মে ২০২৬-এর কবি অর্ণব সামন্তের কবিতাগুচ্ছ

 


অর্ণব সামন্ত কবিতাগুচ্ছ

 

  

সৃজনের পথে

 

সংস্কার খুলে খুলে যায় তবু কিছু কাঁচ 

ঘিরে রাখে আলো আত্মাভিমানের মতন

কিছু খেদ, কিছু খিদে শরীর মন জ্বালায় 

ভুলে যাই শিখরে আমার ঘর , সিংহবিক্রম 

সময়ের চোখে জমা হয় কুয়াশা , তুষার , মেঘের আস্তরণ 

তুমি বসে থাকো খিড়কি হাট করে খুলে 

টের পাওনি কখন ঘূর্ণবাত্যা ভেঙেছে তোমার ঘর 

নিয়ে গেছে নিত্যনতুন শিল্পিত সৃজনের পথে !

 

  

 বৃত্ত

 

 

বৃত্ত সম্পূর্ণ হতে কতটা পরিধি পরিক্রমা বাকি ?

পরিব্রাজক জীবনে তা' বোঝার আগেই 

খসে পড়বো, মায়া চাদর মোহমুদ্গরের এক ধাক্কায়

বর্তির বিলে ডুবে যাচ্ছে হংসহংসিনী ডুবসাঁতারে

আবার ভেসে উঠছে ভুস করে জানালার পালকে হীরেকুচি জল নিয়ে 

ভালোবেসে ভালোবেসে প্রথম জলজ প্রাণী হবার চেষ্টা করছে 

স্থলপদ্মের মতন ফুটে থাকছে রঙ বদলে মুহূর্তে মুহূর্তে 

ফুরসত পেলেই অ্যালবাট্রসের ডানায় সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছে 

কখন যে সমুদ্র হয়ে যাচ্ছে কখন পাহাড় পর্বত মালভূমি 

মন্দারমনি ছুঁয়ে চলে যাচ্ছে মোহনার গভীর থেকে আরও গভীরে

বৃত্ত সম্পূর্ণ হতে আর কত আকাশ পেরোতে হবে সুব্রতা ?

আর কত সময়কে স্বাধীনতা , সংস্কারবিহীন করে দিতে হবে ?

 মুক্তির আবেগ আশ্লেষ লেগে যাবে শরীরে মনে সত্তায় 

পরিব্রাজক জীবন আজ একা নয় অনিবার্য মাধুকরী

এইভাবে কবিতাময় গানময় নৃত্যময় হয়ে 

যুগল নিশ্চয়ই উড়ে যাবে শুন্যপুরের দিকে 

বুকে এক জগতপ্লাবিত ঢেউ নিয়ে একক সহজ গানের মুর্চ্ছনায় ... !

 

 

 

গহনের মেঘমল্লারে

 

গহন মেঘের সংঘর্ষ থেকে এত যে গহীন উঠে আসে

ধারাপাতে ঝরতে থাকে রূপ, লাবণ্য , কামনাবাসনা অহং, লিবিডো 

হাওয়া ডাকে ভেতরের মাতঙ্গকে বীজ বপন করতে

সেই প্রাগৈতিহাসিক থেকে নদীভিত্তিক সভ্যতা‌ এগোচ্ছে 

শিকারভিত্তিক, কৃষিভিত্তিক সেই সঙ্গে জাল বিছাচ্ছে 

সৃষ্টির আদিতে ফিরে মানব মানবী সমস্ত কমপ্লেক্স ফেলে 

সমুদ্র জলে, আগ্নেয়গিরির লাভায় বাষ্পে, সহজ সরল 

জীবন জেগে উঠছে বিদ্যুচ্চমকের যাপনে যাপনে

সংঘর্ষ দ্বন্দ্ব ঝগড়া ভূমিকম্প ভেঙ্গে ভেঙ্গে খুশির তুফান 

ভাসিয়ে দিচ্ছে সমস্ত কফির ক্যাফেতে , ঘাসের বিছানায় 

নদীর জলের গভীরে যেতে চাইছে ঘূর্ণিজল

 

ডুবসাঁতারে ডুবসাঁতারে অমল ভাসানের গান গাইতে

বিপর্যয়ে বিপর্যয়ে কখন যে সমস্ত সহজিয়া গান হয়ে উঠছে 

মেঘযুবক মেঘযুবতী দীপকে মেঘমল্লারে দহনে দহনে

গহীন তুলে আনছে অনুপম কবিতার মতো ... !

                                                                          

 

সাক্ষাৎকার , একটি দুপুরের সঙ্গে

 

পাওয়া গেল এমন এক রাজকন্যার মুখশ্রী 

যার জন্য অনেক জাহাজ ধ্বংস হয়েছে যুদ্ধের অনুপ্রেরণায় 

জ্যোৎস্নার মতন নেমে এসেছে আফ্রোদিতি পৃথিবীর বুকে 

রহস্যময়ী নীহারিকা চোখে দাঁড়িয়েছে ক্লিওপেট্রা 

ভূমিকম্পের আগে কবুতর জোড়া উড়েছে অবিরাম 

কোনো আড়ালে থাকা পদ্মবুকে তখনো লেগেছিল শিশির

দমকা হওয়ার মতন দীর্ঘশ্বাস পুকুরের বুকে কাঁপুনি তুলেছে 

অতীত ভবিষ্যতের সুতো টেনে বর্তমান হাস্যমুখে উদ্ভাসিত 

নৈঃশব্দে হারানোর আগে মিষ্টি কথকতা উঠে এসেছে 

টুকরো টুকরো শব্দের শরীর , আদরে আদরে আদুরে স্বরবর্ণ স্থাপন

ওগো দুপুর তোমার মন নেই , মন নেই ,

একটি সত্তা ভালোবাসা মাখামাখি হয়ে পড়ে আছে আরেক সত্তার বুকে 

ঘুঘু জোড়া তখনো মোৎসার্ট সিম্ফনি তুলছে ব্যালকনিতে , গাছের শাখা-প্রশাখায়

একটি ঠোঁট জোড়া আকুলতার সঙ্গে অপেক্ষমান আরেক ঠোঁট জোড়ার পুষ্টির জন্য !

                                                                          

 

 

 সহজ গানের কিসসা

 

সহজ গান হয়ে বসে আছো অগ্নি নদীবুকে, সমুদ্রসৈকতে 

আগ্নেয় লাভার মতন শব্দগুলি দমকে দমকে ছন্দে ছোঁড়ো 

দুবুকে অজন্তা ইলোরা কারুবাসনার কারুকার্যে উজ্বল 

মোহনায় উত্তাল অরণ্য ভয় দিয়ে অভয়ের ঘরে ঠ্যালে 

ভাটিয়ালি ভাওয়াইয়া হয়ে সেই পথ ঘুরে গ্যাছে জলের গভীরে 

জল আবার যেতে চায় জলের আরও গভীরে গহীনে 

পাললিক হয়ে যায় আগ্নেয়শিলার মাতনে মাতনে দীপক মল্লার মারিয়ানার 

বিদ্যুচ্চমকে বিদ্যুচ্চমকে বিদ্যুৎ নিজেই জানে না কখন সে অপত্যের আলো !

এভাবে সহজ গান হয়ে এসো , কড়ি কোমলে গড়ো স্বরবিতান গীতবিতান 

এভাবে আগুন জ্বালালে দীর্ঘশ্বাস দীর্ঘতর ঢেউগুলি ফুলেফেঁপে ওঠে 

সহজ গান হয়ে বসো গানের মুখেই ঝালায় ঝালায় রবিশঙ্কর 

হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া ভেসে আসে মনপবনের নোয়ার নৌকায় 

গানে গান মিশে হয়ে যায় চানঘরে সহজতম গানের সঞ্চারী !

 

             

 জ্যোৎস্নার ঋণ

 

বারংবার ছুটে গেছি জ্যোৎস্নার ঋণে স্বরবর্ণ স্থাপনে

অরণ্য আদিম ডেকেছে তার গুহাপথে অজন্তা ইলোরায় 

দুরন্ত বাইসন ছুটে গেছে আলতামিরার সৌন্দর্যে , লাবণ্যে 

আবেগে আশ্লেষে দীর্ঘশ্বাসে নদী সহজাতভাবে 

সহজ গানের সহজিয়া সুর নিয়ে উচ্ছল হয়েছে

পাহাড় পর্বত উপত্যকা মালভূমি সমভূমি পেরিয়ে 

ঝপাং পড়েছে মোহনার মারিয়ানা খাতে

অকথ্য হর্ষে জীবন পেয়েছে সাফল্যের এভারেস্ট তুষারশুভ্রতা নীলিমাসমেত 

বারংবার ছুটে গেছি জ্যোৎস্নার ঋণে জ্যোৎস্না সম্প্রপাতে 

রক্তমেদমজ্জাস্নায়ু সম্ভারে জ্বলেছে আলো অমলিন

জীবনকে করেছে উজ্জীবিত, মরণকে করেছে জীবনের চেয়েও বেশি জীবন্ত 

তুমি এসে হাত ধরো, আরশিতে দেখতে দাও আমিকে আমার মতন 

আমাকে আরশি করে তুমি তোমাকে দ্যাখো তোমার মতন 

ঘুরেফিরে সেই অমল জ্যোৎস্নার স্নিগ্ধতা দীপ্যমানতা বহমান ....

                                                                           

 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন