সুদেষ্ণা দত্ত সাহার ৫টি
কবিতা
১ মেঘবেলা
নীল শূন্যতায় মেঘোৎসব।
বৃষ্টির তার বেয়ে নামছে বিষাদ জোনাকি।
ঘর ভর্তি অবসাদ জুড়ে
নিরালার সম্মেলক সঙ্গীত
যে মেয়েটি একাকী নির্জন
তার মাথার বালিশে মেঘ
বুকে একা দাঁড়িয়ে ভিজছে
মেঘবেলা
তুমি শুধু দূরত্বের
সমীকরণ কষছ। ছায়াপথে ঢেকে যাচ্ছে চোখের শরীর।
মনের ভাঁজ খুলে ঢুকছে
গুমোট হাওয়া।
মাইল মাইল এপিটাফ লিখছে
ভালোবাসার রাত
সময়ের অর্বাচীন ফলক থেকে
মুছে ফেলেছ প্রিয় ডাকনাম
মেয়েটির একলা চিলেকোঠায়
আজানুলম্বিতব্যথার রাত, চোখে দুরন্ত মেঘবেলা।
২ জ্বলেনি আলো
"আমার জ্বলেনি আলো,
অন্ধকারে..."
মাঝেমাঝেই এ সুর শুনি
অদূরে খড়খড়ি দেওয়া
জানালার ওপারে বিধবা বউটি গায়।
অশান্ত ঝড়ের রাতে দস্যু
হাওয়া নিভিয়ে দেয় আলো।
রেলিং দেওয়া ছাদে দাঁড়িয়ে
অপূর্বদের বাড়ির সেই পাগল ছেলেটা গায়।
মেধাবী ছাত্র ছিল,
ভালোবেসে আঘাত পেয়েছিল।
তারাদের বুকে অস্ফুট
ব্যথা,
পূর্ণ বসন্তেও জ্যোৎস্নার
কান্না শোনা যায়।
এসে দাঁড়াই বসন্তের
বারান্দায় দূরের দেশ থেকে
এস্রাজের আওয়াজ ভেসে আসে,
"আমার জ্বলেনি আলো, অন্ধকারে। "
৩ একটি বসন্তের বিকেল ও
আগুনরঙের শার্ট
ছায়ার সিম্ফনি পেরিয়ে যখন
তুমি দাঁড়ালে
জীবন এগিয়ে গেছে
এসক্যালেটরের মতো।
তেইশের বি লেনের ছাতিম
গাছটার পাশে
পলেস্তারা খসা বাড়িগুলোর
গায়ে আধফোটা রোদ।
বিকেলের আলোয় তোমার মুখে,
ঠোঁটের পাশের স্বেদবিন্দু
পালস্ রেট বাড়িয়ে দিচ্ছে
তিনগুণ।
বসন্তের বেজরঙা হাওয়া
এলোমেলো করছে তোমার চুল
সাদা শার্ট ও ডেনিম ব্লু
জিন্সে বিকেলটা আরও তীব্র, রক্তস্রোত তীব্রতর।
হঠাৎ দেখলাম তোমার সাদা
শার্ট আগুনরঙা হয়ে উঠছে
আর আমি সেই আগুনে
আত্মাহূতি দিচ্ছি।
৪ মেঘাশ্রিতা
এ শহরে মেঘ করে এলে
গীতবিতানের কথা মনে পড়ে।
সেদিন চব্বিশে বৈশাখের
সন্ধ্যায় হঠাৎ কালবৈশাখী,
রিহার্সাল রুমে লোডশেডিং
মোমবাতির আলোয় মহড়া শেষ
হল 'চিত্রাঙ্গদা'র।
সেদিন সন্ধ্যায় চারিদিকে
অতর্কিতে শ্রাবণ, জুঁইফুলগন্ধ
চিরকুটে লেখা 'তোমার
চোখের ঘনকৃষ্ণ মেঘ হব, মেঘাশ্রিতা!'
পরের পাতার কথা লেখা আছে
হাওয়ায় হাওয়ায়
এ শহর জানে,
মেঘাশ্রিতা আর গীতবিতান
খোলে না।
৫ সুখ ও শরশয্যা
সেসব জ্বরের ঘোরে
সার্কাসের তাঁবু মনে পড়ে
ঝড়, জল আর জমজমাট রাশিয়ান
সার্কাস!
জীবনে গানের দিন শেষ হলে
সমান্তরাল লাগে আলো
আর তামাম দর্শক।
মার্চের শেষ থেকে মহড়া
শুরু হয়
শেষ হয় অন্য এক দূরবর্তী
ফেব্রুয়ারির হলুদ সন্ধ্যায়
রঙিন মুখোশে সেজে মঞ্চায়ন
শেষ হলে
জীবন সুযোগ দেয় সুখ ও
শরশয্যার।

