এপ্রিল ২০২৩ অলক্তিকা চক্রবর্তীর ৬টি কবিতা

 



অলক্তিকা চক্রবর্তীর ৬টি কবিতা

 

 

ক্রমশ...

 

মা প্রতিদিন আলো কেটে কুটে সংসার বানায়

পুরান থেকে ঝরতে থাকা মায়ায় মায়ের চোখমুখ উজ্জ্বল

 

বাবার বেলায় বাজার থেকে আনা চুনোমাছ,

শাক পাতা আর অপগন্ডদের জন্য খানিক মায়া মমতার ভালো-মন্দ

 

ভাইয়ের নিত্য দিনের বায়নাগুলো খেলনা-বেলা ছাপিয়ে সাইকেলের চাকায়

আষ্টেপৃষ্ঠে ধরা পড়ে টানাটানির রসকষ

 

ক্রমশ হেলে আসা বেলায় মা চোরকাঁটা কুড়োয়

শাক-ভাত সাজিয়ে সন্তোষজনক মনকে তৈরি করেন সততা আর ভালবাসার মিশেলে

 

কেমন সদ্য ডিম ফুটে বেরোনো ছানাদের গায়ে বাৎসল্যের গন্ধ বিলোন

 

দিন ফুরোলে বাবা যেন কোন এক ইন্দ্রজালিক

যাদু লন্ঠন হাতে একে একে তুলে আনেন অনেকটা স্বস্তি আর স্বাচ্ছন্দ্যের আকাশ

অনটনের নৌকোয় ক্রমেই ভরে ওঠা সোনার ধানে

 

মাথুর

 

কথা ছিল

একতারা... দোতারায় কাটিয়ে দেবো জীবন

 

রসকলি আর ছেঁড়া ঝুলি সম্বল

পথে পথে অকিঞ্চিৎ ক্ষয়

বাকিটাতো বিরহ মাথুর আর অনুরাগ বেলা

 

কপালে দাগ কেটে তুলে রেখেছি সিঁদকাঠি

 

'বিরহ মধুর হলো আজি...'

 

দূরাশা

 

এক ফালি কুয়াশা

যাকে আমি পাপ ভেবে ভুল করেছি

 

সংযম শব্দে স্পর্শ বাঁচিয়ে হাওয়া সরাই

নাগাল পেতে পেতে পুরোদস্তুর সংসারী

আলো আঁধারে হাজার বাক্যবন্ধ

 

তবু যাপনের ফাঁকফোকর গ'লে

গলগল করে বেরিয়ে আসা ধোঁয়ায়

আমি আচ্ছন্ন শব্দে ...

চোখ জ্বলে...মনও

 

আমি হাত বাড়াই সেই দূরাশায় ...

 

ঠিক যেন ...

 

ঘরটা একা ছিল...

 

একলা হওয়া কাকে বলে সত্যি করে সে জানতোও না, সে জানতো শুধু ভরা আর ভার

 

ভারবাহী একজন মানবী যাবত বিশ্ব সংসারের দায়ভার কাঁধে নিয়ে

কখনো দু'পায়ে কখনো এক পায়ে

 

কারা যেন খোলা জানলায় চিৎকার

আঁকশি দিয়ে টেনে আনতো তার হাড় মাস মজ্জা ঘর ও ঘের

এটুকু যা ব্যক্তিগত বলে আখ্যা দেওয়া গেলেও বাদবাকিটুকুই আদতে সে

তাকে দিয়ে লিখিয়ে নিতো যন্ত্রপাতি ও তার মেরামতির কৃতকৌশল

 

ঠিক এভাবেই কখন তার সেই পক্ষাঘাতটুকুও ঝেড়ে ফেলে সে স্বয়ংসম্পূর্ণা

সন্তানের জন্য, স্বামীর জন্য, ঘরকন্না, তুলসীতলা, লক্ষীপুজো একমেটে দোমেটে...

 

 নানান লোলুপতায় যাপনের সূচিমুখ ক্রমশ ভারী  

আলো-আঁধারি আর সেইসব প্রবল জলস্রোতে

মন খারাপের দরকচামারা দিনগুলো

কেমন এক বিষন্ন মায়া নিয়ে  আজও দুচোখ মেলে তাকিয়ে আছে মাগো,

ঠিক যেন তুমি...

 

সেইসব শব্দ

 

স্নান অথবা জলাশয়ের কথায় কেমন করে উঠে আসে ঘের শব্দটা

বারান্দা কিংবা চৌবাচ্চা যাই হোক না কেন

এক্ষেত্রে নারী শব্দটি প্রবেশে প্রশ্নচিহ্নের মুখে  ঝুলে থাকে সীমানা শব্দটি

পর্দা শব্দটি সম্ভ্রম বোঝাতে আর

ঢেউ শব্দে আচমকা উথাল পাথাল হলে

চুপ শব্দে হাত বাড়াই আব্রু রক্ষার তাগিদে

 

এভাবেই অন্তঃপুর পর্দাপ্রথা অবরোধ শব্দেরা একে একে মিছিলে যোগ দেয়

ক্রমেই বাড়ে তাদের ধার ও ভার

 

আর যারা প্রথম এগুলোর বিরোধিতা লিখেছিল জবরদস্তি শব্দটায় জোর দিয়ে

সেই সব পুরুষতান্ত্রিক লেখাগুলো কেমন কেমন জবুথবু নখদন্তহীন

শিরোনাম খোঁজে শুধু

যার যার অন্ধকার নিয়ে

 

 

 

 

 

টাপুর টুপুর

 

আসলে সেই সব টাপুর টুপুর গুলোর কোন ভবিষ্যৎ ছিল না

 

আবছা নামতো চুলে, চোখের পাতায়, ঠোঁটে আচমকা

আলগোছে চুমুর মত শুধু ছুঁয়ে ছুঁয়ে যেত শরীরের প্রত্যন্তদেশও ...

 

যেন এক না বলা সাহসের শিরোনাম লিখতে চাইতো কখনো কখনো

 

অথচ মিশ্র জলধারায় বয়ে যাওয়া বেলা তখন বেশ পোক্ত

কোনোমতে নশ্বরতা কাটিয়ে গুছিয়ে বসছে গৃহস্থ দিন

 

তবু কখনো কোন ঝড়ের পূর্বাভাস

 

হঠাৎই এলোদিনে এক টুকরো ঝিলিমিলি

না বলা কুহক

শিহরণ জাগানো রোমকূপে

ক্রমশ ডাক দিয়ে যাওয়া চিরন্তন নারীজন্মের প্রত্যাশা পূরণের ...

 

এপ্রিল ২০২৩ অরিত্র চ্যাটার্জির ৬টি কবিতা

 




অরিত্র চ্যাটার্জির ৬টি কবিতা

 

বরফ পড়ার দিনগুলি

 

বরফ পড়ার দিনগুলির জন্য যে আমরা আদতে প্রস্তুত ছিলাম না

তা আবারও বোঝা গেল তুষারপাত শুরু হতে না হতেই।

সামান্য উষ্ণতার খোঁজে যারা বেরিয়েছিল – একে একে

কেউ চলে গেল দক্ষিণে, কেউ বা হয়তো পুবে

পৃথিবীর দ্রাঘিমা বিভেদে আমাদের ফিরতিপথের কম্পাস 

কেবলই সরে সরে যায়- যেভাবে বুকের ভেতর

জমে থাকা জল, কাচ হয়ে যায় ক্রমশ

তেষ্টা চেপে রেখে আমরা একদিন টের পাই-

আর ঝোড়ো হাওয়ার বিপরীতে আড়াল করি ব্যক্তিগত শব্দসমূহ।

বরফ পড়ার দিনগুলি আমরা প্রায়শই মানুষের কথা ভাবি

খুব নীরবতার ভিতর ভাবি আমাদের কথোপকথন কেমন হতে পারতো

প্রায় ধূসর একটা জনপদে ক্রমাগত ঠাণ্ডা মাংসের খোঁজ করে 

যখন আমাদের স্মৃতিগুলো সাদা হয়ে আসে -এমনই কোন একদিন

হাইওয়ের ওপর দলছুট এক হরিণীর শান্ত অপেক্ষা দেখে

আমার প্রথম উপরতির কথা মনে হয়… 

 

মেকানিক নরভ্যান

 

কিছু একটা বানাতে হবে আর কীভাবে তা মাথায় আসছে না

এরকম হলেই আমি ওর কাছে যেতাম

আর সিঁড়ি বেয়ে নেমে যেতাম মাটির গভীরে

সাথে খানিক জটিল হিসেব নিকেশ

‘ওসব কোন কাজের না’ – এটা অবশ্য প্রতিবার শুনতে হত

আর প্রতিবারই ও খুঁজে বার করতো

দরকার মতন একটা লোহার পাত কিংবা ঠিকঠাক স্ক্রুগুলো

‘সবচেয়ে সহজ উপায়টা জানা থাকতে হবে

যাতে আমাদের কম ভাবতে হয়’- এটা বলত প্রতিবারই

যেমন বলত ওর পাঁচ ছেলেমেয়ের কথা -

যাদের সাথে দেখা হবেনা এবছর

আর অনায়াসে কেটে ফেলত লোহাগুলো মাপ বরাবর

‘সেই কোন এক কালে হয়তো জার্মান ছিলাম, আর দেখ

এখন কেমন দিব্যি আমেরিকায়– এটা একটু জটিল

তাই সবচেয়ে সহজ হচ্ছে এই নিয়ে আর না ভাবা –

আর এই যে লাল লোহাগুলো ঘষে মেজে করে তুলছি চকচকে

ভেঙ্গে দিয়ে কেমন জুড়ে দিচ্ছি আবার– এটাও আসলেই খুব সহজ

আর জীবন- এমন একটা ওয়ার্কশপ থাকলে কতই না সহজ হত  

কিন্তু তা যখন নয়’- চশমার আড়ালে সে থেমে যেত খানিক 

‘তখন সবচেয়ে সহজ হল এসব নিয়ে আর বেশি না ভাবা …’ 

 

 

এমনি দিনলিপি

 

একটা বেশ বড় মাপের খাট

তার ওপর গোটা কম্বল পেতেও যদি জায়গা বাঁচে

আর তারপরেও যদি কয়েকটা বই রাখতে পারো

এলোমেলো কাগজ, বাসি কাপড় কিংবা ওলটানো গ্লাস

তাছাড়া ওষুধের স্ট্রিপ অথবা আধখালি বোতল 

তাহলে তো কথাই নেই –

কখন যে ওটা নিজস্ব সাম্রাজ্য হয়ে গেছে

শুয়ে শুয়ে তুমি খেয়ালই করবেনা

চেয়ার টেবিল থেকে যে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছ

আর এই যে নিরাপদ দূরত্ব, বজায় রেখে

পৃথিবীকে দেখা যায় সহজেই-

কাচের ওপার থেকে, এব্যাপারটা তোমার ভালো লাগে

আর ভালো লাগে হাওয়ায় উড়ে আসা কথোপকথন

বরফ পড়ার সাথে অবশ্য অস্পষ্ট হয়ে আসছে  

একটা গোটা নদীই বা কিরকম সাদা হয়ে যাচ্ছে

দিন কে দিন- তুমি এই নিয়ে খানিক ভাবো

আর কম্বল টেনে নাও – বাইরে যখন আবারও বরফ পড়ে

মুখঢাকা মানুষেরা দ্রুত পায়ে হেঁটে যায় একের পর এক

বরফ পড়ে কেবল, তুমি জানো আমাদের সম্পর্কের ওপর

ম্যান্ডেলব্রটের আশ্চর্য জ্যামিতিরা এত অনায়াসে

স্ক্রিনের ওপরে ভেঙ্গেচুরে যায়- তা দেখে তোমার

কাচ পেরোনো কত কঠিন আবারও মনে পড়ে যায়।

 

আমাদের কোনো ঘোড়া নেই

 

আমাদের এখন আর কোনো ঘোড়া নেই

চাইলেই যাতে চড়ে ঠিক ফিরে যাওয়া যায়

ধরা যাক পাহাড়ে বা সৈকতে, ইচ্ছেমত সাদাকালো ছবির

আড়ালে সাজানো কোনো রঙিন স্মৃতির কাছে –

ভেবে দেখো, তুমিও তো যেতে চেয়েছিলে একদিন

এইসব সমতল কংক্রিট, শহুরে লোকাচার ছেড়ে

উত্তর পশ্চিমের এক অনামা উপত্যকায়

জনৈক ঘাসিয়াড়া রমণী দেখে, তখনো সদ্য কিশোর

শিরায় শিরায় সেই প্রথম কি এক আশ্চর্য কিমিতি

তুমি টের পেয়ে বিভিন্ন ভঙ্গিমায়, লুকিয়ে অনেক

তার ছবি তুলেছিলে, সে কি জানতো না - 

ঝাপসা অ্যালবামে তার সামান্য প্রশ্রয়ের হাসি  

দেখে এতদিন পর, হয়তো শিথিল বুকের আজ

সেই মেয়েটির প্রতি তোমার নিজস্ব অভিযান মনে পড়ছে

আর চেনা সুতোগুলো জড়িয়ে যাচ্ছে মগজময়-

আমি জানি পরিযায়ী পাখিদের নিয়ে তুমি প্রায়শই ভাবো

ভাবো ফেলে আসা বাসায় কিভাবে তারা ফিরবে না কখনোই

একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে তোমার এই ব্যক্তিগত সফরে

যাওয়ার আগে আমি বলি তবু ভেবে দেখো,

ভেবে দেখো একদা তোমরা যাকে দৈত্য ভেবেছিলে

সেরকম কোন সুবিশাল হাওয়াকল, জটিল যন্ত্রাংশ 

কিংবা চকচকে মেয়েরা- এসব কিছুই আজ অপ্রতুল নয়

অথচ আমাদের আর এমন কোনো ঘোড়া নেই

যার নাম চাইলেই, এখনো ‘রোজিনান্তে’ রেখে দেওয়া যায় …  

 

কলকাতা, ২০২২ 

 

টেবিলে কাঠের স্পর্শ, চারকোনা ধুলোট বিকেল -

এহেন যা কিছু ছিল, আসলে

যে একটা খুব বড় না পাওয়ার অংশ

বুঝতে পারা যায়। ক্রমশ

দূরত্ব প্রকট হলে তুমি

আরো স্পষ্টতর দেখো এই বীক্ষণের আলোয়

বিগত খণ্ডচিত্রেরা কিভাবে সংকুচিত হচ্ছে

প্রাগৈতিহাসিক এক জীবাশ্মের পাঁজরে।

স্মৃতিপোকারা ওইখানে এলোমেলো।

তাদের নড়াচড়া - তীব্র শৌচালয়ের দেওয়ালে

হলুদ মন্তব্য, শেষ বাসে মাতালের অনর্থক হাসি,

রক্তে প্রোটিনাভাব, আবারো হাতছানি দিয়ে ডাকছে-

দেখো, এইভাবে যেতে পারতো দিন। বিস্মৃত হয়েছ।

তুমি তবু অনেকখানি পথ ফিরে যাও -

তুমি আসলে কখনোই পুরোটা পথ ফেরো না।

অনতিদূর বাসস্টপে, তার মরচে ধরা কাঠামোয়

বড় অবহেলায় পড়ে থাকে বিকেলের ফালি রোদ

ওই যত না বাঁচা জীবন।

তুমি খুব মমতা ভরে তাকে দেখো ...

 

ব্যাকস্পেস

 

মনে পড়া আটকে রেখে

দ্রুত হেঁটে যাচ্ছে কেউ

রাস্তার ওপাশে

সে যখন তোমার মুখোমুখি

সে তখন আসলে অনেক দূরে

খুঁজে ফিরছে কোন হারানো সর্বনাম

আর বোতামগুলো ছড়িয়ে পড়ছে

জমে থাকা মেলবক্সে

যতটুকু দুপুর 

সেখান থেকে শিরায়

সে খুব জলদি শব্দ সাজায়

আর উত্তর লেখে পরপর, মাথার ভেতরে

খুব পুরনো একটা বাড়িতে এসময়

সিঁড়ি বেয়ে কয়েকটা লোক উঠে যায়

ভারী জুতোর আওয়াজ, সে অপেক্ষা করে

আর দরজা খোলার আগেই

ঠিক সময়ে চেপে ধরে ব্যাকস্পেস…