সেপ্টেম্বর, ২০২৫ এর কবি শতাব্দী চক্রবর্তীর একগুচ্ছ কবিতা


 

শতাব্দী চক্রবর্তীর একগুচ্ছ কবিতা

 

১. গান্ধারী

 

সার সার দাঁড়িয়ে আছে চন্দ্রভুক অমাবস্যা

এই মুহূর্তে আমার চোখ যেন গান্ধারীর। 

একটা ঘেউ গা ঘেঁষে দাঁড়ালে

অন্ধকারে সেই যেন অন্ধের যষ্টি।

সেই উলঙ্গ পাগলিটাকে শোনা যাচ্ছে

গঙ্গার ঘাটের দিকে দেখেছি তাকে,

আঙুরের মতো ফল ধরা লতাপাতার নারীদেহ। 

নদীটির মতো ছলছলে যৌবন তার

ডুবে যায় সারাদিন ধরে জলের শরীরে। 


"হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হল, পার করো আমারে"

ঐ তো, গাইছে গঙ্গার মতো পাড়-ভাঙা গলায়

যেন ঐশী সঙ্গীত গেয়ে যায় বুকের দালানে আমার

এমন ললিত সুরের মধ্যেও ভালো মতো জানে ও, 

প্রবঞ্চনাময় অন্ধকার কাকে বলে? 

জানে হাঙরের কামড়গুলি 

কতখানি রক্ত খায় জোঁক! 


এমন কত কিছুই দেখে ফেলি অন্ধকারে পেঁচার মতো

গান্ধারীর মতো নিশ্চুপ বসে থাকি 

কৌরবের বস্ত্রহরণ দেখে। 

ভেতর ভেতর ঘরবাড়ি সাজিয়ে রাখি পরজন্মের সুখে

পুণ্যলোভাতুর শুচি মন নিয়ে গঙ্গাপ্রাপ্তির আশায়। 

 

পাগলি গায়, পাগল হাওয়ায়, নগ্ন অমাবস্যায়

আমার চোখের ভেতর শূন্য-সাম্রাজ্যে 

দানবীয় আঘাত হানে করালবদনা

অপরাধবোধ নিয়ে জলের ঢেউয়ে মিশে যায় 

শিশিরফুলের মতো আমার যত অশ্রু। 

 

২. দ্রবণ

 

শরীরে শরীর লেগে ফুটে ওঠে কত নক্ষত্র নকশা, 

কত মদ, কত কত ঐশ্বরিক ক্ষমতা

জলে ডোবে হাতের চেটো ও ছোটো ছোটো মাছ

দ্রবণে উল্লাস জেগে ওঠে, 

বাঁশির মরমী সুরেলা ব্যথা খুঁড়ে খুঁড়ে আরাম খুঁজে নেয়

খাদ্য বলতে রাত, যা কিছু চর্ব্য চোষ্য লেহ্য পেয় স্বাদ। 

তুলোর মতো পাখি উড়িয়ে সরীসৃপ হয়ে ওঠা 

আত্মা দুটি শুধুই গোলকধাঁধার মধ্যে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত 

শীত এসে যায় নুন জলে দ্রবীভূত হয় কাতর রাত যত। 


শীতের রোদ নখ ছোট করে পিঠে হাত বোলাতে

সাবান বাক্সে চন্দন গন্ধ, তনুতে সুগন্ধি ছড়ায়

এদিকে বিরহী বিরহ লেখে অরণ্যময় কুঠারের আঘাতে

আঁধারে আলোর সুখে একটি বৈরাগী মন 

রক্তে প্রেমে ফুলে ফুলে ওঠে তার বুক। 


চিরকাল বিধবা-পিঠে শীতকাল চেপে বসে খুব জোরে

সে জানে, নিষিদ্ধ তার ঘর 

খেলা করবে না কোনো ছোটো মাছ 

 

৩. নিভছে আলো

কাক এসে বসে লেখার ওপর, ছায়া উড়ে যায় না

বরং দীর্ঘ বসবাস করে সেই ছায়া 

আবরণ খুলে দেখে ফেলা যায় না আকাশ কোনোমতেই 

খানিক পরেই কবিতার স্বর হয়ে যায় ভোরের কাকের মতো। 

এই দুর্মুখ তৈলমর্দনের কালে

বাক্ যুদ্ধে জিতেছি বহুবার কিন্তু কাক-যুদ্ধে নিরুপায়! 

মাটিতে ফুল ফুটছে না কতকাল আমার কবিতার মতোই 

তারা গৃহহীন মাটিহীন রুক্ষ গোলা বারুদের ছায়ায় ধুঁকছে।

সূর্য উঠছে কিন্তু তার ভেতর কোন দৈববাণীর ভবিষ্যৎ নেই

ধ্রুবতারার সঠিক দিশা পাচ্ছি না,

আমিও এক ছিন্ন নাবিক;

কেবল সারাৎসার জুড়ে ধেয়ে আসে 

কিছু ঘূর্ণির মতো অন্ধকার কুৎসিত মুখ

সেই মুখ থেকে ঘুঘুর ফাঁদের ভয় উঠে আসে বারংবার।

এই উঠোনে কবিতা লিখতে বসে

ভুলভুলাইয়ায় ঢুকে ঘুরে ঘুরে মরছি বিস্তর

লেখার লেখা লিখতে পারছি না

অর্ধজাগরণে চৈতন্য নিয়ে বসে আছি,

কাকে পালক ফেলে যায়

হাহাকার শেষ হয় না; বারান্দা নিভে আসে । 

৪. উচ্ছন্নে যাক

 

রাজপথের রাত, আষাঢ়ের থৈ জল, কালো আকাশ 

এসবের মধ্যে জ্বরের ঘোরে আমি পড়ে আছি প্রস্তরীভূত মূর্তির মতো

ঝড় এসে নিভিয়ে দিল বাতি

শুধু স্তম্ভ দাঁড়িয়ে থাকে নিশ্চুপ, অসাড়

হঠাৎ যে ছায়া আমার ওপর পড়লো, 

অন্ধকারেও ঠিক বুঝতে পারি সে তোমার মুখ। 


মায়াবী আঁধারে সরে সরে যায় গাছ, পাহাড়, মেঘ

তোমার হাত ফুল ফুটিয়ে দেয় মরু কপালে। 

যেখানে ছুটে চলে যায় আঙুল নানান আয়োজনে

তোমাকে ছুঁয়ে প্রাচীন ভাস্কর্য হতে চায় নরম লতা

কোন্ পদাঙ্ক অনুসরণে তুমি যাও অরণ্যে ? 


আলো এসো না এখন, নিরুদ্দেশ হও , 

দেবদারু পাতায় লেখা আছে ঐশ্বরিক লিপি

ওরা স্বর্গ যাত্রা করুক বাসনা নিভিও না এই ক্ষণে–

দূরে কোথাও বাজ পড়লো বুঝি, দেখো না ওদিকে

আমাদের এখন আবাদের প্রয়োজন

সমস্ত অজুহাত তুমি শিকেয় তুলে রাখো। 


অযথা ঘ্যান ঘ্যান কোরো না

ঘ্রাণ নাও সাঁতার ভুলে যাও, ভালো আঁকিয়ে তুমি

ইশারা ঘাতক রিপুগন্ধে দগ্ধ করো

জোনাকির আলোয় ভেসে যাক যাবতীয় গান্ধর্ব

উচ্ছন্নে যাক আর যা বাকি কিছু

 

৫. শিকারি

 

যখনই পাতা চিনতে শিখেছি

একটা একটা করে গাছ উবে যেতে থাকলো

অরণ্য একটি সহজলভ্য দাহ্য উপকরণ

শাখা প্রশাখায় ঝুলে আছে বেবাক প্রশ্নচিহ্ন। 


যখনই রাতে আকাশ চিনতে চেয়েছি তারা গুনতে

কালবৈশাখী সমস্ত নক্ষত্র মুছে দিয়েছে ধোঁয়াশায় 

বাচ্চাটি ইংরেজি পড়ে ‘দ্যা স্কাই ইজ ব্লু’। 


যখনই পুকুরের জলে নিজেকে দেখতে চেয়েছি

কিংবা মাছরাঙা ও মাছেদের বিন্যাস

ধীরে ধীরে পুকুর হয়েছে জমিন

আস্ত পুকুরটাই আবাসন হল নির্বিঘ্নেই। 


যখনই ঝরনা দেখতে গেছি

পাহাড়ের গা ধুয়ে দিচ্ছে দুধের ঝরনা

এমন মনোরম দৃশ্য নিষিদ্ধ হয়ে গেল কঠোরভাবে

পর্যটকদের আশ্রয়স্থল কেবল। 

 

এসব ঘটেছে, এসব দেখছি, কফি খাচ্ছি 

সন্ধ্যামালতী ফুটছে

হাহাকার করে ঘুরে মরে চিল

জগতে শিকারি পাখি নামে দোষ পায় সে-ই! 

 

৬. প্রলেপ


প্রবাহ অধিক আসে লাল পাতার মতো দুলে দুলে

নিজের শব্দ ভারী হয়ে দাঁড়ায় দেহের ওপর তখন

এক মণ স্বপ্নদর্শন শেষে লাভ হয় শুধু বালি, 

ঝরে পড়ে যায় চোখের পাতা থেকে কূট স্বপ্নগুলি। 


নির্ঝরের মতো ভেঙে যায় সমস্ত স্বপ্ন, 

রঙের মাসে ফিকে হয় দেউল

বৃন্ত বৃন্ত কুসুমের ভোরে ঢেউ খেলে যায় 

ঝাঁটা হাতে মা শীতলার গাধা। 


মড়ক এসেছে ও পাড়ায়, মাঝে একটি দেওয়াল

বিধিবদ্ধ সতর্কতায় আসে দোলের বসন্ত

নিমপাতা সর্বস্ব দেহে কিছু ক্ষতের সমাহার ঘটে গোপনে

সে ক্ষতে প্রলেপ পড়ে সারা ফাগের মাস ধরে

সে ক্ষতে পুষ্প বৃষ্টি ঝরে না কখনো। 


ঘাড় গুঁজে বয়ে চলে আধ খাওয়া চাঁদের দেশে 

রক্ত লেগে মরচে পড়ে যায় ভাঙা হাড়ে

মলমের প্রলেপ তখন নিরাময়ের রহস্য! 







 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন