অগাস্ট ২০২৪ এর কবি সংবেদন চক্রবর্তীর কবিতাগুচ্ছ

 



সংবেদন চক্রবর্তীর কবিতাগুচ্ছ


চিত্রকর

 

ছবিদের বাড়ি থেকে তুলিদের বাড়ির দূরত্ব

গঙ্গা নদীর এপার ওপারের মতো

মাঝ বরাবর চরা, চাষ আবাদ মানুষজন

ডানলপ খেয়াঘাট থেকে দেখা যায়

নদীচর জুড়ে যাপন রচনা গড়ে ওঠে

 

এরকম গৌরবের চোখ চিত্রকরদের থাকে।

 

বন্ধ কারখানা শ্রমিকের মতো চিত্রকর হেঁটে যান

গায়ে তাঁর রং তামাশার চাঁদর জড়ানো

পায়ে পায়ে যতটুকু পদচিহ্ন ততটুকু শিল্প

শেষ টুকু জীবনযাপন ---সাপের মতন!

 

 

প্রণয়

 

চকিতে উড়েছে ধুলো। ধুলো, মাটি নতুন কিছু না

আজন্ম পৃথিবী থেকে যে দূরত্ব বেড়েছে আমার

আমি তার পরিমাপ মেপে মেপে জল ছেটাবো না

নিতান্ত প্রণয় হোক রবীন্দ্রসঙ্গীত

সুরে সুরে ভেসে যাবে আমাদের অন্তর্জলি যাত্রা

বিচ্ছেদের পারাপারে তবুও পেছনে তাকাবো না

 

 

লজ্জাবতী গ্রাম

 

বিছানার চাদরের মত আমরা দুজন

শরীরে শরীর পাতা। প্রচন্ড দূরের গাছে গাছে

সম্মুখে, ঘোমটা পড়া লজ্জাবতী গ্রাম

দিন দুপুরে এখনো শেয়াল বেরোয়

চেতনা জাগায় অল্প বিস্তর দারুন অহংকারে

 

এমন রূপের কথা তোমাকে বলবো না ভেবেছি!

 

যে যে স্থান তুমি পছন্দ করতে

সেই সেই স্থানে প্রণতীর বড় হয়ে ওঠা

তোমার কাঙ্খিত সরু ফিতের ব্রা---লজ্জাবতী গ্রাম

 

বন তুলসীর ঝোঁপ ঘেরা নাম না জানা পাহাড়

শরীরে শরীর বেয়ে ঝর্না গড়িয়ে পড়েছে মুখে

আঃ কী দস্যি মেয়ে দেখো

বৃন্ত চেপে ধরতো ফোকলা মাড়ির চাপে

এমন গ্রামের মতো রূপ আমাদের প্রণতির।

 

 

 

সাম্রাজ্য আর সম্রাট

 

কতগুলো ফুল পেলে একাকী বাউল হওয়া যায়

বাউল ফকির হয় ঠিক কতগুলো ফুল পেলে---

কাকভোরে ঘুম থেকে তুলে ঠোঁটে চুমু এঁকে দেবে

ঠিক কতগুলো গাছ ,আমাদের আদর শেখাবে

ভালোবাসা বলে যাবে বাঁচো বাঁচো কেউ শত্রু নেই!

 

এসব আবেগী কথা তোলা থাকে সাম্রাজ্য বিস্তারে

রক্তের ভিতরে রক্ত জানে সবটুকু প্রেক্ষাপট

অন্ধকার। শূন্য ঘরে শব্দ আরো বেশি শক্ত হয়

চিৎকার। ভয়। খুব ধীরে ধীরে দেওয়ালে দেওয়াল

চাওয়াপাওয়া সন্তানের মতো এসে আঙ্গিকে দাঁড়ায়

 

সাম্রাজ্য একটা তীব্র তলোয়ারের ঝোলানো খাপ

যেখানে সম্রাট আর হিংসা একসঙ্গে ঘর হয়ে বাঁচে!

 

হত্যা

 

বধিব গন্ডার ভোরে

কোন পুত্তলিকা জাগে নগরে?

