অমিতাভ দাস: একগুচ্ছ কবিতা
বিদ্যাদেবী, ব্রহ্মপদ:
১
বৃষ্টিতে ভিজতে পারি এই বোধিবৃক্ষ
ঘুম ভাঙে সাড়ে তিন, ব্রহ্ম মুহূর্তের
গান, ঋষিকল্প কথা। নিজস্ব আগুন
ভিতর বাহির জুড়ে বৃষ্টি নুপূরের।
কী কথা একাকী তাঁর ছিন্ন অহংকার
ভালোবেসে পদাম্বুজে বিষাদ প্রতিমা
শিবকল্প মায়াভূমি বুকের গভীরে
বিষে বিষে বিষক্ষয়, প্রেরণার সীমা
গদ্য এবং পদ্য মাঝে তাঁহার সংসার
মৌন আমি, যোগী বেশে হলুদ বসন
ষষ্ঠপতি নিজগৃহে ভূমিজ মঙ্গল
স্বপ্ন ভাঙে স্বপ্ন গড়ে -- সাধুর আসন
বাবা নিম করোলির, কৃপা যদি হয়
চলো কাইঁচি ধামেতে, শূন্য হোক ভয়।।
২
একা একা বৃষ্টি লেখে ব্রহ্ম সম গীত।
ছায়া ছায়া ব্যথা আসে ভোরের বাতাস
একা একা প্রেমময় আত্মার সুবাস
তোমার শ্রাবণ জুড়ে প্রত্যাখ্যাত শীত।
মৃতদের নীল নদী পেরিয়ে চলেছি
বঙ্কিম পথের রেখা, ভুলে যাক নাম
সারাদিন পাহাড়ের, গাছেদের তামাম
আদরের দিনে আমি, মগ্নতায় আছি
দিন যায় চুপিচুপি, কথা কমে আসে
অন্ন হতে ব্রহ্ম বলে : ত্যাগের মহিমা
তবু মায়া, তবু ইচ্ছা, তবু জাগে ক্ষমা
পাখিরা বসায় ফেরে আকাঙ্ক্ষার আশে
আমিও ভনিতাহীন দীন ভক্তজন
সমূহ প্রবাস মনে, কামিনীকাঞ্চন।
৩
ভেতরে ভেতরে রোজ ভেঙে যাচ্ছে নদী
ভেঙে যাচ্ছে বিরহের হেমবর্ণ মায়া
কেঁদে কেঁদে উঠে আসে অতীতের ছায়া
দেবী ত্রিপুরাসুন্দরী, সনাতন আদি
ভেতরে ভেতরে মৃত্যু, নেমে আসে ধীরে
বিশ্বাস কোথায় থাকে আজানা রোদ্দুরে?
এই যে এত ভালোবাসা বিজন দুপুরে
ব্রহ্মপদে লীন হলো সমুদ্র গভীরে
কে তোমারে ডাকিয়াছে? কে বলিছে কথা?
মাতৃপদ অভিলাষ, মাতৃভাষা সুধা
তথাপি অবিদ্যা মায়া, শরীরের ক্ষুধা
দেবীর মহিমা কোথা? শিলা ভাসে যথা...
সমর্পণ শেষ হল, যাতনা অশেষ
তোমার মায়াবী ভূত, জীবনের শেষ।
৪
নদীটির কাছে শেষ তক চলে যেতে চাই
আশ্রয় পেয়েছি যেন বিলম্বিত আলো
বেদনা গভীর ছিল, পরাজয় ভালো
মাঝেমাঝে হেরে গেলে ঋতপথ পাই
তোমার শহর থেকে দূরে চলে গেছি
হাসির আড়ালে কে গো রৌদ্রস্নাত ভুল
আতপুর ঘাট দেখি বৃষ্টি ভেজা ফুল
বালকের টগবগে জীবন দেখেছি
মূলাজোড় কালীবাড়ি, এ শ্যামনগরে
কত স্মৃতি জমে ছিল--বিপন্ন বিষ্ময়
সম্পর্কে জড়িত বালি ঘুনপোকাময়
ভালোবেসে ঋণ জমে পাখিটির ঘরে
চলে যাবো একদিন এ গল্প-শরীর
মায়া থাকে, কথা থাকে, প্রণয় গভীর।
৫
প্রতিদিন ভোররাতে ঘুম ভেঙে যায়
বাহিরে পড়িছে বৃষ্টি কামপুষ্পময়
মেঘজ হৃদয় প্রভু, কী বিপুল ক্ষয়!
জপ তপ মহানিশি ব্রহ্মরন্ধ্র চায়
দেবী সিদ্ধেশ্বরী লেন, জবাফুল মালা
শিবশক্তি একীভূত মায়া মায়া খেলা
আত্মার পাখিটি ছিল বুকে ভাসে ভেলা
শ্যামগীত মধুকণ্ঠ রাধিকার কালা
রাধিকা কুসুম যিনি তিনি অবিদ্যার
সমূহ জাদুর কথা কী আর বলিব
কী আর বলিব আমি, কী কথা লিখিব
অর্ধসত্য প্রেমকথা কেমন আচার?
তোমার মায়াতে আমি কাব্যকথা বলি
তুমি সর্বনাশী দেবী বারংবার বলি
৬
মানুষই মানুষকে ঠকায়। সেকথা
তুমি কি বোঝনি কবি? এতকাল ধরে
যে ব্যথা লিখেছ ফুল, বেদনার ঝড়ে
নিবেদন, উপচার--- বিরহের হোতা
পাখিদের ডানা আছে। পতঙ্গের ভাষা
কীটস্য কীটের মতো তাহার চরণে
কী লিখেছ শিলাময়, রতিসুখরণে
তোমার ডানাটি ভাঙা, কল্পনার আশা
অরণ্য সমীপে দেখি নিজস্ব অসুখ
অবহেলা, ঘৃণা থেকে উঠে এসো কবি
পুরুষের বক্ষমাঝে পাখিময় ছবি
সেটুকু করুণা করো তাঁহার শ্রীমুখ
ভ্রমণ রমণ জুড়ে নিত্য রচে লীলা
রক্তমুখী জবামালা পূজা অর্ঘ্য দিলা
