শুভ্রাশ্রী মাইতির কবিতাগুচ্ছ
রাই সর্ষের ঘরকন্না
১
কবে কোন রাঙা রোদের নোলক পরা বিকেলে
আমরা ফেলে এসেছিলাম আমাদের
কলেজ পালানো বসন্তদুপুর
আর কেউ না জানুক,
ফুলডুংরির ঘাসে ঢাকা মাঠ,
লাজুক পাতার রিনরিন ম্যাণ্ডোলিন,
দিগন্ত উথলানো দুরন্ত মেঘের খুনসুটি তা জানে
তাই ঠাকুরাণ পুকুরের পানানরম জলে
স্মৃতি ভাসিয়ে রাখে ছলছল, নিহিত ঢেউয়ে
কোন নিঃসঙ্গ, নির্জন, নিদাঘ অবসরে
খুঁজে নিতে পারো, ইচ্ছা হলে
দ্যাখো, মুখ তুলে চায় কিনা
অভিমানী, সেই চেনা চোখে
২
বুকের বামপাশে কবিতা হয়ে শুয়ে আছে
রোদের উঠান; মাদুরে ধানদুব্বার আলো,
তারে মেলা মায়াবসত কবেকার
নিরাময় হরিতকীর বরাভয় আঁচলের ছায়ায়
এসবই ওঁকার আশীর্বাদ বলে মনে হয় যেন
মনে হয়, এখানেই ফুটিয়ে নেব আমরা
আমাদের চালেডালের সংসার; ঘিয়ের মতো
ছড়িয়ে দেব স্নেহ; ফুলকপি চেয়ে থাকবে
ডাঁটো চোখে এ স্বাদময় জীবনের দিকে
এসো, আসন পেতে দিয়েছি এখানে
সমর্পিত হৃদয়ের; নরম অনুভূতির জলছড়া,
লাল শালুর হাতপাখার পাশে কাঁসার গেলাস
জল নয়, জীবন রেখেছি, দ্যাখো, ডাকনামের
নৈবেদ্যটুকু মুখে তোল এবার...
৩
সেলাই করব বলে
তোমার নীল ডেনিমের শার্টটা
কোলের ওপর ঘন করে টেনে নিতেই
হাতাজোড়া সোহাগী আকাশ হয়ে
জড়িয়ে ধরল আমার কোমর দুষ্টু হেসে
জমিনের ছড়ানো ছিটানো তারাগুলো
কি নির্লজ্জ আর বেহিসাবী দ্যাখো,
আলো ছুঁইয়ে দিল মিটিমিটি
আমার চিবুকে, কপালে, ঠোঁটে
কি যে করি এখন, বলো!
এ ঘুঘুডাকা ক্লান্ত দুপুরে
শূন্য বিছানার দিকে তাকালেই
রাতের সমুদ্রের উথালপাথাল শুনছি খুব
সেলাই ভুল হয়ে যাচ্ছে শুধু বারেবারে...
৪
কিছু তো বলতে হয় মাঝে মাঝে
তাই বলি, তোমার আমার কথা
কবেকার সেই পুরানো চর্যাগীতি
সন্ধ্যা ভাষার কারুকাজ সহজিয়া
উঁচু উঁচু পর্বত পেরিয়ে নেমে আসো তুমি
কাঁধে তীরধনুক, হরিণের মাংস পাতার থোকায়
আমার গলায় সবরী বালির গুঞ্জাফুলমালা
রান্না বসাই হোগলার ঘরে, নিকানো জোছনার দাওয়া
এসব ধানদুব্বো গল্পই তো আমাদের সম্বল,
সুখদুঃখ পাতার ছেঁড়া ছেঁড়া সংসার
কাহ্নপাদ কবে থেকেই তো প্রস্তুত
খাগের লেখনী লেখে
নিহিত আলো, ভালোবাসার
৫
চানঘরের ছিটকিনিটা খট্ করে
খুলে বেরোতেই, তুমি চোখ তুলে
তাকালে আমার দিকে, বহুদিন বাদে
খুঁজে পাওয়া দারুচিনি দ্বীপটির মতো
অমনি জল নয়, কানের লতিতে
টলটল করে উঠল স্বাতীনক্ষত্রীয় মুক্তোর কানবালা
শঙ্খের ডাক শোনা গেল সুগভীর নাভিচক্রে
কোমরের খাঁজের লোনাবালি ভাস্কর্য পেরিয়ে
চিত আর ডুবসাঁতারে মাছেরা উড়িয়ে দিল
রুপোলি আঁশের সলমাজরি আঁচল; দ্যাখো,
শামুকখোলের স্বপ্ন ভাসছে কেমন প্রবালপ্রাচীর ছুঁয়ে
ঝিনুকবাড়ির মৎস্যকন্যা হয়ে উঠি এবার যদি
শ্যাওলা ঝাঁজির গন্ধ মেখে!
৬
তুমি ‘ভালোবাসি' বললেই,
সিঁদুরটিপ করে পরে নেব সকালের সূর্যকে
ধনেখালি শাড়ির আঁচলে বুনে দেব
সবুজ মাঠ, গৃহস্থী নদী, লাল কাঁকড়ার চর,
রক্তকরবী আলতায় এঁকে দেব নরম লক্ষ্মীপায়ের সারি
কবরীবন্ধনে বেঁধে নেব আলুলায়িত আশ্চর্য সন্ধ্যা
রুপোর নক্ষত্রকাঁটায় জোনাকফুলের দিপ দিপ
মেঘলা কাজললতা থেকে মায়া গড়িয়ে পড়বে
দেখো, চোখের পাড় ধরে খুব
শুধু তুমি ভালোবাসি বললেই
অভিসারী রাধিকা হব আমি
নইলে, এসবে এমন কি প্রয়োজন আমার, বলো!
৭
সন্ধ্যেবাতি জ্বালা হয়েছে দ্যাখো, ঢের আগে
মিনুদের টি. ভি. থেকে সাড়ে আটটার খবরের পর
সারেগামাপার গানের কলি কয়েক টুকরো...
সব ঢুকে পড়ছে এখন একে একে
আমাদের জানলাখোলা, আদেখলা ঘরটিতে
সমুদ্রের সফেন বিস্তার, সূর্যাস্তের সন্নত সিলুয়েট, ঝিনুক
কুড়ানো ছোট ছোট ঢেউয়ের আদর ছোঁড়াছুড়ি অশেষ
বড়ো জ্বালাছেন রফিসাহেব আমায়,
পোড়াচ্ছেন একা পেয়ে
এখনও কি সময় হয়নি তোমার?
শেষ টিউশনের ঘন্টি বাজিয়ে
বলো, কখন ফিরবে তুমি ঘরে...
৮
এইমাত্র স্পর্শ করলে
তুমি পাতার হাতে
অমনি শরীর জুড়ে মধুকুপী ঘাস
আর সবুজ মায়ার অরণ্য
ঝমঝম মল বাজিয়ে বয়ে গেল
নুড়িপাথরের দুরন্ত ঝরনা
এখন পলাশের লাজরাঙা গাল পেরিয়ে
তোমার দ্রিমি দ্রিমি মাদল
বেজে ওঠে এখানে যদি
দ্যাখো, ঐ মাতাল চাঁদ, মহুয়ার নেশায়
সাঁওতাল পরগণা করে তুলবে আমায় কেমন
৯
তোমাকে বলব বলব করেও
বলা হয়নি কথাটা এতদিনে
কে যেন আজকাল ঘোরেফেরে আমার সাথে
তার কাপড়ের খসখস, বালার ঠুনঠুন
আওয়াজ পাই খুব
তুলসিতলায় পিদিম জ্বাললে,
আলোর তাপ ধরে কেউ বুকে পেটে
শাঁখ বাজিয়ে প্রণাম করলে
মাথায় ঠেকায় নক্ষত্রশিশির হাত
তাকে কোনদিন চোখে দেখিনি আমি
তবু জানি, তার ছবি টাঙানো আছে
আমাদের ‘সুখী গৃহকোণ' লেখা দেওয়ালে
তোমাকে কোলে নিয়ে, সেই কবে থেকে...
১০
চন্দ্রমল্লিকা ফুটেছে এবার
উঠোন আলো করে
শাকতলায় ছনছনে পুঁই
একটা কচি লাউ সমানে টুকি দিচ্ছে
পাতার আড়াল থেকে নরম রোদে
মাচার দুষ্টু শশাগুলোকে ফনফনে বাতাস
কান মুলে সহবত শিখিয়ে গেল এখনই
দ্যাখো দিখি, কি বলছে ওরা
ফিসফিস সকলে---খোকা হোক!
খোকা হোক এবার কোলজুড়ে!
ছিঃ! লজ্জা পায় না আমার বুঝি
এমন গভীর করে তুমি তাকালে...
১১
দিন প্রতিদিন এসব গেরস্ত গেরস্ত
কুটোনাটি, আটপৌরে অভাব, টানাটানি, ছাড়াছাড়ি,
পাই-পয়সার হিসেবনিকেশ...
কবে কখন যে এ খড়কুটো সংসার
দেওয়ালে ঝোলানো লাল-নীল দিনগুলোর সাথে
গড়াতে গড়াতে ঠিক পৌঁছিয়ে যায় মাস-পয়লা থেকে
সংক্রান্তির অসহায় চৌকাঠটির দিকে, কে জানে!
তা বলে কিন্তু রাগ হয় না আমার এতটুকু
বরং নিজেকে কুলুঙ্গির তেলসিঁদুর ঠেকানো
লক্ষ্মীঠাকুরণটি মনে হয় যেন; না চাইতেই
উপুড় করে দেবে অনন্ত জমানো ভাণ্ডার মুচকি হেসে
তারপর ঘর আলো করে যা ঝরে পড়বে
তা শুধু টাকা, পয়সা, সিকি, আধুলি বুঝি!
আমাদের কবেকার ভালোবাসাও তো
রুনঝুন...রুনঝুন...লাজে
১২
এই যে সূর্য ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে পরিক্রমা সারা বছর
ধুলোবালি, খড়কুটো, ফুটিফাটা ডাঙাডিহি,
শস্যপোড়া শব্দের দিন
জষ্ঠির খরা শুধু ফুঁড়ে ফুঁড়ে আসে,
হাঁসগুলো ডানা ঝেড়ে উঠে আসে
চই চই ঘরবাড়ি, জাবনার পাশে
এখানে ঘট কাঁখে লক্ষ্মী পা আঁকে
হরিতকী ছায়ার বধূ; ল্যাংটো শিশু
হেঁতালের ডালে চাঁদসদাগর সাজে
তারই মাঝে কোন্ সে দেবী, গ্রাম ডুরেপাড় শাড়ি;
পদাবলি চোখ বেঁধে রাখে শুধু জলবাতাসা নাড়ি
তুমি আমি হাতে খঞ্জনি, হেঁটে যাই পথ মেখে
কোন্ সে গোকুল, কত যুগ ধরে, কালা কানু খুঁজে ফিরে
শ্যামলী কপাল, তাতাপোড়া স্নেহ, ভারি হয়ে আসে ঝোলা
দুপুরের রোদে জল হয়ে আসে নবীন রসকলি বেলা
আর সব কিছু যে যেখানে থাক, তুমি আমি চলি হেঁটে
তুমি প্রিয় চণ্ডীদাস, আমি রামী রজকিনী বটে