 

প্রকৃত যোদ্ধার থেকে চাণক্যর ঘরোয়া আলাপ

বড় বেশি মুগ্ধ করে। মুগ্ধ করে উদ্ধত পতন

 

আজ বৃষ্টি হতে পারে, ঝমঝম আমাদের গ্রামে

ওঁর শহরেও বৃষ্টি ছাদের উপর

 

কলিকাতা কতদূর? সেখানেই বাস

সাজানো রয়েছে থরে থরে বিমুগ্ধ পশুর লাশ

 

উর্বর মাটির থেকে একদিন উঠে আসবে ভ্রুণ

শোধ করে যাবেই যাবে জীবনে বাকি যত ঋণ---

 

 

 

ছায়া

 

ছায়া দীর্ঘ হয়ে গেলে

জলবন্দি করে রাখি নিজেকে নিজেই

পরিধি পবন থেকে জলমগ্ন বাতাসের সুর---

একটা হারানো গান মন খুলে গাইতে ইচ্ছে করে

আপনার কণ্ঠ ভেসে ওঠে

গাইতে পারিনা, তবু চেষ্টা করি

আপনি হাসেন ঠোঁটে ঠোঁট চেপে

আমি লজ্জা পাই কিন্তু লজ্জাবতী হই না কখনও

ধীরে ধীরে আলো জাগে দৃষ্টিহীন দর্শনের মত

 

ভক্তি ছায়ার চেয়েও নম্র

ভক্তকুল উচ্ছ্বাসিত তবু বলবান

এমন কাব্যের ভোর

প্রতিদিন বাংলা ভাষায় আসে।

 

ভোররাত্রে যে গাছটি খুন হল

 

সফেদ কাপড়ে মোড়া তুল্য মূল্য দেহখানি আজ

হাটবাজারে নিলাম ডাক ওঠে সেয়ানে সেয়ানে

পাখি সব কলরব উড়ে যায় ভেঙে পড়ে ঘর

আর্তনাদ অবিকল গর্জে ওঠে পুরনো বিবাদ

 

সব ভুল ক্ষমা হয়ে গেলে ফুল ফোটে গাছে গাছে

মানুষ মাত্রই ভুল করে খুন করে বোমা ছোঁড়ে

নিজের খাবার তৈরি করে খায় আজন্ম গাছেরা

তবুও মানুষ আজও ভূত ভগবান ভবিষ্যৎ

 

ভোররাত্রে যে গাছটি খুন হলো দেহ নিয়ে গেল

সে আঠারোয় পা রেখে পরিপূর্ণ হতে চেয়েছিল

 

 

অগাস্ট ২০২৪য়ের কবি বিশ্বজিৎ বাউনার কবিতাগুচ্ছ

 



বিশ্বজিৎ বাউনার একগুচ্ছ কবিতা

 

 

ওষধি স্মৃতি 

 

লুটেরা আলোর কাছে দাঁড়িয়েছি আমি 

আমি বলতে মৃত ছায়ার আর্কাইভ 

এক অনাবৃত কঙ্কাল প্রবণতা 

আর ময়লাটে আধুলি 

 

উর্বর পাপিরাস বৈভব ছিল একদিন 

ষোড়শী আগুন নদীখেকো মাঝ বয়সি বাতাসের 

ছোঁয়া লেগে আমাদের অযুত বৈঠা গলে গেছে

লবণের অভিমানী সিলেবাসে 

 

এখন পরোক্ষ অভিযোগে রস খোঁজে যন্ত্রনার উই 

শাখা প্রশাখা জুড়ে রোজ রোজ মরে যায় ওষধি স্মৃতি

 

 

আততায়ী 

 

আয়ত্ত করতে পারছি না নিখুঁত খুন

শিয়রে মরা বিছের মতো আলো খুবলে নেয় বেহুঁশ 

গৃহস্থ দহনে মেতে ওঠা খোদায় নুন 

বিষাদ শস্যের নাভি থেকে জিওল চাঁদের কষ গলে যায়

 

ম্লান দোহাই আঁকড়ে তোমার নৌকা অক্ষরে

নির্লজ্জ জলের চাহুনি নিয়ে বসে থাকি 

উদ্দাম হলুদ নিয়ে একা একা ভেঙে যাই উন্মাদ জ্ঞান 

 

প্রাবল্য প্রতিক্ষণ মরু পেঁচিয়ে নেমে আসে

শীতল মাছের সহকারী। নশ্বর তীর নির্বাক।  

 

অন্ধ হোমারের পাঁজর থেকে খাপছাড়া বালির প্রহর

উড়ে আসে উপমা জাতক তবু জায়মান

 

উপেক্ষিত চোলাই থেকে স্খলনের বিনিময় বেজে ওঠে 

অন্তঃক্ষরা ঝাপটে---

স্বপ্নের অ্যাসট্রে শুধু ভরে থাকে হত্যা মেঘের ছাই দিয়ে।

 

 

 

 

বৃত্তের সারি

 

এই যে চিরদিন দেখি বৃত্তের হিংসে নেই কোনো 

 

দক্ষ জলের পেন্সিল দিয়ে এঁকে নেয় শৈশব

শালুক ফেনা নিয়ে চোখ নিভে আসে।

 

রোদ ছাত্রের গায়ে শান্তিনিকেতনের শীত 

                                       ঠেস দিয়ে বসে থাকে 

                                                          অথৈ মুগ্ধ 

 

স্খলনের বিপরীতে এই যে অগাধ প্রোটিন মুগ্ধতা

নাব্য আড়াল রোপন করে দেয় মজ্জায় প্রতিদিন

কোনো আক্রোশ পরিত্রান নয় 

 

ছাই থেকে নেমে আগুন কুঁকড়ে যায় 

                          অতিদূর ছায়া কুকুরের গুহায় 

 

নির্বিকার মথ সবুজ চর্চা  খেয়ে খাদ্য হয়ে যায় শূন্যের

 

নিথর ক্রিয়াপদে নেমে আসে বৃত্তের সারি।

 

 

 

 

উপেক্ষিত 

 

বিকিয়ে যাওয়া ক্ষুরে ধুলো তেতে ওঠে।

 

মাথা সরিয়ে খুলি রাখা বিদ্রোহী বাতাসে

সন্ধ্যা নেমে আসে 

 

তড়িঘড়ি হাড়ে ভ্রমের ঘোর এঁকে 

আজ সন্তানসম অভাবিত ফাল্গুনের ঘাসে 

         চাঁদের স্লোগান ছড়ায় 

 

পরমার্থ ভেবে 

শীর্ণ মথের থেকে ছিটকে পড়ে আছে সময়ের আঁচড়

 

বাতিল বিকিরণ ক্ষয়াটে

সহজ নিরাময় সেতু নেই পাঁজর থেকে পাঁজরের ফাঁকায় 

 

সুতোর পাখি থেকে দিব্য খেদ 

হলুদ রোদের মতো নিঃশব্দে খসে পড়ে বলগা উপেক্ষায়।

 

 

পন্থায় 

 

নিজেকে যথাসম্ভব নির্বিকার রাখি

 

স্রোতের পুরুষ ক্ষয়ে যায় আজীবন পাথরের সম্মুখে

বিবাহিত বাতাসে ছোবলের স্বাদ নিতে নিতে

আমি একা কাকের মতো ডিম শূন্য বাসায় 

              ঝুঁকে থাকা সূর্যাস্তের মরা রোধে 

                                       বিলীন উড়ি... 

 

প্রত্যহ ভঙ্গুর হতে দেখি পাটাতনে জলের স্পর্শ

সীমানা গলে যায় 

          ভোগ্য ইঙ্গিত আলো থেকে শরীর পাঠায়

 

আমি তবু অসফল ডাহুকের মতো 

একা একা খোদিত দিনের পায়সান্ন খুঁজে খুঁজে  

চমকে চমকে পায়ে হেঁটে লুকিয়ে পড়ি 

ভীতু আত্ম বলয়ের সমাহিত সীমিত মাটি মঠে।

 

ভেবেছি কতবার মুঠি থেকে গুল্মের সংখ্যায় তোমাকে আঁকড়ে নেব

         দাউ দাউ পাখি জল লবণের চিরায়ত পন্থায় 

 

 

 

পলায়ণকারী

 

 

এই ছায়া গৌড়ীয় 

আমার নিভৃতে রাখা অন্ধকার পলায়নকারী, মৃত অভিসার থেকে 

শ্রীখোলে বেজে ওঠে অসুস্থ শ্বাস। পালকের রোশনাই।

 

বুনো শিকড়ের কাছে আজ অভিমান জল হয়ে

স্রোতের প্রকট একাকী জ্বলে ওঠে উন্মাদ প্রত্যয়ে 

এই বিনম্র আন্তরিক খেদ, উচ্ছ্বসিত খোলসের নীচে 

উদগ্রীব অতীতের গ্রীবা ছুঁয়ে জলীয় স্মৃতি উড়ে আসে 

সমূহ প্রস্থানের অতিভূজ যুগল ঘাড়ে 

 

নাভি ভেদ করে ভাঙ্গা বৃত্তের দিকে চলে যায়

মৌন ফারাক

 

বানভাসি তুমূল দূরত্বের নীচে আজ আলোড়িত প্রহর 

মৃত আঁশের মতো আরোহী মিলনের উষ্মা 

বেদনায় বেদনায় ছড়িয়ে রাখে।