হলে মানুষ কেন মানুষের দিকে যায়ঘরের পিছনে

স্নান করতে আসে আঁধারঝুঁটি পাখিদের দল

 

জলে পালক ভিজলে পৃথিবীতে মৃত্যু থাকবে নাহত্যা থাকবে না