তৈমুর খান গুচ্ছ কবিতা
১
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপনের কাছে রোজ এসে দাঁড়াই
দেখতে দেখতে ভরে যায় পাড়া
ঈশ্বরকেও এখন আর দেখা যায়
না
বিজ্ঞাপন ছাড়া
বৃষ্টি আসবে তাই রোদ বিজ্ঞাপন
দেয়
মেঘের ভেলা ভাসলে তবে আগমনী
গায়
প্রেমের বিজ্ঞাপনে আজও কেউ
কেউ হাসে
রাধা-কৃষ্ণের বিজ্ঞাপনে জমে
পরকীয়া…
জ্যোৎস্না তবে রাতের বিজ্ঞাপন
মৃত্যু এসে লিখিয়ে নেয় জীবনের গান
২
বিমূঢ় মানুষ সব
সিঁড়ির পর সিঁড়ি
নেমে আসে ঝরনার আবেগ
খুঁজে পায় মোহনার মেঘ
মাঠে মাঠে নিশানার স্ট্যাচু
স্মৃতির মালা পরে
কাকে ডাকে রোজ ?
ইতিহাস চেয়ে থাকে
যুগের আরোগ্য কলোনি থেকে
দ্যাখে সব লোক
হাসপাতালগুলি সেবাশ্রম বিলি
করে
আর তাদের মসৃণ নার্সেরা এসে
স্বপ্ন দিয়ে যায়
বিমূঢ় মানুষ সব বাঁচে
বেঁচে থেকে তারা স্বপ্ন খায়
৩
জানালার ওপারের মুখ
মেঘের পুলকগুলি হাসির বাতাসা
খায়
গাঢ় হয় সম্পর্কের ভাষা
তবুও বিশ্বাস কাঁদে, ঘরে ঘরে
উত্তুঙ্গ নিরাশা
ঝড়ের শ্রাবণ দোলে, এপারে ওপারে
নৌকা যায়
নৌকায় দোলে মাছগুলি
আহা চকচকে মাছেদের আঁশ
রৌদ্রের বাঁশি হাতে নেমে আসে
জাগরণ
সেও এক ভাষাপাখি, গান তার উদাসীন
গায়
পথ জুড়ে খেলা করে বর্ষণের
ক্রিয়া
যা দেখে জুড়ায় হিয়া জানালার
ওপারের মুখ বহুদিন পর ভাবে
আজ সে লিখবে এক পূর্ণ সংবাদ…
৪
নিয়ত সঙ্গমলীলা
হরিণেরা খেয়ে যায় নিঃশব্দ বাগান
আমরা বরণীয় হই চারপাশে গান
অনন্তর ঝিলিকরেখা স্বরবর্ণে
বাজে
উচ্চারণ অমুদ্রিত বোঝে না সহজে
জীবন কুড়িয়ে নেয় ভাঙা ব্যঞ্জন
কিছুটা বিগত ক্ষুধা বিমূর্ত
সাধন
দৈবের গৃহস্থ আলো না চাওয়া
জল
কাঙ্ক্ষিত বসুধা থেকে ছোটে
মৃগদল
বনপথ জুড়ে আসে মোহন বিলাস
পথে কার সর্বনাশ কার অভিলাষ
দেখা যায় না তবু আছে, থাকার
কারণে
নদীও বিহ্বলবতী বন্যাবর্ষণে
এসব তিষ্ঠতা থেকে মৃগনাভি জ্বলে
ওঁ স্বাহা পর্যটনে বেঁচে যায়
মরার বদলে
৫
তিমির প্রবাহ
সরসীবোধের জলে নামে ভাগ্যবতী
অনিমিখ আয়নায় জ্বলে ধ্রুবজ্যোতি
বাক্যবাণ সহনশীল ধৈর্য তিমির
নাচে বীর্য অবিভাজ্য উন্নত
শির
দৈব ক্ষরণ থেকে আলো ঝরে তার
আলোকে বানায় কৌতুক চন্দ্রহার
নিকট মদনমেঘ বৃষ্টি কাতর
বর্ষণের অগ্নিবাণে কাঁপায় প্রহর
পেছনে শৌর্যের কাল ঐতিহ্য বিস্তার
উৎসমুখ খুলে দিয়ে ডাকে আদিম
জ্বর
পথেও হারায় পথ নিকট বহুদূর
কাম্য জীবনের মুখে অকাম্য সুর
দুর্জয় সময়কাল যদি দেয় ধরা
সরসীবোধের জলে সাঁতার কাটে
ভাগ্যবতীরা
৬
সন্ধিক্ষণ
যে স্টেশনে ট্রেন আমাকে নামিয়ে
দিয়ে গেল
আমি তার কিছুই চিনি না
একটি মেয়ে শুধু কাপড় খুলছে
আর কাপড় পরছে
প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে সভ্যতা
এটা কি শহর নাকি ?
কালো পাথরের মতো হৃৎপিণ্ড পড়ে
আছে
অস্ত সূর্যের আলোয় রোদের উচ্ছ্বাস
নেই
গাছপালা দীর্ঘ ক্রান্তিকালের
ইতিহাস
পাঠ করে চলেছে নীরবে....
ট্রেন আমাকে নামিয়ে দিয়ে গেল
আমি কার কাছে এখন রাখব নিজেকে
এই সন্ধিক্ষণে?
৭
আত্মরতি
একটি কুয়োর কাছে এসে বসে আছি
কুয়োতে কি জল আছে?
বিশুদ্ধ সংশয়হীন জল?
যে জলে নিজেকে দ্যাখে জল
যে জলে আমাকে দেখি আমি
নিম্নমুখী স্রোতের কথা থাক্
এখন পিপাসাবিদ্ধ প্রাণ
বাতাসে বাতাসে খুঁজি আত্মঘ্রাণ
কুয়োর শীতল ছায়া, নরম তরঙ্গ
বুকে তুলে নিতে আসি
আর আন্দোলিত চোখে চোখে
চোখ রেখে রেখে যাই...
৮
আমার নীরব ধর্ম
স্বর্ণকমলগুলি ফুটেছে সরোবরে
গুঞ্জন এসেছে কত গুঞ্জরিত হতে
আমার নীরব ধর্ম, আমার নিশির
খড়কুটো
বিশ্রামে অবিশ্রাম অস্থির হয়েছে
প্রতিবাদ ছিল নাকো, ঘোষণা ছিল
না
নির্বেদ অভ্যাসে শুধু শূন্যতার
রচনা
একটি মানুষ যদি এভাবেই মানুষ
হতে চায়
কাঁটাগুলি কেন রাখো তার রাস্তায়
?
রাস্তা যেমনই হোক লক্ষ্য শুধু
হাঁটা
একটি পৃথিবী থেকে অন্য এক পৃথিবীর
দিকে
আমাদের ভাষার ভিতরে অন্য এক
ভাষা আছে
আমাদের বাঁচার ভিতরে অন্য এক
বাঁচা
৯
আর একটি বসন্ত
নখের হলুদ দাগ এখনো জেগে আছে
শিয়রে ফুটেছে ফুল, পাখিরা ডেকেছে
স্বপ্নের মুকুট পরে আমি
রোজ আসি তোমার
নিকটে।
রঙিন আঙুলের স্পর্শগুলি
সাজিয়ে রাখি স্মৃতির
বাগানে।
আবার যদি নীল জ্যোৎস্না হাসে
আমরা উড়ে যাব
বাসন্তী আকাশে।
তুমি চুল এলোমেলো পরি
আমি যুবক মুসাফির
আলোয় আলোয় খুলে যাবে দ্বার
আমাদের নতুন পৃথিবীর।
১০
নামের তালিকা
একটি ঝরনার পাশে একটি মোরগ
ডেকে উঠল
সূর্যের রোদ পড়েছে
ঘাসে ঘাসে অতিজীবিতের মুখ
কণ্ঠে সকাল দুলছে বালিকার
যুবতী স্রোতের কাছে কে চাইবে
বাঁশি?
বংশীধ্বনিতে পুড়ছে শহর
প্রেমের আরোগ্য নেই
যদিও উদ্বোধন হল হাসপাতাল
মসৃণ নার্সদের শুরু হল চলাফেরা
দীর্ঘ রোগের বিছানায় আমাদের
সহিংস প্রলাপ
একটি মোরগ শুধু কম্পন লেগে
থাকা ডানায়
ডেকে উঠল
গৃহমুখী আলোয় প্রত্যাশার কারুকাজগুলি
হেসে উঠল বলে
ঝরে পড়া ব্যগ্র চুমুগুলি ভাসল
ঝরনায়
ধোঁয়াময় শহর জুড়ে আমাদের
নামের তালিকা
নির্বাচনের কোলাহলে উডতে উড়তে
ঘুরপাক খেল
১১
অভাগীর সন্তান
ধরা যাচ্ছে না পিছল পিতল নাভি
এখানে চৈতন্য বাস করে
দাঁড়কাকগুলি তীর্থ খোঁজে
তীর্থে হাহাকার জমে আছে
তবুও অব্যয়টি ক্রিয়ার পাশে
আলোকিত হতে চায়
কিনারা জুড়ে আঘাত প্রত্যাশার
ধ্বস ছাড়ে , দুধুর্ষু গ্রাসের
কবলে গ্রাম
বসবাস উঠিয়ে দিয়ে উঠে পড়ি
যাযাবর বাসে
লক্ষ্যহীন বেতাল পঞ্চকের দেশ
অবশ্য কারো কারো মাথার দাম
নির্ণীত হয়
আমাদের মাথা নেই , বিগলিত ইন্দ্রিয়
রোজ রাতে জেগে ওঠে সঙ্গমের
ঘ্রাণে
চতুর বিশ্বাস এসে হাত রাখে
যদিও নির্বীজ হাত ব্যঞ্জনায়
সদর্থক হয়
ভুল ব্যাকরণ নিয়ে বুকের বৈরাগী
তার উন্মুক্ত দর্শনে নিষিক্ত
করে রাখে
আমরা পর্যুদস্ত অভাগীর সন্তান
এক একটা গাছ কাটি, স্বপ্নের
উদ্দাম গাছগুলি
১২
কম্পিত বঙ্গদেশ, দগ্ধ বাংলা ভাষী
ভাষাহীন হয়ে যেতে থাকি
আনমনে তোমারই নূপুর বাজে
রাঙা সূর্য তোমার মুখেই লেগে থাকে
জ্যোৎস্নায় শাড়িপরা রাতে
তুমিই ধারণাতীত লাজুক রূপসী
আমি কম্পিত বঙ্গদেশ, দগ্ধ বাংলাভাষী
উদাসীন চেয়ে চেয়ে দেখি
আমারই রক্তে প্রবাহিত নদী
শ্যামল সবুজ মাঠ, কাতর আত্মীয়
কারা এসে দাগ কাটে?
দাগে দাগে অন্ধকার
মৃত প্রজ্ঞার কাছে একা একা কাঁদি
সমৃদ্ধির হাতটুকু ধরবে না এসে?
রাখালিয়ার শেষে বাজাবে না বাঁশি?
মৃদঙ্গে আবার তবে গৌরাঙ্গ হই
গৃহসন্ন্যাসী
মুখর বাংলায় অমরত্ব খুঁজে দেখি…