বর্ণময় বাড়ৈ একগুচ্ছ কবিতা
বাস্তুশাপ
প্রশস্ত মর্গের উঠোনে দেখা হল আমাদের–
শর ও মৃগয়ার অভিসম্পাত তখনও স্পষ্ট,
লিখিত স্তবক ডিঙিয়ে ঢুকে পড়েছে উভয়ের ভবিতব্যে–
তবু দেখা হল, লালাসর কুয়োর কিনারে,
প্রবৃত্তি এবং প্ররচনার ফলাফলে,
সর্বনাশের বাগিচায় একটি স্থুল দংশনের বদ্ধগৃহে–
যৌথমরণ যেভাবে ফাঁদ বুনে রাখে গোপনে!
তারপর প্রিয় বিষ,
উত্তরাধিকারসূত্রে মেনে নিয়েছে শরীর,
তার তুচ্ছ স্বেদবিন্দুর উপর প্রেতের ছায়া জলন্ত
একটু একটু করে উজ্জ্বল করেছে ক্ষয়–
তীক্ষ্ণ করেছে প্রত্যাবর্তনের সামরিক বাণ!
প্রশস্ত মর্গের উঠোনে যে লেপে দিয়েছে গোবর মাটি জল
যে এঁকেছে মৃত্যুচিহ্ন হাঁড়িকাঠের দাওয়ায়
সে কি ছদ্মবেশী বাস্তুশাপ?
বৃক্ষের অতীত, চিতার ভবিষ্যৎ?
তবু আমাদের দেখা হোক উন্মুক্ত কবরের মায়ায়
আহত কঙ্কালের ললাটে শেষ সর্বনাশের মতো
উদবাস্তু শরীরে যেমন অবৈধ প্রবেশ করে শরনার্থী আত্মা!
...........
অনুনয়
অন্ধ না দেখতে পেয়েও পড়ে নিতে পারে যে কবিতা
তা লেখা হয়নি এখনও।
চিরবধির না শুনেও বুঝতে পারে যে কথার মানে,
একজন মূক না বলেও বুঝিয়ে দিতে পারে যে ভাষা
সে লেখা লেখা হয়নি আজও–
এই সমস্ত অসাধ্য সাধন করতে পারিনি আমরা।
আমরা ঔদ্ধত্বের ভারে নুঁয়ে পড়েছি,
আমরা জ্ঞানের ভারে নুঁয়ে পড়েছি,
অহংকারে নুঁয়ে পড়া আমাদের মাথা
মাধ্যাকর্ষণের নিয়ম অতিক্রম করে
ঢুকে পড়েছে মাটির আরও গভীরে–
হে বাংলা কবিতার দূর্বল পাঠক , তোমার জাদুস্পর্শে,
আকাশমুখী পা দু'টো টেনে
বের করে আনো আমাদের...
..............
গান
একদিন গানের সাহচর্যে ভরে যাবে আমাদের ভিক্ষাপাত্র।
যেটুকু সুর যুগিয়েছেন প্রভু
তা সবটুকু তাঁর নামেই উৎসর্গ করে অধরা হাত ধুয়ে আসব।
দুপুরের ঢলে পড়া জলে
ক্ষুধার মুখোমুখি পরমান্ন সাজিয়ে বলব,
এই নাও তোমায় দিলাম
আমার ক্ষুধা সামলে দিও, দয়াময়–
সে গানের ছলেই বলবে মৃদু হেসে, খিদে নেই।
যেটুকু সুর বুঝেছি গোপনে
তাই আমার সর্বপাওনা, আমার আবাদ
নীরবতা গহীন হয়ে এলে
গানে গানে কথা ভোগ হয়ে সাজাবে প্রসাদ...
.............
নির্মোহ
দরজা খোলা রেখেই ঘুমিয়ে পড়েছে গৃহদেবতা,
বালিশে অস্থির তুলোর মেঘ সহিষ্ণু অনেক
বজ্রপাতের বিপক্ষে তার চলন
এক উদাসী প্রেমিকের মতো অস্থাবর–
কাঁটার ভিতর পাতার নিমগ্ন দানপত্র পড়ে ফেলেছে কুঁড়ির লাবণ্য
তবু আঘাতপ্রিয় হাত দ্বিধাহীন জাতক হয়ে
শত্রুর ছদ্মবেশে পেরিয়ে যাচ্ছে সীমারেখা–
যতিচিহ্নের ওপারে দাঁড়িয়ে নির্মোহ সংলাপ একাকী ফিরছে ঘর।
'ভালবাসি' বলতে ভুলে গেছে যে লাজুক যুবক
আমি তার হয়ে কথা বলতে এসেছি আপাতত।
ঘুমন্ত মানুষটিকে একটু ডেকে দিয়ে বলুন,
উদাসীনতা নিয়ে কিছু কথা আছে তার সাথে...
..............
সহিষ্ণু
মৃত্যুর থেকে শিখে নিচ্ছি নিশ্চয়তা।
যে দুঃখ জন্মগত তার নাম মৃত্যুশোক
একথা জেনে গেছে পোষ্য ছায়া–
আমিই আমার প্রতিপক্ষ,
নিজের মুখোমুখি দাঁড়ালে জানতে পারি নিশ্চিত;
ব্যক্তিগত খাঁদের ভিতর হাঁ করে থাকে নিস্ফলতা
ভ্রান্ত ইঙ্গিতে আঁকছে জটিল সমাধী
ও পাখি, আমায় বটফল ভেবে ঠুকরে নিতে পারো।
পাখির অন্তরে অরণ্যের সম্ভবনা জানে না কেউ,
আকাশও জানে না ডানা পক্ষপাতদুষ্ট চিরকাল–
তবুও এত নির্ভরহীনতার মাঝে বিচ্ছেদের ফাটল
লাজুক শিকড়কে জায়গা করে দিচ্ছে গোপনে...
................
কাটাকুটি
এই যে খেলার ছলে
তুমি কাটা-চিহ্নে বুঝিয়ে দিচ্ছ মতামত,
আমি শূন্য বসিয়ে আগলে রাখছি ঘর;
এর কোনো সম্ভাব্য ফলাফল নেই...
আমাদের জয় ও পরাজয়ের ছেদবিন্দুর উপর
টালমাটাল জীবন বারবার হারিয়ে ফেলছে ভরকেন্দ্র
এই যে খেলার ছলে
এত কাছাকাছি চলে এসেছি আমরা;
আমাদের চোখে চোখ পড়ার আগে জানা উচিত,
শূন্যের সাথে যে কোনো সংখ্যার গুণফল, শূন্য!
..............
স্পৃহা
অপরাধ না জানিয়েই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে জল
আমি সর্বস্ব হারিয়ে ফেলা একটি মাছ
বাতাসের থেকে নিচ্ছি ভৎসনার পাঠ।
ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে জমি,
চিতার বরাদ্দ আগুনটুকুও এখন আমার নয়
মরে যাওয়া সহজ নয় এমন সময়
যেমন সহজ নয় সাঁতার ভুলে যাওয়া,
যেমন প্রতারক বন্ধুর চোখ খুব মনে পড়ছে এখন,
পাপ কতটা নিবিড় হয়ে এলে এমন হয়,
হে প্রভু, আমাকে শিখিয়ে দাও।
শিখিয়ে দাও, কীভাবে আঁশটে বসন খুলে রেখে
তীক্ষ্ণ বড়শি হওয়া যায়।
আমি সর্বস্ব হারিয়ে ফেলা একটা মাছ
বরাদ্দের জলটুকু না দিলে নাই দাও,
অন্তত আমার অপরাধ জানিয়ে তারপর আমায় হত্যা করো...
............
