ছায়াভুক
১
এখানে বসে আমি কেবল পাখির ছায়া দেখতে
পাই
আর ছায়াভুক রাক্ষসীর মতো তাই খাই,
এই উপমহাদেশে আমি আর পাখির ছায়া –এই দুই
খাদ্য খাদক।
২
বিহারের আরা জেলা ছেড়ে ওরা ঢাকার রিফিউজি
ক্যাম্পে,
ওদের কানে কেবল বাজে- যেও না, এ দেশ
ছেড়ে যেও না,
ভুল করছ,
ওরা সেই কণ্ঠস্বরকে জুতো ছুঁড়ে মেরেছিল,
এখন সেই স্বরটা ওদের ভেতরে ঢুকে এসেছে,
ওরা কান্না আর এই স্বর গিলে জেনিভা
ক্যাম্পে বসে থাকে
আর ওদের ছেলেরা বাংলা পড়তে যায়।
৩
এই সকালটাকে আঁকা দরকার
আর পাখির শিস,
সারা রাত দীর্ঘ দীর্ঘ শিস শুনেছি
বুলবুলির।
র্যাডক্লিফ লাইন
দুটি শরীর, নগ্ন , পাশাপাশি শুয়ে
আছে,
মাঝখানে র্যাডক্লিফ লাইন,
এর রাঁধা ভাত
ওর ঠোঁটে পৌছতে পারছে না!
লাইন বরাবর একটি কদম গাছে
একটা কাক, অভুক্ত, ডেকে যায় সমস্ত দুপুর।
অনথিভুক্ত দুটো শরীর
পাশাপাশি শুয়ে আছে,
মাঝখানে র্যাডক্লিফ লাইন…
আমার স্পন্দিত জন্ম মাসে
কোথা থেকে এসে যায় হাওয়া,
কী স্নিগ্ধ এই অরণ্য, আর আমার হাতের
পাতার মতন
এখানে এখনো মিশে সকলের আকাংক্ষার বীজ,
বেগুনি রঙের ঘাস, বুকে ধরে হ্লুদ কুসুম,
ওখানে বৃষ্টিরা যায় ঘুম আয় ঘুম।
এই সব মহা সার্থকতা,
এর মাঝে নিজেকেই রচি আমি,
কোথা থেকে হাওয়া,
কোথা নিয়ে চলে গেল-
এসব ভাবি না,
পাখির মুখের বীজ, আদরের মতো বেগুনি
ঘাসের নিচে শুয়ে থাকি
আর মহাজাগতিক মেঘ জলের ধারায় নেমে আসে,
আমার ঠোঁটের পাশে, আমার স্পন্দিত জন্ম
মাসে।
বৃষ্টিভেজা সকালের কবিতা
চাল আর ডাল বার করার আগেই বৃষ্টি এসে
যায়,
বাগানের ঘাসগুলো লকলকিয়ে এত বেড়ে গেছে
যে,
আজকাল ওদের তলায় দাঁড়ালে জল মাথায় পড়ে
না,
আমার বাগানে যেহেতু বারমাসই বৃষ্টি পড়ে,
বিশেষ করে ভেতরের বাগানে,
সেখানে পায়ের গোছ ভেজানো জলে
লাল কাঁঠালপাতা নৌকোর মতো ভেসে যায়,
তিনটে কাঠঠোকরা,
শেষ বিকেলে কদম গাছের মালিকানা
নিয়ে কাজিয়ায় ক্লান্ত,
আজ সকালে তারা চুপচাপ নৌকো ভাসিয়ে
চলেছে,
আমার সমস্ত চাল ও ডাল অবিরাম
বৃষ্টিপতনের শব্দে
নৌকোর পেছন পেছন মহাজাগতিক খিদের দিকে
ধেয়ে চলে যায়…।
ভাদ্র জাতক
আমার ল্যাপটপের স্ক্রিনে বৃষ্টি কুচি
হীরের মতো জ্বলছে,
আমার ঘাড়ের ওপর ফুঁ দিচ্ছে বৃষ্টি,
মেঘগুলো ঢুকে যাচ্ছে উপন্যাসের পাতায়,
আমার সমস্ত অক্ষর বিন্যাসে সে ভিজে চুলে
দাঁড়িয়ে রয়েছে,
আমি কী ভাবে তোমাকে ভুলে যাব জন্ম মাস?
অভিসার
গরজত বরষত আয়ী বাদরিয়া
পিয়া আছে রেঙ্গুনে, পচা এ ভাদরিয়া
একাকী পথচারী, ঘন নীল ছত্রী
না মেল, না হোয়াটস্যাপ, না কবুতর প্ত্রী
প্রবল পবনে যেই তরঙ্গম দুলিল
পুররমণীকুল তোরঙ্গটি খুলিল,
কী আছে কী বেরোয় হুতাশে যামিনী
ঘননীল শাড়িতে সেজেছে কামিনী
মঞ্জীর ফেলিয়া সঘন বাদলে
সে আসিবেই আমার মন বলে…
ভিতর কণিকা ২
তোমার কী কিছু হারাইয়াছে? ও পথিক? এই
চাঁদবালি
পুরনো বন্দর ছিল, বুকে নিয়ে শতাব্দীর
কালি
এখন তা হাজা মজা, শুধু এই বৈতরণী আছে,
পার হতে চাও যদি, খঞ্জন লেজ তুলে নাচে।
ভিতর কণিকা ৫
ঘর থেকে হেঁটে যাওয়া, বাজারের মধ্যে
দিয়ে পথ
কাঠের ক্যাঁচকঁচ দরজা, গাছে দোলে রঙ্গিন
শপথ
মাঝিরা আকুল হল, হাওয়া বয়, অধীর
তরণী-
ও মেয়ে এমন দিনেও তুমি ডুরে শাড়িটি
পরোনি?
ভিতর কণিকা ৬
এসেছ ভিতরে ঢুকে, আগে থেকে কিছুই বলোনি
সারারাত বৃষ্টিতে ভিজে আছে শহিদ কলোনি,
অনেকে এখনো ভাবে নেত্রকোনা, মেঘনা
সুরমা-
অথচ এ বৈতরণী, রাজবাড়ি বিকচ উপমা।
ভিতর কণিকা ৭
এখানে শরত বড়, ওখানে কেমন আছ তুমি?
আরেকবার পারি যদি ছুঁয়ে আসি ভূমি,
ছুঁই ওই নদী চর, কাশফুল, নিঃস্তব্ধ
সুষমা
ছলচ্ছল ছলচ্ছল, এত জল কোথায় যে
জমা!
চাঁদবালি অরণ্য নিবাস
আজ সকাল থেকেই অন্য রকম হাওয়া দিচ্ছে,
মনে পড়ছে চাঁদবালি অরণ্য নিবাসের সেই
আশ্চর্য মাঠের মতো ছাদ,
তার মাথায় প্রথম শরত আর উল্টোদিকে বহে
চলেছে বৈতরণী নদী-
এই দেখাটুকু নিজের মনের মধ্যে জমিয়ে
জমিয়ে
অনেক দিন ধরে ধরে চাখা-
আর মন তার নিজস্ব রসায়নে কী যে বানায়,
যে সেই দেখার স্বাদ কিছুতেই ফুরোয় না।
শ্যামচন্দ্র কোথাও নাহি রে
‘কিছুদিন মনে মনে ঘরের কোণে
শ্যামের পিরিত রাখ গোপনে’
বলা সোজা, বলা খুব সোজা,
মন আছে, ঘরের কোণও আছে,
পিরিতও আছে যথেষ্ট,
কিন্তু একলাটি হবার যো নেই।
শাশুড়ি ননদ স্বামী সবসময় ডাকাডাকি
খোজাখুজি করে,
তাছাড়া নদী যাবার রাস্তাটিও সরু হয়ে
গেছে,
চারদিকে উঁচু উঁচু ঘর, দোকানপাট,
পেরিয়ে নদীর ধারে গিয়ে আঁতকে উঠি-
নদী! নদী কোথায়?
শুখনো খাত পড়ে আছে,
বালি ভরে ভরে ট্রাক চলছে কোন সুদূরে।
আমার যুবতী বয়সের মতো কত মেয়ে
বালি বইছে মাথায়।
তারা অর্ধেক বেতনও পায় না,
তার ওপর সুযোগ পেলেই শরীর ঠুকরতে আসে
ছোট বড় লোক ,
মজদুর খাটায় যে লোকটি, শ্যামলা রঙ,
হাতের কলমটি সুদর্শন চক্রের মতো ধরে থাকে,
মেয়েরা কারো নামে নালিশ করতে গেলে
তাদেরই কেটে খণ্ড খণ্ড করে ফেলে,
কোথা থেকে উড়ে আসে ময়ূর পালক, সে চুলে
গুঁজেছে বলেই তো আর……
এখানে এক সময় প্রচুর ময়ূর আর হরিণ
ছিল,
ওরা শেষ করে দিয়েছে।
এখানে ময়ূর ছিল হরিণ ছিল নদী ছিল,
শ্যামচন্দ্র ছিল,
এখন কোথাও নাহি রে!
