ডিসেম্বর ২০২৩ চন্দ্রাণী গোস্বামীর একগুচ্ছ কবিতা

 



চন্দ্রাণী গোস্বামীর কবিতাগুচ্ছ

 

১) শাপমোচন

আর মুখ ফিরিয়ে থেকো না, হে বিদ্যেধরি। প্রেমপত্তর বা যাহোক কিছু লিখতে গেলে আমার ভোমরাটি চাই। স্বপ্নেরও অসুখ হয়, মধু ঝরে ইদানিং, জানো কি তা! প্লিজ, চুড়িপড়া হাতের মতো তরল হও। মনে মনে ছুঁয়ে দেওয়া তোমার স্পর্শগুলো বিন্দু বিন্দু করে আমাকে রোজ নিঃস্ব করছে। উপসংহারে শরীর পোড়ানোর আগে দহনের নিয়মটা বলে যাও।এবার মাথা টলে যাচ্ছে। এতো নৈঃশব্দের ভেতর যার মৃদু ওষ্ঠ সঞ্চালনে স্তব্ধ আমার দুই ঠোঁট, এই ঘোর লাগা আরণ্যক রাত, উজাড় করা বসন্তবয়স,  অগ্নি নিমন্ত্রণে সাড়া কি দেবে না পতঙ্গকুল...!

২) দাম্পত্য ও পরকীয়া

গড়িয়ে পড়ছে।


বাঁশরির শরীর থেকে টুকরো টুকরো হয়ে ঠোঁট, বুকের বাতাস

আমি আঙুলে করে জড়ো করে করে নাজেহাল

এই তো কালকেই কথা ছিল

মাতামুহুরী দেখতে যাব----  আগেই বাঁশরির কাঁচা বাঁশে একি হয়রান!

 

অবশ নালি বেয়ে রক্ত ঝরে

টিনচার আয়োডিন, শরীর জুড়ে ছেলেখেলা করে

 

বেহায়া নার্সারির গাছে আজ আবার দুই শালিখ----

 

উফফফ! এসব রক্তপাত মুছে নিয়ে

এবার কি রাতে তোমায় নতুন করে চিঠি লিখব?

 

৩) বেশ্যা ও মহিলা

 

যে কোনো বেশ্যা পাড়ার রাস্তা, অহেতুক মাছি ভনভন...

কেউ বেলফুলের মালার সাথে বাসী মাংস ফেলে চলে যায়

 

এভাবে তুমি প্রতিটা ঋতুকালে নিজেকে বিশ্রাম দিতে দিতে

বত্রিশ বছর বয়সে নিজের শরীরের যত্নে নিখুঁত হয়ে উঠবে

 

ছোটবেলায় শেখা যে'কটা রবীন্দ্র সংগীত,

এমন চটুল গানের পাশে গাইতে গিয়ে লজ্জা বোধ করবে

 

ধুমসো মাসিটার দোর্দন্ড প্রতাপ এড়িয়ে

একদিন খুব সকালে,

ধরে নাও চারটে সতেরোর বনগাঁ লোকালে

একা একাই বাড়ি ফেরার জন্য চেপে বসবে

 

৪) বিরহিনী

 

চাঁদ দেখেনি কখনো মাথা তুলে

 

জনান্তিকে নিবিড় চোখের মৃদু ইশারায়

স্থবির স্থাপত্যেও লোভ জমে--- অজানাই ছিল।

একদিন সহসা আদুল করা পূর্ণিমার জোয়ারে

বিরহী যক্ষের আদল খুঁজে পায়

 

সেই থেকে তার পাহাড় দেখার সাধ...

 

তার বন্দি কারাগারে এসে আজকাল

শ্রাবণও দিকচিহ্ন ভুল করে, ভাস্কর্য আঁকে

নরম পলিস্থানে।

 

একাকী পেলে তাকে জেনে নেব

 

চাঁদ-রাত পার হয়ে কবে গিয়েছিল জ্যোৎস্নার উলঙ্গ বুকে?

উত্তুঙ্গু পাহাড়ে কবে খুলে পড়েছিল অবাধ্য এক খোঁপা?

 

৫) খুন

 

এখনও রয়েছে বিষ, সেই কবে চৈত্র সন্ত্রাসের দিনে

গঞ্জিকা সেবন করে মুখের উপর মুখ চেপে ধরেছিলে,

শব্দহীন একটা খুন হয়ে যেত, কিন্তু তা হয়নি দৃশ্যত ;

 

সন্তানরা জানতেও পারেনি। ইদানীং বাজারে দেখা হয়,

আড় চোখে দেখি ঠোঁটের নীচে কালসিটে, দুজনেই হাসি

পুরোনো প্রতিবেশীর মতো, চৈত্র সন্ন্যাসের নিঃস্বতা

মাড়িয়ে হলুদ বসন্তের যাবতীয় গরল কণ্ঠনালীর ভাঁজে ঘুম

পাড়িয়ে পেরিয়ে যাই বিগত অশ্রু। শুধু গলার কাছটাতে এখনো

নীল রয়ে গেছে, অভিমান হয়েছিল, বিচ্ছেদও---

 

তাকিয়ে থাকা আর মুখ ফেরানোর সময়টুকুর মাঝে ওটুকুই...

 

৬) কবুলনামা

 

(ক)

 

তুমি চলে গেলে বড়ো নিঃসঙ্গ

হয়ে যাব জেনেই, বাচ্চা মেয়ে হয়ে যেতে চাই----

এতোটাই বাচ্চা, যাকে অবরণহীন তুমি

কোলে নিয়ে ঘুরতে পারো, কিংবা এতটাই বাচ্চা যে,

নিঃসঙ্কোচে তোমার বুকের গায়ে লেপ্টে বলতে পারি,

আমাকে দত্তক নাও, হে পিতৃ প্রতিম প্রেমিক।

 

(খ)

 

তুমি চলে গেলে কবিতা লিখব না, ঠিক করেছি।

 

বোবা কালা গৃহস্থ বৌটার মতো চিনি, আতপ চাল

অন্তর্বাসের ইলাস্টিক লুজ হওয়া ফিতে।

শুধু অতীতের দুটো শরীরের দাগ, যা কখনো দেখাইনি-----

আমার ভুলভ্রান্তি, স্বেচ্ছাচার গ্রাস করে আমার বর্তমান রাজ্যপাট।

 

আমার মনে পড়ে, আমার প্রেমিক শহর পার করেছে

আমি হা-ক্লান্ত কবিতা লিখে লিখে।

 

 

৭) প্রতিসরণ

 

প্রতারিত রাতের এলো চুল

ক্রমে আরো কালো

কালো নিরুদ্দেশে মিশে গেলে

টের পাই শয্যায় তুমি গভীর নিদ্রা মগ্ন

 

সাংসারিক বাহান্নতাসের গূঢ় প্ররোচনা অচিরেই বাতাসের

কোমল স্পর্শে স্তিতধী হয়ে আসে, রমণ-ধ্বস্ত গোলাপ

সরিয়ে ভোরের কোমল রেখাবের দিকে বরাবর চেয়ে থাকি

 

প্রগলভ চাঁদের আলোয় ভেসে যেতে থাকে এ'যাবৎ

আমার আলজিভের গোড়ায় লেগে থাকা অগণন

প্রতিরোধহীন ক্রূর অভিসন্ধি

 

মগ্ন চৈতন্য জুড়ে নিঃশব্দে বেজে ওঠে শৈশবের লালিত সূর্যস্তোত্র...

         ওঁ জবাকুসুমসঙ্কাশং কাশ্যাপেয়ং মহাদ্যুতিম

 

মাটি ছুঁয়ে প্রহর ছুঁয়ে রাত্রি জাগরণ ছুঁয়ে ক্রমে এক

ঋজু আলোর রেখা অঙ্কুরিত হয় আমার ব্যথার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ে

 

আমি ধীরে ধীরে হাঁটু মুড়ে অভাবী কিশোরের মতো

নতজানু হয়ে পুনরায় ভিক্ষা করি নিজেকে।

 

৮) স্নেহ

 

রাতের শরীর বেয়ে অলৌকিক সেতার বেজে উঠলে

দুয়ার ঠেলে মন্দ্র পায়ে বেরিয়ে আসি

সপ্তর্ষিমন্ডলের সবচেয়ে বরিষ্ঠ নক্ষত্র আমায় পথ দেখায়

 

ধীরে ধীরে পৌঁছে যাই জলের কিনারে

 

মৃদু বাতাসের আলিঙ্গনে জলজ দাম আর

সবুজ শ্যাওলারা লাজুক হেসে মাথা নাড়ায়

পায়ে জড়ায় অজানা হলুদ ফুলের রেশম বুটি

 

যেন এক অচিনপুরের বিষণ্ন রাজকন্যা খোঁপার

সোনার কাঁটা খুলে রেখে নেমে গেছে পাতালদেশে

 

হঠাৎ'ই মনে পড়ে যায় মায়ের মুখ...

বাতাস থেকে জল থেকে তিল তিল করে

জড়ো করি তার খোয়া যাওয়া মখমলি আঁচল

 

তখনই এক অপার্থিব কুহকী মায়ায় ভেসে যায় আদিগন্ত চরাচর।

 

৯) দাগ

 

সমুদ্র অনেকদিন বহুদূর সরে গেছে

যত্ন করে দেখলে নুনের দাগ অল্প বিস্তর ঠাওর হয়

কাঁকড়ারা বালি খুঁড়ে ইতস্তত গর্ত করে।

 

এককালে আমাদেরও বুকে মধুর মতন ঘন

                                      প্রেম জমেছিল----

 

শাল অরণ্যের ভিতর দিয়ে ঘন পথ। এবেলা অবেলা

যাতায়াত। হরিণের শিঙের মতো সুখ সেসব পথ জুড়ে।

 

এখন লবণে চোখ ঠোঁট জারিয়ে গেছে

খোলস খসে পড়লে কাঁকড়ার চেয়েও তীব্র

লাল কিছু ঘৃণা দেখা যায়।

 

কারা যেন সাইরেনের শব্দে সমুদ্র জঙ্গলকে খুব সতর্ক করে যায়।

 

১০) ডাকনাম

 

কুঁচ ফুলের তিরতিরে লজ্জার চেয়েও মৃদু ভোর।

 

সারেঙ্গার জঙ্গলে পাতার গায়ে আলোর ফোটন কণা

ভালোবাসার শরীর নিষ্কাম ছুঁয়ে আছে।

 

আদিবাসী রমণী হাঁটুর কাছে কাপড় তুলে

সাঁকো পার হয়ে যাচ্ছে,

                   ওর মুখে গত রাতের বাসী হাড়িয়ার সারল্য।

 

ওর স্তনে এখনও লেগে আছে বাছার কচি ঠোঁট...

 

সন্ধ্যা ঘনানোর আগেই ওর বুকে ঘনিয়ে আসবে

দুধের ওম----

                             এসব অপার্থিব দৃশ্য অভিনীত হলে

যদি ভুলে যাই আমার গানের শেষ কনসার্ট

 

তুমি কি ভুলে যাবে আমার ডাকনাম?

 

১১) কান্না

 

বুকে, ক্রমাগত উপুড় হতে দিই।

    কালো অন্ধকারে একদম উলঙ্গ, এই অজ্ঞাতবাসে নেই নূন্যতম আড়াল

                        সুতোটুকুও যেন বিচ্ছেদ বলে মনে হয়।

 

জোনাকিরা চোখ বুজে ফ্যালে; এসব ব্যর্থতার দিনে

নির্ভুল ভাবে সে আমার ওপরে ওঠে নামে ;

                          কান্না,  তাকে তরল হতে দিই-----

                           

১২) নক্ষত্র

 

নিয়ে গেছ, ছাতিম ফুলের মতন।

 

এসব অসুখেরা বড়ো গতিময়

চাঁদের চেয়েও নীরবে সংক্রমণ ছড়ায়

তারপর আলো ডুবে গেলে পিছু ডাকে...

 

"ঝর্ণার'ও নদী আছে

আমার আছো তুমি, শুধু..."

 

আছো?

 

আমি জানি এইসব গান গন্ধ নিয়ে

আমার ম্রিয়মাণ পথ চলা

 

তোমার সাথে...

 

 

১৩) রাত কাহিনী

 

 

ইদানীংকালে ছাই সংযোগে নষ্ট হয়ে গেছে

যে সব রাত...

আমি তাদের শোরগোল করতে বারণ করি,

 

তারপর দুহাতের পাশে পড়ে থাকে যেসব

টুকিটাকি কাজ

সেগুলোই আপন মনে করি , করতে থাকি।

 

হঠাৎ আনমনে

কাজের ফাঁক চেয়ে চেয়ে দেখি রাতের কুমারী স্বভাব ;

 

দেখতেই থাকি---

কেমন রাতের বুকে, রাতের চাঁদের বৃন্তে, নাভিতে, বিভাজিকার মুখে,

এমনকি শিউলিরঙা উরুতেও ফ্যাকাসে শ্যাওলা জমেছে ;

 

অনাবৃষ্টির কিছু শীৎকার পাথর হয়ে কেমন আছড়ে পড়ছে

এক অশরীরী

মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে ।

 

তখনও, আমি টুকিটাকি দুহাতের বাকি কাজ সারি,

অস্থির রাতকে বলি--- রোসো।

 

আসলে, কতোটা অবহেলা গাঢ় হলে শোরগোল হয়

তুমি তো আমায় কখনো শেখাও নি!

 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন