দেবদাস রজকের ১২টি কবিতা
১
জ্যোৎস্নাধোয়া
নুড়ি
দেবদাস রজক
-- -- -- -- -- -- -- -- -- --
রাতের বাটির ভিতর
চাঁদ যেন কেটে
খাওয়া
ক্ষীর,
জোনাকীর গাঢ়রং
উতলানো দুধের মতো
ঝরে
পড়ে
দ্রাক্ষার পাতায়
সারারাত কপালে দেখি নিয়তির প্রহর
মিটমিট তারার গায়ে
কীভাবে
ফুটেছে
নারীর
স্তনমুখ
কোন্ অছিলায় ভরে
নেব
ওদের
খনির
দ্রবণে?
ঝরঝরে রাত, আমি
মানুষ
থেকে
ভগবান
হয়ে
উঠি
তবু কি ছুঁতে
পারি
আমাদের
প্রিয়
ঘর,
জ্যোৎস্নাধোয়া নুড়ি?
২
রোদ
দেবদাস রজক
-- -- -- -- -- -- -- -- --
ভাঁজ করা রোদ
মৌন বাবার মতো
বসেছে
হৃদয়
ঘেঁষে
ওর হলুদ গায়ে
দুঃখ
ঘষে
দিই,
বেঁটে
দিই
জলভরা
মেঘ
রোদ্দুর কেন আসে? পৌষীধানের মাঠে
বসেছি
চুপ
ও ছায়া, ঘনছায়া! কত
বড়
হও?
আঁধার
কি
নেমেছে
ঝুপ!
চুপচুপ খনখন বরফের
দেশ,
কে
থামায়
ওকে?
দীর্ঘ
ক্লেশ
হে রোদ, পবন
ঘনায়,
মুক্তির পথ
জানে
সাগরেই
শেষ
৩
জলভূমি
দেবদাস রজক
-- -- -- -- -- -- -- -- --
ওপারে যেও না
মাঝি
আমাকে এপারেই রেখে
যাও
ঘুমের আগুনগুলো আপাতত
খুলে
দিই
নিভিও না কেউ,
নিভিও
না
ওপারে কাদের বাস!
কেউ
কি
আছ
চেনা?
আমার জলভূমি মেঘময়...
তুমি
আজও
জানো
না
গাও মাঝি, আমাদের
দুঃখপরাণ গাও
ওপারে যেও না
গো
সখা,
আমাকে
এপারেই
রেখে
যাও
৪
নির্বাণ
দেবদাস রজক
-- -- -- -- -- -- -- --
শুধু চারবার জন্ম
হয়েছিল তার।
একবার
জলে,
একবার
যুদ্ধক্ষেত্রে
একবার অন্তরীক্ষে, একবার
প্রবল
বর্ষায় আমাদের
আউশবনে।
শুধু চারবার শব্দ
উচ্চারণ করেছিল
সে,
তরঙ্গ।
অহং।
শূন্য
আর
সঙ্গীত!
চারবার জন্মের পর
সে-ও বুঝেছিল আসলে
এসব
খিদে
আর
আপেক্ষিক
জন্মের পর আবার
জন্ম
হলে
ধুয়ে
যায়
পুরনো
শরীর
মৃত্যুর পর আবার মৃত্যু
হলে
বেজে
বেজে
ওঠে
সমুদ্র
মীড়
৫
অবক্ষয়
দেবদাস রজক
-- -- -- -- -- -- -- --
শেষ রাতে অর্জুন
ফেলে
রেখে
গেল
জ্যা
হে চক্রপাণি! তুমি
তো
জানো
শোকসূর্য কাকে
বলে?
দ্রোণের কাটা মুন্ড পড়ে
আছে
গোধূলিপ্রান্তে
শুধু চেয়েছিল একবিন্দু জল,
সে
কার
হাতে?
গাণ্ডিবীর ফেলে রেখে যাওয়া
অবক্ষয়, মৃত্যুবাণ
উড়িয়ে দিচ্ছে দেহ, দ্যাখো
রক্তের
হোলি
ঢেকে
দিল
আকাশ
এই তো হাঁটুগেড়ে বসা,
এই
তো
পুত্রের বিশ্বাসঘাতকতা
অশ্বত্থামা! তোমাকে শেখাতে পারিনি
বাবার
কুমন্ত্রণা
৬
গলাকাটা
কৃত্রিম চরিত্র
দেবদাস রজক
-- -- -- -- -- -- -- --
বলাবাহুল্য, ঘরের ভেতর কোনও
টাওয়ার থাকে
না
টাওয়ারের প্রত্যাশাও করি না, মোবাইল
ঝুপ
মেরে
থাকে,
শুধু ওয়াইফাই অন্
করে
পাবজি
খেলি,
মাথা
কেটে
দিই
খুলি ওড়াই...
আমার মুখ থেকে
খুনখুনে একটা
শব্দ
হয়,
লালা
ঝরে
দু’টি আঙুলের
চতুরতা
দেখে
আশ্চর্য হই,
লেলিহান চোখ
মহাকালের সীমানা পেরিয়ে কীভাবে
ঢুকে
যেতে
থাকি
যন্ত্রের উদ্দামে...
বলাবাহুল্য আমার দেহের ভিতর
কোনও
মানুষ
নেই
অথচ মানুষের খোঁজেই
ক্রমাগত হয়ে
উঠছি
গলাকাটা এক
কৃত্রিম চরিত্র...
৭
ইনস্টাগ্রামের
বাগানে
দেবদাস রজক
-- -- -- -- -- -- -- -- --
কোনখানে ফুটেছে দ্যাখো বাচ্চার ফুসফুস
ওরা কি ফোটে?
সাবলীল নয় এই
রাস্তার মোড়গুলি
সাবলীল নয় চৈত্রের স্ট্রিটলাইট, ছেটানো
ম্যানহোল
বেলুন ফোলানো সময়...
বাচ্চারা খ্যালে
সাইবার
ক্যাফে
ওরা কি ফোটে?
ওরা কি ধরে
নেয়
আঙুল?
ফুসফুস ঢেকেছে আজ
ইনস্টাগ্রামের বাগানে
ফোটে না ফোটে
না
বলে
চেঁচাচ্ছে রোদ্দুর
বাচ্চারা নেই মাঠে, নেই
কোথাও
কখনও
ঠিক এইখানে ফুটেছে
দ্যাখো
বাচ্চার ফুসফুস
ওরা কি ফোটে?
৮
পূর্ণলতা
জাগেনি কোনওদিন
দেবদাস রজক
-- -- -- -- -- -- -- -- --
ভেবেছি আর ফিরে
যাব
না।
কেন
যাব
আর?
আটকে আছি জলের
কাছে।
সংসার,
বিভ্রম,
কালি-হাত
এত ময়লা মেখে
আর
কি
যাওয়া
যায়?
ছেঁড়া প্রেম, সে
তো
অশ্রু!
অতীত-জমানো বরফ
আঘাত খেতে খেতে
বড়
অচেনা
দিনকাল!
দোকানে
দোকানে
ঘুরি
ফেরি করি, কী
বেচি?
কতটুকু
বেচি!
শুধুই
দুর্বিপাক... ঘূর্ণি
যেখানে আছ, ভাল
থেকো,
নদীর
মতো
বও...
আয়নার ভিতর কুঞ্জলতা-বন।
ডানদিক
ঘেঁষে
বিদায়ের ঘাট
নিতুপিসি এখনও দেখা হলে
কাঁধ
নাড়ে,
তোমার
কথা
বলে
বৃদ্ধা
তুমি নেই জেনেও
বলি-
‘আছে
গো
আছে,
দেখা
হ-য়!’
দেখা কি হয়?
সময়
ভাঙার
আর্জি
এসেছে
আজ
শেষ ট্রেন কাকে
নিয়ে
যায়?
তোমাকে!
নাকি
মাটির
ভিতর
পুঁতে
রাখা-
হলুদবর্ণ ভোর! দপদপ করে
রাত,
পূর্ণলতা জাগেনি
কোনওদিন
দৃশ্যরা নিভে গেলেও প্রেম
তো
দুলে
ওঠে
জলের
মঞ্চে,
অন্তহীন
৯
নিউরোদৈত্যের
কায়া
দেবদাস রজক
-- -- -- -- -- -- -- -- --
মুখের ভিতর আরও
এক
তীব্র
মুখ
ঢুকে
যাচ্ছে
দেহের ভিতর নিজেরই
দেহ
অবিকল...
গলা ফুঁড়ে নীলপোকাদের অদৃশ্য
ধাতব-ডানা
আমাকে নিয়ে চলেছে
সফটওয়্যারের শীতলগলিতে
জ়িগাবাইট গিলে আমি অতিকায় দানবঋষি এখন
এই পাসওয়ার্ড, এই
আমার
বায়োমেট্রিক, আমার
ছায়া
আমাকে খুন করে
ক্রমাগত বড়
হয়ে
যাচ্ছে
শরীরে
হে পিতামহ হিন্টন!
পেঁচানো মাথায় জাগ্রত আজ
নিউরোদৈত্যের কায়া
১০
তরল চাঁদের
পাশে
দেবদাস রজক
-- -- -- -- -- -- -- -- -- --
এই তো এসেছি
ভালবেসে দু’ফোঁটা বৃষ্টি
দাও
কতদিন পরে দেখা।
হেতালের বন,
বেতভূমি, খয়েরী
কুহক
এসব পেরিয়ে আসার
মানে
রোদের
পোষাক
খুলে
ছায়াময়।
দূর থেকে দেখি
পশুর
উপদ্রব,
মানুষ-হত্যার সিনেমাটিক দৃশ্য,
তরল চাঁদের পাশে
মাংসের
বাতাস,
মচকানো
কালো
গোধূলি
ছেঁড়া জীর্ণ ঘরের
ভিতর
আপদের
মরণ-পাখা ওড়ে শুধু
তারপরও আমি এলাম।
এসেছি।
থেকে
যাব
অধিককাল
ভালবেসে দু’ফোঁটা বৃষ্টি
যদি
দাও
১১
অন্ধ গলি
দেবদাস রজক
-- -- -- -- -- -- -- -- --
ঝিরঝিরে এক বাদুড় রাত!
ক্রুদ্ধ শিয়াল
হাঁক
ছেড়েছে
হুক্কা হুয়া! শ্লোগান তুলে
হুতুম
পেঁচা
হাত
তুলেছে।
ছল চাতুরী নন্দ
নাগর
মিছিল
মিটিং
ফিটিং
ক’রে
চুপ চুপ চুপ
পড়শী
সবাই!
ঢুকছে
ইঁদুর
ঘাপটি
মেরে...
এই তো এখন
গভীর
শ্রাবণ। ঘুমের
ভেতর
জানলা
খোলা
রেশন আনতে পান্তা
ফুরোয়...
অন্ধ
গলি
রাস্তা
ভুলে
মেঘ করেছে শ্যামনগরে, সূর্য
নেভে
দিনের
শেষে
দিন ফুরোলেই আলোর
গানে
দুলবে
শিশু
নির্বিশেষে
১২
ডিঙাখানি
দেবদাস রজক
-- -- -- -- -- -- -- -- --
শতাব্দীর শেষ ফুল আঙুলে
ধরেছে
কোনও
মেঘ
দূরে ঝুমস্বর, জলের
ফিসফিস,
পাথরধ্বনি রেখে
যাওয়া...
কী গভীর দীর্ঘপথ! ক্লোন-সময়, তারাদের লোভ,
ক্ষয়
এর বেশি আর
কী
দেবো
করতলে
তোমার?
রেখেছি দু’মুঠো
আগুন,
জন্মের
ডিঙাখানি ছুটেছে
আকাশে
ফ্যাকাশে শিরার ভিতর ঘুমের
নীলতম
দরজায়
দেখি
আবছা সিঁড়ি, অতীত
বড়
বাঙ্ময় অথচ
নিষ্ঠুর বাতাস
আমাদের দেখা হোক
কালের
নিরালায়, এটুকুই
বাকি
থাক...

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন