ঋতুপর্ণা খাটুয়ার
একগুচ্ছ কবিতা
রিভার ট্রেকিং ও
কয়েকটি কবিতা
(১)
আপেল বনের নির্জনতা
পেরিয়ে পৌঁছেছি পাহাড়ি নদীর পাড়ে
বড় পাথরে উঠে চারিদিকে
সিমেট্রির মতো বিচ্ছিন্নতা দেখে
এবারের আচমকা বর্ষায়
কোয়াক কোয়াক ডাকের পাখিটার
নিরবচ্ছিন্ন কাতরতা
অথবা ফুর্তি মনে পড়ল। পাথরের নীচে
রাক্ষসী নদী ছুটে
যাচ্ছে দাঁত নখ বার করে। জলের হিংস্রতা
যেমন বুঝছি, তেমনি
বুঝতে পারছি বাংলাদেশের মেয়েটি
এতটাই ভার্নারেবল
ও ইমপালসিভ হয়ে উঠছে, অহরহ মিথ্যা
বলার পর, ড্রাগ ইনজেকশন
নেওয়ার পরও একটি সত্যি সে
বারবার কবুল করছে,
এবার পাহাড় থেকে ফিরে ওকে না
বাঁচালে, আসতে আসতে
ও তেজহীন সূর্যের মতো ডুবে যাবে।
কেন জানি না, মনে
হচ্ছে নাদিয়া এই জলেই ছুটছে, পাথরে
বারবার মাথা থেতলানোর
পরও, হাড়হীন প্রানহীন জোম্বির মতো
ঘিষ নদী লালে লাল
করে বয়ে আনছে ‘বুবু বুবু’ শব্দ
(২)
নদীর প্রবল স্বার্থপরতা
ও টক্সিসিটির কথা বলতে চাই,
ট্রেকিঙের প্রথম
রাতেই সে আমাদের তিনটি মেয়েকে
খেয়ে ফেলার তালে
ছিল। চিমনির ভকভকে ধোঁয়াসম
কুয়াশা কাটা বৃষ্টিতে,
টেন্টের নীচে মাটি পাথর সরে
আমাদের মাথা নদীতে
ঝুলে পড়ছে, বিদ্যুৎবেগে উঠে
টেন্ট সরিয়ে ভেতরে
ঢোকা জল বার করছি আর সেযাবৎ
পড়া নদীর পেলব চেহারাকে
সন্দেহ করছি। পাড়ের
জমিটি যেমন আমাদের
নয়, তেমনি নদীরও নয়,
প্রকৃতি নদী ও মানুষ
দুজনকেই হিংস্র ও সুন্দর করে
একইভাবে গড়েছে, এ
মেনে নিতে জেহাদি কাব্যিক
লোকজনের একটু সময়
লাগবে।
(৩)
ট্রেকিঙে রাতে আসা
স্বপ্নের কথা বলা যাক।
দলে কেউ রটিয়েছে,
ব্ল্যাক লেপার্ড যাতায়াত করে
এ পথেই, সেই কল্পনায়
স্বপ্নে বারবার দেখছি সামনে
লেপার্ড চলে আসছে,
আর আমি একসময়কার এই
জঙ্গলের রাজা, যাকে
দেখে কালো জন্তুটি নতমস্তকে
গরগর করতে করতে জঙ্গল
ও তৎসংলগ্ন রাস্তা নদীপথ
সব ছেড়ে দিচ্ছে।
কিংবা ঝাঁপিয়ে পড়লে জন্তুটিকে
কুস্তির প্যাঁচে
কাত করে জঙ্গলের দখল নিচ্ছি।
পরদিন খবর কাগজ আমার
একটি বড় ছবি সহ
সাহসের কথা ফলাও
করে রচনাকারে ছেপেছে।
বাস্তবে যেখানে ফাট্টু
চরিত্র দেখে সম্পর্ক যায় যায়
স্বপ্নে নিজের সুপ্রিমেসি
দেখতে, উপভোগ করতে
বেশ লাগে
সিরিজ কবিতা : ট্রেকিঙের
দিনগুলি
(১)
ওখরে
ছ'সাত ঘন্টা গাড়ির
ক্যাওস কাটিয়ে ওখরেতে উঠে
আসার পর তোমাকে নিয়ে
একটা শব্দও লিখতে
ইচ্ছে করে না। বরং
সহজেই মন দখল নেয় গোলাপি
সাদা খাঁজের রডোডেনড্রন।
আসতে আসতে গড়ে উঠছে
যে মনাস্ট্রি, তার
গোড়ার কালচে হৃদয়ের রঙ আমায়
চুপ করায়। স্কুল
যাওয়া নেপালী অথবা গোর্খা জনজাতির
দুরন্ত বাচ্চার লাফিয়ে
সিঁড়ি ভাঙা কমনীয় এক কল্পদৃশ্যের
জন্ম দেয়। মদহীন
সন্ধ্যায় শুধুমাত্র অর্গানিক উপায়ে প্রস্তুত
রডোডেনড্রন ওয়াইন
আমার সুন্যাহেরি পাহাড় অভিজ্ঞতার
ডিকনস্ট্রাকশন করে।
এসব দিনে কবিতার বাঁকবদল নিয়ে
বেশি ভাবতে হয় না,
শব্দের আড়ালে নেমে যাওয়া যায়
ঘন কুয়াশার কুহকে,
ভৌতিক আবহে
(২)
হিলে টু বারসে
এমন ঘন জঙ্গলে পাঁচ
কিমি চড়াই-উৎরাই
কম কিছু নয়, তবু
এসব সারাজীবনের ভারের চেয়ে
লঘু এই ভেবে ছয়জন
সঙ্গী ও নাছোড়বান্দা কুকুর
মোতিকে নিয়ে ব্যস্ত
হই সফরে। মার্চ শেষের ধুঁকতে
থাকা জলধারা মনে
তেমন কোনও আলোড়ন ফেলে না,
ক্ষীণতনু বাঁশগাছ
অ্যাটট্রাকটিভ লাগে। কখন দেখা হবে
মায়াবী লেকের ধারে,
রডোডেনড্রন জঙ্গলে কোনও
আচমকা বিদেশিনী হাত
নেড়ে হাসবে এসব ভেবে
পার হই পাতার ফোকরের
আলোকরশ্মিগুচ্ছ, বিস্তীর্ণ
তৃণভূমি। তীক্ষ্ণ
বুটে পিষে যায় পেস্তা রঙের পাতা।
হাইপের রেড পাণ্ডা
অগোচরেই থেকে যায়, সৌখিন
কিছু পাখি শিষ দিয়ে
ডাকে, ডেকে যায় কোথায়—
চমক ফেরে শিকারী
মৌমাছির কটুবাক্যে, দেখতে
পাই সামনেই রঙিন
টেন্ট ও কাঠের ডরমিটরির
সৌভাগ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে
বৃদ্ধ গুরাসকুঞ্জ
(৩)
হিলে টু ভারেঙ
এসব দিনে পথ নিয়ে
লিখতে ভালো লাগে।
জঙ্গল, গ্রাম, সমভূমি,
উঠানামা, নদী, পাথর,
শর্টকাট, সাবধান
—এই কীওয়র্ড কানে বেজে
চলে ঝনঝন ঝনঝন। পায়ের
পেশির আন্দোলন
বেড়ে চলে, জুতোর
গ্রীপ আটকে রাখে আমাদের,
গলা শুকিয়ে আসে,
মনে পড়ে মখমলি বিছানা,
আরামের চেয়ার, লাক্সারি
জীবন। তবু কোন্ মরীচিকা
হাত ধরে টেনে নেয়
গাইড হয়ে, প্রলোভন দেয় সুন্দর
দৃশ্যের অথবা হোমস্টের
দেশী মুরগী মাংসের।
বিছিয়ে থাকা ছোট্ট
টক স্ট্রবেরি তখন পা জড়িয়ে
রাখে, মনে পড়ে যায়
কত নকল সংশ্রব ত্যাগ করতে
হবে সমতল জনজীবনে
ফিরে, এড়াতে হবে
মায়াবী দুর্ভোগ
(৪)
ভারেঙ টু গোরখে
ভারেঙে এক মাতাল
বুড়োর বাড়িতে ম্যাগি খেয়ে
আমাদের আবার অনন্ত
পথচলা, এন্ট্রি করাতে হবে
সিকিম চেকপোস্টে।
শুনছি সামনেই পাব রিজার্ভ
ফরেস্ট, অন্ধকার
পথ, জ্বালতে হবে তীক্ষ্ণ হেডল্যাম্প।
দুর্গম এক শর্টকাটে
উঠে ভেতরের শ্বাস সব পাঁজর
ভেঙে বেরিয়ে আসতে
চায়, কী হবে এমন অভিজ্ঞতার!
কেন জরুরি ঘরের মোহ
ত্যাগের! ডরাওনা রিজার্ভ
ফরেস্টে এসে বুঝলাম,
এত সুন্দর কালো গভীর জঙ্গল
ডালে ডালে ফুরফুরে
চেরি ফুলের গোলাপি নিস্তব্ধতা
আমাদের শত্রু হতে
পারে না। করোনার নিঃসঙ্গতার
চেয়ে অনেক ভালো এত
গাছপালা, কালোজামের
অন্ধকার ও ঝিঁঝি
শব্দ। নীচে কান ফাটানো জলের
আওয়াজ স্বস্তি দিচ্ছে, বোঝাচ্ছে টার্গেটের কত কাছে
আমরা। আন্দোলিত পায়ের
পেশি, ফুলে ওঠা কাঁধ
তখন দেখে চলেছে নদীর
ওপারে লাল টিনের বাড়ি
(৫)
ওয়ে টু সেপি
আজকের পথ শেষ হয়ে
যাবে সেপিতে,
কুড়ানো হয়ে গেছে
পাইন ফল, ভেবে ফেলেছি
রেজিনে সংরক্ষণের
উপায়ও। ফুলের পাঁপড়ির
চাতালে বসে ছবি তুলেছি
কতক। নেটওয়ার্ক পেয়ে
বাবাকে জানিয়েছি
পথের ক্লান্তির কথা। একপ্রস্ত
খিস্তি দিয়েছি চড়াই
পাথুরে নিরীহ পথকে। এও বুঝেছি
জীবনে ওঠা যতটা কঠিন,
পিঠে বেঁধে নেওয়া আদর্শ
নিয়ে নেমে যাওয়া
ততোধিক কঠিন। বিশ্রামস্থল, ঘোড়ার
মল, ঘুমন্ত সামানদেন,
নড়বড়ে কাঠের ব্রিজ, ছোট্ট
রাম্মাম গ্রাম পেরিয়ে
যখন কোনও পথিককে জিজ্ঞেস
করি সেপি আর কতদূর,
আশ্বাস পাই স্বল্প পথের।
সেই একটু একটু পথ
পেরোতে পেরোতে তিরিশ
বছরের জীবন ও শ্রীখোলা
ব্রীজ দেখতে পাই

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন