অগাস্ট ২০২৫ এর কবি তন্ময় ভট্টাচার্য – একগুচ্ছ কবিতা




অগাস্ট ২০২৫ এর কবি তন্ময় ভট্টাচার্য – একগুচ্ছ কবিতা
 
লগ্ন
 
হাঁ-মুখে চাপাই কব্জা—যত দীর্ঘ টানো শ্বাস
ভয় তত চেপে বসে, বাষ্প জমে যন্ত্রের ভেতর
 
মাত্রা বেড়ে চলে, আর, মাত্রাছাড়া কেঁপে ওঠে কাঁটা
 
কাঁটা কি যমের দৌত্য, চলাচল স্তব্ধ করে ছাড়ে
বাষ্প কি মোছার পরও জল হয় অন্যদের চোখে
 
যন্ত্রের ভেতরে ছিল নিজস্ব পৃথিবী, তার পাপ—
যন্ত্র খুলে রাখা মানে, শান্ত হয়ে এসেছে বিদায়
 
গুল্ম
 
ছুঁড়ে-ছুঁড়ে দিই জল—যথেষ্ট, যথেষ্ট করা হল
এর বেশি চাইলে ঘাড়ধাক্কা মেরে তাড়ানোই যেত
তবে সে এতেই শান্ত—ছাদের কিনারে, ভীতু, বসে,
                         বলে সূর্য এবারে নামুক
এবং সারাটা দিন অতিকষ্টে ধরে-রাখা ফুল
আমাকে পরাতে চায়, আমার কি সে-বয়স আছে!
 
নিশিনবমী
 
যখন নিভে আসছে চতুর্দিক, হাত ধরে
চেয়ে ফেলছি বাড়তি একটা দিন, আমায়
নস্যাৎ করা হচ্ছে। তুমি, নিয়ম ভাঙতে উৎসুক,
ভেবেই শিউরে উঠছ—কার ভয়ে
             সে-কথা যদিও কাউকে বলব না
আঁচল ঠিকঠাক করো, ছেলেমেয়েরা বড়ো হয়ে গেলে
ধীরেসুস্থে বোলো, এই মামা কিন্তু তত মামা নয়!
 
 
স্পেস
 
আরেকটু সময় যাক। দিনগুলো নষ্ট হোক আরও।
দাঁতে দাঁত চেপে, কিংবা অন্য কাজে নিজেকে ভুলিয়ে
ক-দিন পেরোনো গেল। সামনে কিন্তু বহুকাল—তুমি
ভবিষ্যৎ দেখতে পারো? সত্যি-সত্যি ফুলে উঠবে মুখ?
চেনাই যাচ্ছে না, শুধু নামে জানো—এমন প্রস্তাবে
রাজি হও? নষ্ট দিন, পোকা বাড়ছে একটা-দুটো করে
 
দিবানিদ্রা
 
আমার নিজের বলতে কেউ রইল না—
ঘুমের গভীরে এই ধন্দ কেটে যায়
                      ভালো লাগে বেশ
 
ঘুম, আরও ঘুম—
আমি মা-বাবাকে রোজ দেখতে পাই
 
দ্রুত ভেঙে যায়, দেখি
ঘুমের ভেতরে তাঁরা নেই, তবে
                   বাড়িতে আছেন
 
কোন প্রাপ্তি ভালো—এই দোলাচলে
সূর্য কিছুক্ষণ
 
গুহ্য
 
মিলনে ব্রহ্মের স্বাদ, বিরহে তীর্থের
বিচ্ছেদে আত্মার মুক্তি—
              এই তিন জেনেছ, সাধক
 
কখনো দুর্মদ হয়ে তছনছ করে দিয়েছ সব
 
গৌণ থেকে গৌণতর এভাবে জন্মাল
তুমি আর তোমার সঙ্গিনী
 
তোমার সঙ্গিনী তুমি
তুমি তার প্রশ্নাতীত গান
 
সংকেতে মজেছে বাক্য—সুরে অন্ন, সুরেই প্রয়াণ
 
রঞ্জন
 
জেগে ওঠো ছদ্মবেশ, বলো কোন প্রকাণ্ড আধারে
গৃহীত হয়েছ, বলো, হাসি কান্না লজ্জা ও কুসুম
অথবা নিষ্ঠুর বাক্য— কোন আধার, অতিকায় ক্লেশে
জগৎ আচ্ছন্ন হল, তিরোভাব, সমর্পণবাণী—
ছদ্মবেশে কী-বা ভয়, আমি তার অস্থিচর্ম জানি
 
স্বপ্নাদেশ
 
মন্মথ নদের নাম—বিশাল পুলের নিচে শুয়ে থাকা ভাষ্কর্যরেখায়
আপাতত চেনা যায়, পুলের ওপরে গেলে দেখা যায় পূর্ণযুবা খাত
অথচ আবেগ শূন্য, ফলে স্রোত শূন্যতর—অস্তিত্ব রয়েছে, যেন তা-ই
তোমার সান্ত্বনাবাক্য, হাঁটুজলে নেমে ঠোঁট ছোঁয়ার মনোবাসনা-প্রায়
মন্মথ নামের নদ—শ্যামলী বাংলার বুকে তোমাদের সঙ্গম শেখাই
 
দূরত্ববাচক
 
তোমাকে পেয়েছি আমি ধ্যানে ও বিজ্ঞানে
অভাববোধের কোনো সুযোগই হল না
 
যদিও অনুপস্থিতি বিষবৎ লাগে
শরীরও অপর কারো আঁকিবুকি জানে
 
তোমাকে পেয়েছি আমি ধ্যানে ও বিজ্ঞানে
ধৈর্যের অভাবে প্রজ্ঞা সফল হল না
 
শান্তিচুক্তি
 
রাগের মাথায় যদি কেউ বলে বসে 'কেন মরোনি এখনও'—
আমি কি সত্যিই তার মন রাখতে ছুটে যাব ব্রিজের ওপরে
নিচে কি জল না রেলগাড়ি সে-বিচার করা সম্ভব যদিও
হবে না তৎক্ষণাৎ, ফাঁসির বীভৎস দৃশ্য কিংবা বিষ খেয়ে
নিয়ন্ত্রণ হারাতে আমি চাই না, বরং তাকে জাপ্টে ধরে যদি
রাগের মুহূর্তগুলো জল করে ঝাঁপ দিই, না-উঠি কখনও
 
যৌগিক
 
সহজ সন্তানবাক্য ভুলে গেছি ভাই
এরপর পৌঁছব কোথায়
 
সন্তান—সহজ বাক্যে ওঁয়া-ওঁয়া কাঁদে
                      হেসে দেয়
 
অমন দেয়ালা কেন এ-ঘরে পড়ে না
প্রতিফলিত আলোয় ডাকি চাঁদ
 
বন্ধুর সন্তান দেখে সন্তানকামনা বেড়ে যায়
 
বিমানযাত্রা
 
বাংলা জানে না কেন আমাদের এয়ার হোস্টেস
মুখেও লাবণ্য যেন কিছু কম বাঙালির চেয়ে
কী জানি বোঝাতে চায়, মানা করে, দিব্যি দিয়ে ফ্যালে
আমার সাহস চাই, সে-ও চায় স্বচ্ছন্দ উড়ান
অথচ ভাষার ভারী ব্যবধান, একসঙ্গে উড়ে যেতে হলে
আকারে-ইঙ্গিতে আর কতক্ষণ, কে তাকে পড়াল
পেশাদারিত্বের বুলি, কেন খোঁপা করেনি অঢেল
বাংলা জানে না, তবে, বিদায় জানাতে পারে ঠিকই!