একগুচ্ছ কবিতা : রবীন বসু
প্রেমজন্মে বাঁচি
দাক্ষিণ্যে কৃপণ তুমি ধরে রাখো মুঠি
তোমার আত্মার কাছে হাঁটু ভেঙে বসি
প্রাণপাখি কোথা থাকে? জানা আছে ভাল
সেখানে প্রণয় ডাল হৃদয়ের বৃক্ষ!
কবরে মৃতের আঁশ উল্লসিত ভিভা
প্রেম যেন নিভে গেল, ভগ্নচাঁদ পোড়ে
দহনে জ্বলন আছে অবশিষ্ট ছাই
আত্মহত্যা মুখ দেখে অবিকল জল।
তোমাকে উদাসীন ভাবি হয়তো-বা ক্ষোভ
অ-প্রেমের পৃথিবীতে এত রুগ্ন ডানা
উড়ানে আনন্দ নেই বিমর্ষতা ঢাকা
অন্ধরাতে চাপা কান্না ন্যুব্জ দেহ স্থির।
কার্পণ্য করো না তুমি আত্মার বান্ধবী
দাও ভিক্ষা কৃপাপ্রর্থী প্রেমজন্মে বাঁচি!
নিরাময় প্রয়োজন
উদ্ভট এই আবহে কুঁজো হয়ে বসে থাকি
আমার মেরুদন্ড বাঁকা, হাড়ে ঘুণ ধরে গেছে
হৃদয়ে ক্ষত, পুঁজ জমে আছে ঢের…
তাহলে কি গ্যাংগ্রিন হয়ে গেল? দুর্গন্ধযুক্ত
ব্যাকটেরিয়া বেড়ে গেছে! আমার মৃত্যু আসন্ন!
সন্ধ্যায় বাংলা কবিতা আমার ঘরে এল
কিছুটা পরিহাসের ভঙ্গিতে বলল, ‘কী ব্যাপার
কবিমশাই, আপনার তো আমার দশা!
হাঁটুভাঙা ‘দ’! এই যে সর্বাত্মক সংক্রমণ
শরীর মনে অসম্ভব খিঁচুনি, আশার আলো নেই
তাই এলাম, কিছুটা আলোচনা হোক!’
আমি চেয়ে আছি অসহায়! অ্যান্টিবায়োটিক
কাজ করছে না, টিস্যু পাতলা হচ্ছে ক্রমশ..
এবার আপনাকে অপারেশন করে নতুন টিস্যু
প্রতিস্থাপন করতে হবে! বেঁচে যেতে পারেন।’
যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠে কবিতাকে বলি,
‘সে তো অনেক টাকার ব্যাপার! ভালো সার্জেন চাই!’
‘সে দেখা যাবে। এখন তো চলুন— ‘খুঁজে দেখি,
যদি কোনো মহানুভব সার্জেনের দেখা পাই!
আমাদের নিরাময় প্রয়োজন!
এ-আই নবজন্ম
এআই ঘিরেছে আজ আমাদের ভবিতব্য
যান্ত্রিক সে বুদ্ধিমত্তা গঠনের নির্মাণ কৌশল
সুচারু বিন্যাসে বিদ্ধ বর্তমান চাইছে কিছু
এত কারুকাজ নিয়ে উদ্ভাবন সম্ভাবনা দেখে।
আন্তরিক উচ্চারণ সময়ের অভিমুখ
কৃত্রিম এ বুদ্ধিমত্তা কতদূরে যেতে পারে
সেটাই দেখার কথা; অনুভূতি ছিন্ন হলে
অসহায় রক্তরেখা ফুটে ওঠে গাঢ় বেশি।
আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের পৃথিবীতে
হৃদয়ের গুপ্তকথা গোপনেই থেকে যায়
স্পর্শময় অনুরাগ তীব্র বিচ্ছেদের ভয়
তবু তো আগামী দিন তার দিকে ধেয়ে যায়!
কবি ও কবিতা আজ কোনদিকে যাবে যেন
এআই তাকে কি দেবে আগামীর নবজন্ম!
জিডিপি উঠবে পড়বে
ঘুরে যাচ্ছে পৃথিবী সময়, আবর্তন বিবর্তন সদৃশ
এই যে অন্ধকারে সভ্যতার মুখ ঘাড় আর মাথা
নাড়িয়ে নাড়িয়ে চলছে প্রতিবাদ, তাকে যথেচ্ছ
ব্যবহারের বারোয়ারি মহোৎসব ঘিয়ে দিন রাত্রি
হিম কুয়াশা মাখে শহরের স্কাই ওয়াকওয়েগুলো
পুরনো রূপকথারা ফ্রক পরে পা-ঝুলিয়ে বসেছে
ডালিম ফুলের মতো লাল ও বাহারি সূর্য উঠবে
একটু পরে; নগর জেগে উঠবে ধোঁয়া ঘাম নিয়ে
অর্থনীতির চাকা ঘুরবে, জিডিপি উঠবে পড়বে–
হে হত্যোদম সময়, ঘানির মতো ঘুরে লাভ নেই
সরষে পিষে তেল নয়, শুধু শাসানি ভয় যুদ্ধের
হুমকি চলছে; তৈলাক্ত বাঁশে মানুষের টেনশন
যতটা না কমছে তার থেকে বাড়ছে ঢের বেশি;
সময়তাড়িত আমাদের সভ্যতা ঢুকে যাচ্ছে গর্তে!
বণিকী চতুরতা
ঘোড়াগুলো ঘাস খেয়ে মরে গেছে বহুদিন আগে
জলজ গুল্মের ভিতর কচ্ছপ-ডিম পড়ে আছে
অপরাহ্ণ দিনের আলো তির্যক খোড়োচালে পড়ে
আবাসযোজনার ঘর সম্পূর্ণ চুক্তি ভিত্তিতে হয়
কারা দেয়, কারা তুলে নেয় ভাগ, মাথার উপর—
শূন্য ধূ-ধূ ত্রিপলে গিঁট বাঁধাও নেই! হাওয়া খেলে
অন্ন নেই, ক্ষুধাদীর্ণ পেটে শুধু অপুষ্টি অসুখ—
তারা মরে যায়, শবর লোধা—প্রাচীন জনজাতি।
সভ্যতা চেয়ে আছে জটিল আর ধোঁকাবাজ চোখে
মানুষ জানে না শুধু ক্ষুধা নিবারণের কৌশল—
এখনো জানে না ভুখা গণতন্ত্র কেন ভোট চায়!
বাহারি মলের থেকে বিচ্ছুরিত আলো ধাঁধিয়েছে
অন্তঃসারশূন্য উন্নয়ন-পথ! দুর্নীতির জালে
জড়িয়েছে রাজনীতির বণিকী চতুরতা ছল!

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন