অরিত্র চ্যাটার্জির ৬টি কবিতা
বরফ পড়ার দিনগুলি
বরফ পড়ার দিনগুলির জন্য যে আমরা আদতে
প্রস্তুত ছিলাম না
তা আবারও বোঝা গেল তুষারপাত শুরু হতে
না হতেই।
সামান্য উষ্ণতার খোঁজে যারা বেরিয়েছিল
– একে একে
কেউ চলে গেল দক্ষিণে, কেউ বা হয়তো
পুবে
পৃথিবীর দ্রাঘিমা বিভেদে আমাদের ফিরতিপথের
কম্পাস
কেবলই সরে সরে যায়- যেভাবে বুকের ভেতর
জমে থাকা জল, কাচ হয়ে যায় ক্রমশ
তেষ্টা চেপে রেখে আমরা একদিন টের পাই-
আর ঝোড়ো হাওয়ার বিপরীতে আড়াল করি ব্যক্তিগত
শব্দসমূহ।
বরফ পড়ার দিনগুলি আমরা প্রায়শই মানুষের
কথা ভাবি
খুব নীরবতার ভিতর ভাবি আমাদের কথোপকথন
কেমন হতে পারতো
প্রায় ধূসর একটা জনপদে ক্রমাগত ঠাণ্ডা
মাংসের খোঁজ করে
যখন আমাদের স্মৃতিগুলো সাদা হয়ে আসে
-এমনই কোন একদিন
হাইওয়ের ওপর দলছুট এক হরিণীর শান্ত
অপেক্ষা দেখে
আমার প্রথম উপরতির কথা মনে হয়…
মেকানিক নরভ্যান
কিছু একটা বানাতে হবে আর কীভাবে তা
মাথায় আসছে না
এরকম হলেই আমি ওর কাছে যেতাম
আর সিঁড়ি বেয়ে নেমে যেতাম মাটির গভীরে
সাথে খানিক জটিল হিসেব নিকেশ
‘ওসব কোন কাজের না’ – এটা অবশ্য প্রতিবার
শুনতে হত
আর প্রতিবারই ও খুঁজে বার করতো
দরকার মতন একটা লোহার পাত কিংবা ঠিকঠাক
স্ক্রুগুলো
‘সবচেয়ে সহজ উপায়টা জানা থাকতে হবে
যাতে আমাদের কম ভাবতে হয়’- এটা বলত
প্রতিবারই
যেমন বলত ওর পাঁচ ছেলেমেয়ের কথা -
যাদের সাথে দেখা হবেনা এবছর
আর অনায়াসে কেটে ফেলত লোহাগুলো মাপ
বরাবর
‘সেই কোন এক কালে হয়তো জার্মান ছিলাম,
আর দেখ
এখন কেমন দিব্যি আমেরিকায়– এটা একটু
জটিল
তাই সবচেয়ে সহজ হচ্ছে এই নিয়ে আর না
ভাবা –
আর এই যে লাল লোহাগুলো ঘষে মেজে করে
তুলছি চকচকে
ভেঙ্গে দিয়ে কেমন জুড়ে দিচ্ছি আবার–
এটাও আসলেই খুব সহজ
আর জীবন- এমন একটা ওয়ার্কশপ থাকলে
কতই না সহজ হত
কিন্তু তা যখন নয়’- চশমার আড়ালে সে
থেমে যেত খানিক
‘তখন সবচেয়ে সহজ হল এসব নিয়ে আর বেশি
না ভাবা …’
এমনি দিনলিপি
একটা বেশ বড় মাপের খাট
তার ওপর গোটা কম্বল পেতেও যদি জায়গা
বাঁচে
আর তারপরেও যদি কয়েকটা বই রাখতে পারো
এলোমেলো কাগজ, বাসি কাপড় কিংবা ওলটানো
গ্লাস
তাছাড়া ওষুধের স্ট্রিপ অথবা আধখালি
বোতল
তাহলে তো কথাই নেই –
কখন যে ওটা নিজস্ব সাম্রাজ্য হয়ে গেছে
শুয়ে শুয়ে তুমি খেয়ালই করবেনা
চেয়ার টেবিল থেকে যে ক্রমশ দূরে সরে
যাচ্ছ
আর এই যে নিরাপদ দূরত্ব, বজায় রেখে
পৃথিবীকে দেখা যায় সহজেই-
কাচের ওপার থেকে, এব্যাপারটা তোমার
ভালো লাগে
আর ভালো লাগে হাওয়ায় উড়ে আসা কথোপকথন
বরফ পড়ার সাথে অবশ্য অস্পষ্ট হয়ে আসছে
একটা গোটা নদীই বা কিরকম সাদা হয়ে
যাচ্ছে
দিন কে দিন- তুমি এই নিয়ে খানিক ভাবো
আর কম্বল টেনে নাও – বাইরে যখন আবারও
বরফ পড়ে
মুখঢাকা মানুষেরা দ্রুত পায়ে হেঁটে
যায় একের পর এক
বরফ পড়ে কেবল, তুমি জানো আমাদের সম্পর্কের
ওপর
ম্যান্ডেলব্রটের আশ্চর্য জ্যামিতিরা
এত অনায়াসে
স্ক্রিনের ওপরে ভেঙ্গেচুরে যায়- তা
দেখে তোমার
কাচ পেরোনো কত কঠিন আবারও মনে পড়ে
যায়।
আমাদের কোনো ঘোড়া নেই
আমাদের এখন আর কোনো ঘোড়া নেই
চাইলেই যাতে চড়ে ঠিক ফিরে যাওয়া যায়
ধরা যাক পাহাড়ে বা সৈকতে, ইচ্ছেমত
সাদাকালো ছবির
আড়ালে সাজানো কোনো রঙিন স্মৃতির কাছে
–
ভেবে দেখো, তুমিও তো যেতে চেয়েছিলে
একদিন
এইসব সমতল কংক্রিট, শহুরে লোকাচার
ছেড়ে
উত্তর পশ্চিমের এক অনামা উপত্যকায়
জনৈক ঘাসিয়াড়া রমণী দেখে, তখনো সদ্য
কিশোর
শিরায় শিরায় সেই প্রথম কি এক আশ্চর্য
কিমিতি
তুমি টের পেয়ে বিভিন্ন ভঙ্গিমায়, লুকিয়ে
অনেক
তার ছবি তুলেছিলে, সে কি জানতো না
-
ঝাপসা অ্যালবামে তার সামান্য প্রশ্রয়ের
হাসি
দেখে এতদিন পর, হয়তো শিথিল বুকের আজ
সেই মেয়েটির প্রতি তোমার নিজস্ব অভিযান
মনে পড়ছে
আর চেনা সুতোগুলো জড়িয়ে যাচ্ছে মগজময়-
আমি জানি পরিযায়ী পাখিদের নিয়ে তুমি
প্রায়শই ভাবো
ভাবো ফেলে আসা বাসায় কিভাবে তারা ফিরবে
না কখনোই
একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে তোমার এই
ব্যক্তিগত সফরে
যাওয়ার আগে আমি বলি তবু ভেবে দেখো,
ভেবে দেখো একদা তোমরা যাকে দৈত্য ভেবেছিলে
সেরকম কোন সুবিশাল হাওয়াকল, জটিল যন্ত্রাংশ
কিংবা চকচকে মেয়েরা- এসব কিছুই আজ
অপ্রতুল নয়
অথচ আমাদের আর এমন কোনো ঘোড়া নেই
যার নাম চাইলেই, এখনো ‘রোজিনান্তে’
রেখে দেওয়া যায় …
কলকাতা, ২০২২
টেবিলে কাঠের স্পর্শ, চারকোনা ধুলোট
বিকেল -
এহেন যা কিছু ছিল, আসলে
যে একটা খুব বড় না পাওয়ার অংশ
বুঝতে পারা যায়। ক্রমশ
দূরত্ব প্রকট হলে তুমি
আরো স্পষ্টতর দেখো এই বীক্ষণের আলোয়
বিগত খণ্ডচিত্রেরা কিভাবে সংকুচিত
হচ্ছে
প্রাগৈতিহাসিক এক জীবাশ্মের পাঁজরে।
স্মৃতিপোকারা ওইখানে এলোমেলো।
তাদের নড়াচড়া - তীব্র শৌচালয়ের
দেওয়ালে
হলুদ মন্তব্য, শেষ বাসে মাতালের অনর্থক
হাসি,
রক্তে প্রোটিনাভাব, আবারো হাতছানি
দিয়ে ডাকছে-
দেখো, এইভাবে যেতে পারতো দিন। বিস্মৃত
হয়েছ।
তুমি তবু অনেকখানি পথ ফিরে যাও -
তুমি আসলে কখনোই পুরোটা পথ ফেরো না।
অনতিদূর বাসস্টপে, তার মরচে ধরা কাঠামোয়
বড় অবহেলায় পড়ে থাকে বিকেলের ফালি
রোদ
ওই যত না বাঁচা জীবন।
তুমি খুব মমতা ভরে তাকে দেখো ...
ব্যাকস্পেস
মনে পড়া আটকে রেখে
দ্রুত হেঁটে যাচ্ছে কেউ
রাস্তার ওপাশে
সে যখন তোমার মুখোমুখি
সে তখন আসলে অনেক দূরে
খুঁজে ফিরছে কোন হারানো সর্বনাম
আর বোতামগুলো ছড়িয়ে পড়ছে
জমে থাকা মেলবক্সে
যতটুকু দুপুর
সেখান থেকে শিরায়
সে খুব জলদি শব্দ সাজায়
আর উত্তর লেখে পরপর, মাথার ভেতরে
খুব পুরনো একটা বাড়িতে এসময়
সিঁড়ি বেয়ে কয়েকটা লোক উঠে যায়
ভারী জুতোর আওয়াজ, সে অপেক্ষা করে
আর দরজা খোলার আগেই
ঠিক সময়ে চেপে ধরে ব্যাকস্পেস…

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন