নভেম্বর ২০২২ এর কবি শুভঙ্কর দাসের একগুচ্ছ কবিতা

এক গুচ্ছ কবিতা

শুভঙ্কর দাস









১ একটি তারার তিমির


ট্রাম আসার আগেই রাস্তা পেরিয়ে যাবে কবি,আর সময়।

ট্রাম আসার আগেই রাস্তা পেরিয়ে যাবে কবি,আর

মুহূর্ত। 

ট্রাম আসার আগেই রাস্তা পেরিয়ে যাবে কবি, আর

কবিতা। 

এবার অলৌকিক ক্রিয়াপদটি বাদ দিয়ে যেই মাত্র

একটি তারা তিমির ভেদে উঠল

ট্রাম এসে গেছে,আর দুর্ঘটনা। 

'কবি'  শব্দের জায়গায় অপমান, প্রত্যাখ্যান এবং হতাশা---- এসব বসিয়ে দাও


তাহলে শেষপর্যন্ত দেখবে,কবি কোনোদিন মহানগরে যায়নি,ট্রামরাস্তা তো অনেক দূরের কথা


এখানে ধানখেতে শুয়ে আছে দিগন্তের কাঁধে হাত রেখে....


২ মার্জিনে মুগ্ধতা


যে কবিতা লিখিনি,যে কবিতা পড়িনি অথবা এভাবে 

বলা যায়, যে কবিতা এখনও আমাকে প্রসব করেনি

সেটা কবিতাটি উৎসর্গ করে দিলাম,

সেই অন্ধ ভিখিরিকে, যার ফুটো থালার শব্দে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ঘুম ভাঙে!

সেই কাঙালিকে, যার হাতের রেখায় দশটা মন্বন্তর

আটকে আছে জঞ্জিরে বাঁধা পশুর মতো!


নিজেকে নিঃশব্দে নিঃশেষ করে কবিতাটি লেখা হল

স্বাক্ষর দিতে গিয়ে দেখি

সেই ভিখিরি বা কাঙালির সঙ্গে আমার কোনো তফাৎ নেই অথবা আমি সেই তাহারাই... 


মুগ্ধতায় যা দেখতে পাইনি রাতদিন!



৩ কাদম্বরী


একটি ফুল ফুটে আছে নদীর ওপর,স্রোতের পর 

স্রোতে ভেসে আসছে,তার সুবাস...

যা নৌকা ভেবেছিলে,তা আসলে পাপড়ি

যা পারাপার ভেবেছিলে,তা আসলে বৃন্ত 


ফুলটি নদী হয়ে গেল নাকি নদীটি ফুল হয়ে গেল


এই ভাবনায় এক নবীন কবি ছুঁয়ে ফেলল মন

 

যাতে আস্ত একটি ভুবন বানানো যায়।


৪ জাদুজন্মের পরের কথা


একটি ধুলোমাখা লোক পাথরের অস্ত্র ফেলে

শুধু অশ্রুতে চাষ করবে বলে

মাঠের মধ্যে পড়ে থাকে অনন্তকাল... 


একটি আনন্দময়ী অমরাবতী সব রঙ মুছে  

শুধু ধুলোর রঙে গৃহ বানাবে বলে

বৃষ্টি হয়ে ঝরতে থাকে রাতদিন...


একদিন সূর্য নৌকা চড়ে দিগন্তের ঘরে গেলে

সেই ফেলে রাখা তরঙ্গে লোকটি ও অমরাবতী

কাছাকাছি হতেই

রাত্রি শেখাল কীভাবে জ্যোৎস্না মাখতে হয়ে

শরীরের ভেতর শরীরে


ভোর হল শালিকের হৃদয়ে 

উড়ে যায় ডানা মেলে শস্যশিশু কখনো নক্ষত্রের দিকে,কখনো মাটির দিকে...



৫ এক মুহূর্তের মাটি


হাতের ভেতর জঙ্গল,মুখের মধ্যে খরস্রোত আর বুকের ভেতর শিকারীর হিমচোখ


হরিণের রঙে আসে প্রস্তাব প্রেমের,দূরীভূত সকল শোক!


মৃত্যুর কাছে চেয়ে নিয়েছে প্রত্যাবর্তন,আগুনের কাছে পুনর্জন্ম  আর অন্ধকারের কাছে সন্ন্যাস-সঙ্গম


নিজের মুখ আয়নায় আঁকবে,একজীবন বড্ড কোমল ও কম!


হরিণ ছুটে আসে ছবির মতো,তীরও ছবির মতো,শিকারী দাঁড়িয়ে পাতার ফাঁকে


শুধু হত্যার সময় এবং সময়ের খুন,বসুন্ধরা কোঁচড়ে তুলে রাখে,তুলতেই থাকে।



৬ স্থাপত্য 


ঘাসের ওপর সুগন্ধি পদধ্বনি আদি পিতামাতার মিলনস্নান তুলে ধরে আকাশে

এখন বৃষ্টির সময়,মাঠে মাঠে বীজধান জন্মান্তরের গান করে,যে গান লালন,রামপ্রসাদ আর হাসন রাজাকে ছুঁয়ে যায়।

এখন খরার সময়,মরুরেখা নদীর বুক চিরে রক্ত বের করে,যে রক্তে রাবণ,ইবলিস আর দুঃশাসনকে জাগায় আবার ঘুম পাড়ায়


নক্ষত্রের নিচে সহস্র মিলন,শরীরকে পিতা করে,ভালোবাসাকে নারী করে চলেছে,আদি-অন্ত,চিরকাল

কখনও যদি সুদর্শন চক্রের জন্ম হয়।


৭ নীরবতার নৌকা 


নতজানু প্রিয়মুখের কুরুক্ষেত্র আর তপোবন এক,জলে স্পর্শ করলেই নদী,বাতাসে ফুঃ দিলেই স্রোত,মাটিতে দাঁড়ালেই শিকড়

এত শরীর, এত প্রেম , এত প্রস্তাব,এসবের আছে অনন্তকাল মানে?


আমি নগ্ন হতে পারব না

প্রেমিকা আমার পাতা-ফল-ফুল

নগ্ন নতুন নীরবতার সামনে

একা অথবা একার অধিক।


৮ খনন


কুরুক্ষেত্রের শেষ দৃশ্যে যে অস্ত্রটায় একটুও রক্তের দাগ লাগেনি,তাই বুকের পাঁজর করে নেমে আসে সন্তান।


তাকে অবতার বলো না,তার জন্য কোনো লীলাকীর্তন রচনা করো না অথবা কোনো অলৌকিক জীবনরচিত!

এমন এক চিতানো ইস্পাতবুক চাই

বুদ্ধআঁধারের মতো অন্যায়

হজরতঅসহ্য অত্যাচার

যীশুবিদ্ধ অসাম্য

যে অস্ত্রের রূপ করে আসুক না কেন,সংসারে,প্রেমে,গোপনে অথবা প্রবৃত্তির আদিমতায়


মাটির মতো পেতে দেবে সন্তানের বুক

শতসহস্র অসুখেও কোনো পিতামাতা কুরুক্ষেত্র চায় না,খনন চায়


যাতে জল উঠুক,পিপাসার।


৯ পাথরের পৃথিবী 


নতুন পর্দা লাগানো হয়েছে জানালায়

নতুন সাজ কিছু অভিযাত্রী আলনায়

কিছুটা নরম সত্য,কিছুটা সবুজ মিথ্যে আর কিছুটা সমর্পণের নৌকা ও নগ্নতা মিশিয়ে নতুন একটা দিনের কাছে এগিয়ে যাই


দু'হাতে তুলে ধরি সঞ্চয়ের সোনা রোদ,বিষাদের বৃষ্টি আর স্বপ্নের বীজধান 

কোন সে মহাকাল? মৃত্যুভোলানো মায়া,জন্মান্তরের মাতৃগর্ভ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে আয়নায়! 


শুধু নিজেকে দেখি,নিজের মধ্যে পথ করি,নতুন সব তো নিজের মতো,চমৎকার!


এই তো মূর্তি, এই তো ধুলো আর অদৃশ্য আবেগের কারিগর,বুকের বাঁদিকে কখনো ছোটে, কখনও না ধ্যানে


সে তো ততোটুকুই,এক জীবনে যে যার!


সহস্র নতুন,নতুনের ভেতর নতুন বছর পার!



১০ এক ভুবনের সন্ধানে


যে মূহুর্তে মাটি ছুঁয়েছিলে,মৃত্যু  কোনো একটা ছেদ-যতির ভেতর নিঃশব্দে ঢুকে পড়ে সেই সময়,তুমি শিরোনামহীন,পরিচয়হীন, একা এবং এতটাই পরনির্ভরশীল, যে হাতে নীরব রেখা,পায়ে কয়েকটি সর্ষেফুল আর বুকের ভেতর জন্মঘড়ির ধুকপুকানি 


কী করে জানবে কোথায় পথ শেষ,কোথায় আগুন অপেক্ষায় আর কোথায় ছাই উড়ছে তোমারই অবয়বে!


কে জানে কবে জন্মের জয় হবে?


শুধু জন্মে গেছ,আর কি প্রাপ্তি আছে,শস্য,সাহস, প্রেম বা ঈশ্বরের কাছে?


শেষ শ্বাসটুকু পৃথিবী,এই পৃথিবীর প্রাণ!



মরবে তো নিশ্চিত, তার আগে অনন্ত একজনের কাছে যদি গোটা ভুবন হয়ে উঠতে পারো, তবে তা সহস্র জন্মের সমান!



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন