অক্টোবর ২০২৫ এর কবি পিয়াংকীর গুচ্ছকবিতা

 



কুশপুতুল

পিয়াংকী 

 

(১)

অনির্বাণ ধ্বসে গেলে... 

আয়ুর ভিতর হেঁটে যায় মানুষ 

চাষমাটি স্ট্রীটলাইট আর বাতিস্তম্ভ পেরিয়ে বিরতি 

 

নোঙরে বাঁধা পথ।

থতমত পা, অবশ আঙুল

এদের জড়ো করলে পিঠের ওপর জন্মায় খড়গাদা

 

আলো জ্বালাই, ঘর খুঁজি

কুশপুতুলে বারুদ ভরে লুকিয়ে রাখি দেরাজে

একটি রাত এসে খুঁটে নেয় সমস্ত হিসেব 

 

হিসেবের যে গরমিল তাতে রাষ্ট্রের হাত নেই

বেহিসেবী স্বপ্ন এবং লোকলাজ -- অন্তরায় কারা ? 

 

অত:পর পুতুল নাচে... 

*************************************************

(২)

 

সেদিন একটু সরে দাঁড়িয়েছিলাম

তারপর থেকে সব লাল হয়ে আছে

গতরে যে পোকারা খুঁটে খাচ্ছিল শরীর, 

ওরা এখন পায়রা পোষে।

বাটিতে জল ভরে রেখে দেয় আমার দুই স্তনের ওপর 

 

মাটি কাটি রোজ,পুতুল বানাই

দুই চোখে ঠেসে দিই গর্জন  

কান নাক ঠোঁট। আঁকি সাবধানে

 

সূর্য ডোবার পর কেনাবেচা শেষ হয়।

যে পোকাদের সাথে সহবাস, তাঁদের চলাফেরা দেখি আর

চেষ্টা করি, পোকার ভিতর থেকে শুষে নিতে নিজের রক্ত

 

প্রতিটি সাহসী রাত জানে, বিক্রিবাট্টার পর আমি ক্লান্ত 

 

দড়ির বদলে গলায় ঝুলিয়ে রাখি পুতুলের গলা

*****************************************************

(৩)

...অথচ সব জল হতে পারত , চুম্বনও

যে তুমি, তারল্যের ওপর নিষেধ বসালে

মাছি উড়লে ধুয়ে নিলে গ্লাস--

সেই তুমিই জানলে না, ক্ষমতার কথা 

ক্ষমতাহীনের কথা। 

রাষ্ট্রের উপর নির্ভর করে যারা খেয়ে নিল গ্লাসসমেত 

তারা আজ পুতুল বানায়। তুমি আমি আরও... 

 

অথচ,  সবটুকু আগুন হয়ে যেতে পারত, এমনকি জলও

এক আঙুলে ঘোরানো যেত জীবন। 

লাট্টুটা ফুটো হয়ে গেল 

 

মানুষ রাষ্ট্র ধর্ম 

ধর্ম আগুন প্রেম

প্রেম অহিংসা অতিমারী 

 

অতিরিক্তটুকু গার্হস্থ হলেও তো ক্ষতি ছিল না---

*****************************************************

 

(৪)

 

আয়ু থেকে  কাল -- বিয়োগ করি রোজ 

শূন্য এলেই শেষ করে দেব,  ভাবি। 

শূন্য আসে না তবু--

এ-ও এক অপেক্ষা। 

 

ট্রেন চলে যাবার পর রেললাইন কাঁপে যথারীতি 

অবশিষ্ট পাথর জ্বলে ওঠে নিবিষ্ট মনে 

দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে,  চক্ররেল ঢুকে যায় প্রত্যেকের ভিতর 

 

আমি জানি, 

তুমি আমি সে নিভে গেলে পড়ে থাকবে সামান্য যা

তার পাশেই গজাবে ছাতিম। 

ট্রেন ছেড়ে যাবে অন্তিম স্টেশন 

 

কুশপুতুল আসবে। মুছিয়ে দেবে আমাদের কান্না

*********************************************

(৫)

সন্তর্পণে ফেলি। বিড়ালের মতো নিঝুম পা আমার 

শব্দহীন, তবু নিজেকেই সন্দেহ হয়। 

বিড়ালকে দাঁড় করাই আয়নার সামনে 

নিজে -----  আড়ালে থাকি

 

দরজাটুকু পেরোতে পারলেই সংক্ষিপ্ত  হয়ে উঠব, একথা জেনেও গিলে নিই উক্ত সন্তর্পণ  

অথচ, এই গুটিয়ে আসা ভয় আমাকে টেনে রাখে মৃত কপালের ডগায়

ঘন ঘন শ্বাস পড়ে ।

সূঁচের ফুটো বরাবর গলে যাই, 

যেমন গলে যায় নির্দিষ্ট একজন কবি

 

আশ ফুরিয়ে যাবার আগে শেষবার পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখি 

 

পোশাক বদলে যাচ্ছে,  

পুতুলের উলঙ্গ গায়ে উল্কি আঁকছি নিজস্ব ডিজাইনে... 

****************************************************

 

***********************************************

(৬) সমর্পণ 

 

সমর্পণ এনো।

বিছিয়ে দেব অহংকার 

তালপাতায় লেখা যত পরিণাম 

শুভ হোক বা অন্যকিছু, 

চৌকাঠ পেরিয়েছি। এখন কেবল উধাও হবার পালা

দর্পণে জলের ছিটদাগ। কতকাল হল

খসে পড়ছে নিজস্ব মুখোশ 

পাহাড়ের দিকে তাকাই। তারপরেই নদীর দিকে

মাথা উঁচু করি, আকাশ  

চোখ সরলরেখায় থাকলে ঘর পাই, ক্ষীণ আলোও

 

যতক্ষণ ভিতরে কাঠ আছে ততক্ষণ নগর 

ফুরোলেই শেষ 

 

ধ্যান ভাঙলেই আগুন 

 

অক্টোবর ২০২৫ এর কবি রাখী সরদারের কবিতাগুচ্ছ

 



তথাগত ,আমার ভুলে যাওয়া পৃথিবী

রাখী সরদার


১.

অতঃপর চিত্রকূট পাহাড়ের কোল

ঘেঁষে মেঘ গোঙায়


ইন্দ্রাবতী নদীটি এখন তাড়া খাওয়া

হরিণ, সহস্র ছলনায় ছুটে চলেছে

দূর-বিশ্বের দিকে


নেচে উঠছে কামবতী বাতাস!

পুণ‍্যগাভীটিও আনমনা!

তথাগত, এমন আকুলিবিকুলি 

রাত্রিকালে  তোমার দু'চোখে কেন

বাজে না ডাহুকের শিস!


দ‍্যাখো,দ‍্যাখো, চকিত মেঘের পাশে

যুগলমুরতি হরগৌরী!

প্রেমবিগলিত হয়ে একে অপরের

বুকে নখবিলিখনে এঁকে চলেছে

রতিরাগ!


স্ফুরিত হয়ে উঠছে ধ্বংস ও সৃষ্টির

মুহূর্ত


অথচ,

তথাগত তুমি মহৎ জাদুকরের

খেয়ালে আমার দু'চোখ থেকে

মুছে দিতে চাইছ এমন

                          মিস্ট্রি মেঘলোক!


                   ------*----

২.


কী আশ্চর্য!

ওই ক্লান্ত ইচ্ছের ওপর উদ্ভাসিত

'পাগলী,তোমার সঙ্গে!'

তথাগত, তোমার সঙ্গে জয় গোস্বামীর

রোজ দেখা হয়! এ যেন


পৃথিবীর সব ঝোড়ো জোছনার

মাঝে ডেকে ওঠা মেঘ-পাখি!

দূর-দূর পঙক্তির গায়ে দুলে উঠছে

নদী, তারও ওপারে দুলছে

অসংখ্য ঢেউয়ের মুদ্রা


তথাগত, বহুকাল পর

তোমার দু'চোখে দেখি কেয়াকলির

জাগরণ! কতশত বর্ণময় কবিতার

মৃদু সুষমা ওই চিবুক ছুঁয়ে!


আমিও তেমনি চন্দ্রাবতী

সেই একভাবে রূপসাগরের পাড়ে

বসে বাজিয়ে চলেছি  'জলপাই

কাঠের এসরাজ।'


বিনম্র কৌতূহলে

যে কবি এসে দাঁড়িয়েছেন সম্মুখে তাঁকে শতকোটি প্রণাম


সমগ্র রাতের অক্ষরে এখন আমার

হৃদয় ভাসে


শব্দ নয়,স্পর্শ নয়

তারও অধিক যে বাক‍্য-প্রেমিক

তথাগত, সেই তোমার অধরে

চুম্বন রেখে শপথ করছি–


আমার যা - কিছু প্রশ্ন,মাধুরী

আজ থেকে হয়ে যাক অগ্রন্থিত কবিতা


অতীত সূর্যাস্ত পেরিয়ে

            তুমি তার অনন্ত পাঠক।


               ------------

৩.

এখন অনটনের কাল। খাদানের

অতল যেভাবে টানছে

মেয়ে মরদের চকিত চুম্বনের মধ‍্যেও

ধুলো,ধোঁয়া একাকার!


অনঙ্গ অন্ধকারেও

এমন এমন অভিমান ঢালছে তারা

মনে হয় পুরো কালো আবহটিকে

শরীরী বুদবুদে ধারণ করছে!


তথাগত,তুমি সেই চেনা অচেনা

কুলি -কামিনের আঙুলে চুম্বন

করছো অবিরত! এই দৃশ্যে

আমার তর্জনীতে বেজে উঠছে

                                পরিত্রাণ


তথাগত, তোমাকে দেখার আগে

কেন খুঁজিনি তোমার আত্মিক

স্বদেশ!


বাতাসে বেজে উঠছে অনন্ত সুর


তবে কি শ্রমশীল মানুষের নুনতাপ

শরীরেই ঈশ্বর খুঁজে পান

মধুর-গোপন?


তথাগত, এই চলমান হৃৎপিণ্ডের

দিব‍্যি, একবার বলে দাও, কীভাবে

ওই নিরন্ন,নশ্বর চেহারাগুলো

তোমার দৃষ্টিতে হয়ে পড়ছে অবিনশ্বর


অতি বিচ্ছেদের আগে

একটিবার আমার এই দু'চোখের

ধুলো গলে গলে হয়ে যাক

                          দূরবর্তী দামোদর...

                   ---------


৪.

তথাগত, একটি জীবৎকাল মাত্র

আমাদের হাতে–

ওই সমাধির ধুলো পর্যন্ত

আর কিছু নয়


হয়তো এই মুহূর্তে শূন‍্যতার মেঘ হয়ে

উড়ে যেতে পারি, তুমিও এইমাত্র

হতে পারো কোনো উড়ো নদীর

এক বিন্দু জল!


তথাগত, সূক্ষ ছায়া হয়ে যাওয়ার

পূর্বে  এসো, হারিয়ে যাই আজন্মের

পিপাসায়


তুমি হও হু হু হাওয়া

আমি তীব্র ছন্দ


দেখো,আমাদের আনন্দবিহারে উড়ে

আসছে শত শত নীল ভ্রমর!

আকাশ জুড়ে পারাবতের শীৎকার

প্রজাবাটের ঘাট থেকে উঠে আসছে

থৈ থৈ কংসাবতী!


আমি চিনে নিচ্ছি

তোমার রক্তের ভাষা

তথাগত, তুমি ছুঁয়ে আছ আমার তৃষা


স্বপ্নমত্ত শালিকটি উড়তে উড়তে

আমাদের গাঢ় উষ্ণতার ভিতর

ছড়িয়ে দিচ্ছে প্রেমের মঞ্জুষা


আমরা সংসারের অতি জটিলতা

পেরিয়ে হয়ে উঠছি উজ্জ্বল এক

                         ধ্বনিময় পৃথিবী...


                   ----*-----

৫.


তথাগত, ভুলে যাওয়া পৃথিবী থেকে

কখনও যদি ফিরে আসো


চিনে নিও মথুরার ঘাট

যেখানে অকথ্য শ্রাবণে ঘোলা হয়ে

সান্ধ‍্য জোয়ারের জল। কোনো

পড়শিবাড়ির রাধা খুলে রাখে

মৃন্ময়ী বদ্বীপ


তথাগত,মাটি-মাংস ও মানুষের  মোহনীয় ঘ্রাণে আজও


তুমিও তো তেমনি উন্মনা পুরুষ!

শরীরে নাগিন জড়িয়ে

মেলে ধরছো নিজস্ব বিভাস!


আজ যেন সব কিছুই কোনো

অপার্থিব মুহূর্তের কাটাকুটি! খুব

বেশিরকম স্মৃতিকথা কিংবা

প্রবল ধর্মজিজ্ঞাসা


তথাগত, আমারও ঘটেছে জন্মান্তর

চোখের সরলতা মেখে একা আমি

জলগামী হংসিনী


ডুবু ডুবু উথালিপাতালি পরান


অপেক্ষা করি কখন সেই অপরূপ

ঘোরের রাত্রে আমাকে চিনে নেবে

অন্তরপুর কাঁপিয়ে ছুঁয়ে দেবে

কামনার রঙিন কোরক!