এপ্রিল ২০২৫ এর কবি কৌশিক সেন একগুচ্ছ কবিতা

 



ঝড়

কৌশিক সেন

 

দুটি জোতদার। পাড়াতুতো দুই ভাই

ভিতরের ঘরে অস্ত্রের কারবার

খুঁটি জোরদার। লতিয়েছে বনসাই

তারই মাঝখানে জনতার দরবার।

 

আঁচ জ্বলে ওঠে। ধিকিধিকি, লেলিহান

পাতালের ঘরে এখনও মরক, মারী

পাবলিক জানে নিষাদের জয়গান

পিধানে এখনও নিদ্রায় তরবারি।

 

 

শপথের লালা ভিজিয়েছে রাজপাট

নুনের বদলে পান্তার গ্রাস শেষে

নিশাচর পাখি জ্বালিয়েছে চ্যালাকাঠ

দুটি নিমগাছ। দাঁড়িয়েছে ঘেঁষে ঘেঁষে।

 

ঈশ্বর জানে কামনালব্ধ ফল

পাতা ঝারা দিলে কতখানি বয় স্রোত

মরা নিমগাছ কবে ছাড়ে বল্কল

তানাশাহিবীর বাঁধলে যুদ্ধপোত!

 

তরবারি আজও সাবলীল অক্ষর

মাধুকরী সারে গণধর্ষিতা নান

বীক্ষার নেশা বেঁধে রাখে ধরোহর

আরেকটু পর ভেঙে হবে খানখান।

 

বুক বাঁধে তবু ক্ষীণতনু তস্কর

এ মহাবিদ্যা এখনও সিদ্ধকাম

ছাই হয়ে গেছে আদিতম জতুঘর

এইতো সময়। পেরোয় মধ্যযাম।

 

 

কর্ষিত মাটি। অনুলোমমুখি কৃষি

শ্রীখোল বেজেছে। হরিনাম ধরতাই

চাঁদ খুঁড়ে তোলে আদি বৈদিক ঋষি

ওরা দুইজন। রূপ-সনাতন ভাই।

 

অকুলান তবু। শব্দ নেহাৎ কম

ভোজালির ধারে এঁকে রাখা সাদাঘুড়ি

বনপথ দিয়ে হেঁটে চলা হরদম

ঘন জঙ্গলে খুঁজে ফেরা কস্তূরী।

 

 

উদ্বাহু সুখ। ছলকে পড়েছে বীজ

রাজসিক রোষে জ্বলে যায় গোলাঘর

বাতি নিভে গেলে গলে যায় মনসিজ

পুড়ে গেছে ঘাস, স্তব্ধ তেপান্তর!

 

গান গায় কবি, অশ্রুতকাল জুড়ে

ধিকিধিকি ছাই, দগ্ধ কণ্ঠনালী

গরম ফোয়ারা উপচায় মাটি ফুঁড়ে

পেটফোলা শিশু দিলে শুধু করতালি।

 

 

আলেয়ার দেশে মরিচগন্ধী বট

বিশালাক্ষীর নাটমন্দিরে শলা

গর্ভগৃহে কি বাসা বাঁধে কর্কট

মেঘে মেঘে বুঝি পুড়েছে ষোড়শকলা!

 

দেবীর আসনে ষড়যন্ত্রের মেঘ

এ ফাগ ফুরায় দ্বিজের মন্ত্রজোরে

মূষিকের দায়, বাতাসে মিশেছে প্লেগ

এইতো সময়, শান দিই খঞ্জরে।

 

 

ভেদ করো বাণী, তানপুরা তোলো দেবী

আছড়াক ক্রোধ লুপ্তনগরী পথে

আদিতম প্রাণী সেজেছে সমাজসেবী

কালনেমি যদি ফিরেছে পুষ্পরথে

 

যদি’বা ছিঁড়েছে দেবীর পূজার মালা

রাখি সে বিষাদ নিমীলিত অন্তরে

ধূপ-দীপ তাপে সাজিয়েছি আটচালা

ডানা মেলে ধরি সম্ভাবি ধুলোঝড়ে!!

 

 

 

এপ্রিল ২০২৫ এর কবি সিদ্ধার্থ মিত্র একগুচ্ছ কবিতা


 


সিদ্ধার্থ মিত্রের কবিতাগুচ্ছ

 

অসুখ

আমাদের মাঝে ঢুকে পড়েছে তৃতীয়জন

কঠিন অসুখ নিয়ে

বিচ্ছেদের কালপুরুষ

করুণ সুরে পড়া চলছে ধৈর্য্যের কবিতা

আমরা তিনজনেই এখন আবৃত্তি করছি নিঃশব্দের

 

 

অতিথি

 

রান্না ঘরে আজ খুব বাসন পড়ার আওয়াজ

সন্তর্পণে ঘরে ঢুকে পড়েছে রাগ, অতিথির বেশে

তার পর কল খোলার শব্দে

ভেসে উঠল, মৃদু ফোঁপানির জল

এই অতিথি হয়তো আজ থাকবেন রাত ভর

যতক্ষণ না অতিক্রম করছে আদরের পাহাড়

 

ব্রেইল

 

অন্ধ ভিখারী সত্য

তার অভিন্ন বন্ধু ঈশ্বর, পাগল

দুজনে মিলে পথে বসে ভিক্ষা করে

সত্য বাঁশি বাজায়, পাগলটা তার চোখ আঁকে রাস্তায়

শুধু মনিটা আঁকার সময় ভিক্ষার কয়েন দিয়ে

গোলাকার বানিয়ে নেয়

দূর থেকে দেখি, ঈশ্বরের আঁকা চোখে হাতবুলিয়ে

অন্ধটা পড়ে নেয় ভিক্ষার ঝুলি

 

শাফেল

তোমার ইচ্ছে হাত গচ্ছিত ব্যথার কপালে

ফুঁ দিয়ে সম্পর্ক সরিয়ে, ঝাঁপ দিলে অতলে

নির্বাচিত কবিতার সংকলনে দেখেছি, তোমার

ছদ্মনাম, বেমালুম চেপে গিয়েছ থার্ড জেন্ডার

অথচ শব্দের রূপ এতটাও ক্লীব নয় যে তার ছন্দ

বদলে জলেই ঢেলে দেবে আগুন, গায়েমাখা মন্দরাজ্য

বিভাজনের পাতায় আটকে থাকা স্মৃতির পেজ মার্ক

খুলে শাফেল করেছ লিঙ্গ, টাইম জোন দিন রাত,

ওখানে নারীখেকো বিড়ালের মুখোশ পরে, গোপনে

ছৌ নাচে, অদৃশ্য তিল থেকে ভেলকিবাজির রসায়নে

সম্মোহন দেখায় আস্তিনের চিঠি, ঘোর লাগা কবিতা

এই শহরে আপদকালীন ভালবাসায় সবাই খুব একা

দুদিকের ফুটপাত জুড়ে গেলে রাস্তাশূন্য গন্তব্যে

চাপা পড়ে মানুষের হেঁটে যাওয়ার ইতিহাস

 

বাঁক

জানো রঞ্জাবতী? গতরাতে তোমার ব্যাগে চিরকুট

রেখে এসেছি, যাতে লেখা এক টুকরো বাঁকের কথা

শরীরে পথ বাঁক নেবেই, তখন ভাঙা মেসেজে জানিও

পরের ভ্রমণপথ, প্রতিটি মাইলস্টোনের পাশে দাঁড়িয়ে

ইশারায় জানান দেব, আগের বাঁকের ছবি, সর্ষেক্ষেত,

পাহাড়ের টিলায় আগুনরঙা রডোডেনড্রন, গ্রেট হর্নবিল,

কিছু বিশৃঙ্খল ঝরনা, সোনালী ধানজমি ছুঁয়ে নরম রোদ।

গাড়ির কাঁচ নামিও না, বাতাসে লঘু চুমুর শব্দে ঘনবাষ্প,

সবার নজর ঘুরে গেলে, ভালোবাসা গড়িয়ে পড়বে খাদে।

গন্তব্যে পৌঁছে, মিলিয়ে নিও মানচিত্র চিরকুট, দেখবে

ভোরের আলো বাঁক নিতে নিতে ক্লান্ত কোকিল শিস

দিয়ে জানান দেবে, ভ্রমরের পাল চলেছে মধু সংগ্রহে।

তুমি ছুটতে ছুটতে উঠে পড়বে সর্বোচ্চ টিলায়,

ওখান থেকে দেখবে, নিচের গভীরে

একলা কাকতাড়ুয়া দুহাতে ডাকছে,

আর তুমি উড়ে চলেছ নিচে আরও নিচে নিরুদ্দেশের গল্পে..

 

 

মৃদু উপসর্গ

আশালতা, তোমার কপালে লাল টিপের বৃত্তে

একফোঁটা হাসি লুকিয়ে বলেছিলে, ওটা জন্মদাগ।

আমি সরল মনে ভাবেছিলাম, গোধূলির রক্তিম ছায়া

স্বপ্নে তোমায় গলায় জবার মালা পরিয়ে, আঙুল ধরে

পেরিয়েছি হিজলগঞ্জের ন্যাড়া সাঁকো, পলাশডাঙা স্টেশন

পথে হোঁচট খেয়ে কালশিটে চিবুকে স্পষ্টত লজ্জার রঙ।

নিরুদ্দেশের চাবি রেখে গেলাম তোমার কোমরে,

 যদি বাড়িয়ে দাও হাত, বাতাসে,

তৈরী থেকো দমকা আভাসের।

মৃদু উপসর্গ নিয়ে ফিরে আসব, আমারও ইচ্ছে খুব জ্বরে

প্রশ্ন করি, জ্যামিতি বক্সে রাখা রবারের গন্ধ কি খুব অচেনা?

কি যেন ছিলো আঁকা, গোলাপী পাখি না হলুদ টিউলিপ ?

অসুখ সারিয়ে, বিস্বাদ জিভে সাজিয়ে রাখা পদ রাঁধতে,

কাঠের উনুনে ফুঁ দিয়ে আগুন আগলেছো? কতবার ?