তথাগত ,আমার ভুলে যাওয়া পৃথিবী
রাখী সরদার
১.
অতঃপর চিত্রকূট পাহাড়ের কোল
ঘেঁষে মেঘ গোঙায়
ইন্দ্রাবতী নদীটি এখন তাড়া খাওয়া
হরিণ, সহস্র ছলনায় ছুটে চলেছে
দূর-বিশ্বের দিকে
নেচে উঠছে কামবতী বাতাস!
পুণ্যগাভীটিও আনমনা!
তথাগত, এমন আকুলিবিকুলি
রাত্রিকালে তোমার দু'চোখে কেন
বাজে না ডাহুকের শিস!
দ্যাখো,দ্যাখো, চকিত মেঘের পাশে
যুগলমুরতি হরগৌরী!
প্রেমবিগলিত হয়ে একে অপরের
বুকে নখবিলিখনে এঁকে চলেছে
রতিরাগ!
স্ফুরিত হয়ে উঠছে ধ্বংস ও সৃষ্টির
মুহূর্ত
অথচ,
তথাগত তুমি মহৎ জাদুকরের
খেয়ালে আমার দু'চোখ থেকে
মুছে দিতে চাইছ এমন
মিস্ট্রি মেঘলোক!
------*----
২.
কী আশ্চর্য!
ওই ক্লান্ত ইচ্ছের ওপর উদ্ভাসিত
'পাগলী,তোমার সঙ্গে!'
তথাগত, তোমার সঙ্গে জয় গোস্বামীর
রোজ দেখা হয়! এ যেন
পৃথিবীর সব ঝোড়ো জোছনার
মাঝে ডেকে ওঠা মেঘ-পাখি!
দূর-দূর পঙক্তির গায়ে দুলে উঠছে
নদী, তারও ওপারে দুলছে
অসংখ্য ঢেউয়ের মুদ্রা
তথাগত, বহুকাল পর
তোমার দু'চোখে দেখি কেয়াকলির
জাগরণ! কতশত বর্ণময় কবিতার
মৃদু সুষমা ওই চিবুক ছুঁয়ে!
আমিও তেমনি চন্দ্রাবতী
সেই একভাবে রূপসাগরের পাড়ে
বসে বাজিয়ে চলেছি 'জলপাই
কাঠের এসরাজ।'
বিনম্র কৌতূহলে
যে কবি এসে দাঁড়িয়েছেন সম্মুখে তাঁকে শতকোটি প্রণাম
সমগ্র রাতের অক্ষরে এখন আমার
হৃদয় ভাসে
শব্দ নয়,স্পর্শ নয়
তারও অধিক যে বাক্য-প্রেমিক
তথাগত, সেই তোমার অধরে
চুম্বন রেখে শপথ করছি–
আমার যা - কিছু প্রশ্ন,মাধুরী
আজ থেকে হয়ে যাক অগ্রন্থিত কবিতা
অতীত সূর্যাস্ত পেরিয়ে
তুমি তার অনন্ত পাঠক।
------------
৩.
এখন অনটনের কাল। খাদানের
অতল যেভাবে টানছে
মেয়ে মরদের চকিত চুম্বনের মধ্যেও
ধুলো,ধোঁয়া একাকার!
অনঙ্গ অন্ধকারেও
এমন এমন অভিমান ঢালছে তারা
মনে হয় পুরো কালো আবহটিকে
শরীরী বুদবুদে ধারণ করছে!
তথাগত,তুমি সেই চেনা অচেনা
কুলি -কামিনের আঙুলে চুম্বন
করছো অবিরত! এই দৃশ্যে
আমার তর্জনীতে বেজে উঠছে
পরিত্রাণ
তথাগত, তোমাকে দেখার আগে
কেন খুঁজিনি তোমার আত্মিক
স্বদেশ!
বাতাসে বেজে উঠছে অনন্ত সুর
তবে কি শ্রমশীল মানুষের নুনতাপ
শরীরেই ঈশ্বর খুঁজে পান
মধুর-গোপন?
তথাগত, এই চলমান হৃৎপিণ্ডের
দিব্যি, একবার বলে দাও, কীভাবে
ওই নিরন্ন,নশ্বর চেহারাগুলো
তোমার দৃষ্টিতে হয়ে পড়ছে অবিনশ্বর
অতি বিচ্ছেদের আগে
একটিবার আমার এই দু'চোখের
ধুলো গলে গলে হয়ে যাক
দূরবর্তী দামোদর...
---------
৪.
তথাগত, একটি জীবৎকাল মাত্র
আমাদের হাতে–
ওই সমাধির ধুলো পর্যন্ত
আর কিছু নয়
হয়তো এই মুহূর্তে শূন্যতার মেঘ হয়ে
উড়ে যেতে পারি, তুমিও এইমাত্র
হতে পারো কোনো উড়ো নদীর
এক বিন্দু জল!
তথাগত, সূক্ষ ছায়া হয়ে যাওয়ার
পূর্বে এসো, হারিয়ে যাই আজন্মের
পিপাসায়
তুমি হও হু হু হাওয়া
আমি তীব্র ছন্দ
দেখো,আমাদের আনন্দবিহারে উড়ে
আসছে শত শত নীল ভ্রমর!
আকাশ জুড়ে পারাবতের শীৎকার
প্রজাবাটের ঘাট থেকে উঠে আসছে
থৈ থৈ কংসাবতী!
আমি চিনে নিচ্ছি
তোমার রক্তের ভাষা
তথাগত, তুমি ছুঁয়ে আছ আমার তৃষা
স্বপ্নমত্ত শালিকটি উড়তে উড়তে
আমাদের গাঢ় উষ্ণতার ভিতর
ছড়িয়ে দিচ্ছে প্রেমের মঞ্জুষা
আমরা সংসারের অতি জটিলতা
পেরিয়ে হয়ে উঠছি উজ্জ্বল এক
ধ্বনিময় পৃথিবী...
----*-----
৫.
তথাগত, ভুলে যাওয়া পৃথিবী থেকে
কখনও যদি ফিরে আসো
চিনে নিও মথুরার ঘাট
যেখানে অকথ্য শ্রাবণে ঘোলা হয়ে
সান্ধ্য জোয়ারের জল। কোনো
পড়শিবাড়ির রাধা খুলে রাখে
মৃন্ময়ী বদ্বীপ
তথাগত,মাটি-মাংস ও মানুষের মোহনীয় ঘ্রাণে আজও
তুমিও তো তেমনি উন্মনা পুরুষ!
শরীরে নাগিন জড়িয়ে
মেলে ধরছো নিজস্ব বিভাস!
আজ যেন সব কিছুই কোনো
অপার্থিব মুহূর্তের কাটাকুটি! খুব
বেশিরকম স্মৃতিকথা কিংবা
প্রবল ধর্মজিজ্ঞাসা
তথাগত, আমারও ঘটেছে জন্মান্তর
চোখের সরলতা মেখে একা আমি
জলগামী হংসিনী
ডুবু ডুবু উথালিপাতালি পরান
অপেক্ষা করি কখন সেই অপরূপ
ঘোরের রাত্রে আমাকে চিনে নেবে
অন্তরপুর কাঁপিয়ে ছুঁয়ে দেবে
কামনার রঙিন কোরক!
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন