জুন ২০২৩ বিমান মৈত্র ৫টি কবিতা

 

বিমান মৈত্র ৫টি কবিতা 

 


 

১) যাদুতুলি

 

কখনো কখনো একটা ছবিও 

অতিক্রিয়াশীল হয়ে উঠতে পারে। 

যখন সে বোঝে তার নিজস্ব পরিসীমাটি 

কেবল একটি নিষ্প্রাণ অঞ্চলে সীমাবদ্ধ 

এবং গ্যালারি থেকে গ্যালারিতে 

বেচাকেনার সামগ্রীর মতো ভ্রাম্যমান।।

 

কিন্তু যখন আমরা দেখিতার বুকের ওপর

একটি দুঃখিত অচলা স্রোতস্বিনী এবং 

পাশে একজন বিষন্ন স্থিরচিত্রা 

খাতার ছেঁড়া পাতাটি হাতে নিয়ে....

মরা গাঙে জোয়ার আসার মত 

আমরাও আশাবাদী হই।

 

তুমি ফিরে এলেই সেই অভিমানী নদী

ছেঁড়া পাতার নৌকোটা 

জলে ভাসিয়ে  

একটা আশ্চর্য ঘটনার মতো 

জলের উপর মুক্তির দিকে পতাকা আঁকে।।

 

 

২) ডিনার পুরাণ

 

সমস্ত প্রবেশদ্বার ব্যবহারের অধিকার 

পান্থশালা তোমাকেই দেয়

আবছা চৈতন্যের মতো

অপরা যুক্তির কাছে মাথা নত করা 

যেন এক বিভ্রমের উদ্বোধন ছিল

 

কিন্তু উপনিষদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েও 

পবিত্র ভান্ডারে শেষ পর্যন্ত মাঝরাতে 

ইঁদুরকলের প্রয়োজন হয়ে পড়ল

 

কাস্টমার আপাতত হাইকোর্টে

রায়ের অপেক্ষায় ।।

 

 

)  ব্যস্ততার মহাজাগতিক সমীকরণ

 

অত ব্যস্ত হবার কিছু নেই 

সকাল থেকে যাদের দেখছো 

তারা কিন্তু কেউই তেমন চুলচেরা ব্যস্ত নয়। 

আসলে আমরা কেউই তেমন নই 

সবাই প্রায় একটা নির্দিষ্ট গতির 

ক্রীতদাস হয়ে ঘুরন্ত কমলানগরের সাথে

জবাকুসুমের রাসায়নিক চুল্লির চারদিকে

ভ্রাম্যমান... এবং এভাবেই একটা অকল্পনীয়

গতিতে আকাশগঙ্গার সাঁতারু....

 

এমনকি আবহমান যে কচ্ছপটি

খোলের অন্ধকারে মুখ লুকিয়ে

নিজেকে মহা ব্যস্ত মনে করে আসছিল 

মহাজাগতিক তত্ত্বের কবলে না পড়লে

মহাবিশ্ব আজও তার পিঠে বসে থাকতো 

 

সুতরাং মুখ লুকিয়ে কোন কাজ হয়না

খোলের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা চাই 

তবেই বোঝা যাবে 

অন্ধকার আলো-বিরোধী নয় 

অন্ধকার থেকে অন্ধকারের

প্রান্তিক বিন্দুদ্বয় সর্বদা আলোকিত।।

 

৪) ইউ আর এক্সপায়ার্ড 

 

সমস্ত শিক্ষিত শব্দের ওপর তথাকথিত এবং

এক্সপায়ার্ড স্ট্যাম্প পড়ে গেছে। 

কবিতার জন্য এখন নতুন শব্দ চাই। 

সাড়ে পাঁচ কেজি সংসদের ঢাকনা খুলে,

তাকে পাওয়া যাবে না।

জন্য তোমাকে যেতে হবে কুয়োতলায়,

জলতোলা কালো ঢেউটির কাছে

লাউ ফুলের মাচায়, লোটে মাছের লঙ্কাকাণ্ডে

 

তারপর তোমার লেন্স দুটো ভিতর পানে ঘুরিয়ে দাও।

ক্রমশ দেখতে পাবে সমস্ত অভিসন্ধির সিস্টেম

আর ভেতরে পুষে রাখা ময়লা  

দুর্গন্ধের দৃশ্যমান সেপটিক ট্যাঙ্ক;

যাকে এখনো পরিষ্কার না করেই 

এতদিন গাছের মাথায় চড়ে বসে আছো।

 

ভয় নেই তথ্য জানার অধিকার এখন সুপ্রিমকোর্ট স্বীকৃত ।।

 

৫) বাসভূমি 

 

একটি সফল চিত্রনাট্য বানাতে গিয়ে 

কিভাবে যেন তিনি তার 

সখের গোয়েন্দার কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে যান। 

একে আমি কিভাবে ব্যাখ্যা করব, ভুমিকায়

না উপসংহারে, সেটা অন্য বিষয়। 

 

তবে, দাঙ্গার দৃশ্য তৈরি করতে গিয়ে 

একজন মুরুব্বী হয়ে উঠলে সামনে 

অন্ধকার সুড়ঙ্গ ছাড়া আর কিছুই থাকেনা। 

 

এখন যদি এমন হয় যে একটি রহস্য চিত্রনাট্যের স্রষ্টা নিজেই নায়ক 

আর সেটা ধীরে ধীরে এক আবর্তিত 

সর্বংসহা হয়ে দাঁড়াচ্ছে 

আমরা কি তাকে 

আহ্নিক গতি এবং বার্ষিক গতির অধীন

একটি অনিবার্য বাসভূমি বলবো না?



 

জুন ২০২৩ উদিত শর্মার ৫টি কবিতা

 


উদিত শর্মার ৫টি কবিতা

 

১ তৃতীয় ব্যক্তি 

 

রূপা হঠাৎ নিখিলেশকে বলে ওঠে --

আপনি কি চাননা আমাদের মধ্যে কেউ 

তৃতীয় হিসাবে আসুক 

 

চমকে ওঠে , তবে কি সে নিজেই

সেই তৃতীয় ব্যক্তি  --

 

জীবনের দৌড় থেকে ফিরিয়ে নিয়েছে চোখ 

এখন আর সে একা নয় , তবুও 

পয়ষট্টির চাদর টেনে লিখে রাখছে সেইসব

পূর্ব অভিজ্ঞতা... 

বিনুনির ফাঁকে লেগে থাকা রোদ-বৃষ্টি-ঝড়

পুরোনো গলি দিয়ে হেঁটে চলেছে 

পা খুলে ফেলছে কথার বন্ধ্যাত্ব 

বুকের পাঁজর ছুঁয়ে নেমে আসা স্রোতস্বিনী নদী। 

আজও সেই বকুল ফুলের গাছ একইরকম

যার তলায় দাঁড়িয়ে ছিলো 

রূপা, নিখিলেশ আর সেই তৃতীয় ব্যক্তি  

 

২ শুভদৃষ্টি 

 

একটি খয়েরী রঙের ভালোবাসার কাছে 

সমগ্র বাৎস্যায়ন উপুড় করে ফেললেও 

মিলবে না সঠিক চিত্রটি

বুকের বাঁ দিকে ডান হাতের চার আঙুল 

স্পর্শ করে যদি বলা যায় -- লভ লভ লভ 

তবুও পাওয়া যাবে না সেই সমুদ্র-গন্ধ  

 

চোখের ভেতর রাস্তা আছে হৃদয়ে প্রবেশের 

রেটিনায় ধরা থাকে তার মানচিত্র  -

সেখানে অপলক থাকার কাব্যও হয়তো লেখা 

আছে কোনও কোনও পদাবলিতে

শুধু লেখা নেই সেই আরব্য উপন্যাসের 

মহামন্ত্র : খুল যা সিম সিম 

 

লেখা নেই পান পাতার আড়ালে থাকা 

দুজোড়া চোখের আত্মকথন  

 

৩ লাল ডুরে শাড়ি 

 

লাল ডুরে শাড়ির পাশে পাজামাটা 

বহুদিন ঝুলে ছিলো 

পাজামা কখনও চেয়ার হয়ে গেলে

রেলিঙের ধারে ঝুঁকে পড়া শাড়ি 

বলে ওঠে : চা আনবো

 

এভাবে বছরের পর বছর শাড়ি-পাজামা

বিসমিল্লা খানের হাত ধরে 

এগিয়ে যায় শিল-নোড়া পথে

সেখানের রোদ ঝলমলে দুপুরের 

সন্তানেরা পরিপাটি 

বেড়ে ওঠে লাউ মাচায়। 

 

পথ আরও চওড়া হলে

বিকেলের সাদা মাঠে

ওরা স্রেফ রেলিং বাসিন্দা 

 

দূর থেকে হাত নাড়ে

স্ট্যাচু অব লিবার্টি  

 

৪ মধ্য রাত্রির কোরাস

 

প্রতিটি নাইট আউটে নতুন নতুন রক মিউজিক

তাপমাত্রা বাড়ছে হেয়ার স্টাইলের... 

সারাদিনের আলফা নিউমেরিক নড়াচড়া 

লম্বা লম্বা গসিপ গুলজার

শরীর শিখছে ট্যাটুর অহংকার  

ফাটাফাটি। আউট ফিট। নিউজ ফিড। 

মুঠোফোনে দিল কী বাত 

চিকচিক ড্রিমল্যান্ড স্বপ্ন-গল্প-স্বর্ণসুখ। 

 

এই যে সারাদিনের ননভেজ বৃষ্টিপাত আর

চোরাবালির গর্ভপাত ... 

হাই ওয়াটেজ বাংলা ব্যান্ডের তালে

স্প্যানিশ গীটারের ভাষায় নিতম্ব-তরঙ্গ

লেখে প্রেয়সীর উল্লাস  

চাই আরো আরো চিৎকার

আরো আরো শব্দশক্তি 

কোনও গোপন দুঃখ চাই না আর  

 

৫ ওয়ার্ক ফ্রম হোম

 

আটলান্টিকের ওপার থেকে ভেসে এল

--- কী করছো ?   

শরতের শুরু বর্ষণ সিক্ত সন্ধ্যাকাল    

--- ওখানেও কি বর্ষা এখন

--- না এখানে ঠান্ডা পড়তে শুরু করেছে  

আমার চোখে অরেঞ্জ কালারের পুত্র 

ফিরোজা রঙের পুত্রবধূ এবং দুরন্ত রঙের নাতি

আহ্লাদিত মাঠ। এলিগেরায় ছাওয়া পথ। 

--- তোমার লেখা ভ্রমণ কাহিনী পড়লাম। খুব ভালো।  

আমার চোখ ডুয়ার্সে ফিরতে চায় পাড়ে না..( নৈঃশব্দ্য  ) 

--- কোথায় ? --- মিটিং ব্যস্ত ওয়ার্ক ফ্রম হোম  

--- দাদাসোনা কী করছে

--- পাজল সলভ করছে    --- আর তুই

--- আকাশ দেখছি। যেভাবে রোজ দেখি  

চারপাশে সবুজ লন। পা ছড়িয়ে নির্জনতা। 

বুদবুদের বুকে রঙধনু হয়ে ভেসে আছে জীবন।