চতুর্থ বর্ষপূর্তি বিশেষ সংখ্যা ২৩ জন কবির কবিতা


 

উজ্জ্বল একঝাঁক পায়রা অনলাইন পত্রিকা

চতুর্থ বর্ষপূর্তি বিশেষ সংখ্যা


২৩ জন কবির কবিতা প্রকাশ পেয়েছে। 


অভিষেক ঘোষ, অমর্ত্য দত্ত, আমিনুল ইসলাম, এলা বসু, কৌশিক সেন, চন্দ্রনাথ শেঠ, চন্দ্রানী গোস্বামী, তন্দ্রা ভট্টাচার্য্য, তিস্তা, দিলীপ দত্ত, দেবযানী বসু, নমিতা বসু, নিমাই জানা, ব্রজকিশোর রজক, রূপক চট্টোপাধ্যায়, শংকরনাথ চক্রবর্তী, শমীক, শিশির আজম, শীর্ষা, শ্রীতমা ত্রিপাঠী, সমর্পিতা ঘটক, সোনালী ঘোষ, স্বর্ণালী সরদার দাস


মুখবন্ধ

অমিত চক্রবর্তী

 

আমরা ট্রেঞ্চে তখন, গণৎকারই শুধু জানত

যুদ্ধশেষের কথা, মাথা থেকে

বেরিয়ে পড়ে গরম লাভা 

তরল এবং তামাটে লাভা এবার

গড়িয়ে পড়ে

ছোঁয় তাকে, ঘেরে তার চারধারে, নাচে তার                                                                                 

চারধারে কালের কণ্ঠ, দম্ভ, দাম্ভিক লোকটা

তেইশটা কবিতা ছেপেছিল, আমারটা ছিল

আটাত্তরে। 


==================================================================

অভিষেক ঘোষ – ২টি কবিতা


তিরিশ শেষের কবিতা 

১          

বোধহয় খুব কেতাবি যন্ত্রণায় সাদরে

সাজিয়েছিলে ঝালর দেওয়া বাহারি 

পর্দার সোহাগ জানালায় অথচ এখন 

বাইরে পুকুর, নরম আর ঝকঝকে

দেখলেই জাল ফেলতে ইচ্ছে করে বাইরে!

ফেললেল উঠে আসবে আলোর মাছ,

অপেক্ষায় আঁশবটি রক্তাক্ত কলরব নিয়ে

দলছুট ঘুম শিশিরের শব্দ হয়ে বালিশে লুকোয়।

পোড়া মন যখন হাত বাড়ায় অথর্ব বেলেশেষে

তখন জবাব দিয়ে ফেলা হাঁটুদের ভিড়ে,

জানালার বাইরের ওই নরম পুকুরে

নেমে যায় আমার শৈশব-কৈশোর গলা জলে।


যদ্দুর চোখ মেললে ঝাপসা লাগে

অবুঝ চশমার মতো সেইসব দুর্বোধ্য দুপুরেরা

কাজল চোখের মতো অন্ধকার পুকুর

আর সন্ধ্যার দমকা বাতাসের মতো ব্যাকুল

অথচ বেসুরো দীর্ঘশ্বাস, আলপনা আঁকা

কবেকার কোন্ গৃহস্থ প্রণয় দিয়ে,

অথচ আজ কেউ ঘর চেনে না,

চেনে না দুঃখের স্বপ্ন, যার অগোচরে 

ফুল ফুটে থাকে বিষের, কবরের আর

দেখা হয় অতীতের সাথে যখন

আমাদেরই বাবা-মা হাত ধরাধরি করে 

হেঁটে যেত কোনো বিকেলে পার্কে 

গঙ্গার ধারে তখনও কি আফসোস 

এত গভীর হত মায়াভরা সূর্যরঙে?



অমর্ত্য দত্ত


ফলতঃ


তু‌মি চাও লঘুসারকতা। আ‌মি চাই সর্বানুভূ‌তি।

এভা‌বেই ই‌প্সিত ঘ‌টে যা‌বে দ্যোতনবশতঃ।

ঘ‌টে যাবে মন্থন, জ‌লের প্রসার, নিম্নাবগাহ।

যেমন ক‌বিতায় থা‌কেনা কিছুই অস‌ন্নি‌হিত।


যেমন আলম্ব‌নের অন্ত‌রে বিভাব শুধুই বিভাব

আর বিভা‌বের সুগভী‌রে তদ্গত থা‌কে অন্বয়।

আ‌মি তার যা দে‌খে‌ছি সবই তোমার গোপনীয়।

আপাতদৃ‌শ্যে সেই অ‌ভিনব প্রকাশিত নয়।


আ‌মি তার যা ছুঁ‌য়ে‌ছি সবই তোমার প্রণোদনা

সর্বথা ছ‌ন্দিত ছ‌ন্দিত..,তাই তো তোমার তো‌ট‌কে

ও তন্মূ‌লে ব‌সে আ‌ছি কতকাল। কি যে‌ চাও?

যে প্রেম অদ্রা‌ব‌্য, কি ক‌'রে প্রেম ব‌লি তা‌কে!


এতদূর এ‌সে‌ছি যখন, দেহ দেহে ঘ‌টে‌বে দ্যোতক।

তু‌মি যতই চাও অল‌মি‌তি, আমি চাই যথার্থ হোক।



আমিনুল ইসলাম - দুটি কবিতা


চা-পাতার মোড়কে সাজানো আদিমতম সেই জোকার। পাতার মোড়কেই লুকিয়ে রেখেছিল সরু হাড়ের সেই তাণ্ডব। দূরবিনের উলটো পিঠে মেঘের ঘোলাটে। রাজমিস্ত্রির মুকুট-সাজানো। সেই কি রঙের অনুপাতে ঘর বানাবে। জিভে ছুতোর আঁকছে লাভার স্রোত। হয়তো কুকুর বলেই এতো কনকনে উপসর্গ। কিছুক্ষণ পর একদল নেকড়েও ফিরবে। নিরামিষ আঁচড়ে অন্ধকারেরও সেই যৌন-সংশয়


কাঁটা বুনতে বুনতে দুঃখও আনন্দকে জাড়িত করছে। আর খুঁজেও পাচ্ছে না ঘুমের বড়ির মতোই নরম গন্ধ। আচ্ছন্নতা দুপুরকে সেলাই করবে। সচেতন এই রাজধানীই বুনবে মাকড়সা। বুকের ভেতর শয়তানের দাবায় কেঁপে কেঁপে উঠবে বাতাস



এলা বসু 


বিজয়া 


মহিলা স্পষ্টই বিরক্ত 

কেন এলাম অসময়ে 

নিজেকেই পারেন না সামলাতে 

ফোন সামলে মেয়ের সাথে কথা হচ্ছে সবে 


কাঁদছেন কথা বলতে বলতে 

একবার নয়, চার পাঁচবার 

এনাকে আমি চিনি,  

এনার কাছেই এসেছি 

সাদা সিঁথি জন্ম নিলে 

কাঁধে সামান্য হাত রাখতে 


সুস্থ নন, লড়ে যাচ্ছেন 

নিজেকেও বলেন দিনে দশবার, বেশ আছি 


বাইরের ঘরে আলো জ্বলে 

ভিতরের ঘর অন্ধকারে একা 

অক্সিজেন ঘনত্ব বাড়ে কমে 

দেয়াল সরে সরে আসে 

ঘর ছোট হতে থাকে



কৌশিক সেন


বণিক


যেটুকু ঘুম

তার চতুর্গুণ শোক 

কুড়িয়ে আনি বাণিজ্যে…


নগর সভ্যতায় বিরাম নেই আর

সূর্যাস্তের পর আকাশে ছড়িয়ে পড়ে

বিষাদ


আমি আর কতটুকু কিনে নিতে পারি

আমি আর কতটুকু কেড়ে নিতে পারি!

শুধু একরাশ ধুলো জড়ো করি

অন্ধকার বজরায়।




চন্দ্রনাথ শেঠ


স্পিচথেরাপি


মিশতে-না-পারা লোক--সমুদ্রে আসে;পর্যটন বেছে 

নেয় 

পাহাড়তলিতে। অরণ্যে এসে কথা ফোটে তার অধিক বয়সে। 

তখন পাশে থাকে না আর প্রকৃত কথা বলা পুতুল। 


শুধুই সমুদ্র গর্জন তখন;পাহাড়ের পাশাপাশি শুধুই  হাঁটা-কথা 

আর অরণ্যের রহস্যময় ফিশফিশ ক্রমশ ঘিরে ধরে তাকে :

 চামচে করে মুখে তুলে দিতে দিতে বলে,

--'একে বলো সমুদ্র-ঝিনুক', 

--'এটাকে পাহাড়ি-পাইন...ভুলো না'...


তখন মিশুকেলোকের মতো তার মুখে গভীর অরণ্যের

অনিমিষ অঙ্কুরোদ্গম; গুরুগৃহে কথাফোটার ধুম মুখ্ড়া



চন্দ্রানী গোস্বামী 


অগ্রন্থিত


অগ্রন্থিত যা কিছু, অন্ধকারে ঝড়ে গর্জায় বুকের ভিতর


মনে আছে, স্কুলের টিউনিক ফ্রক, ওয়ার্ক এডুকেশন ক্লাসে

গিঁট ফোড়ে তার নাম তোলা রুমাল, অতঃপর

ভ্রষ্ট গল্পের একাকী জলতলে নুয়ে আছে কুমারী লজ্জার

চাঁদ, অনেকটা ইচ্ছেস্রাব...


একবার, আরো একবার পাহাড়ে এসো। দেখবে ছায়া ফেলে

জলের লজ্জায় আজও। অস্থিমজ্জায় গোপনতা নিয়ে

চাঁদের ঠোঁট আর চোখের তারায় কার যেন ত্বক আলোয়

খুব নম্র...


আজ পর্যন্ত কেউ একটাও ডাকে পাঠায়নি কাউকে 

আমার কবিতা

মফস্বলের ছেলেটা নির্ঘাত দাঁতে ঘাস কাটতে কাটতে 

                    পরিচিত মেয়েকে জপাতে গিয়ে, কিংবা 

                    কস্মিনকালেও প্রেমিকার কাছে

                    দুটো একটা শব্দও উদ্ধৃত করেনি

                    মহুল থেকে ডুং ডাং ডাঙরির মতো মন্থর

                              এবং মাদকতাহীন আমার কবিতা

খুব কাছ থেকে দেখেছি মিছিলের শেষপ্রান্তের ছেলে

পায়ে রবারের জুতো, গোড়ালি ফাটা 

                     স্লোগানে সে' ও একবারও ব্যবহার করেনি 

                      আমার লেখা কোনো একটাও লাইন


আমি তবু কবিতায় লিখি পৃথিবীর নির্জনতম পতাকার রঙ 


আমার প্রথম বন্ধু চুমু খেয়েছিল আমাকে

ঠোঁটে ঠোঁট দিয়ে কবিতা চেপে

দ্বিতীয়জন মূর্খ, তাই ফোড়নে জিরে আর ধনে পুড়িয়ে

গাল খেয়ে গালে হাত দিয়ে সবার শেষে ব্রেকফাস্ট খায়

আমার কবিতার নায়িকার মতো ----

আর 

আমি

মিশ্রকলাবৃত্তে তবুও কবিতা লিখি, যার কোনো পাঠ কখনও হয় না


                 ...শুধু নিজের কলমে প্রিয় রঙের পতাকা কাঁপে।


তন্দ্রা ভট্টাচার্য্য


তুমি ফাল্গুন পূর্ণিমায় এসো

                      

অনুবাদ নয় তুমি  আছো অক্ষরে অক্ষরে।

জড়ানো লতার মতো গাছ ঢেকে দিয়েছ তুমি।

ব‍্যস্ততার পারদ চড়ছে তবুও ছায়ার নিচে 

গিয়ে বসি দুদণ্ড। ভাতহীনতার নাভি বেয়ে 

নেমে আসে রাক্ষস। বস্ত্রহীন, গৃহহীন 

মানুষের লালামাখা শরীর। বোতল বন্দি জলের কাছে 

পিপাসা নতশির। কে কাকে খায়, কাকে কামনা করে? 

নির্জন রাতের বেদিতে কুকুর ঘুমায়।  

তারা হারা আকাশে মেঘ শুধু মেঘ। 

এসো হাতে হাতে মন্দির গড়ি। আরশিতে দেখি দেবতাকে।

নুন ও মিষ্টির পরিমাপ জিভ শিখিয়েছে। 

মুক্ত কথা দিয়ে ধুয়েছি হৃদয়।  

বাঁশপাতায় হাওয়া লেগেছে এই ফাল্গুন পূর্ণিমায়। 

ঠিকানা ভেঙে ফেলার খেলায় 

দুটি গৃহ যেভাবে এক হয়।


তিস্তা 


শ্মশান (অংশ)

আগুনের ভিতর একটি গোপন সিঁড়ি

ক্রমশ দৃশ্যমান হয়ে ওঠে গঙ্গার তলায়...

প্রতিদিন নদী নিজের মৃত্যুকে স্নান করায়


এই মাটি জানে,

কোন দেহের অনুতাপ কোন দগ্ধ ফুলের গন্ধে মিশেছিল।

কোন প্রেম একদিন তুলসীপাতায় মুড়ে

নিজেকেই উৎসর্গ করেছিল আগুনে।


নদীর জলে কারও প্রতিফলন টেকে না

যেই মুখ জলে ঝুঁকে পড়ে,

তৎক্ষণাৎ জন্ম নেয় অন্য এক মুখ —

অন্ধকারে দীপের মতো কাঁপতে থাকে।


এখানে মৃত্যুর চেয়েও দীর্ঘ হয় সময়,

আর জীবনের চেয়ে ক্ষণিক—

এক ফোঁটা ছাই।



দিলীপ দত্ত


পুনর্বাসন 


যদি আরও একবার ফিরে যেতে ইচ্ছে হয় 

তার মানে এই নয় চলে আসাটা প্রকৃত ছিলনা 

চলে গেলে কিছু গন্ধ ঘর ধরে রাখে 

প্রকৃত না বলে সঙ্গত বলাই যেত 

বলবো না 

পোশাক পড়ালে শব্দের গায়ে রঙ লেগে যায় 

অনুবাদে শব্দেরা হ্রস্ব হয় আলাদা গান গায় 

তবু আজন্ম অনুবাদেই বিস্তার 

আসি বলার মধ্যে ফিরে আসবার শুদ্ধটান অমোঘ 

যেভাবে তট তৃষ্ণা নিয়ে সমুদ্র বেসামাল 


প্রকৃত প্রস্তাবে ফিরে যেতেই পারি 

সে কথা আলাদা 

সে তো পূণর্বাসন চায় 

আবাসন ছেড়ে গেলে প্রতিটি গাছ কাঠ হয়ে যায় 

পুনর্বাসন এ নতুন করে গোছায় আলনা ও আলমারি 

ঘুঁটের উনুনে পৃহপালিত আগুন  

রাত জেগে বসে থাকে


দেবযানী বসু


প্রার্থণা এক অবয়ব


কামড়ানো বিস্কুট দিগন্তে নেমে গেলে শ্রাবণী কড়ি মধ্যম  

সেজে ওঠে পূর্বী আরশিতে।

ফুটে ওঠে কিশোরীর সানাইআলাপ ভোর ভোর বেলায়। 

আঁখির জন্য যা কিছু লিখি পাখির জন্য তা লিখি না। 

এই দ্বিচারিতা এক তাঁত যন্ত্রের যন্ত্রণার ছোঁয়া লেগে মধুর।

কর্পূর তুলসীর অসুখ ভাবায়।

দিগন্তে ফোটে শহরের জ্যামজট বহুকৌণিক জ্যামিতি।

লংশটে জাগো।

এই জাগা মালতীকর্পূর রুমাল ধার দেবে।

মালতী পুরের মালগুঞ্জির দিকে ঝুঁকে এখানকার গাছপালা।

অপ্রিয়েসু, ঘনঘোর মেঘমল্লারের কাল শেষ হল।

এই যে এখন প্রতিমাশুকানো রোদ উঠল

আর সাদা মেঘের ভেলা মাথায় চড়িয়ে

তোর ছবি ওং নমো বলে আকাশের এ গলি ও গলি ঘুরে 

হোয়াটসঅ্যাপে।

নায়ক এখনো সুবোধ বালক মাত্র বছর ত্রিশের।

ভূতের হাওয়ার লাগল নাচন মাশরুমের ঐ কলোনিতে....

জলের পালাই পালাই ভাব আজন্মের। 

দেয় আর ফিরিয়ে নেয় সহজ মীমাংসা।

দুলে যাওয়া কবিতার মাখনপিছল ত্বকে শিশিরও অস্থির।

পেন্ডুলামে কখনো পান্ডুরতা লাগে কি?

ভিখারিণী আলোয় জাগে মধুবন্তী রাগ।



নমিতা বসু


মনন


জলের ঘূর্ণির স্রোতে 

ফুলের দক্ষিনি  গন্ধে বেহুলার বাস 

যেখানে নাভির মদিরায় পিপাসার গ্লাস,

অসহিষ্ণু সাগরের জলে সঁIতারের অভিলাষ

সরলরেখা অনতিক্রম গরলের ভেবে নেওয়ার অনভ্যাস।

এটা ভেবে নিলেই সুবাস।


নিমাই জানা


উৎপাদক বিহীন গ্লিসারাইড কবরের পিতা ও নষ্ট বোতলের জং স্থপতি


দশম যজ্ঞ কেন্দ্রের থেকেও হড়হড়ে গ্লিসারাইড কবরের থেকেও আত্মার দীর্ঘ চিৎকার বেরিয়ে আসা কালো রঙের পিতার সাম্রাজ্যের স্টেরয়েড খাওয়া মহাশূন্যের অপ্সরার নর্তকী, ধুধু আগুনের স্তব্ধ বরফ অনাবৃত তীব্র তাপের উদ্বায়ী অন্ধকার থেকে অসংখ্য আঁশটে রক্তস্রাবের বিদ্যুৎপৃষ্ট পিশাচ উঠে আসছে কেন্নোর মতো , অপরা শরীর লোমকূপের মহাপার্থিব সংজ্ঞা দাতব্য সমাপিকা ক্রোধের অলিখিত রেখাচিত্র থেকে আঁচড় খাচ্ছে আবর্জনা ভর্তি উনকোটি রাতের নিরামিষ মাংসাশী ভগ্নাংশের তলপেট , নষ্টের মতো যীশুর তরবারি নেই রুহ অন্ধকারে দাতব্য গিরি খাতের তুলো ভর্তি সংকেত শব সংরক্ষণাগার দমবন্ধের ছদ্মবেশ পোশাক পরে নিচ্ছে ধারালো ছুরির থেকেও মারাত্মক সঙ্গমশালায় , কেউ পোশাক আলগা করে শুয়ে থাকে, হরিৎ নেই জ্যামিতিক ফসফরিক দানার হরমোনাল পরজীবী কৃমির কেটে রাখা অ্যাসিটিক বোতল থেকে উঠে আসে জঙ্ঘা পাগলের চুমু, নষ্ট কবরের উপর দুগ্ধবতী চামড়া বিহীন ক্যাঙ্গারু দল সাপের শরীরে ঝুলে থাকা অসংখ্য মৌর্য স্থপতির স্তনগ্রন্থিতে দেশলাই ফোটাই রক্ত বিন্দুতে ঢুকিয়ে জমা করছি সম্পাদ্যবিহীন অলৌকিক রাসায়নিক চেম্বারের মূত্র গ্রন্থি , কফিন বিক্রেতার নিতম্ব ভর্তি জামার দোকান পালকবিহীন নিউক্লিক সক্ষমের বীজথলি ইউরোপ্লাস্টের ভেতরে থাকা চুম্বকীয় কারখানার নাবিক মধ্যরাতে নেমে যায় নিষিদ্ধ পল্লীর টকটকে প্লাস্টিক পাত্রে জমিয়ে রাখা মৃতদেহের পাকস্থলীর পা ফাঁক করে , শেষ রাতে একাই ৪৩০৯৪ কোটি খন্ডের শরীরটাকে ঝুলিয়ে তৈলাক্ত করে তুলি লক্ষ কোটি প্রজন্মের বিষাদগ্ৰস্থ ডলফিনের মতো, হে হত্যা এখন ৩২ ভগ্নাংশের চক্ষুগুলো বের করো গর্ভপাত অগ্নাশয়ে তরল তামা ঢালো



ব্রজকিশোর রজক


ঝুমুরিয়া বেশে


প্রশমনের আগে নেমো না তুমিও, এই জাগরণে 

সলতেখানি ভিজে আছে আমাদের ক্ষোভে 

আবার জ্বলে উঠুক অন্ধকার, ঝিঙেফুল রঙে

মাদৈল আবার যদি কখনো বা জাগে

আমিও হাঁকাবো প্রিয় ঝুমুরের রিঁঝ ভোররাতে,

তোমাকে না হয় নেবো ঔষধের মতো


অথবা জাগলে পলাশ, নীরবে নীরবে এসো

মৌমিতা মৌতাত মেখে, আমাদের ডাক ছোবে

নীরবে আকাশ, কোনো এক ঝুমুরিয়া বেশে।।



রূপক চট্টোপাধ্যায় 


পঞ্চ প্রদীপ (অংশ)


দূরবীন দূরত্বের আগে তোমাকে বসাই। 

লক্ষ্য হোক হেতালের বনে আঁকা

লবনের মায়া, অবেলায়  পোড়া রুটির পাশে 

সিঁন্দুর সোহাগির নামে  তোর সুখটি সাজাই!


চৈত্রের ঠোঁট কড়া রোদ পড়ে, পুড়ে যায়। 

কিছু দহন মাধবীলতা হয়ে আসে ভোরবেলা 

কিছু দহন দোতারায় তুলে রাখে অন্ধ বাউল

কিছু দহন তৃষ্ণা হরিণী, ডুবে যায়, তৃণাচ্ছন্ন লোখায়!



শংকরনাথ চক্রবর্তী


চোখে একটা ফাঁকা রাস্তা 


চোখে একটা ফাঁকা রাস্তা দেখে 

শূন্য  বারান্দাকে ডেকে  এনে বসাই

বলি , এসো পরষ্পরের বিষন্নতার গল্প করি ,

চা খাই শোকমাপা কাপে নাহয় কিছুক্ষণ 

উষ্ণতার লোলনচাঁপায় ছন্দ ঢেকে 


যদিও বিকেল বলে গেছিল 

সন্ধ‍্যে হলেই দেখা করতে ,

প্রহরের ঝিলে ছায়ারা নাকি 

আলো টুকে রাখে বিধ্বস্ত দিনের 

ঘামে আর যামে অন্ত‍্যমিল মাপতে 


ইদানিং চোখে একটা ফাঁকা রাস্তা দেখে 

পারাপার ঢাকি নৌকার ছইয়ে ,

মাঝি দেখে ফেললে ঢেউকে বলে দেবে ,

একজন সাঁতারুও এখনও জীবিত আছে 

যে শূন্য বারান্দাকে ভাঁজ করে রাখে 

ঘরকে স্বাধীনতা দেবে বলে !


চোখে  একটা  ফাঁকা রাস্তাও নদী হয়ে যায় 

জল যদি শোক চিনে যায় বিষন্নতার দ্রোহে


শমীক ২টি কবিতা


১) মৃত সুহাসিনী ও ঘটমান -বর্তমান


মৌর্যযুগ, গুপ্তযুগ পেরিয়ে অন্ধকার কার্নিশ টপকে বারিস্তা-সন্ধ্যায়।

পেন্সিল হিল ছাড়িয়ে মেরুদন্ড বেয়ে বেড়ে ওঠা গুহাচিত্র ছুঁয়ে ফেলছে পিটুইটারি।

তুঘলকি আবদার শেষ হোক প্রথম রাতেই -

এমন সুতীব্র বাসনায় নিজেকে দংশন করে চলে সুহাসিনী।

আইনরক্ষকদের মতো দেখতে ম্যানিকুইন বন্ধ শাটারের ওপারে নিদ্রামগ্ন।

তুঘলক শিখে নেয় হেলথ - ড্রিঙ্ক খেতে;

বড়ো হয়ে  তুঘলকের নাম হয় বোমারু বিমান।

সুহাসিনীর শরীরের হিরোশিমা, হ্যানয়, বাগদাদ জুড়ে

লালা - সংসদ- রক্ত- আইনসভা- হেল্পলাইন- বীর্য - পিটিশন -গণভোট।

অবশেষে জলপ্রপাতের মতো মেঘলা ভোর।

 

বাঁশবাগানের মাথায় চাঁদ , ড্রোন নাকি ঈশ্বর -

কার অস্তিত্বের সম্ভাবনা বেশি, 

এই নিয়ে ডিগ্রিধারী - সাদাদাড়ি তুমুল তর্ক জমে উঠেছে

যদিও “আমাদের সময় একদম শেষ”। 


২) নগরযাপন

 

ডায়েট কোকে মিশেছে বেদনা

যূপকাষ্ঠে অন্ত্যজনের গল্প

ব্লু-জিন্স পেরোচ্ছে গড়িয়াহাটের মোড়

বাঁশদ্রোণীতে মেদ জমেছে অল্প।

 

চিত্রকল্প রোজ তো একই

ব্ল্যাক কফি -টোস্ট , আলতো ডাবল নট

বাইপাসে রোদ দুর্ঘটনায় হত

পাখিরা ডেকেছে প্রতীকী ধর্মঘট।

 

এসব পেরিয়ে সেনসেক্সে চোখ

এসব পেরিয়ে স্থিতধী ফাগুন আবেশ  

নিয়ম - মানা নাগরিক ট্রাফিকেতে

বেমানান রোদ - হঠাৎ অনুপ্রবেশ।

 

তদন্তে দোষী মৃত রোদ্দুর

ধর্মঘটী পাখিদেরও জরিমানা

ওটিপি-তে জমা রাষ্ট্রীয় বিশ্বাস

মিছিল ছুঁড়েছে অমোঘ রূঢ় ঘৃণা। 


শিশির আজম


বই বাঁধাইকারী


বই বাঁধাইয়ের কাজটা একাধারে রোমাঞ্চকর ও চ্যালেঞ্জবল

প্রতি মুহূর্তে নিজেকে সতর্ক রাখতে হয়

প্রস্তুৎ থাকতে হয় যে কোন রিস্ক গ্রহণ করবার জন্য

কেন না বইয়ের ভিতর যে নির্দিষ্ট সংখ্যক অক্ষর রয়েছে

তারা তো একই গোত্র থেকে আসেনি

তারা স্থান-কাল-পাত্র নির্বিশেষে যে হাজার হাজার শব্দ নির্মাণ

বা বিনির্মাণ করেছে সেগুলোও ধর্মে-বর্ণে-রীতিপ্রকরণে

পরস্পর ভিন্ন এমন কি কখনো কখনো প্রতিদ্বন্দ্বীতামূলক

অবিস্বাস্য মনে হবে, জীবনানন্দের 'বেলা অবেলা কালবেলা'

বাঁধাইয়ের সময় বখাটে ঘাসফড়িং

আমার অসাবধানে বাম চোখের কোণ দিয়ে ঢুকে

কখন খামচে ধরেছে রেটিনা

ডান চোখ টেরই পায়নি

কিন্তু এখন প্রতিবেশি দার্শনিক দুটি শব্দ তাকে সমানে জ্বালাচ্ছে

(মহাদেশ জুড়ে শব্দ দুটি যথেষ্ট বিতর্কের জন্ম দিয়েছে)

তবে ৭ লাইনের একটি পৃষ্ঠা

একবার আমার পেশাগত জীবনকে বিপন্ন করে

তুলেছিল প্রায়, বিশদ খবর নিয়ে জেনেছি

ক্ষুদ্র ঐ পৃষ্ঠাটি

এক সিরীয় বেদুইন কন্যার হৃৎপিন্ডের প্রজ্জ্বলিত অংশ


শীর্ষা 


অধরা নদী কিংবা বোকা মানুষের কবিতা (অংশ)

 

নদীর গল্প লিখতে গিয়ে মাছের কথা উঠে আসেই। আসাটুকু যেন অনিবার্য। অথচ মাছ এ পৃথিবীতে এমন কিছু অপরিহার্য প্রাণী নয়। হাজারও পুষ্টিপুষ্প মাছের শরীর জুড়ে ফুটে থাকলেও মাছকে এমন কিছু সম্মান দেয়নি মানুষ। যতখানি বনের প্রাণীরা পেয়েছে। এদিকে এই অপমানে রাঙা হয়ে মাছ নিজের শরীরকে বদলেছে। চতুর পিচ্ছিলতা দিয়ে মানুষের কাছে অধরা করে রেখেছে নিজেকে। মুমূর্ষুর ভাতের থালার মতোই মানুষ তার পিছনে ছুটে চলেছে। ছুটতে ছুটতে জলে পড়ে গেছে। জলের গভীরে ডুবে গেছে। এবং প্রাণ হারিয়েছে। অতঃপর আবারও শেষমেষ নদীই জিতে গেছে। মানুষকে হারিয়ে একক চিরন্তন হয়ে বেঁচে আছে পৃথিবীর বুকে।

 

 

ঠিক এই বিন্দুতে এসে মাছ, নদী এবং মানুষের মধ্যে একটি ত্রিকোণ প্রেমের কল্পনা করা যেতে পারে। যেহেতু কল্পনা একটি গল্পের গাভীমাত্র, তাই তার পা ছুঁতে কোনো দোষ নেই। আর ঐ ত্রিকোণ প্রেমটি গল্প থেকে বেরিয়ে এসে পাড়ার দোকানের শিঙাড়ার রূপ নিতে সক্ষম অতি সহজেই। যার সুগন্ধে মানুষ দৌড়ে আসে। ঝাঁপিয়ে পড়ে ফুটন্ত কড়াইয়ে। তার এই ঝাঁপান দেখে অন্য মানুষ হাসে। তার দিকে ত্রিকোণ প্রেম বাড়িয়ে দেয়। শিঙাড়া বাড়িয়ে দেয়। মন দিয়ে ত্রিকোণ প্রেম চিবোতে চিবোতে মানুষের মনে পড়ে যায় বাকি নর-নারীদ্বয়ের কথা। তৎক্ষণাৎ শিঙাড়ার পুর বিস্বাদ হয়ে যায়। দাঁতে লঙ্কার কুচি ঠেকে। নিরীহ সবজির সামান্য ঝাঁঝ মানুষের দু-চোখে নদী ডেকে আনে। আবারও একইভাবে নদী বইতে শুরু করে। ত্রিকোণ প্রেমের সাথে সাথে মানুষকেও ডুবিয়ে মারে। মানুষকে হারিয়ে দিয়ে একক চিরন্তন হয়ে বেঁচে থাকে পৃথিবীর বুকে।


শ্রীতমা ত্রিপাঠী


 প্রদাহ


যতবার লঙ্ঘন করেছো গুহা মুখ, ছিঁড়ে গেছে যাবতীয় কৌমার্যের সুতো

অপরিমেয় ঝড় জল সয়ে যাওয়া ফিতে দিয়ে মেপে নিলে কাম, সূত্রের বরাত 


সন্ন্যাস শরীর থেকে বের হয়ে এলো এক কমন্ডলু ব্রহ্মচর্য, স্বেদ কণিকার আস্বাদন 

অথচ, পাথর ফাটিয়ে বেরিয়ে আসার কথা ছিল কিছু বেদুইন রাত, ভুলে যাওয়া ঢেউ কিংবা 

আমার অন্দরের তুমি-র!


আজ, যজ্ঞের ছাই থেকে তুলে আনলাম তোমার পরাভূত দেহ, নিষ্কাম, গার্হস্থ্য যাপন 

আহুতি দিলাম স্বর্গসুখ, অনুভব আর

যৎকিঞ্চিৎ যবের দানা 


এখন সমারোহে ভাসে বাসরের সুঘ্রাণ,

চুলার আগুনে ফুটন্ত চাল-ডাল আর শীৎকার 

আগুন সাজাতে সাজাতে নিভে যায় শেষ শয্যার রেশ

তোমার ভুল ধরি সাধ্য কি!

তাই,গহীন বনে রেখে আসি পাকশালা ও দুটি দেহ 

আর আমাদের গায়ে আঁকা শত সহস্র রতিচিন্হ।।


সমর্পিতা ঘটক


কিচির মিচির

 

জড়ো করেছি সহস্র ধ্বনি।

হেসে উঠি, অভিমান, রাগে ঝনাৎ রাখি চাবির গোছা,

বাড়ি ফিরেই আমরা অশান্ত পক্ষীছানা।

কথা থেকে কোন কথায় নদী গড়ায়,

কোন মুখে আলো, কে ছুরি শানালো!

ভেসে আসে ক্ষত, কলরব, পোষা খরগোশ,

স্রোত ছোটে অনাদি প্রান্তর...

 

পোশাক পালটে ঘরোয়া আমিরা ক্লান্ত,

রসদ জমিয়ে পক্ষীমাতা কল্যাণকর দিনটাকে

আপাতত ছুটকারা দেয়।

কালসাপদের পুরে রাখি ঝাঁপিতে,

অন্ধকার শান্ত বাড়িটা এখন শ্রান্ত বেদেনিদের নৌকা,

জেগে ওঠে, ভেসে ওঠে, নড়ে ওঠে শান্ত দেওয়াল।



সোনালী ঘোষ


নিশিজল (অংশ)


১.

মন্ত্রে ফেরোনি তুমি বহুদিন, তবু এপাড়ায় ওপাড়ায় কত

কানাকানি শুনি, আজকাল গোলাপের বাসর দেখলে 

মনে পড়ে কাঁটা, 

এখনো রক্তে জমে আছো ত্বমেকা...


ঈশ্বরী পেলে আনত মুখে মেয়ে ডাকি, 

হৃদি মাঝে দু'খানি পা...আকাশে হেমন্ত এখন

দুয়ারে নিশি জল, টলটলে মুখ অমলিন হাসি


স্বর্ণালী সরদার দাস


নিহত পাখিরা


অসংখ্য নিহত পাখির মধ্যে আমি একজন

সকালের সূর্যের পাশে উড়তে উড়তে

ক্রমশ বিন্দুতে মিলিয়ে যেতে চাইছিলাম 

লাল, আর শুধু লাল

যারা পৃথিবী থেকে আকাশ দেখে রঙ চিনতে চায়

তাদের সকলের একজোড়া করে ডানা দিও ঈশ্বর 

মাটির বুক থেকে দূরে সরতে সরতে ওরা 

বুঝে যাবে

এমন করে সব রঙ চেনা যায় না


আলোর চোখে চোখ রেখে বুক চিতিয়ে দাঁড়াক ওরা

প্রথমে ধাঁধিয়ে যাবে চোখ

অবশ হয়ে যাবে সব অনুভূতিগুলো 

হয়ত বা মাথা ঝুঁকিয়ে ওরা পিছু হঠতে চাইবে প্রথম প্রথম

তারপর এক দুটি মুহূর্ত  কাটিয়ে দিতে পারলেই

আলোর আলিঙ্গন বুকে জড়িয়ে

নীল থেকে সবুজ ,সবুজ থেকে হলুদ, হলুদ থেকে লাল 

রঙ চিনে নিতে নিতে

অপরাহ্নের সূর্যের মধ্যে মিশে যাবে 

সব পিছুটানহীন নিহত পাখিরা