হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় একগুচ্ছ কবিতা
সফর-নীল জোনাকি
শ্বাস-প্রশ্বাস
------------------------------------
এক
এই যে দূরে দাঁড়িয়ে আছো গাছের থেকে, অথবা খুবই কাছে, আসলে আমার ভাবনাতেই গাছের ঢুকে পড়ার এখনও কোনও প্রবেশপথ দেখা যায়নি বলেই সকালে গানের কোনও প্রয়োজন পড়েনি এবং এইভাবে গানহীন মরুভূমির সকল শর্ত আমাদের জ্ঞাতসারে সাদা পাতায় পরপর সাজানো আছে এবং আমরা মরে যাব অথবা ধ্বংসের সর্বোচ্চ উচ্চতায় উঠেও খুঁজে পাব না আমাদের শুকিয়ে যাবার সমীকরণ আর পরেও চারপাশ ঢেউহীন থাকবে এই ভেবে যে এখনও গানের কান ঠিকঠিক ভাবে গঠন হয়নি পরম্পরার অভাবে
দুই
ভুলে যাওয়ার পরে আরও একটা ভুলে যাওয়া, কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা অবাধ্য সকাল, সবটুকুই মনে না পড়ার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে এবং আবহাওয়ার এলোমেলো ভাব হয়তো নয় কিন্তু তবুও মনে মনে কেউ ঠিক করে নেয় এইভাবেই স্থির দাঁড়িয়ে থাকা, কোনোভাবেই হাত পা না ছোঁড়া ---- যাবতীয় শরীরী ভাষার যোগফল কোথাও কিছু মনে না পড়ার মতো করে ঘরের এক কোণে ঘুমিয়ে আছে এবং এইভাবেই পরপর মনের গোপন কোণ থেকে হারিয়ে যাওয়ার এক প্রতিবন্ধক আবহাওয়া
তিন
আমিষ আবহাওয়ায় যাবতীয় জল খেলা এবং মাছের মতো এক গভীর দেশের বাসিন্দা হয়েও কোথায় কে যেন ফুল ছিঁড়ে ফেলেছে, এমন একটি অভিযোগের ভেতর কেন জানি না কিভাবে ঢুকে যেতে হয়, অথচ আমার কোনও কিছুতেই সায় নেই, তবুও আমরা কিভাবে যেন বলে ফেলছি আমাদের যাবতীয় যাত্রার সাজ যদিও বহু প্রাচীন তবুও কোথাও কোনও এক বিন্দুতে মিল আছে এবং এই মিলের পথেই দেখা মিলবে বৃহতের ---- এ শুধু প্রচার নয়, আমাদের ভেতরে এক স্বগত কোলাহল
চার
গাছের ভেতর থেকে সরে গেছে সবক’টি ঘর, কোলাহলে ব্যস্ত ছিল সমস্ত ডালপালা, রাস্তা চলতে চলতে ভুলে যাওয়া কোথায় থাকে অথবা সামনে হঠাৎ করে কি উদয় হয় গন্তব্যের গন্ধ—মনে তো রাখতে হয় না, কক্ষপথে পা দিলেই খুলে খুলে যায় পথ, তুমি শুধু পা রাখো মাটির কাছাকাছি— এখন কান পাতলে শুধু হাওয়া আসে, বুঝতে পারি কেউ একজন অথবা অনেকজনা হাত বাড়িয়ে তুলে নিতে চাইছে পাতায় পাতায় মিশে থাকা ঘুমানো আগুন কিন্তু সে কল কোথায় খুলবে— উচ্চারণেই ধ্বনিত হবে মাটির পাতার ওপারে পাঠশালার ঘন্টা
পাঁচ
আলোকের মাথা থেকে উড়ে গেল জল। তোমার পরিচয় জলের হাত। অথচ জলের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে তুমি এখন আকাশমুখো। কেউ তোমার পরিচয় ভালো করে খুলেও দেখেনি। কিন্তু কত কত কথা হচ্ছে তোমার নামে। তোমার নাম তো একটা পাখি। উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে যখন সে জলের কাছে আসে তখন সবটুকুই একটা দমকা হাওয়া। কাউকে উড়িয়ে দেওয়া তার ইচ্ছেয় নেই। সে শুধু ছড়া বলে অথবা গানের এক আধটা কলি— এখান থেকে সোজা পৌঁছে যাওয়া যায় ঘরের পাতার একেবারে ভেতর অঞ্চলে যেখানে আলো আসার পথে যেকোনো অর্ধবাক্য মাটিতে পড়ার আগেই উড়ে যায়
ছয়
কুঠিদলের পরের স্টেশন হাপারিয়া—ঢেউবলের জোড়াতানে আমরা কোথাও কোথাও এমন ছোটো হয়ে যাই, মুখে বললেও বুঝতে পারি পা জোড়া ঠিক নেই অথবা এমন কোথাও একটা হেলে আছে যে আমরা ঠিক জানি না সেটা কোনও পক্ষের সমর্থন কিনা আর তাই চেনা স্টেশনও গুলিয়ে যায়—আমাদেরই জল অথচ চোখের সামনে দিয়ে এমনভাবে উড়ে যায়, মনে হয় আমাদের আরও আগে জেগে ওঠা উচিত ছিল
সাত
গড়িয়ে পড়লেই গোল হয়ে যায়—কেউ পরিধি এঁকে দেয়নি—আমাদেরই সম্বলের ভেতর বেশ কিছু অঞ্চল যা এখন তোমারই চৌহদ্দি বলে পরিচিতি পেয়েছে—এটাই তো শেষ বাঁশি নয়—এখনও দুপুরের ভাত হয়নি—এখনই বিকেলের গলায় গেয়ে উঠছো কেন—তোমার জন্যে জল বসে নেই—আওয়াজের আগেই সমুদ্রের ডাক এসে ঘুম ভাঙিয়ে দেবে
আট
এবার বলো কোনদিকে যাবে—ফণা তো গায়েই লেগে আছে—একে কি উন্মাদনা বলে—বলে ফেলো পাহাড়ের সবটুকু ঘোষণা—জানি সবটুকু মনে রাখা যায় না—তবুও তুমি যতটুকু বলে যাবে সে আসলে তোমার বাড়ানো হাত, সকাল থেকে রাতের যাবতীয় ঘোষণা
নয়
ফুলের মতো ঘিরে
রেখেছো
কেন
ঘর?
চারদেয়াল তো
চার
পৃথিবী। খুঁজে
পাওনি
বলেই
কি
এক
নামে
সবটাকে
বেঁধে
ফেলার
চেষ্টা?
এতদিনের পরিশ্রমে কি
হাত
দুটোকেও চিনতে
পেরেছো? সেই
এক
সমীকরণে ফেলে
সমাধান?
ঘর মানেই বুঝি
সবটুকু
চেনা?
জেনো,
এ
তোমার
শৈশব।
স্বরবর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণ ভাঙতে
ভাঙতেই
তো
বাক্যের পৃথিবী।
চারদেয়াল তোমার বানানো সমীকরণে বদ্ধ
পৃথিবী।
জেনো ওপারেই আছে
কুয়াশার কোলাহল।
দেয়াল ভাঙলেই এক
ধাক্কায় উড়ে
যাবে
তোমার সমীকরণের পৃথিবী
দশ
ঘরের পাতায় একটি
প্রদীপ। একঘর
আলো।
প্রদীপের আলোয়
একটি
পাতা।
আলোর
পাতা।
আলো
এমনই।
সরলরেখায়। চারপাশ।
ঘর বলতে দাঁতের প্রবাহ থেকে বেরিয়ে এসে হাওদাখানার মাঠে ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ। ব্যক্তিগল্পের ভেতর কোনও আলোর মানুষ। অথবা হাওদাখানার মাঠে আলোর থাম— খোড়োচালে লম্পর কথকতা।
এগারো
পথের ভেতরেও আছে
একটি
পাখি।
মনে
হয়
না,
পথ
যেন
উড়ে
উড়ে
কোথায়
উড়ে
যাচ্ছে?
তাই
তো
চেনা
পথে
হাঁটতে
হাঁটতে
খুঁজে
পাই
না
চেনা
সুর।
সুর তো ফুলেরই একটি নাম। ফুলের ভেতরে বদলে বদলে যায় কি রং? অথবা কোনোই দাগ নেই, এমনই যেন সকলের চোখের অচেনা হয়ে পথের ধারে শুয়ে আছে?
বারো
এসো জল হাত
দিই
তোমার
বুকে।
যদিও
জানি
কোথাও
কোনও
আগুন
নেই।
তবুও
মাঝে
মাঝেই
হাওয়ায়
কিছু
না
কিছু
ভেসে
আসে।
সেসব
রংদার
কিছু
নয়।
বরং
অনেক
বেশি
নিশ্চুপ নিজের
পরিধি
পরিচয়ে।
