চন্দ্রাণী গোস্বামীর একগুচ্ছ
কবিতা
ব্রেথলেস
(১)
মাসিমনি সদ্য নাইজেরিয়া থেকে ফিরে বললেন:
ওখানের মেয়ে পুরুষের চেহারা কুঠারের মতো দৃঢ়;
ওরা নাকি নিজের শর্তে খুশিতে নিজেরা থাকে।
কুঠার বলতেই, জলদেবী আর কাঠুরিয়ার দেনা পাওনার কথা মনে হয়।
দেওয়া কি? পাওয়াও বা কি? একটা গোধূলি
তোমার বাম হাতের মধ্যমায় সোনার আংটি, আংটি আর সিঁদুর দান,
একটা ঝলমলে বিবাহ বাসর, হাসির ছড়রা...
একটা একটা খইয়ের বুক পুড়ছে একমনে।
নিজের মতন
(২)
প্রতিবার মহালয়া এলেই রেডিও চালিয়ে শোনার কথা মনে হয়।
পাশের ফ্ল্যাটে মিঃ নায়ার নতুন এসেছেন।
ইচ্ছে তো করেই ওনাকে মহিষাসুর মর্দিনীর কয়েকটা নাচ করে দেখাই,
ওনার মিসেস, সকাল-সন্ধে রেওয়াজ করেন
হেসে হেসে ওনাকেও বলতে পারব যাহোক দুচারটে নাচের কথা,
সত্যি বলতে কি, এই বয়সটায় চোখের চামড়া কুঁচকে যায় তো,
হতাশ লাগে...
তাও যদি বলেন: আপনার ছন্দমাত্রা বেশ...
(৩)
অসময়ের তৃষ্ণা গলা থেকেও গভীরে স্নায়ুতে কেনই বা ছড়িয়ে দিয়েছ?
উপদ্রুত সময়ে যাহা কলকাতা তাহাই পাঞ্জাব কিংবা শিলিগুড়ি
ইচ্ছা গলাধঃকরণ-এর শব্দ কেউ পায়নি, আমরা দুজনে
যথেষ্ট চেষ্টা করেও প্রমাণ লুকাতে পারিনি, জ্যান্ত ছিল আমাদের কথার ইচ্ছারা
শিশির আসে যায় ---- আমরা যাই যাই করেও ঘুরতে থাকি:
আমাদের অম্ল অজীর্ণ ও মধুর নিয়ে নিজেরাই নিজেদের খুঁড়তে থাকি
(৪)
ফিরে আসি, তোমার থ্যাতলানো মাথা ও বিকৃত শরীরের কাছে।
যদিও সতর্কবার্তায় আগাম অবরোধের আশঙ্কা করেছিলে,
তবু কোনো কোনো জায়গায় নিজেকে ধরে রাখা অসম্ভব জেনেই
অপেক্ষাকৃত তরল তোমার লাশের পাশে লিখি----
শরীরের খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছে মৃত্যু, আর
আমার মৃত্যুর খুব পাশে কেবল আমি।
(৫)
একটি অশ্লীল মেয়ে কবিতা লিখতে চায়----
যে মেয়ে ভাষার চেয়েও বিষাদ
যার এক স্তন পুড়ে যায়, অন্য স্তন দেখে
হিলহিলে বিচ্ছেদ তরল হয়ে রাস্তা, রাস্তা বেয়ে জানুর গভীরে ছুটে যায়...
সে জানে, এক-এক সময়ে নির্মম থেকে মৃত্যু
আর জীবন থেকে নির্মমকে
আলাদা করা একপ্রকার অসম্ভব।
তবুও সে তার কবিতা বিষয়ক সব ভাবনাকে
খুঁটিয়ে লেখে শাদা পৃষ্ঠাতে, আর রোজ রাতে
বিবাহিত প্রেমিকের সঙ্গে ঘুমাতে যায়, কবিতার
কয়েকটি আপাত অসংযত পংক্তির স্তরে...
(৬)
মেপলের দীর্ঘ দরজা
ওপারে তোমার নরম হাসি ... লন্ডভন্ড করছে
ফুলগাছ, বৃষ্টির ফোঁটা, গীতবিতান এবং এর সাথে
জুড়ে থাকা কান্নার যাবতীয় অনুষঙ্গ। প্রতিদিন। আমারই...
দরজা খুলি নি ভয়ে, যদি বা যাই দরোজার ওপারে
জেগে থাকা নরম দুই ঠোঁটের মাঝে কেঁপে কেঁপে ওঠা
হাসি---- চুম্বনের অধিকার নেই।
(৭)
একখানা কাক এতখানি ডাক নিয়ে
অবশেষে উড়ে গেল তবে
রক্তাক্ত কিছু মাংসের দলা মুখবন্ধ প্লাস্টিকে মুড়ে
বারান্দায় কে রেখে গেল, জানো কিছু?
