উজ্জ্বল এক ঝাঁক
পায়রা অনলাইন পত্রিকার দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি বিশেষ সংখ্যা জানুয়ারি ২০২৪ -এ প্রকাশ পেলো।
এতে থাকছে ৩২ জন কবির ৯৭টি কবিতা। যাঁদের কবিতায় উজ্জ্বল এক ঝাঁক পায়রা অনলাইন পত্রিকা
সম্মৃদ্ধ হয়েছে তাঁরা হলেন (ব্র্যাকেটে ক’টি কবিতা প্রকাশ পাচ্ছে জানানো হয়েছে) –
অনিন্দিতা সেন (১),
অন্তরা সরকার (১), অসীম সমাদ্দার (১), ইন্দ্রনীল গাঙ্গুলী (২), ইন্দ্রাণী পাল (৫),
ঋত্বিক চক্রবর্তী (১), ঐন্দ্রিলা বন্দোপাধ্যায় (১), কাঞ্চন রায় (২), তপনকান্তি
মুখার্জি (৩), তৈমুর খান (৫), দেবব্রত রায় (৫), দেবাশিস মুখোপাধ্যায় (৪), নজর উল ইসলাম
(৫), নাসির ওয়াদেন (৫), প্রণব রুদ্র (৫), বিকাশ মন্ডল (২), বিমান মৈত্র (১), রবীন
বসু (৫), রাজদীপ ভট্টাচার্য (৫), রাজেশ গঙ্গোপাধ্যায় (৫), লিটন শব্দকর (১), শতাব্দী
চক্রবর্তী (১), শিবালোক দাস (৫), শীলা বিশ্বাস (৫), শুভঙ্কর দাস (৫), শুভ্রাশ্রী
মাইতি (৫), শোভন মন্ডল (১), শ্রাবণী গুহ (২), সুপ্রভাত মেট্যা (১), সুশীল হাটুই
(২), সৃশর্মিষ্ঠা (২), সৌমিত্র উপাধ্যায় (৩)
এঁদের প্রত্যেককে
“বান্ধবনগর” প্রকাশনী থেকে ৩০০ টাকার কুপন দেওয়া হবে।
এই কুপন ব্যবহার করে বান্ধবনগর থেকে ওই মূল্যের বই কেনা যাবে, কোনো শিপিং চার্জ
লাগবে না।
১ অনিন্দিতা সেন (১টি কবিতা)
দাগ
কত জ্যোৎস্না খাদ
ডুবে গেছে সময়ের নিজস্ব জলাভূমি জুড়ে
আজও তার সাক্ষী কোন
সুবাতাস নেই
এক নদী দুবার
পেরোতে পারেনা মানুষ
একই খালের বুকে জমে
ওঠেনা পবিত্র ইচ্ছের মত সাদা বালি
সঙ্গীহীন রাত্রি
নামে বিলের বুকে
সাদা বালি আর হাওয়া
কেটে নামে পরিযায়ী ডানা
বড় বড় গাছের গায়ে
লেগে থাকে সময়ের নিঃশ্বাস ও কলঙ্ক দাগ!
২ অন্তরা সরকার (১টি কবিতা)
যদি
প্রেম দিলেনা প্রাণে
দুরন্ত
রাতের নৈঃশব্দ্যতায় কারুকার্য নির্মিত বালিঘর ভেঙে পড়ে আছে,
নিষ্ঠুর
কোতোয়ালের ধারালো অস্ত্রে ফালাফালা হৃদের আর্তনাদ।
মনোবল
নেই।
দু’হাতে
আগলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেও সম্পর্কের সলিল সমাধি।
নিষ্ঠুর
অভিযোগে স্নায়ুতে স্নায়ুতে যুদ্ধ।
এই রাত
গাঢ় থেকে গাঢ়তর।
পথ
দেখানোর ধ্রুবতারা নেই,
দিগন্তব্যাপী
উন্মত্ত রাতের শেষে ছিঁটে ফোটা ভাগশেষ নেই ।
তবুও,
তন্দ্রা -জাগরণে কুয়াশা ঘেরা নদী বুকে নিয়ে বেড়াই।
যার
সমাপন নেই, বিস্মৃতি নেই, ধ্বংস নেই।
কেবল
তেজস্ক্রিয় চুম্বকের অলখডোর,
বিবর্ণ
বিকেলের অন্তিম নির্যাস,
জটিল
আবর্তে ক্ষণিকের প্রশস্তি।
৩
অসীম সমাদ্দার (১টি কবিতা)
রয়েছো শুভর
কাছে
তুমি
নারী , পর্দানসিনা , কোন অধিকার নেই প্রয়োগে
খড়ির
গন্ডি মেনে নাও , মাতবে না কোন হুজুগে
শৈশবে
খেলা ছিল রান্নাবাটি আর পুতুল-বিয়ের সাজ
যুবতী
আর জননী হয়ে নিয়েছো সারা দুনিয়ার কাজ
সমাজপতির
বিধান তোমায় বারবার করে আহত
সুস্থ
জীবন ধ্বংস করে ছন্দ হয়েছে ব্যাহত
যারা
ঠেলে দিল পিছনে সন্ধ্যারতির আগে
বজ্রকঠিন
রূপ দেখে শয়তানেরা ভাগে
পৃথিবীর
সব সৃষ্টিতে ছিলে সকলের অগ্রভাগে
ভিঞ্চির
মোনালিসায় বা অসুর নিধনে তোমার স্পর্শ লাগে ,
সংস্কার
আর বিধিনিষেধের বেড়াজাল ভেঙে ফেলে
এগিয়ে
গিয়েছো বহুদূর তুমি প্রসারিত ডানা মেলে
অনাহারে
অনিদ্রায় কাটিয়েছো বহু রাত
সব
লড়াইয়েই জিতে করেছো বাজিমাত
তুমি
মেয়ে ,মা আর প্রেমিকা হয়ে থাকো সবার পাশে
অশুভর
বিসর্জনে রয়েছো শুভর কাছে ।
৪ ইন্দ্রনীল গাঙ্গুলী (২টি কবিতা)
ক)
আলস্য
দুদিনের
বৃষ্টি পাতের পর চারিদিক শান্ত
মেঘলা
বিকেল গড়াতে গড়াতে বারান্দায় এসে ঠেকেছে - গুটি পাকানো উলের বলের মতো।
হয়তো
কোথাও যাওয়ার ছিল আমার - অথবা কোথাও যাওয়ার নেই - সারা বেলা শুধু বসে থাকা
এইভাবে।
যে
ট্রেন খানা আমায় ফেলে ছুটে গেল দূর শহরের উদ্দেশ্যে
বন্ধুরা
- পরিচিতরা - জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে হাত নাড়ল
একটি
বারও তারা কি বুঝল না? - আমারও যাওয়ার ইচ্ছে ছিল?
অথবা
কখনো যেতেই চাইনি আমি!
দুদিনের
হতাশার পর আজ জ্বর ছেড়ে গেছে
কপালে
জল পট্টি
টেবিলে
প্যারাসিটামল
আরোগ্যের
পাখি নেমে এসেছে জানালার কাছে
আর
সমুদ্রের নোনা বাতাস হু হু করে ঢুকে পড়ছে আমার শরীরে।
হয়তো
কোথাও যাওয়ার ছিল আমার
অথবা
কোথাও যাওয়ার নেই
সারা
বেলা শুধু বসে থাকা এইভাবে।
খ)
নতুন প্রেম
আজ
বিকেলে আয়নার সামনে দাড়াতেই হঠাৎ মনে হলো
এ দেহ
খানি বড়ো হালকা হয়ে গেছে
আমার
আর ওষুধের প্রয়োজন নেই
প্রয়োজন
নেই টাকা পয়সা, ভালোবাসা, আলো হাওয়া।
যার
কাছে যত টুকু প্রাপ্য জমে আছে
আমি
অনায়াসে ছেড়ে দিতে পারি তার সব টুকু
আমার
আর লোভ নেই, রাগ নেই, হিংসা নেই।
বড্ড ফুরফুরে
লাগছে
পাখির
পালকের মতো ফুরফুরে
বাতাসে
ভাসতে ভাসতে উড়ে যাব সাগর পেরিয়ে।
নতুন
কবিতা লিখব
রাত্তিরে
গান গাইব
সদ্য
কেনা জামা টি আমি দান করে দেবো ভিখিরিকে।
নতুন
নতুন প্রেমে পড়লে এমনই হয় বুঝি?
৫ ইন্দ্রাণী পাল (৫টি
কবিতা)
ঠোঁটের বত্রিশ ভাঁজে
জ্বলন্ত চুরুট,
সুষমা থেকে চোখ
ফেরানো দায়।
ইঁদুরের উতরোল,
স্বপ্নে হ্যামলিন বাঁশি।
চলো, হারাকিরি করি
অস্তিত্বের
মহালিখারূপ ডিনামাইটে চৌচির
সব পাখি ঘরে ফিরলেও
ব্যান্ডমাস্টার ফেরে না
দুঃখের মহাফেজখানায়
সমবেদনার স্মৃতি
যতবার আমি নিজের কাছে
হারি
এ পৃথিবী ততবার
নবজাতকের।
(খ) প্রতিদ্বন্দ্বী
রাস্তারা হাতের পাতায়
উঠে আসে
নেশাতুর চোখ চাঁদ
খোঁজে
তুমি কি মাথা মুছবে?
এইমাত্র জল থেকে
উঠে এলে?
নবান্নের ধান
গাঙশালিক খেয়ে যায়
অন্ধ চিত্রকর নিপুণ
তুলির ছোঁয়ায় ছবি আঁকে
সারারাত শুকতারার
পরিচর্যা করে আমিও ছোট্ট একটি তারা
হয়ে গেছি
উদ্বিগ্ন জোসেফ,
তোমাদের জন্য এই শহরে কোনো আস্তাবল নেই
জঙ্গলের পথ চিরে
বেদেনী অন্তর্হিত হয়েছে
ঈশ্বরের
প্রতিদ্বন্দ্বী, তুমি আজও ফাঁকতালে বাঁশরি বাজাও।
(গ) উজ্জীবন
স্মৃতির আগুন উসকে
বসে আছি
শীর্ণ হাত। জিরাফের
রাত্রি
সিন্থেটিক হাসি জলের
তলায়
নিভু নিভু ভালবাসা
মনে পড়ে ফুলকারি ও
চড়ুই
গুসকরাগামী ট্রেন
প্যাঁচা ডেকে ওঠে
আধখাওয়া চাঁদ
ধানক্ষেতে নেমে আসে
মাথার ভিতর আগুন
নিভে যাওয়ার আগে দপ
করে জ্বলে ওঠে।
(ঘ) পয়ারের চাঁদ
আমাদের হাঁড়িকাঠ জলমগ্ন হল
আমরা রাস্তায় এসে
দাঁড়িয়েছি
তুমি কি আমাকে
ঊর্ণাজাল ছিঁড়ে দেবে?
বহুরাত নির্ঘুম
কাটিয়েছি
ঘাসের একান্নপীঠে
হেঁটে গেছি একা
পানকৌড়ি ঘুরে ঘুরে
মরে অন্ধকারে
সন্ন্যাসিনীর
রমণকুশলিত নাভি ও শীৎকার
পঞ্চভূত থেকে জন্ম
নেওয়া জীব পঞ্চভূতে মিলিয়ে যায়
আমাদের হাতবাক্স বদল
হতে থাকে
আস্ত ইঁদুরের কাছে
পয়ারের চাঁদ রেখে যাই
ইচ্ছে হলে দাঁতে
ছিঁড়ে কুটিকুটি করুক।
(ঙ) আবাহন
মাঝরাতে সিঙ্গল মল্ট
খেয়ে বাড়ি ফিরি
পার্থক্য তো একটি
শীতের মৃত্যুর
জলচর হাঁসেরা নিজেদের
ভাষায় পাঠ করে আমাদের ভূতগ্রস্ত নদী
ঢিমেতালে সেতুটুকু
ঝমঝম শব্দে পার করে দেয় একটি দুটি হেডলাইট ;
উৎকণ্ঠার ভিতর ফিঙেপাখি লেজ দোলায়
এসো সৌন্দর্য, এসো
অমরত্ব
মহাজাগতিক কেন্দ্রবিন্দু থেকে দীর্ঘশ্বাস ঝরে।
৬ ঋত্বিক
চক্রবর্ত্তী (১টি কবিতা)
অকুস্থল
সবেমাত্র এজাহার নেওয়া হল।
দু’টো
শুকনো চ্যাপ্টা ফুল, খান চারেক
ভাঙা ঝিনুক আর কিছু প্রেমের দস্তাবেজ।
অভিশপ্ত প্যান্ডোরার হাওয়া
গায়ে লাগিয়ে পার পেয়ে গেল ওরা,
‘ আমি গরীব আদমী আছি’ বলে।
এদিকে ক্রাইম সিনেই চলছে
ময়নাতদন্ত ।
সময়ের অভাবে।
শুধু বেড়ে চলেছে
আমার ধ্বংসস্তূপের ক্ষেত্রফল।
৭
ঐন্দ্রিলা বন্দ্যোপাধ্যায় (১টি কবিতা)
জন্মকথা
ব্যাকপ্যাকে
সেঁটে থাকে অতীত
চারিদিকে
নিদারুণ শূন্যতার
মাঝে
ভিক্ষাপাত্র বাড়িয়ে দিই
শিমুলের
কাঁটা
ছেদবিন্দু
অতিক্রম
করে
কখন যেন চলে যায়!
রক্ত ও
আগুনের মাঝে
লুকিয়ে থাকা ফুল ফুটে
ওঠে।
৮ কাঞ্চন রায় (২টি কবিতা)
ক) পর্যবেক্ষণ
পর্যবেক্ষণ করবার জন্য আমি একটি রাস্তাকে বেছে নিয়েছি।
একটি খোয়া ওঠা, ভাংচুর, গ্রাম্য রাস্তা। যেখানে বসতি কম কিংবা এক প্রকার নেই বললেই
চলে। যেখানে জঙ্গল আর জঙ্গল; আনাড়ি দু'চারটা জলাশয়,
বাদবাকী রাস্তা শুধু বেহিসাবী পথ চলে। আমি পর্যবেক্ষণ
করার জন্য
ঠিক এরকমই একটি রাস্তাকে বেছে নিয়েছি এবং জঙ্গল আর
জলাশয় পার হতে হতে আমার সব রকম প্রবীণ ধূসরতার মধ্যে একটু একটু নির্জন নীলের প্রচ্ছন্ন
রং বদল অনবরত পর্যবেক্ষণ করে চলেছি...
খ) অশ্রুত
বোতল বন্দী অশ্রুত তুলে রেখেছিলাম
কয়েক পাতা সময় নষ্টের অজুহাতে।
নানা কীটপতঙ্গ, ফুলদানি থেকে খসে পড়া
বাসি ফুলের নিঃস্পৃহ অবকাশ!
বেশ কয়েকটি দিন, বেশ কয়েকটি মাস।
তারপর? তারপর আবার কোনো বৃষ্টির দিন,
ভিজে যাওয়া জানালার পর্দায় তোমার গন্ধ
মনে হলো, ভয়ংকর কমনীয়!
ঠিক যখন দ্বিখন্ডি আকাশের সূচিকে
কাঁচের গোলাপের মত ভেঙে
নেমে এলো, অসমাপ্ত বিদ্যুৎ ক্ষরণ
এখন, শৌখিন সেই বোতলটিতে
আলতো করে চোখ রেখে দেখি
ভিতরে রক্তের মত কবিতা প্রবাহ
আর তুমি দাঁড়িয়ে আছো, স্থির নদীটির মতো...
৯
তপনকান্তি মুখার্জি (৩টি কবিতা)
ক) মানুষ
বড়ো
অবেলায় প্রেমে পড়ল শ্রাবণী। এখন আর তার সেই রূপ নেই, গন্ধ নেই, রোদও নেই।
শরীরজুড়ে
শুধু আঁধারি ছায়া।তবু...।
যে
মানুষকে ভালবাসল সে, সেও এখন আর নদী নয়। বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস তার নেই, নেই সেই
ছলাৎছল। শুধু বয়ে বেড়ায় সাম্রাজ্যপতনের চিহ্ন। তবু...।
তবু
দুজনেই অগ্নিসাক্ষী করে জাপটে ধরতে চায় উলটোদিকের মানুষটাকে। কেন - এতদিনের জমা
অভিমান উগরে দিতে, অধিকার ফলাতে, নাকি আশ্রয়ের খোঁজে?
খ) আদেখলেপনা
আজ আর
জ্বর আসেনি। এতদিন জ্বর ছিল, খাবার ইচ্ছে ছিলনা। এখন জ্বর নেই, খাবার ইচ্ছে বেড়েছে
বহুগুণ।
কোথায় পাব গরম ভাত? হাত পাতলে মানবতার অপমান,হাত মোচড়াতে গেলে হেরে যাই। বিবেক বড়
দায়,চিবিয়ে খায় মাথা।
আমি
জানি কিছু দামি ধানের দাম, জানি তাদের ঘ্রাণ। কিন্তু আমার পেটে সত্যিকারের কি কোনো
প্রতিবিম্ব আছে তাদের, আছে কোনো বিচ্ছুরণ?
আমার
একদিকে দারিদ্র, অন্যদিকে ধানফুল। দ্রোহকাল উপস্থিত। গন্ধহীন, স্পর্শহীন, কম্পনহীন
শরীরী ভেজা।
গ) প্লাবনের
গান
বৃষ্টি
পড়ছে। এই সন্ধেয় একটু ভিজি। গুঁড়ো গুঁড়ো দুঃখকে উড়িয়ে দিই গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টিতে।
স্মৃতির আঁচল খসে পড়ুক মেঘমল্লার রাগে। মাপা বৃত্ত খানখান হোক দোতলার ওই ছাদে।
নির্জন
আত্মকথনে আটকে থাকি কিছুক্ষণ। হৃদয় যখন কবিতাময়, তখন জলে ভাসে রণিত বলয়।
এক্কাদোক্কা খেলা যাক জীবনের সঙ্গে।
এখন আর
বৃষ্টিতে বৃষ্টি নেই। খেলাশেষে রংভরা স্বপ্নগুলো ছাদে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
আমি জনারণ্যে মিশি বাতি নিভিয়ে।
১০ তৈমুর খান (৫টি কবিতা)
ক) ডানা নির্মাণ
রোজ
ডানা নির্মাণ করি, হালকা নরম দীর্ঘ ডানা
আমাকেই
উড়তে হবে, উড়ান শিক্ষার পর্ব এখন আমার
সবাই
মাটিতে শুয়ে আছে, শুয়ে শুয়ে স্বপ্ন দেখছে বিপ্লবের
ঘরবাড়ি,
প্রেমিক-প্রেমিকা, চন্দ্রযান আর মিথ্যাচার
প্রতিদিন
কতই কসরত চলে; ভাঙা মন, জোড়া মন
ব্যবসাপাতিরও
দোকান জমে
আমার
শুধু ডানা নির্মাণ স্নিগ্ধ নীলাভ আকাশে
যেখানে
অবিনশ্বর আকাঙ্ক্ষারাও তারার মতো জ্বলে
(খ) আত্মরতি
তুমি
তো দেবদারু বৃক্ষ
তোমার
তলায় দাঁড়িয়ে খুঁজি আমার ঈশ্বর
অনেক
জন্ম, অনেক আয়ুর ভিতর
ঘুরপাক
খায় আমার হৃদয়
চিনতে
পারি না ওকে
এই
তৃণভূমি, এই মরুপ্রান্তর, এই জলাশয়
প্রাচীন
বিষণ্ণতার ভাষা জানে
অথবা
উজ্জ্বল হাসি কবে তুলে দিয়েছিল রোদের আঁচলে
তারপর
দীর্ঘপথ, পথেই বিশ্রাম
নিজেই
নিজের মুখের পানে চেয়ে
বারবার
দেখেছি নিজেকে
সমস্ত
জীবিতকাল আত্মরতি গেয়ে গেছে গান
(গ) কৃষ্ণেন্দ্রিয়
ভালোবাসা
আর থাকতে চাইছে না
পুরনো
ভালোবাসাগুলি চলে যাবে এবার
কত
রাতজাগা ক্লান্ত প্রহর গেছে
কত
জ্যোৎস্না খুঁটে খাওয়া শব্দবীজে
স্বপ্নের
ঘরদুয়ার নির্মাণ করেছে
তারপর
কাব্যশরীরে যৌবনের গান
কত গান
অন্ধকার ভেঙে ভেঙে উঠে দাঁড়িয়েছে
এবার
সব গোপন বেরিয়ে পড়েছে
আমাদের
সব বিরহজন্ম
রাধাভাব
থেকে রাগানুগায় পৌঁছাতে চেয়েছে
(ঘ) হাহাকার
হাহাকারের
সঙ্গে আর কথা বলব না
হাসিখুশিদের
বাড়ি কোন্ পুকুরের পাড়ে?
কুমোর
পাড়া ঘুরে রথতলার কাছে
এসে
থেমেছি কিছুক্ষণ—
নতুন
বউ এসে নামল গরুর গাড়ি থেকে;
ওর
ঘোমটা আর পানপাতা মুখের গল্প
আজ আর
বলব না কাউকেই;
শুধু
আওয়াজ উঠবে চপ্পলের
যেন
কৈলাশ থেকে এল মহামায়া
বাংলার
ঘরে ঘরে….
সূর্য
ডুবে গেলে সব অন্ধকার
আমার
ঘরের বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকবে
সেই
পুরনো আদিম হাহাকার!
(ঙ) অসময়ের
বৃষ্টি
ট্রেন
থেকে নেমেই বৃষ্টির সঙ্গেই দেখা হল
এমন
অসময়ে তুমি এলে?
সকাল
দুপুর সব চলে গেছে
নকশী
কাঁথার মাঠে বিকেলের রোদের প্রহর
মেলে
দিয়েছে ছায়া—
কোথায়
হারিয়ে গেল ধানকাটা দিন!
হেমন্ত
বিদায় নিয়ে গেছে পরবাসে
মাঠে
মাঠে শুধু ক্লান্তির দীর্ঘশ্বাস পড়ে আছে…
স্টেশনের
বাইরে কয়েক ফোঁটা অশ্রু শুধু
আর
কিছু নেই
অবেলার
বৃষ্টি তুমি, কেমন করে আমাকে ভেজাবে?
১১ দেবব্রত রায় (৫টি কবিতা)
ক)
হেড-টেলের অ্যালজেবরা
এক
টাকার দাম হেডের দিকেও যা টেলের দিকেও তাই অথচ, জমি-জিরেত জরু গোরু সবই একমাত্র,হেডের
যদিও,একটাকার
দুটো পিঠ = ষোলোআনা অর্থাৎ,কোনো পিঠেরই একজনের কাছে আরেকজনের বে-ইজ্জত হওয়ার
সম্ভাবনাই নেই
অথচ,
হেডই যেন জাতির ভবিষ্যৎ এবং কয়েনের অন্য পিঠটা একেবারেই দলিত- হরিজন
জাতপাতের
পিছনে যে-সমস্ত অ্যালজেবরার
ক্যালকুলেশন
থাকে সে-সব শিঙের মতো
মানুষেরই
মাথা থেকে গজায়
অথচ
একটা কয়েনকে কেন যে শূন্যে ছুড়ে দেওয়া হয় এবং বুড়োআঙুলটা উপরদিকই নির্দেশ করে
খ)
আরোগ্য
একটা
মোরগ ডানার ঝাপটে তার শরীর থেকে সমস্ত অন্ধকার ঝেড়ে ফেললেই, মন-ভালো-করা একটা আলো
ঈশান থেকে নৈঋতকোণ অবধি ছড়িয়ে পড়ে। আর মোরোগটার তুলোট পালকের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে
একটা হার্পসিকর্ড-পিয়ানো
দখিণা-বাতাসে
সেটা সাত-রঙে বেজে উঠলেই, পৃথিবীর সমস্ত অসুখ আরোগ্য পায়
গ)
হাতে একটা স্বপ্নের কলম আছে
রেডিওতে
কাঙালিনি সুফিয়া,রাত সাড়ে-আটটায় মনফাগুন আর হাতের খবর-কাগজটা নামিয়ে রেখে মায়ের
ডেইলিকার চিন্তা, আজ কী-যে রাঁধব
এই
মুহূর্তে আমার পাশের ভাঙা টুলটাতে ভাগাভাগি করে শার্লক হোমস আর,জেমসবন্ড বসে আছেন।
অথচ নিরুদ্দেশের কলমে বিজ্ঞাপন দিয়েও,ব্যোমকেশ বকশি-রা দশ-টাকায় দু-টো
ফুলকপি,দু-পাঁচ-টাকার কানাবেগুন,দাগি আলু, মুলো...ইত্যাদির একটা হাট-বাজারও খুঁজেই
পাচ্ছেন না
তবে এই
নেই-নেই-এর দশকেও আমার হাতে একটা স্বপ্নের কলম আছে
ঘ)
মনোগত
প্রেসক্রিপশন
অনুযায়ী প্রতি-রাতেই একটা করে নাইট্রোজেন-টেন আমার পথ্য।অথচ প্রায়-দিনই সেটা
বালিশের তলায় রেখে আমি দিব্বি ঘুমিয়ে পড়ি
আলোর
বেড-সুইচখানা হাতের মুঠোয় আছে জেনে অন্ধকারেই বালাপোশটা দিব্যি শরীরে টেনে নিই
যদিও
রিভলবারটি হাতের কাছে পাওয়া মাত্রই, আমার আঙুলগুলো নিশপিশ করে।
পৃথিবীর
সমস্ত অন্ধকার এক-ডাকে অভিন্ন- রঙের একটা ছাতার তলায় এসে জড়ো হয়
ঙ)
প্রতিবাদ, নিশ্চয়তার বিরুদ্ধে
ঝাঁ-চকচকে
অ্যাস্ট্রোটার্ফ-ফিল্ড। সাজানো-গোছানো-ঝিনচাক-গেলারি
যদিও,স্পট-আলোয়
ধুয়ে যাচ্ছে ফ্রন্টস্টেজের মেক্সিকানওয়েভ এবং তোমার পায়ের তুক-করা-বল আর তুমি
আশেপাশে
তে-কাঠির শেষতম শহীদটি ছাড়া তোমার কয়েক-গজের মধ্যে প্রতিপক্ষ আর কেউ নেই । তবুও
দশচক্রে কোলের ছাগলটি যে-ভাবে কুকুরে রূপান্তরিত হয়,পক্ককেশগুলো
চিরুনি-তল্লাশিতেও, দিব্বি আন্ডারগ্রাউন্ড হয়ে থাকে ঠিক তেমনি, দর্শকাসনও হটাৎ-ই,
আবিষ্কার করে
একটা
ইনসুইং-এর বদলে তোমার জোরালো
আউটসুইং-শটে
ভেসে যাচ্ছে সমস্ত কৃত্রিম-ঘাস,
গ্যালারির
ছাউনি, সাইডলাইন,গোলপোস্ট
এমনকী, একটি
মেক্সিকান-ওয়েভের সমস্ত নিশ্চয়তা
১২
দেবাশিস মুখোপাধ্যায় (৪টি কবিতা)
ক) সমুদ্রে
নগ্ন রোদে
ঢেউ সহবাস
লবণ একটি অনিবার্য
তুমি স্বাদ
নারিকেল গাছটি
দূরে ছায়াপাঠ দেয়
একা বেঞ্চকে
যে তার নীচে বালিগায়
নারীর চরণ চিহ্ন ধরে
নীল রঙ ক্রমশ ফিকে
কে জানে কার
পদগুলি অসম্পূর্ণ
রচনার পাতায়
বাঁশির শব্দে
যমুনা খেলায়
নৌকাবিলাসে
খ) নাবিক জন্মের
বায়োস্কোপ
জাহাজের গল্প শুনলেই
ভিতরে সমুদ্র বাহার
মৎসকন্যার ইশারায়
আদিম
কেঁপে ওঠে অলৌকিক জল
নুনের পুতুল
নিঃসঙ্গ গলিয়ে
নীল তিমি পথে
কুড়িয়ে নেয়
ব্রহ্মকমল
হারিয়ে যাওয়ার আনন্দ
তরঙ্গ শোনায়
গ) চটি
সন্ধ্যার ফ্রিজে
ঠান্ডা মাংস
ফ্যানকে নির্জনতায়
পেয়েছে
বাইরের গাছে ঝড়
চাপা দিচ্ছে কান্নাকে
আরশোলার অসহায়
আত্মসমর্পণ
ভাবিয়ে তুলছে
দেয়ালকে
চৈত্র মাসের অন্ধকারে
তার চটি
পড়ে আছে মৃত বিড়াল
যেন
ঘ) দাম্পত্য
বিছানার চোখ খুলে
পড়ে আছে
অনেক আঁকা ফুলের ওপর
প্রজাপতি উড়ছে
আঙুলের এই ঘুম সহ্য
না হলেও
ঘরকে মানিয়ে নিতে
হয়
সব সময় ছক্কা পড়ার
কথা নয় ভেবে
এই ক্ষুদে পুঁটকেই
অপেক্ষা একটা বৈশাখীর
এলোমেলোর পর নতুন
গন্ধলাগা জামার
১৩ নজর উল ইসলাম (৫টি কবিতা)
ক) দীর্ঘশ্বাস
তোমার ভেতরের সবুজ তুলে
তুলে
কাবরে কারুজল
সাঁতরাচ্ছি প্রতিদিন
যতটা টেনেটুনে একটি
মনপাখি পালিত হয়
রাত্রি হয় বিগলিত
মাটির মোম মন
আমি বিরহ ভাঙতে
জানি,আর জানি
বলেই দুঃখগুলো একপাশে
রেখে
উর্বর হচ্ছি
ঘোরতর,আঁধারেও এখন
একলা নই সস্নেহে
মাখছি তোমাকে
আহত পাখির সাজে তোমার
অরণ্য থেকে
খুঁটে নিই স্বপ্নসখা
আদর
নীলাকাশ পরিক্রমা
করি,সম্ভাষণ
রাখি জীবনের শেষ দিনও
আগ্নেয় দীর্ঘশ্বাস...
খ) ঝরনার আলো জোছনা
নির্ভরতার একক শিল্পী
পুষে যাচ্ছি সঞ্চারী
মন মন ও ঠোঁটে অবিকৃত
আলো ফুটে ঝিকিমিকি
রাঙা মুখে ছাপানো
উদ্ভাস—দীর্ঘশ্বাসও
উড়ানে জীবন আঁকা
অখন্ড স্বাদ-শৈলী
সবটাই যদি বই হয়,
সবটাই প্রচ্ছদ
হৃদয় জড়ানো অভিসারে
জোছনা-অনুবাদ
কাল-সবুজ যেমন
বীজমন্ত্রে সুষম
আবাসিক আমিও
মন-ভিখারি ক্ষুধার্ত
পালকজন্মের অভিমানী
রোদে আমার সঞ্চয়
উপসংহার পড়তে যাব
না—কেবলই চাঁদের
আহত মনডানা ছুঁতে
ছুঁতে ভরপুর দেহঘর
ঘাসের সাম্যের কাছে
মাথা নুইয়ে প্রচ্ছদ করি...
গ) স্বপ্নশূন্য
প্রতিদিন ঢেউ ভাঙি
প্রতিদিন শিল্পমনষ্ক সরোবর
উদাহরণ রোজই বেহালা
বাজানোর পাঠ নেয়
নতুন সূর্য যেন এঁকে
রেখেছিল জলের আয়নায়
আমি সে পরিপূরকতা
আদায় করি সহজ উচ্চারণে
ইতিহাস থেকে খুঁটে
নিই ছারখার নিশানাগুলো
সময়ও সঙ্কায় মেনে
নিতে হয় সব সিনেমার রোল
প্রেম তুমি ফিরে এসো
এহেন কথকতা—নাটক
বাস্তবোচিত দরাজে
বিস্মৃত একাকীত্বের জিজ্ঞাসায়
যত্নের মনোভূমি আবাদি
আকাশ স্বাভাবিক সতর্কতায়
ভোর ভোর ডুবন্ত চাঁদ
চলে যায় স্মৃতির দেশে
হাতে হাত শেকলে
জড়িয়ে যতই বৈদিক পৃথিবী ধরি
পরস্পর সরে যাচ্ছি
কুয়াশার ধোকা অবিশ্বাসে...
ঘ) মনদখলি
ভাষায় আসে না ভাবে
বুঝে নেওয়া মনদখলি
সাঁতরে যাওয়া
সুদূরের নির্বাচিত চর্চাগুলি
প্রানপ্রিয়মুখ
সংরক্ষিত জীবনে অবিচ্ছেদ্য
আকাশি ওড়নায় চেহারা
বদলায়
আমার সারাদিন তখন
দিনমান হাতজোড় বিভোর
বাঁকে বাঁকে আঁকে
অসামান্য ছবি
সহজ সত্যের ডাক
সযত্নে লাগানো গাছ
বেরোচ্ছে আরও
পাতাপল্লব স্মৃতিময়
অচেনা আনন্দে পাখিরা
যেমন নাচে মোহিনী দরাজে
ঠিক সেই ছোঁয়া
অবর্ণন প্রথম স্পর্শে
গায়ে শিহরণ অনুভূতির
আকাশ লাল বৈকালিক
চাদরে জড়িয়ে থাকে
অসম্ভব মায়ার ভূবন
সে-পাখি মায়াপাখি
ডাক পাঠাচ্ছে চিরন্তন
প্রতিধ্বনি কোহলে
দিবানিশি অনন্ত পাঠক্রম...
ঙ) ফুলঘর
আমি বেশ ছিলাম বেশ
যাচ্ছিল আবহমান
একটা ফুল উড়ে এল কী
বৈচিত্র্যময়
কিছুই বোঝা যাচ্ছে না
তার শূন্যের গান
অস্পষ্ট কলস্বরের
মনজমিন শুধু এইটুকুই
জানি সে মানুষ
সভ্যতার সম্পদ— ধরুন মোমবাতি
পৃথিবী দেখছে আকাশি
কতরঙের মূর্ত-বিমূর্ত রকমফের
গাছগাছালির ভেতরও এত
সন্নিবেশের অপরিচয়
ডানাঝাপটানো গণসংগীত
ভাসছে, শিরদাঁড়া ভাসছে
হাত ছেড়ে যাব না
ভেবেছিলাম সেই নিয়ে আছি
আমার পেছনে শকুন ছিল
একবারও দেখিনি
আমি তো ফুলঘরের
বাসিন্দা জেনেও
শূন্যের গতানুগতিকতা
পড়ি লাস্যভূমির ওপর
জমিন কাঁদে সমগ্র
জীবনদর্শন চিরকালীন
মানুষ নামের ভূতুড়ে
দরগায় এসেছি আমি
এমন স্বীকারোক্তি
বরাবরই মনবাহনে থেকে যাবে...
১৪ নাসির ওয়াদেন
(৫টি কবিতা)
ক) গৌরব
গৌরব আমাকে আকাশে নিয়ে যায়
আমার আশ্চর্য শক্তিকে
উচ্চে তুলে ধরে
হৃদমাঝারে আকাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন আঁকে
বেদনার জল খেয়ে হেঁটে যায়
ভেজে আধফোঁটা ফুল বিবস্ত্র কান্নায়
বিশালও একসময় ছিঁড়ে পড়ে
অ-গৌরবগুলো তখন হামলায়
গৌরব-কে ডাকি না আজকালপরশু
কেমন ভয় ভয় চোখে তাকায়
আমার দিকে
এ পৃথিবী শুধু ভালবাসার, বাকি সব ফিকে।
খ) চিঠি
বড্ড অসহায় না হলে কেউ আর তেমন
চিঠি লেখে না ,কালি-দোয়াত নেই ঘরে
কাগজ ছিল না বলে দাদু ঠাকুরদারা
গাছের ছাল আর তাল পাতায় অক্ষরে
লিখে রাখত মনের কথা কবিতার ছন্দে,
ভালোয়-মন্দে
চিঠি লেখা শুরু হলে পোষ্ট কার্ড,ইনল্যাণ্ড,খাম
আমার রানার, ছুটে ছুটে আসে
খবরের বোঝা হাতে, হাতে লণ্ঠন,লাঠি
ওই বুঝি ভোর আসে, নিরুদ্দেশে, প্রভাত আকাশে
জন্মদিন আজ, কতটা লাইক পড়েছে,জানি না
কমেন্ট বক্সে কে কত ভাষণ দিল
তাও গুণে দেখিনি
তবুও কেন যেন মনে হয়, তুমি আসোনি বলে
মৃত মায়েরা বারবার কেঁদে ওঠে, চিঠি ঠাম্মা।
গ) জীবনের রেলগাড়ি
রেলগাড়ি ছুটে এলে লুকোয় হৃদয়
ছমছমছম তালে তালে বাঁশি
বাজায় কেষ্ট, আমাদের কেষ্ট ঠাকুর
তখন আমার রাধা, সর্বগ্রাসী
পরপর চলে আসে জীবনের চলা
শীতে গ্রীষ্মে দু-বেলা দু'পহরে
কদমতলায় দাঁড়িয়ে ইশারায় ডাকে
বাঁকা পথ ভেঙে ছুটে আসে ঘরে
আমি বাঁশি ভালবাসি, রেলগাড়ি ছুটে
জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত জমে ক্ষীর
ভাল আর মন্দ মিশেলে তৈরি আবাস
অশ্রুভেজা সংসার বড়ই অস্থির।
ঘ) মেঘদূত
তুমি ছিলে বলে চিনেছি তোমাকে, চিঠি
ঘাসে ঘাসে ঢাকা মনের দেয়াল
আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে অধুনাস্তিক ভর
কালিদাস লেখে কাব্য,খেয়াল
পাথরের সাথে কী সম্পর্ক মাটির কলসের
গাছের পাতার সাথে প্রজাপতি, মথ
অপরূপা সুন্দরী বালিকা সেজে কিসের
মোহে জ্বলে ওঠো, জোনাকির রথ ?
এই শুষ্ক ভাদরে নদীজলহীন দুদণ্ড পিপাসা
মেটে না তাতে,ধানগাছ গেছে শুকিয়ে
মেঘ কই? শুকনো বজ্রপাতে ঘর জ্বলে
যক্ষপ্রিয়া থাক,ভরে দাও বিষ্ণুপ্রিয়ার হিয়ে।
ঙ) ভাদ্রের অ-ভাবনা
শ্রাবণের ধারাবাহিক ফোঁটা ফোঁটা ঘাম ঝরা
হল্ল্যাদের দিন শেষ যন্ত্রদানবের দাপটে
মাটি চৌচির, কাদা মাখামাখি গাছ,ধানচারা
নির্ঝর বৃষ্টির ফোঁটা লেবুর উঠোনের ঘটে
হাভাতের নেই হাহাকার, রৌদ্রের ঝিকিমিকি
আনন্দ আলো মাথায় ন-আঁধারীর খিদে
কৃষিশ্রমিকের গায়ের রক্ত, আকাশের আঁকিবুঁকি
পারে না কাঁদাতে, টাকার থলে প্রতিটি পকেটে
না-খেয়ে মরে না মানুষ, আরো শৌখিন হতে চায়
অভাবকে করেছি হত, সুখের ঘরকন্নার
অ-শোক করেছে বাস, তবু ভালবাসা হাতরায়
এত সুখ এ ভাদরে,তবু ভয় শুধুই অ-ভাবনার।
১৫ প্রণব রুদ্র (৫টি কবিতা)
ক)
গোপন পাতার কথা
বাতাসের
গায়ে যে অশুভ কথা লিখে রাখে শত্রু
তার
সর্তকতা পরিসরে সম্পর্ক গোছায় লাভ ক্ষতি
জ্বলে
যায় আনাড়ি প্রেমিকের বোকা চুমু, বুঝে নাও
শক্ত
করে যদি দাঁড়াতে না পারে তোমার ঘোড়া
তাকে
ছোলা খাইয়ে আর কী প্রমাণ করতে চাও তুমি?
যতবার
আমাকে ছু্ঁয়েছ তুমি, ততবার আমি স্বর্গ দেখেছি
ঘোর
কেটে গেলে যে বাস্তব স্তরে জীবন এসে পড়ে
তার
খোলা জীবনের গোপন পাতার কথা আমি জানি
সেসব
অপ্রয়োজনীয় অথবা গোপনীয় কুয়াশা ভাঙার
কোনও
দরকার নেই, বিশ্বাসের চড়া দামে আজ
তোমার
কোলে যে শিশু এসেছে তার নাম দিও সত্য
বিবেক,
আবেগ নাকি চাহিদায় সত্য খেলছে পৃথিবীতে?
খ)
বিনয় ক'বার শিখে ফুল
বাকিটা
বিনয় পুষ্প ততবার ফুল জন্মে শেখে
যতবার
যাত্রাকাল সুদূর প্রসারী ফলজীবী হয়
দিনবদলের
স্থির আলো পরবাসে শিরদাঁড়া
বেশরম আমাদের
সব খাই বাঁজা বিচরণ
ধিকিধিক
গুপ্তঘাতে ক্ষুরধার জলডুবি ছায়া
করতল
বলেছিল অনাদরে কাঁদে ওম শান্তি
এভাবেই
চলছিল শরীরের শ্রমডানা বাঁচা-মরা
হিসাবানুযায়ী
এই জীবন অপরিসীম কখনো নয়তো
তবুও এ
পরিসরে ভালবাসি টু দি স্কয়ার অব ইনফিনিটি
ভেতরের
ব্যথা বিষাদ চন্দনে, বিনয় ক'বার শিখে ফুল?
গ) ভিজে থাকা কিছু নীল রাতের হৃদয়
জানালা
থাকল মুহূর্তের দিকে চেয়ে
দূরে
নৌকা এগিয়ে চলেছে জীবনের বুকে
এতো
ভিড় ঠেলে স্মৃতি তাপিত শরীর
তোমাকে
থাকতে হবে দগ্ধদাগের মনখারাপ পাঠে
অবিরত
ব্যস্ততায় সবাই যখন ''জিন্দেগি না মিলেগি দো'বারা''-র
স্বাদ
চেটেপুটে নিতে গ্যাঁড়াকল সাজাচ্ছে শৃগাল বুদ্ধির প্রনয় ভাঁজে
তখন
কোথাও মিশে আছে অবর্ণনীয় লবণ কথা ছবি
নিরিবিল
আগুনের পাশে সিদ্ধিখোর বাবা বসে
অনেক
কিছুই চিরকাল অজানাই থেকে যায়
যতটুকু
হাত বাড়িয়ে ঝরনা থেকে জল পেলে
তা-ই
পানে পূর্ণ তৃপ্তির প্রবেশ লেগে থাক
না-হলে
খাতাবন্ধ করে উঠে যান ভাগাড়ের দিকে
ঘ)
রিয়েলিটি
চাতকের
তৃষ্ণা সূঁচ ও সুতোর সংসার
গোপন
কত শব্দের কার্নিশ
অভিমান
অনুবাদে চিবুকের ইমন
বাতাসে
বাঁশির ঝিমুনি ব'সে
রূপকথার
মতন ইচ্ছে
ছেড়ে
যাচ্ছ- সরে যাচ্ছে
এমতাবস্থায়
মরে যাওয়া যায়, বেশি নয়
মাত্র
মন খারাপটুকু দিয়ে, তিনগজ দড়িতে
ম্যাজিকের
মত ত্যাগ করা যায় সব
অথবা
একটা ট্রাম
জীবনানন্দের
সময় থেকে এসে
প্রেম
ও জীবনের বৈষম্য চাপা দিয়ে যাক
অদ্ভুতভাবে
আমি কিছুই করতে পারছি না
গোল
গোল শূন্যগুলো দুঃখের সাথে স্কচ মিশিয়ে
পান
করছে যেন যৌনপল্লির রিয়েলিটি শো
আমি
রাস্তাগুলোর ওপর ছুটছি কুকুরের মত…
ঙ)
নববধূ
বিপন্নতা
সয়ে বাড়ছে কয়েদি জীবনের স্বাদ
স্তদ্ধতার
গন্ধে পুড়ছে বধূর বালুচুরি শাড়ি
ফিরলো
না দাদনে যাওয়া তরতাজা শরীর
সাদা
কাপড়ে এলো সন্তানের আশা জাগানো শব!
অভাবের
দোজখ হাওয়া কেড়ে নিলো বীজধান
আহ্লাদ
ছড়িয়ে পড়লো ধ্বংসস্তূপ লিখে
বিছানার
ঢেউগুলো মিলনের ব্যথা নিয়ে স্যাঁতসেঁতে
সে
বলেছিলো- 'এবার পুজোয় বাড়ি এলেই মা হবো!'
ভিতর
বাহিরে শূন্যতার অমানিশা, জীবন- পাঁপড়ি
শুকানো
ঝুলন্ত যন্ত্রণা! কার দোষে নেমে আসে
বিধবার
ভাতা? বাঁচতে পারি না, মরতেও-
দীর্ঘশ্বাস হেঁটে চলে সময়ের
ঝলসানো রাস্তা বরাবর
১৬ বিকাশ মন্ডল (২টি কবিতা)
ক) দর্শন
ঠিক
করে দেখলে ভুল নেই ....
শালুক,
থির হ', তোকে দেখি। সবটুকু।
পরিপূর্ণ
করে। দশদিক থেকে।
ঘুরে
ঘুরে। স্থানঙ্ক পাল্টে পাল্টে।
ভিন্ন
ভিন্ন কৌণিকতা থেকে।
দ্যাখা
শেষ ; তবু মনে হয়
পাপড়ির
বেগনি আভা, মৃদুবাস
পরাগচুর্ণ
ও ভ্রমর দেখিনি তো !
শালুক,
মহৎগ্রন্থ হয়ে ফুটে থাক
তোকে
দেখি।
খ) যেন
আবহসংগীত
আমার
এই যাপন, ধরা যাক,
এক
পূর্ণদৈর্ঘ্যের কাহিনীচিত্র
তার
কাহিনী ও চিত্রনাট্য বাবার লেখা
পরিচালনাও,
বলা যায়, তাঁরই
শুধু
আবহসংগীত মা'র
অথবা
মা এক আবহসংগীত
নিরলস বেজে যান নেপথ্যে
থেকে....
১৭ বিমান মৈত্র (১টি কবিতা)
নুলিয়া
সমস্ত
তুমি ছুটে যাও আমাকে নিয়ে যেভাবে শরৎসন্ধি ধান তোমার ওপরে ছিটিয়ে দিয়েছে
অক্ষরের ফোঁটা সেখানে রাখলে গ্লাস বাতাসে ব্রাউনীয় গতিশীলতায় আমাদের সমস্ত
নিঃশ্বাসে যত কবিতার উন্মাদনা শুরু হয় অগণন আরক্তিম আলোর মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে
তোমার চুমু ডিঙিয়ে নেমে যায় উত্তপ্ত নাভিকে ছাড়িয়ে প্রজাপতির খিদের হা'য়ের
ভিতর -- শুভ্র সাপের পোনার মতো ছুটে যায় মিছিলে মিছিলে: যে জেনেছে ডুবে যাওয়া সেই
কৃষ্ণসাগর-ঝিনুক তুলে আনে আর তখন আমাদের বাগানে বাগানে মুক্তোফুলেরা ভোরের মাটিতে
লজ্জায় ঢেকে নিতো মুখ হে হিম ধুসর হিম সরে যাও ফুলমুখ থেকে আমাকে কুড়োতে দাও
কামজ হিমেল ঘ্রাণ মৃত শিউলি অন্তত।
১৮ রবীন বসু (৫টি কবিতা)
ক) গুপ্ত সরীসৃপ
সামনে উদ্যত ফলা, প্রতিহিংসা জেগে আছে
খুব
গ্রামদেশে ঘুম নেই, বারুদের গন্ধে
শ্বাসবন্ধ হয়
মৃত্যু যেন হোলি খেলে বিভীষিকা ছড়ায়
সন্ত্রাস
আবহ অস্থির হলে মানুষের বেঁচে থাকা
দায়!
এবার উদ্দেশ্য শেষ, ষড়যন্ত্র ফলাফল
দেখবে
আহূত ধ্বংসের যজ্ঞ অশ্বমেধ ঘোড়ার বিজয়
পরাজিত মানুষের বুকে পাতা অসহায় ক্ষোভ
দিগভ্রান্ত ঝুলে আছে আশাহত ঘন কালো মেঘ।
এমন দুঃখের দিনে, এমন দগ্ধহাড়ে জ্বলন
শুশ্রূষার নিরাময় নেই, তাপিত হৃদয়
মুহ্যমান
কারা যে ধরেছে ফণা! রক্তচক্ষু ছোবল
নামায়
মানুষের জামা গায়ে এরা হল গুপ্ত
সরীসৃপ!
সমাজ তাকিয়ে আছে, মানুষ নির্বাক
জড়োসড়ো
আগুনের ফুলকি বুকে পরিশেষে জ্বলে উঠবে
ঠিক!
খ) লুকোনো ঝাঁপি
রাখাল বালক হয়ে মাঠে মাঠে ঘুরে মরি
খড় মাটি শস্যদানা দু'হাতে ধরেছি মুঠো
নাগরিক এই আমি একদিন গ্রাম্য ছিলাম
কৃষক পিতার সাথে খেতে গিয়ে চাষ শিখি
সাঁতারে দুপুর কাটে, নদীতে নৌকোর বাইচ
স্থির চোখ কুমিরের, শিয়ালেরা ডেকে ওঠে
সন্ধ্যার বাতাসে যেন জমা হয় রূপকথা
ভারি বুক রাত্রি জাগে ভয় আর স্বপ্নঘোর
সেই ছিল গ্রামদেশ, গতজন্ম হৃত শৈশব
আজ আমি নাগরিক চঞ্চল চতুর বড়
আমার সেয়ানাপনা ঢেকে রাখি সুমসৃণ
তবু যদি খুলে যায় সিন্দুকের ঢাকনা মুখ
হাত দিয়ে বন্ধ করি, অলৌকিক চাবিকাঠি
আমার গ্রামীণ বেশ, আমার লুকোনো ঝাঁপি!
গ) আপেক্ষিক কতকিছু
তোমাকে নতুনরূপে চিনে নিতে থতমত খাই
তবুও সন্দেহ হয়, হিসেবের গোলমাল ঢের
যা ভেবেছি সত্য নয় আপেক্ষিক কতকিছু আছে
তোমাকে নতুনরূপে চিনে নিতে সানুদেশে
যাই;
আমার চোখের দেখা, আমার এ দৃষ্টি বিনিময়
অহেতুক আলুথালু তোমার পরিপাটি সজ্জায়;
হিসেব যেখানে থামে, সেখানেই গরমিল
ঝুলেছে
লাভ-লোকসান তির্যক ভরকেন্দ্র ঝুঁকে পড়ে
ঠিক
তখনই আসল সত্য বেনিয়ার সে উপরচালাকি
হাঁ-মুখ বেরিয়ে পড়ে পলেস্তারা খসে
পড়ে যায়
প্রাচীন মুদ্রার পিঠে কত শ্যাওলা জমেছে
ধুলো
আস্তরণ ভেদ করে সম্পর্ক ছিটকে পড়ে দূরে
বিচ্ছেদের এত ভয়, স্বরূপ সন্ধানের
আকুতি
আমাকে বিহ্বল করে আন্তরিক উদাসীনতায়!
ঘ) নবজন্ম
এই দেহ মরে যাবে, এই প্রেম পুরনো খোলস
ছেড়ে
নতুন আঙ্গিক নেবে; নবতর হাওয়া এসে
ভাসাবে
দু'কূল নদী প্লাবন স্রোতে নিজস্ব
গন্তব্য খুঁজে নেবে;
এই দেহ মরে যাবে, আকাঙ্ক্ষা অস্থির হবে অনুরাগ
ফলিত স্বপ্নের দেশে কারা হেঁটে যাবে
নির্জন দক্ষিণে
করতল শূন্য হবে, সঞ্চয়ের সব কড়ি ফেলে
যাবে;
আমৃত্যু জাদুর টান, ভেলকি দ্যাখে
উল্লসিত চোখের
সম্মোহিত দৃষ্টিবাণ, শরবিদ্ধ হৃদয়ের
আর্তধ্বনি
ব্যাকুল আহত করে ঐকান্তিক মায়াটান
জাগরূক;
জীবন অস্থির হয়, এইসব আনুষঙ্গিক
বিহ্বলতা
ছেড়ে দিয়ে খোলসের পরিত্যক্ত
আত্মউন্মোচন ঘিরে
নবজন্ম দিয়ে যাবে শরীরে প্রেমের জ্বর
আহ্লাদিত!
ঙ) স্বার্থপর বিষ
তোমার ডানার গন্ধ, তোমার চুলের গন্ধ
থেকে
আলাদা সৌরভ এই মধ্যদুপুরে আড়াল খোঁজে;
আমি তস্কর যেন-বা, লুটে নেব এইসব অমিত
ঐশ্বর্যের রত্নখনি, সতর্ক তাই তুমি
সংশয়ে
নিষেধ-প্রাচীর গড়ো লৌহদৃঢ় আবেষ্টন
ঘিরে
তবুও তোমার হৃদয় কোথাও রয়েছে অরক্ষিত
আমি সেই ছিদ্র খুঁজি, সরু গুপ্ত নালাপথ
দিয়ে
ঢুকে পড়ি সন্তর্পণে আর দংশনে ঢালি যে
বিষ!
নীল হয় গাত্রবর্ণ, প্রেম জ্বরে শরীরে
উত্তাপ
ওঝা হয়ে বসে পড়ি সংরক্ত অনুরাগে প্রবল
তোমার ডানার গন্ধ, তোমার চুলের গন্ধ ভরে
আজীবন প্রেমিক ঠোঁটে আমি শুষি কামনার রস
তুমি ধীরে উঠে বসো, আলুলিত অচেনা পৃথিবী
তোমার বুকের কাছে বসে আছে
স্বার্থপর বিষ!
১৯ রাজদীপ ভট্টাচার্য
(৫টি কবিতা)
মাধবীলতা
ক)
তারপর
আমাদের রিক্সা গিয়ে দাঁড়ালো ভাড়া বাড়ির সামনে। তুমি প্রথমে বাথরুম দেখলে অতঃপর ঘর।
তখন আমাদের জনতা স্টোভ। কেরোসিন তেলের রং তখনও নীল হয়নি। হাঁড়ির মধ্যে চালের মধ্যে
ফুটছে গরম ভালোবাসা। আমরা তার শব্দ শুনি বুকের উপর কান পেতে। জানলার ফাঁকে এসে
দাঁড়ায় চাঁদ। যেন দেখতে আসে বাউণ্ডুলে দুজন মিলে কেমন করে ঘর গুছোচ্ছি। তুমিও আছ
তেমন ফাজিল, চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকো যেন আবার শুভদৃষ্টি। সে বেচারা লজ্জা পেয়ে
গাছের আড়াল পালিয়ে বাঁচে। অন্ধকারে অন্ধকারে আমরা ফিরি শহর গ্রামে। আঙুল ছুঁয়ে
দুজন চিনি এপথ ওঠে ওপথ নামে। কোথায় হাসি কোথায় কান্না মাথায় ওঠে রান্নাবান্না। জল
শুকোচ্ছে ভাতের হাঁড়ি, পথ হারাচ্ছে দুই আনাড়ি।
খ)
আমার
ফিরতে দেরি হলেই তুমি অবিরাম ফোন করতে, আমি বারবার তোমাকে বলতাম - আসছি বাবা! আসছি!
আর তুমি নাছোড়বান্দার মতো ফোন করেই চলতে। অথচ আমরা কেউ কারুর কথা শুনতে পেতাম না।
শুধু বুকের মধ্যে রিং হতো। টাওয়ারগুলোর আলো জ্বলত নিভত। আর আমাদের কোনো ফোন ছিল না
বলে কেউ কারুর কথা কিছুতেই শুনতে পেতাম না। আর সারাটাদিন তুমি ভাইব্রেট করতে
তিরতির তিরতির করে, কখনো বুকের মাঝখানে কিংবা কখনো রগের পাশে। ব্যথা কমানোর জন্য
আমাদের একটাই মলম ছিল। সেই ছোট্ট শিশি থেকে অম্রুতাঞ্জন লাগিয়ে দিতাম আমি তোমার
ব্যথায়। আর তুমি আমার নীল হয়ে যাওয়া দাগের উপর।
গ)
পুজোর
ঠিক আগে আগেই আমরা গিয়েছিলাম। ট্রেন পেরিয়ে বাস পেরিয়ে কালো পিচের রাস্তা শ্যামল
চাষের ক্ষেত, বন দপ্তরের কারুকার্য, সেচখালের ঝিলিমিলি জল, পাখিমারা বন্দুকের
শ্বাসরোধী শব্দ। গ্রামটার নাম কী ছিল মনে পড়ছে না। বাংলার এই মুখচোরা গ্রামগুলো কত
সংগ্রাম, মৃত্যু ও আর্তনাদ চাপা দিয়ে রাখে ভেবে অবাক হয়ে যেতে হয়! ঝলমলে রোদের
দিনে ধানক্ষেত থেকে সবুজ বাতাস বয়ে আসছিল। ক্যানেলের পাশ দিয়ে আমরা ফিরছিলাম আর
তুমি একটা কাশফুল ছিঁড়ে হাতে নিয়ে পতাকার মতো দোলাতেই দেবীপক্ষ শুরু হয়ে গেল
তৎক্ষণাৎ।
ঘ)
একটুখানি
রোদ উঠলেই তোমার মুখ বেশ আলো আলো হয়ে যেত। সাকুল্যে দুটো শাড়ি তখন, তাই অনুষ্ঠানে
ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পরে আমাদের কী আনন্দ! আউটিং বলতে গঙ্গার পাড়, আর চাকা মানে এভন
সাইকেল। বিটলবন মোড়া কাগজখণ্ডের এককোণে ছোট্ট ছিদ্র বেয়ে জিভে ছড়িয়ে পড়ত স্বাদ
আঙুলের আলতো টোকায়। মাসের শেষে ব্যাঙ্ক মানে পাওডারের কৌটো আর আয়েশ মানে
পরোটা-আলুভাজা। দেওয়ালে বড় বড় ছায়া ফেলে আমরা স্বপ্ন দেখতাম, ওদিকে তোমার পেট বেশ
ফুলে উঠতে শুরু করল। ভিতর থেকে ভেসে আসত কান্না, ভেসে আসত খিলখিল হাসির শব্দ। আমরা
বৃষ্টি হলেই জানলার সবুজ গ্রিলের ফাঁক দিয়ে করতলে বৃষ্টির ফোঁটা ধরে ধরে একবেলার
রান্না চালিয়ে দিতাম। কোনো কোনো সময় যখন সারারাত বৃষ্টি হতো আর ঝড় উঠত আর মৃদু শীত
করত তখন তোমার ওই ফুলে ওঠা পেটের উপর কান চেপে ধরে খানিকটা বৃষ্টির শব্দ আমরা
ভিতরে পাঠিয়ে দিয়ে হেসে উঠতাম একসাথে।
ঙ)
তখন সামান্য মুর্গির মাংস দিয়ে একটা বেলোয়ারী রাত তৈরি
করতে পারতে তুমি। আমাদের গা জুড়ে উঁকি মারত কত কুঁড়ি, রাত্রি ঘন হলেই ফুল ফুটত
টুপটাপ। কোনো শব্দ হতো না কোথাও, শুধু ফুলের গন্ধে তুমি চোখ মেলে তাকাতে আর মৃদু
হেসে পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়তে আবার। তখন কী সহজে আমি ধুলো-বালি দিয়ে তোমার সারারাতের
স্বপ্ন এঁকে দিতাম। ভোরের দিকে যখন নিঃশব্দে হিম পড়ছে বাইরে, তুমি আমার কোলের
ভিতরে ঢুকে আসতে চাইতে। আর আমাদের মেয়ে হয়নি তখনও অথচ প্রতিদিন সকালে আমি মেয়ের
নাম রাখতাম মাধবীলতা!
২০ রাজেশ
গঙ্গোপাধ্যায় (৫টি কবিতা)
ক) ডুব
ডুবে যাওয়া কিভাবে
ব্যাখ্যা করা যায়
ফিজিক্স প্লবতার সূত্র বোঝালো
কেমিস্ট্রি বলল প্রশমন ক্ষণের কথা
বায়োলজির বক্তব্য অভিস্রবণের নীতি
তারপরও যে কথাটি বাকী
রয়ে গেল, তুমি কেন তার হয়ে বললে না!
কেন বললে না? -
ইচ্ছেরা পাথর হয়ে যায় অনভিপ্রেতে, সে বিষম ভারে যে আধার ভর্তি হয়ে আসে
তার ডুবে যাওয়াই
অগত্যা নিয়তি...
(উত্তেজনার বশে এসব
বলার অনেক পরে খেয়াল হল
তুমিও তো না জেনেই
রয়ে গেলে যুগান্ত পেরিয়ে -
কিভাবে ভারাক্রান্ত
ডুবে গেছে যা কিছু সঞ্চয়ে)
খ) হুশ্
যেভাবে ভয়
দেখাও...দেখাতে চাও...অভিসন্ধি বরাবর কিনারের দিকে
তার ভেতর তরলের
বিপ্রতীপে থার্মোকলের মত পানসে আস্কারা
এখানে প্রশ্ন উঠতে
পারে, এ বোঝার কতটা সোনার জলে মিনা করা কাজ
এ আমার স্বর্ণকার
জন্মের ছিলাকাটা কারুকৃতি, কিভাবে শেখাই!
অলঙ্কৃত উদাসীন
রোদ্দুরের প্রতিফলন ঠিকরে গিয়ে যে ঝিল পেরোতে পারেনা
তার প্রায় বিঘৎখানেক
দূরে গলে যেতে শুরু করে কৈশিক রেখাটি মরীয়া
ইচ্ছে হয়...ভীষণই
ইচ্ছে হয় লোভ ধেয়ে যাক ওই দিকে
যেখানে আচম্বিতে কোন
হুশ্ নেই!
গ) দৃশ্য অদৃশ্য
মনে আছে সিনেমাটা?
পাগল রোগীকে সারাতে গিয়ে ডিভোটেড নার্স নিজেই শেষে...
যদি জানতে চাই এ
দৃশ্য কেন ভালোলেগেছিল...কেন কান্না পেয়েছিল...
আকাঙ্খিত তারে খেলে
গিয়েছিল এক্কাদোক্কা খেলার আঙুল...সুর ভিজে ওঠার শৈলী
সবাই নিজেকে দেখতে
চায় ধকল পেরিয়ে জিতে আসাটির লাস্ট ল্যাপে, হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের শেষ
কেউ পারে...পারতে
ভালোবাসে তো সবাই...প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাচ্ছ?
আঃ থাক না এসব...
উচ্চারণ থেকে বহুদূরে
গিয়ে থিতু হয় জলের আদলে স্পষ্ট হতে থাকা ছবি
সব রঙ মিশে গিয়ে
অনিয়ত সাদার ভেতরে অদৃশ্য হতে থাকে যা দেখার কথা ছিল
ঘ) কৃত
মেপল পাতাটি নিয়ে যে
পাখিটি উড়ে যাচ্ছে, ও জানে সূর্যাস্তের আগে ওকে পৌঁছতেই হবে
অথচ হাওয়া ওকে কতটা
সামর্থ্য যোগাবে ওর জানা নেই
এই দোলাচলে যে আসন্নে
ঘনিয়েছে ঘটনাঝিনুক...ঝিনুকেরা
তাদের জন্য কোন
বেলাভূমে স্রোতের বাহুল্য নেই
বৃদ্ধের দুচোখে নেমে
আসে ঝাপসা স্মৃতিফলকেরা...বাইলেন...উড়ন্ত অলক
ছায়া হয়ে ছেয়ে আসে মেপল
পাতার জার্নি...সন্ততি নয়, প্রিয় পাখিটির মরীয়া উড়ান
অনুপল অতিরিক্ত হয়ে
ওঠে...নার্সিংহোমের জানলা দিয়ে উড়ে আসে মেপল পাতাটি
পাখি ও বৃদ্ধ –ইহলোক
ছাড়িয়ে যায় মেপল পাতার বনে...
ঙ) ফসিল
অর্জনের ঋণ জমতে
জমতেও পাথর হয়ে ওঠে -
গ্রন্থির সূক্ষ্ম
ফাঁকায় হাওয়ার শাসন ক্রমশঃ পরাক্রমী হয়
স্থবিরত্ব কাঙ্খিত
ছিলনা যদিও, তবু ঘাসে ঢেকে ওঠে মাটি,
মাটির শরীরময় কীট
পরিবার, তাদের সন্ধানী চঞ্চুর কাছে
আরোপিত দশার ভেতর
নিভে আসা আলোর দেয়ালা, আত্মীয় অন্ধকার।
কমনীয় কারুকাজ ভরে
ওঠে প্রত্নকলায়, গুহালিপি যতিচিহ্ন পেয়ে গেলে
শেষ অধ্যায় পার হয়ে
গেছে নিঃস্বতা। চরিত্ররা অন্য কোন গল্পের খোঁজে...
বৈধ কুয়াশা ঘনিয়ে
উঠলে শীতঋতু থেকে আমেজের আঁশ খুলে আসে।
ঢিলে প্রতিস্থাপনকে
সম্পর্ক নাম দেওয়ার পর নয়া শিশুপাঠ্যে বর্তে গেছে প্রজন্মবাহিকা।
সভ্যতার কাছে রেখে
দেওয়া পরিখা পেরোতে গিয়ে শতাব্দী ফুরিয়ে এলে
একটা একটা করে পাতা
খসে যাওয়ার দৃশ্যান্তরে শিকড় প্রোথিত হয়ে চলেছে গভীরের দিকে -
ভেবে দেখেছো কি!
২১
লিটন শব্দকর (একটি কবিতা)
প-কারান্ত
পাখিদের পাগলপারা
পাখায় প্রণয়ী পাপড়ি
প্রাঞ্জল পাখালির প্রাচুর্যে প্রতিমূর্তির প্রচ্ছদ
পূর্বাভাস পেরিয়ে প্রাপ্তি পাহাড়ি পর্ণকুটির
পাহারার পুলকে প্রকাশের পূর্ণঋতুর শিশির
পূর্ণিমাপ্রভায় পালকের পান্থশালা; পিউ- কাঁহা
পিয়ানোর পাশে পৌষের প্ল্যাটফর্মে পূরবী
পথিকজন্মের পর পৃথিবীর পরশিবেলায়
পান্না-পোখরাজের পাতা পালটায় প্রতিদিন
পাঁজরে প্রজাপতির পূজ্যমান পাণ্ডুলিপি
২২ শতাব্দী চক্রবর্তী
(১টি কবিতা)
পাঁচালী
ধূপজ্বলা
ঘরের কোণে মেয়েটি কপাল পোড়ায়
লোকে
বলে গ্রহ ধরেছে তাকে,
জ্যোতিষ
বোঝে না সে
জানে
না বসন্তকাল বাড়লে
কেমন
করে শীতল হয় কচি বুকখানি
শঙ্খচিল
উড়ে যায়, ধূলা ঝেড়ে দু-বাহুর ভারে
এদিকে
শঙ্খ লাগে দাম্পত্য ঘরের ভেতরে
অশ্বের
মতো শুধু অসুখ গিলে খায় মেয়েটি
ঝরে
পড়ে ঝড়ের পাতা হয়ে
বিদীর্ণ
সন্ধ্যার বুকে
“বাঁজা
মেয়েছেলে”
নাক
সিটকায় প্রতিটি বসন্ত বিলাপে
‘লক্ষ্মীছাড়া
মাগী’
অভিধান
বসে পৌষের সংক্রান্তিতে
২৩ শিবালোক দাস (৫টি কবিতা)
ক) নির্নিমেষ
আমি
চেয়েছিলাম দু মুঠো ভাত,
তাই
বারান্দায় ছড়িয়ে আছে পা দুটি।
অষ্টপ্রহর
জয়ের উত্থানে আমার ভয় নেই।
দাও,
ফাটিয়ে দাও মাথা...
ব্রহ্মতালু
ছুঁয়ে যদি পাও একটি
তরতাজা
সবুজ লতানো ছোবল।
আমি
তাদের বড় করিনি...
আমি
চেয়েছিলাম দু মুঠো ভাত,
অপরাধ
নির্নিমেষ, তাই দিন গেল।
মথিত
হবার শেষে যখন পুঁতে নিই
শেষ
স্তম্ভ, আমি পোশাক ভাসিয়ে দিই।
অপরাধ
নির্নিমেষ, তবু পান করিনি শেষ অঞ্জলি।
খ)
একবার
একবার
আমি চাই কৃষ্ণগহ্বরের গা
থেকে
একটু পলেস্তারা তুলে আনতে,
যতক্ষণ
না কেউ ঘুমিয়ে পড়ে।
দু পা
পিছলেই আমি পেতাম আমার বাড়ি।
এর আমি
নাম কি দেব, ভাষা ?
তাহলে
তো বলতে হয় মেঝেতে পা
পড়ার
পর আমি নিজের প্রতি আঙুল তুলি।
একবার
মনে হয়, চুরমার সব কিছু আমার
চোখের
মধ্যে নিয়ে নিই এক লহমায়,
রক্ত
পড়ুক, সে তো বন্য নয়।
এর আমি
নাম কি দেব, অন্ধকার ?
তুমি
চেপে রাখো মাটির চিৎকার।
নাম
খুঁজতে খুঁজতে আলোয় পাই বিস্মরণ,
এর আমি
নাম দিই না। সে স্বতন্ত্র।
গ)
বলতে নেই
শীতল,
তুমি উষ্ণ হও চুম্বনের মতো,
একবার
নিঃশ্বাসের পর এই রাস্তায় হাঁটো,
তুলে
নাও আঙুলে কাটা একটুকরো রূপোলী
স্পর্শ,
ভাঙো, গড়ো, আবার অন্তর্নিহিত হও শয্যায়...
তবুও
বোলো না কোনোদিন, যাই !
পেরোনো
দিনের মতো আয়ু তখন
আরো
গভীর, আরো শান্ত, অন্ধকার।
দৃষ্টি,
তুমি এবার নিঃশব্দে পাশ ফিরতে পারো,
উঠোন
ছেড়ে যখন বেড়ে উঠবে ছায়া,
জ্বলে
যাচ্ছে, পুড়ে যাচ্ছে নিমজ্জিত যা কিছু
মাটির
ভেতর, আমি তুলে এনেছি ।
ছুঁয়ে
দিলেই তার তেষ্টা মিটবে না।
তবুও
জলের কাছে বোলো না, যাই !
সেও তো
নিজেকে দেখতে চায় সন্ধে নামলে...
বলতে
নেই যাই। নীরবের কাছে জরুরি এটাই।
জতুগৃহ
যখন একা খুব, তারপরেও তুমি বলবে
চলো
আগুনের কাছে বন্ধক রেখে আসি আমার
মেঘ,
বৃষ্টি, রোদ এবং বিপরীতমুখী স্রোত ?
ঘ)
গোধূলি রঙের পদ্য
বিষ
পান করে তোমার সমস্ত মুখ স্তব্ধ, নীল।
ফিরে
যাওয়ার পথে মাড়িয়েছ অজস্র ফুল।
ভুল
করেছ, ভুল। একটি গোধূলি রঙের পদ্য চেয়ে।
ঘৃণার
স্বাদ রক্তের মতো কড়া হলেও
ছুঁয়ে
দেখলে বেশ শীতল লাগে।
আমি
তুলে নিয়েছি একটু শিশির,
আর
ঢেকেছি দুহাতে মুখ,
আমি
এরকম মৃত্যুর দৃশ্য দেখতে চাই না।
একটি
গোধূলি রঙের পদ্য চেয়ে
এইবার
আমার যাপন খণ্ডন করেছি।
আমি তো
কাউকে কথা দিয়েছি,
একদিন
তোমার বিষ আমি নামিয়ে দেব।
তখন
চুম্বনেও খুলে যাবে অভিশপ্ত দরজা।
ঙ) নাও
রেশমী
সুতোয় লেগে থাকে খানিকটা রক্ত,
পরিত্যাগ
তখনও যে বাষ্পের
মতো
আকর্ষণ করে আমায় !
নাও,
তুলে নাও ফেটে যাওয়া চামড়া,
নাও,
খুঁড়ে নাও পাথরের তল থেকে জল,
সাজানো
নেই মোমবাতির নীচে আমার
লুকোনো
তীর, তবু নাও শেষ কোলাহল !
একদিন
এই মৃত স্বরে চেয়েছিলাম
ঠোঁটে
চেপে যাওয়া অমসৃণ দান,
তুমি
কি তাকে বলবে বারুদ ?
ধ্বংসের
মুখে থামাতে পারো শীত,
বরাদ্দ
আমার হাতের মুঠোয় প্রাণ।
নাও,
তুলে নাও জ্বলন্ত নক্ষত্র,
নাও, তুলে নাও বালির ভেতর
স্পর্শ।
২৪
শীলা বিশ্বাস (৫টি কবিতা)
ডিমেনশিয়া
সিরিজ
ক)
এত বছর
পরে ফিরে যখন এলেন তখন বলুন মঁসিয়ে, নদী কি আগের মতো বয়? চাঁদ কি হাসে? সূর্য কি এখনো উজ্জ্বল?
এসব ভাব আর আবেগের প্রশ্নের উত্তর আমি চাইছি না, বলুন কার কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়ে
ফিরে এলেন মঁসিয়ে?
কথারা চ্যুত হতে হতে কোন ট্র্যাকের উপর আছড়ে পড়ল? কারশেডের কত নম্বর লাইনে দাঁড়িয়ে
ছিল আপনার মন? সামুদ্রিক মাছ, ওমেগা থ্রি আর ভিটামিন- এ খাওয়ার কথা ভুলে গেলেও
আশ্চর্য কোনো কোনো ঠিকানা এখনো মনে রেখেছেন মঁসিয়ে।
খ)
আপনি
বুঝেছেন মঁসিয়ে, প্রকৃত
সম্পর্কের জাহির থাকে না। এতদিন দেওয়ালগুলো ভাঙতে পারেননি কিন্তু জেনে গেছেন
স্তব্ধতার ক্রন্দন। আপনি জানেন চোখ, স্বর ও জিভের প্রতিস্থাপক। চোখ খোলা ও বন্ধের
সাহায্যে পৃথিবীর সমস্ত ভাষায় কথা বলছেন মঁসিয়ে। আপনার চোখে প্রতিটি ঋতু খেলে যেতে দেখছি। আপনার
ভাষাগত চোখ পড়িয়ে নেয় মঁসিয়ে।
গ)
সমান্তরাল
পৃথিবীতে ভুল বলে কিছু নেই। যারা সঙ্গে আছেন তারা সকলেই আপনার নিজস্ব পৃথিবীর
বাসিন্দা। আপনি মাধ্যাকর্ষণের বিপরীতে হাঁটেন। বইয়ের চরিত্রদের সঙ্গে কথা বলেন।
তারা পাশে এসে বসে । আপনি কাঁদলে চোখ মুছিয়ে দেয় স্বয়ং ডায়ানা। শুধু আমি চোখ
মুছিয়ে দিতে গেলে রুমাল ছুরি হয়ে যায় মঁসিয়ে… টুপি পরা অসংখ্য কালো বিড়াল ঘরময় উড়ে বেড়ায়…
ঘ)
সম্পর্কের
কোনো এক মিথস্ক্রিয়ায় একটা বৃত্ত আঁকা হয়ে গেছে অথচ কম্পাস আপনি দেখেননি মঁসিয়ে।
বিপজ্জনক বাঁকগুলিতে যে ছায়া মূর্তিটি সবুজ সংকেত উড়িয়েছিল তাকে সান্ধ্যভোজনে কে আমন্ত্রনপত্র
দিয়েছিল তাও অজানা। ফেরত ডাকে লেখা ছিল তার উদাসীন ঠিকানা। দুঃস্বপ্নের গায়ে নুন
ছিটাতে ছিটাতে একদল ফেরিওয়ালা হেঁকে যাচ্ছে … ভাঙা হারমোনিয়ামের পাঁজরে সুর তুলছে
একটা অবিন্যস্ত অধ্যায়ের পড়ন্ত বিকাল…
ঙ)
এই অসহ্য
পৃথিবীকে আপনার বাসযোগ্য করতে চেয়েছি বলে আমাকেও প্রেমিকা ভেবে নেবেন না মঁসিয়ে।
একটা মায়াভরা রাত উপহার দিতে চেয়েছি। আমার পুত্রের পোষ্য হ্যামস্টারের মতো দিনে
ঘুমিয়ে থাকেন আর রাতে খাঁচার শিক দাঁত দিয়ে কেটে ফেলতে চান। আপনার নিরীহ গোবেচারা
ভাবমূর্তির সঙ্গে যা একেবারেই যায় না। ব্যর্থ হয়ে যখন ঘুমিয়ে পড়েন আমার নিজেকে
আপনার মা বলে মনে হয়…
২৫ শুভঙ্কর দাস (৫টি কবিতা)
ক) নুনভাতের গল্প
সুন্দরের কাছে
রেখেছি, ফুল
দেখেছি,ঋতু পরিবর্তনে
শুকিয়ে গেছে,জন্মসেতু
পারাপারে, হাহাকারে
আবার রক্তে ফুল
ফোটানোর চেষ্টা করেছি
মৃত্যুর ভেতর হাত
ঢুকিয়ে...
আমি তো কোনোদিন
জন্মায়নি,আমি তো কোনোদিন মরিনি,একার মধ্যে একা,
দেখা পাইনি, সেই
অমরত্বের
যা আমার মায়ের মুখ
মলিন হতে দেবে না।
যা আমার পিতার শাখায়
পাতা ঝরাবে না।
যা আমার প্রিয়তমার
রূপে শ্যাওলা ধরাবে না।
আমি নিজেই চক্ষু
রেখেছি,আগুনে
দেখেছি,জন্মজয় আসলে
কিছুই নয়, ক্ষুধাপেটে যা ভাত আর নুনে..
খ) জাগ্রত
ধ্যান ভাঙলে,দেখলে
জগতের সবচেয়ে দরিদ্র সিংহাসনে
বসে শুনিয়ে দিচ্ছে
সন্ন্যাসসূত্র।
কাকে চাইবে পরিত্রাণ?
কাকে বলবে একটু অশ্রু
রাখার পাত্র দিতে!
কাকে বলবে,ভালোবাসা
আসলে আগুনের ভেতরে হাতের ওপর হাত রাখা!
কেউ নেই, শুধু
মৃত্যুর আগের মুহূর্তে মনে করবে
জগত বলে কিছু নেই,
সত্য ও সুন্দর বলে কিছু নেই, কাঠের ভেতর জল নাকি জলের ভেতর আগুন!
শুধু জেগে আছো,এই
আকাশের ডানাটুকু শেষ ভরসা...
এই তো রাস্তা,যাওয়া
আর আসা...
গ) সঞ্জয়উবাচ
একটি শব্দ উচ্চারিত
হবে না,কুরুক্ষেত্র।
জন্ম যদি মৃত্যুর পরে
রচিত,তবে এই মহাপাণ্ডুলিপি কীসের জন্য রচিত?
অন্ধ জানে,সম্পর্ক
তার চক্ষুর চেয়ে এমন কিছু অশ্রুজমাট নয়।
তীর জানে,বুকের রক্তে
কোনো স্বাদ নেই, যতটুকু অশ্রুতে আছে।
রথ জানে,পথ কোনোদিন
তৈরি হয় না অশ্রু-ধুলো ছাড়া।
পাশাচক্র জানে,যার
ভেতর অশ্রুময়, তার কাছে প্রতিটি দান হত্যার।
শেষপর্যন্ত
চক্ষুস্মান ও চক্ষুহীন অশ্রু ছাড়া
ব্যাসদেবকে বুঝতে
পারবে না জেনে,একমাত্র দৃষ্টি সঞ্জয় পেয়েছে
যে দূরের জিনিস দেখার
জন্য নয়, বরং কাছের মানুষকে আয়না করে তুলতে মহাভারত...
ঠিক আমাদের জীবনের
মতো....
ঘ) সূর্যক্ষমা
ব্যক্তিগতভাবে চেয়ে
নিচ্ছি ক্ষমা।
আমি স্বর্গ বা নরকের
কোনো গল্প ফাঁদিনি! আমি বলিনি
পুণ্যের সিঁড়ি সশরীরে
স্বর্গে নিয়ে যতে পারে বা কমিয়ে দিতে
পারে নরকের সাজা!
আমি কাদার ভেতর
মূর্তি, মূর্তির ভেতর প্রাণ,
প্রাণের ভেতর ঈশ্বর
খুঁজে খুঁজে
নিজেকে কাচ
করেছি,রক্তাক্ত কাচ।
একদিন বুকের মধ্যে
হৃদয়পিণ্ড, তার পাশাপাশি যদি একটা
আয়না দেখতে পাও
তাহলে বুঝে নেবে আমি
কবিতায় তাই চেয়েছিলাম!
আর যদি পাথর!
তাহলে ধরে নিও,আমার
প্রতিটি শব্দ সেই অন্ধ বালকের মতো,
যার সামনে যেকোনো
ধ্বনি
মায়ের আঁচলের পায়ের
শব্দের মতো
যে কবিতা লিখতে নয়, কবিতা
হয়ে উঠতে চেয়েছিল!
ঙ) ভালোবাসা
যাকে প্রণাম
ভেবেছো,তা আসলে
সিংহাসন প্রত্যাখ্যান
করার মুদ্রা।
যাকে ঘৃণা বলে ভেবেছো
তা আসলে নিজের হাতে
নেভানো আগুন।
আমি ভালোবাসা চাইতে
পারি না
তার জন্য বুকের মধ্যে
আকাশ,স্নায়ুতে নদী এবং বিশ্বাসে অমরত্ব
থাকতে হয়!
আমি সামান্য
রক্তমাংসের মানুষ
আমি নতমস্তকে শুধু
'ভালোবাসা' শব্দটা উচ্চারণ করতে পারি
যাতে প্রতিটি ঘৃণা নতুন মুদ্রায় প্রণাম হয়ে যায়...
২৬ শুভ্রাশ্রী মাইতি
(৫টি কবিতা)
ক) প্রণম্য হে
যে জীবন বৃক্ষের মতো,
নদীর মতো, পাখির
গানের মতো,
দ্যাখো, চাঁপাফুলি
রোদ এসে তার
পায়ের কাছে রেখে গেছে
নতজানু প্রণাম
পথ এসে দিয়ে গেছে
আনন্দ, হাসি, গানের
আশ্চর্য উপহার
আমি তো অকৃতি, অধম
মুথা ঘাসের মতো নুয়ে
নুয়ে
পড়া জীবন আমার কবেকার
কি আর দিই বলো,
তোমায়, উপহার ?
এমন জোড়শালিখ দিন
ফিরে ফিরে আসুক বারবার...
খ) অনুরাগ
তেমন করে ভালোবাসলে
আঙুলে স্পর্শ নয়,
হৃদয়
উঠে আসে অফুরন্ত,
জানো?
তেকোনা তিনফসলি জমি,
ছায়া ছায়া ঘরদোর,
টিয়ারঙ জানালা,
হরগৌরী উঠোন, বৃষ্টিআলপনা ঝিরঝির
মাচায় জড়ানো ডবকা
পুঁই নয়, সোহাগী নির্ভরতা রাত্রিদিন
সুরভি গাভী স্মৃতির
জাবর কেটে চলে, চোখ বুজে অক্লান্ত
তেমন নরম সুখের মতো
আমায় ভালোবাসো কি,
বলো?
গ) স্মৃতিময়
এসব আগুনে পোড়া
রঙবদলের রাজনীতি, বন্ধ কারখানা,
জং ধরা তালা, শ্রমিক
বিক্ষোভের বোর্ড ঝোলানো
নো ভ্যাকেন্সি অফিস;
এদের নিয়ে কথা বলতে
ভালো লাগে না আর
একদম...
তার চেয়ে, চলো, আজ
গাঁয়ের কথা বলি। ধান গমের ছায়া।
নিকানো উঠোন।
কুঁয়োতলা ছলছল। চাঁদ ভাসে পূর্ণিমা রাতে
কাঁসার থালাটি হয়ে
কেমন। খাড়াই দেওয়াল বাবা। ঝুঁকে থাকা
খড়ের চাল, মা। চালের
মাথায় খোকা-খুকি লাউ কুমড়োর খুনসুটি।
এইখানে হাতে হাত ধরে
গোবর্ধন পর্বত তুলেছিলাম আমরা একদিন।
গাঙুড়ের জল থেকে
বাঁচিয়ে এনেছিলাম সাপে কাটা মানুষের দেহ।
কমলে-কামিনী রূপ দেখে
প্রণাম জানিয়েছিলাম আশ্চর্য দেবীকে কোন
এইখানে, ওই পদ্মবিলের
ধারে, নরম এক শালুকপাতায়
জন্ম হয়েছিল আমার,
বহুযুগ আগে
কবিতার শিশিরফোঁটাটি
হয়ে যেন
ঘ) অভিমান
প্রতিবার ভেবেছি,
দেরীতে হলেও
আমার ভাষা বুঝে নেবে
তুমি ঠিক
আমার অ আ ক খ। আমার
শব্দ, অক্ষর।
ছেদযতি, বাক্যরীতি।
ছন্দ, অলঙ্কার।
স্মৃতিপাড়ের
গান্ধর্বী মেঘ বৃষ্টি নিয়ে এলে এপারে,
ভেবেছি, পাখি হবে
তুমিও। ভেজা ডানায় জড়িয়ে
নেবে ভালোবাসার
ণ-ত্ববিধান, ষ-ত্ববিধান অফুরন্ত
বাঁকানো ঠোঁটে খুঁটে
খুঁটে তুলে নেবে
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ,
গভীর, সায়ন্তন সব ব্যঞ্জনা
একে অপরকে বুঝে নেওয়া--
এ ও তো স্রোতেরই এক
ধর্ম, বলো?
সে ধর্মকে আমি হৃদয়ে
ধারণ করলেও,
দেখেছি, আমার ভাষার
কোন ধর্মই
আয়ত্ত্ব করতে পারনি
তুমি এখনও...
ঙ) আরাধনা
অপেক্ষা সাজিয়ে রাখে
যে মেয়েটি চোখের পাতায়,
তার দুঃখের কথা আমি
জানি
জানি, কেন সে ফেলে
দিতে পারে না
পুরানো বাসি ফুল,
নিভে আসা প্রদীপ,
হলুদ হয়ে আসা কবিতার
কাগজ,
শোক কিছু। কিছু
সুখস্পর্শ। স্মৃতি।
তার ভিজে আঁচল জুড়ে
আদরের দাগ
শ্রাবণ হয়ে লেগে থাকে
শুধু; এসব দুঃখের
কাছে সেই কবে থেকে
বাঁধা পড়ে আছি আমি,
জল বাড়ে, জল বাড়ে
গভীরের ছলাৎছল
তবু পারাপার হয়না
কোথাও কিছুতেই
যেচে দুঃখ নেয় যে,
পুড়ে যেতে চায়
ধূপের মতো ধিকিধিকি,
চোখের জল ছাড়া
তাকে আর কি দিই বলো?
এ চোখের জলে ভিজে যায়
তাল তাল মাটি
পুরো কুমোরটুলি জানে,
এ মাটি দিয়ে
আর কিছু নয়, দেবীর
প্রতিমা গড়া যায় খালি...
২৭) শোভন মন্ডল
(১টি কবিতা)
চাঁদের আলো
বাইরে খুব বৃষ্টি হচ্ছে ঝমঝম
মেট্রো চলে গেলে কয়েক মিনিটেই ভরে ওঠে প্লাটফর্ম
আজ কিসের যেন মিছিল বেরোবে রাজপথে
ছাতা হাতে অজস্র পুলিশের জটলা
বেবাক তাকিয়ে রয়েছে ভিজে কাক
সময়টা ভাল যাচ্ছে না বলে পুরনো ভিখারি রাস্তা পাল্টেছে
অটোর আনাগোনা কম, তাই রাস্তায় নেমেছে
মানুষ
মিডিয়া ধরে ধরে বাইট নিচ্ছে
আজ চন্দ্রযান ল্যান্ড করবে চাঁদে
সে কথা মেট্রো জানে, পুলিশ জানে, জনগন জানে
এমন কি ভিখারিটিরও অজানা নয়
আজ কাজ থেকে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে হবে
মিঠে চাঁদের আলোয় সকলে মিলে
অনেকদিন পর আমরা গল্প করবো।
২৮)
শ্রাবণী গুহ (২টি কবিতা)
ক)
কোমল গান্ধার
ফেলে
এসেছি নীলচে বিষন্ন নদী আর ঝুরি নেমে আসা বটগাছটা,
যেখানে
এখনও হয়তো দুলছে শৈশবের ভাঙা দোলনাটা।
চন্ডীমণ্ডপে
দুর্গা স্তোত্র আর মসজিদে আজানের সুর কানে আসে,
পাতা
ঝরার গল্প শোনায় শ্যাওলা জমা আঙিনার কোণের তুলসী মঞ্চ।
নীড়ে
ফিরতে চেয়ে একলা নীলকণ্ঠ পাখি,
মাঝখানে
ব্যবধানের কাঁটাতার পেরিয়ে যায় বিনা বাধায়,
গঙ্গা
নাকি পদ্মার জল ছুঁয়ে উড়ে যায় শঙ্খচিল,
ভাটিয়ালী
গান, উদাসী বাউলের একতারার টান,
সোনালী
ধানের ক্ষেতের আলপথ,
ধূপছায়া
শাড়ির পাড়ে এখনও কিছু চোরকাঁটা লেগে আছে স্মৃতির কাঁটাতারে।
আলতা
পায়ের ছাপ রেখে যাওয়া সমস্ত উঠোন জুড়ে,
ঠাকুর
দালানে
ছিটেফোঁটা আতপচাল বাটা আল্পনা,
সীমানার
গন্ডি আঁকে সংবিধান কলমের আলতো টানে,
ফোঁটা
ফোঁটা দুঃখ জমে ভারি চোখের পলক,
এখন
শুধু অপেক্ষা বেলা শেষের নিভে যাওয়া আলোর দিকে চেয়ে,
পান্তাভাতে
চোখের জল স্মৃতির আশ্রয় খুঁজে নেয় বলিরেখা মুখ।
খ) কথা
দাও যদি
উঠোন
জুড়ে জল থৈ থৈ কাগজের নৌকো ভাসাই এক কোণে,
এই
দীর্ঘ রাস্তা যেন বেড়ি বাঁধে পায়,
আমি
ফিরতে চেয়েও থমকে যাই চৌকাঠের সীমানায়,
আঙুলের
ফাঁকে জমা অপেক্ষার শিরশিরে কাঁপন বাজে শরীর জুড়ে।
এই
শহরে দেওয়াল ভেজে না তেমন করে,
হীরের
কুচির মতো বৃষ্টি পড়ে,
গরম
কফির কাপ হাতে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে দেখি,
তুমি
হেঁটে যাচ্ছো মরচে ধরা আর্দ্রতার চাদরে।
এই
দীর্ঘ রাস্তা যেন জন্মজমান্তরের দূরত্ব,
পার করতে
পারি না বলেই কি শাড়ির কুচির ভাঁজে অভিমান জমে,
ফেলে
যাওয়া পথের বাঁকে রেখে গ্যাছো ভেজা পায়ের ছাপ,
এই
দীর্ঘ রাস্তা যেন একা হওয়ার দিন,
তাই
আজও হোঁচট খাই,পড়ে যাই,হাত বাড়াই,
হৃদয়ের
একুল অকূল দুকূল ছাপিয়ে কান্নার বন্যা নামে।
যদি
কথা দাও ফিরে এসে হাত ধরবে পরের জন্মে,
আমি কাঁচের বয়মে জোনাকি
ভরে রাখবো, যাতে ফিরতে পারো পথ চিনে।
২৯ সুপ্রভাত
মেট্যা (১টি কবিতা)
কথা দাও
তুমি কথা দাও তবে
কবিতা লিখি।
শিশিরবিন্দু ফুরিয়ে
আসছে ঘাসের । রৌদ্র এসে সরিয়ে দিচ্ছে শরীর
আমার মন থেকে একটু
একটু ।
কষ্টের অর্জিত শব্দগুলি
এখন মিইয়ে আসছে ক্ষুধায়।
ভাতের দু'মুঠো ওষধি
মাগো তুমি আমাকে জোগাও।
আমি কবিতা লিখি।
কন্ঠ শুকিয়ে আসছে
আমার । হাতের তালুতে নুইয়ে পড়ছে আমার হাত, সমস্ত আঙুল। দেশ-বিদেশের রাস্তা পেরিয়ে
শহর পায়ে-পায়ের ধুলো
এসে আজ, আমাকে খুব শাসাচ্ছে ওরা।
আমাকে অন্ধকারে ঠেলে
দিচ্ছে।
জলকাদামাখা
কলঙ্ক-গায়ে ফিরে আসছে আমার কল্পনা শহর থেকে । তুমি কথা দাও তবে কবিতা লিখি।
৩০ সুশীল হাটুই (২টি কবিতা)
ক)
নগ্ন হওয়ার সিলেবাস
সন্ধেবেলা
আমি যতগুলো তারা
গুনেছি, তার মধ্যে ১২২টা তারা অন্ধকারের
প্রতিশব্দ জানে না।
অন্ধকারের প্রতিশব্দ জানলে,
ওদের উজ্জ্বলতা কি ১০০ গুণ বেড়ে যেত?
নাকি ওদের সকলকেই ঘোষণা করা হতো
মিস্ গ্যালাক্সি?
কিছু তারা নিরক্ষর বলে দুঃখে আছে।
পৃথিবী থেকে কয়েকজন জলবেশ্যা ওদের
মেসেজ পাঠাল,
নগ্ন হওয়ার সিলেবাস রপ্ত করতে পারলে, নিরক্ষরতা
কোনো দোষের নয়।
খ)
ফুলদানির ভাষা
ফুলদানির ভাষা শিখতে
আমার লেগেছে, ৭ বছর ৩ মাস ১৯ দিন।
ওর ভাষা শেখার পরই আমি বুঝেছি, ফুলদানি
ভ্রমরকে উত্তমকুমার বলে ডাকে।
ফুলদানির মনখারাপ হলে আমি তাঁকে
জোনাকিপোকার স্লিভলেস ব্লাউজের গল্প
শোনাই।
ফুলিদানি রাত্রে ঘুমোতে না পারলে, আমি
তাকে জলপরির লিপস্টিকের কথা বলি।
ফুলদানি হতাশায় ভুগলে আমি তাকে
গোলাপ-গন্ধের স্টু এনে দিই।
ফুলদানির সুরা পান করার ইচ্ছে হলে আমি
তাকে জবাফুলের ভক্তিগীতি শোনাই।
আমি অনেক কষ্টে ফুলদানির ভাষা শিখেছি।
কিন্তু সে আমার প্রিয় বাংলা ভাষাটা শিখতে
চায় না।
আর এতেই আমার ব্রহ্মতালুতে আগুন জ্বলে
যায়। বিরক্ত হয়ে বলি,
যে ভাষার স্ল্যাংগুলোও বিশ্বসুন্দুরীর চেয়ে
সুন্দর,
তুই সেই ভাষাটাই শিখলি না...
৩১ সৃশর্মিষ্ঠা
(২টি কবিতা)
ক) ঊষাকালে
ভোরের চাঁদে লেগেছে
টঙ্কার
পুবম্বরে পূণ্য ফলেছে
পৃথিবীর আকণ্ঠ আলো,
প্রণয়
ঘনিয়ে আসে ক্যাপাচিনোর
কুয়াশায়
দ্বিধার ঘাম ঝরে যায়
সাড়ে তিন পায়ের
কবুতর পদক্ষেপে
এমনটাই তুমি
সীমাহীন আর্চিজ
গ্যালারি
পেরিয়েছ শতাব্দীকাল
অন্ধকারের ঠোঁট ঘেঁষে
মিটে গেছে ক্ষতের
পুঁজ রক্ত
মুছে গেছে মরানদীর
বলিরেখা,
ধূ ধূ মরুর হু হু
পোড়া গন্ধ
কোমল ম বেজেছে অতলের
পাঞ্চজন্যের গর্ভে
খ) আজি
সাঁঝে যমুনায় গো
কোনো
কু পাখির ফুঁয়ে
ভেঙেছে
বাঁশি
রাখাল
পেরনো সীমান্তে
ছায়ায়
ছায়ার কীর্তনবেলায় যমুনাপ্রেম
মুঠো
মুঠো নাম ভেসে যায়
তার
গাঢ় স্তনের বেফাঁস চীৎকারে
লিঙ্গের
ব্যকরণে অশ্লীল বিলাবল
ভুরিভুরি কাঙালপনা
দিগঙ্গনার
নাগপাড়ায়
জুরাসিক
চিত্রনাট্যের হিমগান
দ্বাপর হেঁকেছে...
৩২ সৌমিত্র
উপাধ্যায় (৩টি কবিতা)
ক) নজরানা
জীবনের নাম সুখ, উহ্য ছিল সেদিন
কাঁটাতারে ঘেরা নিষিদ্ধ সীমানা
তীরে বাঁধা জলযান
কীভাবে পাঠাবে নজরানা
মরশুমে ওঠেনি তখনও মেঠো ধান
অধিকার রঙের রেশমি শামিয়ানা
তার উপরে সাদা চাদর
ভিতরে সর্বোচ্চ প্রাপ্তি স্বাদহীন লবণ
মাটির উপরে দাগ উঁচু নিচু
শিল্পের গোড়া থেকে আগের প্রকৃতি
মিলেমিশে হয়েছে সাদাকালো
অসফল বীজের মিশ্র আকার
বেঁচে যাওয়া তল, যদি ছোঁয়া যায়
মেঘপ্রিয়তার উন্মুখ আঁচল..
খ) সংগ্রহশালা
জলে জঙ্গলে বটের ছায়ায়
কী ঘটেছে যদি হঠাৎ জানা যায়
সৌভাগ্য ঢেকে দিয়েছে আগাছা
তাই নির্ভয়ে প্রেমের জলেতে ভাসা
একবুক অন্তঃক্ষরণে ডোবা লালপাথর
সজল গন্ডিটানা বৃত্তের পরিসীমায়
ক্ষয়ে যাওয়া সাদা শিলা
মৃত্যুর মুখে ছেড়ে আসা বেসামাল
গ্রহণে অর্জিত দুঃখ ভেঙে যায়
আকূতির স্বরে বলে ওঠে প্রাণ
এ সময় আর নয় বলিদান
মাঠে ঘাটে মুখ চেয়ে আছে
কচি কচি বীজধান আর
অহিংস বিটপীর সংগ্রহশালা..
গ) হাতিয়ার
তাড়িয়ে নিয়ে যায় অন্য কোন ভয়
দূর থেকে দূরে অবিকল
একই রকম ফল
যদিও অনেক উঁচুতে বসবাস
জঙ্গলে ঢুকেছে এক বন্য প্রবাদ
কঠিন হয়েছে বনবাস
আগেপিছে ভাবেনি কখনও
উপরোধে কাটবে বিপদ
মাথা নিচু হয়ে যায়
সরল তরল বুক ভরা নিঃশ্বাস
তাও হয়নি সহজ কাজ
জমিয়ে উল্লাস করেছে নির্ঘাত
আগুন আছে তাপ নেই
কে পোড়াবে জংলি হাতিয়ার..