কিছু পাখিজন্ম কিছু পাখিমৃত্যুর দায় কিভাবে তবে
দিয়ে যাই এই আবছা আলোর মিছিলে?
যেই নীল কাক চেয়েছিল, বুঝেছিল কি তার ডানা
উড়ে যেতে যেতে আকাশের অবক্ষয়...!
তাই বুঝি এতখানি যন্ত্রণার ভার
ফেলে গেছিল সে অবহেলা ভরে
তোমার অপঘাতে মরে যাওয়া বুকের ভরকেন্দ্রের কাছাকাছি?
(৮)
একটা পাতার গায়ে লেগে কেঁপে উঠছে অন্য পাতাটি
এটা কি শুধুই শিহরণ নাকি আসঙ্গ সহবাস?
ছুঁয়ে দিলে বোঝা যায় তখন প্রকৃতি নিথর
বাতাসের বিন্দুমাত্র আয়োজন নেই...
যে আয়োজনে কেঁপে উঠছে আমার নিথর
তাকে তুমি কবিতা বলবে নাকি পরাবাস্তব কামনা!
(৯)
বলার কথা ছিল না, এইভেবে বোবা হয়েছি
এখন শব্দের কাছে এসে দেখি, গায়ে হরেক রঙ ;
ভ্রম হয়, দূর... কোনো দূরতম দিনে নির্বাক দৃষ্টি নিয়ে
যে চেয়েছিলাম, "নিয়তি তুমি"---- নীরবে বলেছিলাম
সেইসব রোমাঞ্চ উধাও হয়েছে চাহনি থেকে...
তবুও তো আগুন জ্বালাই, শীতকাল এসে গেল বলে
অযথা উচাটন করি। জানি, নিরীহ হেমন্ত হলুদ সহজতা
নিয়ে চলে গেলেই আমরা ঘুমাবো। সারা শীতে
বলাহীন কওয়াহীন ঘুমটুকু আমাদের সম্বল মাত্র।
(১০)
শাদা জীবনের যন্ত্রণা ক্যানভাসে আঁকার জন্য
নখ দিয়ে খুঁটে খুঁটে রক্ত বের করি হাতের।
ভাসে করতল। বদ ভাগ্যরেখা। উল্লাসে লাফিয়ে উঠে
বোতলে ভরে ফেলি আকাশের চাঁদ। তবু ভরাট
উরুসন্ধিতে শতাধিক বছরের কালো। নিরাসক্ত অন্ধকার
মুচকি হাসে। আমি নারী। হতে পারতাম তোমার প্রেমিকা---
এই ভেবে বাল্বের হলুদ আলোর নীচে নিরামিষ জীবন
খেতে খেতে বেঁচে থাকি সস্তার অন্তর্বাস আর
পেটিকোটের ভেতর গোপন অসুখ ভরা ...
(১১)
আমার অন্ধত্ব দ্রুত বাড়ছিল, ফলে অপথালমোলজিস্ট
খানিক আলো ভরে দিতে চাইছিলেন।
স্পষ্টত মনে পড়ে, হাত বাড়ালেই চোখ ভরে যেত জলে
নাকে ঝুট ফুল, চূড়ো করে বাঁধা চুল, ফোঁটা ফোঁটা তরল
গড়িয়ে নামছে তখন গালে----
অথবা এমন অন্ধ হতেই চেয়েছিলাম, যাতে এই একটাই স্বপ্ন...
আমিই হয়তো ব্যাপক বিরহ কল্পনা করে কখন যেন চোখ সরিয়ে নিচ্ছিলাম
আলো দেখলেই----
একটা কাঠবাদাম পাতার বুকের নিটোল হাসি
তখন কান্না হয়ে উঠছিল।
(১২)
মায়াবী হরিণ অলৌকিক হয়ে গেলে অনুমতি নেবার প্রয়োজন থাকে না
টিটলাগড়ে মেয়েটির পা ভিজে যায়, সে মেয়ে দেখে
আমি তার শরীরের সমস্ত গলিপথ চোখ বন্ধ করে পেরিয়ে
তাকে নিয়ে চলে যেতে পারি এক ভুবনডাঙ্গার মাঠে...
দ্বিধাহীন প্রেমিকের মতো।
(১৩)
ফালি করা বেদানার মতো
যে রক্তাক্ত শহুরে দুপুর জুড়ে তুমি লুকিয়ে ফেলেছ
পাহাড়িয়া ছেলের মাউথ অর্গ্যান
সেইখানে শীত নামে, ছেলেটি খোঁজে নেপালি সুর
তার অসমাপ্ত খোঁজের মাঝে একটি গোপন সরগম বেঁকে যায়
পাহাড়ের গ্রেভিয়ার্ডের দিকে...
সেখানে নতুন কোনো গল্প নেই।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন