মে ২০২৩ তমোঘ্ন মুখোপাধ্যায়ের একগুচ্ছ কবিতা

 

তমোঘ্ন মুখোপাধ্যায়ের একগুচ্ছ কবিতা



 

১. স্বপ্ন

 

শুয়ে আছি ধর্মক্রিয়ায়, দ্রুত নাক ডাকব, শুয়ে আছি জন-জানোয়ারের দেশে,

দ্রুত হাত কচলাব নিজ স্তনে— ওমা! কী ডাগর ডাগর— শুয়ে আছি

যেন এইমাত্র ঘুম পাড়িয়ে দিতে আসবে কেউ। দেহমর্দনের বিপদের নীচে

আমায় এমন কাতরাতে দেখে তার দাঁতকপাটি লেগে যাবে, আর ঠিক তখনই

নখ ও বুক পৃথক হয়ে যাওয়ার শব্দে স্বপ্ন শুরু!

দেখি অনেক কিছু। দেখি অনেক লোকের মধ্যে অন্তত একজন হাবাগোবা

ঠিক নিজেকে রসিয়ে বসিয়ে নেয় চিরকাল; তার উবু হয়ে বসে থাকা দশায়

হঠাৎ হঠাৎ আকাশ পেয়ে যায় জোর আর সে দৌড়ে চলে যায় স্থির পুকুরে—

সেখানে খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সে জলের পর্দায় আকাশ দেখে কাঁপতে থাকে;

তার পাশ দিয়ে কত কত স্বাভাবিক লোক এসব না পাত্তা দিয়েই পেরিয়ে যাচ্ছে,

ভালই করে, আমিই পারি না, কেমন গুমোট লাগে স্বপ্নের ভেতর।

সেই হাবাগোবা লোকটিও তার স্বপ্নের ভেতর আমাকে ঠিক একই কাজ

করতে দেখে শুরুতে বিরক্ত, শেষে তৃপ্তি পেয়েছে জানাল। জানাল যে

এর মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু নেই। বরং জেগে থাকা অবস্থায় নিজের বুক

চটকানোর মধ্যে যে আপাত বিকৃতি ও ব্যথা তাও স্বাভাবিক,

শুধু খেয়াল রাখতে হবে, যেন ঘুম পাড়াতে আসা কেউ এসব জেনে না ফ্যালে!

 

শুয়ে আছি ধর্মক্রিয়ায়, ভগবানের বুক অব্দি আঙুল চলে গেছে,

যাহ্ শালা! বুক কই! থরে থরে ডায়াল প্যাড শুধু। যে যখন পারছে যা খুশি

নম্বর ডায়াল করে ভগবানই চাইছে (কী রগড় মাইরি!), এদিকে স্বপ্নের ভেতর

হাবাগোবা ও আমি, আমি ও হাবাগোবা, আমি কিংবা হাবাগোবা, এই পাঁচজন

হঠাৎ আকাশ পেয়ে গেলে পুকুরের পর্দা যাতে দ্রুত শান্ত করা যায় তার চেষ্টায়

(ভগবান চুলোয় গেল) দম আটকে বসে আছি।

 

বাইরে মানুষ ডাকছে। ঘুম না ভেঙে যায়!

 

 

২. এবার ফিরাও মোরে

 

একটিই তো ঘটনা। তাকে শুশ্রূষা নামে এত দশক চালানো হল।

অবাক করে দেওয়ার মতো কিছু ঘটবে না আর। শুধু বারবার

মরতে ইচ্ছে করলেই সেক্স পেয়ে যাচ্ছে, সেক্সের ইচ্ছা জাগলেই মৃত্যু—

এই প্যারাডক্সের অনেকখানি যৌক্তিক বিশ্লেষণের কাছাকাছি

চলে এসেছে বর্তমান বাংলা কবিতা।

 

একটাই তো কবিতা। খুব অর্থবহ কিছু, এমন ইমেজ খাড়া করে

আরও কয়েক দশক চালানো হবে।

তারপর যখন আসল ব্যাপার প্রকাশ্যে আসবে, তখন সবাই ভ্যাবলা,

সবাই অবাক! হবে না-ই বা কেন! কবিতা তো ছিলই না।

খুব কুখ্যাত কেউ একজন খ্রিষ্টপূর্ব অমুক শতকে একেবারে সদ্যোজাত ভাষায় তার

রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে বিশদে পাঁচ-ছ’পাতা লিখে মাটিচাপা দিয়ে দিয়েছিল।

পরে সেটাকেই কেউ খুঁড়ে বের করে কবিতা নামে বাজারে চালিয়ে দিয়েছে!

তাই নিয়ে কাড়াকাড়ি, কামড়াকামড়ির শেষ নেই!

 

একটাই তো কামড়। তার পুনরাবৃত্তির ভেতর ফলের দ্যোতনা

ঝলমল করছে। ঝলমল করছে কামড় পরবর্তী দাঁত।

মরতে ইচ্ছে করলেই সেক্স পেয়ে যাচ্ছে, সেক্সের ইচ্ছা হলেই মৃত্যু—

এই সামঞ্জস্য চোয়াল থেকে চোয়ালে ছড়িয়ে যাওয়ার পর চিবানোর

স্পৃহা ধ্বংস হয়ে গেল। এখন ঢোক গেলার শব্দে মাথা ভোঁতা হয়ে যাবে।

 

একটাই তো মাথা। তাকে শাবল দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে সব রহস্য জেনে

যাওয়ার পর অবশ হয়ে যাচ্ছে জনগোষ্ঠীর পর জনগোষ্ঠী।

এ হওয়ারই ছিল। শুধু কবে হবে তা ধারণা করা যায়নি। ইদানীং

এক অবশ জনগোষ্ঠীর পাশে নতুন অবশ জনগোষ্ঠী কতক্ষণ একে অপরের

উপস্থিতি সহ্য করতে পারবে তা ঠাওর করার আগেই নৃমুণ্ড নস্যাৎ করে দিচ্ছে

আধুনিকোত্তর বাংলা প্রবন্ধ।

 

আপাতত ক্রিয়া নেই আর। আপাতত স্বীকারোক্তি শুধু—

আমরা সাহিত্য করতে এসেছিলাম। করা হয়ে গেছে। চলে যাচ্ছি...

 

৩. দেশ

 

এই এক উদ্ভট বিষয় যার ব্যাপারে কথা বলতে না চাওয়াই শ্রেয়,

কিন্তু যেহেতু আমায় মঞ্চে ডেকে নেওয়া হয়েছে (বাইরে মাটিতে ছিলাম,

কেন যে ডাকল! যাইহোক—) তখন কিছু কথা তো বলবই। বলা কর্তব্য।

দেখুন, নতুন করে কিছু বোঝানোর নেই আপনাদের। বেশি বোঝাতে গেলে

আপনারা শুরুতে বিরক্ত হবেন, তারপর রেগে যাবেন, তারপর হেসে ফেলবেন।

আমার কথার মাঝখানে কেউ হেসে ফেললে আমার আবার খুব রাগ হয়।

আগে হত না, এখন হয়।

আগে হত না, এখন হয়— এমন অনেক কিছুই তো বেশ গুছিয়েই হচ্ছে,

আপনারাই ভাবুন, হচ্ছে না কি? হচ্ছে। হচ্ছে। আপনারা তা জানেনও,

শুধু কিছু কিছু ব্যাপার, যা আপনাদের দৃষ্টির বাইরে রেখে দেওয়া হয়েছে,

সে নিয়েই আমি একটু কথা বলার চেষ্টা করব।

আ-আপনা-রা, একটু শান্ত হয়ে বসুন। বুঝতে পারছি অনেকেই অনেকটা

দূর থেকে এসেছেন, হঠাৎ বৃষ্টি হয়ে আরও গোলমাল হয়ে গেল, তবু

আপনারা যদি না শোনেন, যদি আপনারা ব্যাপারগুলো গুরুত্ব দিয়ে না ভাবেন,

তাহলে ক্ষতি কিন্তু আপনাদেরই। কতদিন আর অন্ধকারের মধ্যে থাকবেন,

নতুন সময় আসছে, খাপ খাওয়াতে না পারলে সমূহ বিপদ, আপনাদেরও,

আপনাদের সন্তানদেরও।

যাই হোক, যে-ব্যাপারে বলার জন্য... কী যেন, ও হ্যাঁ, দেশ, দেশ!

অল্পই কিছু বলার আছে। অ্যাঁ! কী? শুনতে পাওয়া যাচ্ছে না?

মাইকে? অ্যাঁ? মাইকে আওয়াজ ঠিকঠাক আসছে না?

হ্যালোওওওও... হ্যালোওওও... চেক্ চেক্... শুনতে পাওয়া যাচ্ছে?

কী? যাচ্ছে না? এখনও যাচ্ছে না!

 

ধুর! কী যে হয়!

 

 

৪. গাছ

 

এক মুখ থেকে অন্য মুখে কাঠ পাচারের বিকেল।

আমরা খুব সহজ হয়ে বসে আছি।

যেহেতু তোমার হাত বারবার ধরার পরও আমি কোনও

উত্থান টের পেলাম না, সন্তানাদি’র সম্ভাবনা নিয়ে আর

ভাবার কিছু নেই।

 

খুব দ্রুত আমরা আলাদা হয়ে যাব।

 

এক মুখের কাঠ অন্য মুখ অবধি পৌঁছানোর আগেই

রাস্তা শেষ হয়ে যাচ্ছে বারবার। খুব দ্রুত এই শেষ হয়ে যাওয়া।

হাত স্পর্শের আগেও চারপাশে যা যা ঘটছিল,

পরেও তাই তাই ঘটছে। আলাদাই তো আছি।

এক দরজা থেকে আর এক দরজা অবধি আমরা কুঁকড়ে যাওয়া

শরীরে হামাগুড়ি দেওয়া অভ্যাস করেছিলাম; যেহেতু

নতুন কেউ আসবে না, আমরাই একটু চেষ্টায় ছিলাম যদি

নিজেদের ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে একটু বাল্যদশা দেওয়া যায়...

 

এক মুখ থেকে অন্য মুখে কাঠ পাচারের ভোর।

বহুদিন যমজ থাকার পর রতি-অভিজ্ঞতা। বহুদিন কাঠ

পাচারের পর শিকড় দেখার বিস্ময়।

 

সম্ভাবনা নিয়ে ভাবার কিছু নেই। অত ক্ষয় আমাদের ধাতে সইত না।

খুব সহজ হয়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছি আমরা।

নীচের বিস্তীর্ণ ছায়া আমাদের মুখাগ্নি সাজাবে।

 

 

৫. স্বমেহন

 

বাপের রমণ-ইচ্ছা তোমাতেও গেছে চুপিসারে।

এই শেষ গতি যাকে প্রাকৃতিক মনে হয় রোজ।

ভাবো, পশু নও, কিন্তু পাশবিক জাগার অছিলা

এ গতি না দেহে এলে তুমি মাইরি কখনও পেতে না।

 

বাপের রমণ-ইচ্ছা তোমাকে পাওয়ার পর আরও

কিছু মাস ছিল, কিন্তু তোমার বৃদ্ধির ক্বাথ দেখে

সে খুব সন্ন্যাস-চিন্তা চেপে ধ’রে নীল হয়ে গেছে।

এখন তোমার চোখে তার খিদে নাচে, গান গায়।

 

যেহেতু গানের মধ্যে কাম-প্রবণতা অত্যধিক,

তোমার নিজের মুখ নিজেরই অসহ্য লাগে রোজ।

মুখগহ্বরের মধ্যে মাটি ফ্যালো। মাটিও জননী।

রমণধাক্কার শব্দে ঊর্ধ্বতালু ফেটে ফেটে যায়।

 

ফাটা ঊর্ধ্বতালু নিয়ে কার কাছে শুশ্রূষা চেয়েছ?

কার উপশম থেকে তুমি পাবে ভাষা ও বিকার?

তোমার সমস্ত শব্দ বিকৃতির পথ বেয়ে নেমে

শিশ্নের অবাধ্য পেশি শক্ত করে দেয় ক্রমাগত।

 

বাপের রমণ-ইচ্ছা তোমাতেও গেছে। শব্দময়।

ভয় হয়! ভয় হয়— ছেড়ে চলে যায় যদি! যায়!

স্বকীয় ইচ্ছায় যন্ত্র চালু করা প্রাকৃতিক হবে?

শুধু তো গমন নয়, তারও পরে বহু স্নেহ বাকি।

 

এখানে সদিচ্ছা কম, পিতৃমোহরক্ষাদায় বেশি।

তুমিই তোমার পাশে নগ্ন শুয়ে একা একা আজ

নিজেকে ভোগের লক্ষ্যে নিজের প্রস্তুতি শান দাও...

 

নিজেই নিজেকে নিচ্ছ। ব্যথা লাগছে। অনুতাপহীন।

 

৬. লাভ ইন দ্য টাইম অফ ইনস্যানিটি

 

সাধারণ অর্থস্তর থেকে সরে যাওয়ার পর বন্ধু বলতে কিছু নেই।

একটা প্রচ্ছন্ন ঘরের মধ্যে সারা দিন শুয়ে থাকি আমি। ভারী স্তনের নার্স আসে।

“চিকিৎসা থাক, আপনি আমায় বলুন শুয়ে থাকতে থাকতে

এই যে আমার হাত-পা অবশ হয়ে যাচ্ছে, এরপর কেউ বন্ধু হবে আমার?”

নার্স হাসে। হাসিটা ভারি মিষ্টি। হাত মুঠো করায়। শিরাস্পন্দনের ওপর

স্পিরিট ঘষে। তারপর সিরিঞ্জ ভর্তি ঘুম...

 

ডাক্তার বলেছেন, “এসব খাতাপত্র থেকে দূরে থাকুন। বউ ছেড়ে গেছে,

রক্ষিতা রাখার মুরোদ নেই, সন্তান নেবেন না স্থির করেছিলেন, কিন্তু

শুনেছি আমার সন্তানটিও নাকি আপ—... এনিওয়ে, মোদ্দা কথা হল

এসব ছাইপাঁশ লেখা থেকে দূরে থাকুন। লোকজন হাসাহাসি করে।”

নার্স হাসে। লুকিয়ে পাতা এনে দেয়। জানি সে চায় না এই অসুস্থ দশা

আমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাক। আমিও কি চাই?

সাধারণ অর্থস্তর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর এই যে

আমার আর নিজেকে নিয়ে কোনও চিন্তা নেই, বউ ছেড়ে যাওয়ার

সাময়িক দুঃখের ওপর তুলোগাছ বেড়ে ওঠার দৃশ্যে এই যে আমি

খিলখিল করে হাসি ইদানীং, এও তো একরকম সুস্থতা।

 

শুধু আগে যে বন্ধুরা বেড়াতে আসত আমার কাছে, মদ খেত,

কবিতা পড়ত, পাহাড়ে বেড়াতে গিয়ে কতবার তাদের বেটার হাফ

বমি করবে বলে গাড়ি থামিয়েছে তার গল্প করত ঠান্ডা গলায়,

ইদানীং তারা আর আসে না। চন্দ্রভাগা নাম্নী এই নার্সটির মাস-মাইনে অবশ্য

তারাই পাঠায়। কিন্তু নিজেরা আসে না। না এসে ভালই করে।

আমি আর নার্স সুখে আছি। ডাক্তারবাবু সব জেনেবুঝেও কিছু বলেন না।

শুধু মাঝে মাঝে আফসোস করেন, আর ভাবেন— কেন আমি

পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে বারবার কোল্যাপ্স্ করে যাই!

 

সাধারণ অর্থস্তর পেরিয়ে গেছি বলে নার্স আমার সামনেই

নির্দ্বিধায় পোশাক পাল্টায়। মাঝে মাঝে ঘুরে দ্যাখে আমি আগের মতো

হাঁ করে তার চর্বি দেখছি কি না। আমি তো চর্বি দেখি না! দেখি

তার ঊরু ভেদ করে অজস্র শালিক পাখি ছটফট করতে করতে বেরিয়ে আসছে।

 

খাতায় এসব লিখলে ডাক্তার অকালে মরে যাবে...

 

 

৭. হাইপাররিয়েলিটি

 

“Paradox asks so much from us

We often experience it as grace.”

                                      —Peter Gizzi

 

ধ্রুব সত্যের মতো দেখতে এমন যে-কোনও মানুষকে অপহরণের পর

আমরা, একটি গুপ্ত সংস্থার বিনা মাইনের অত্যুৎসাহী কর্মচারীরা,

তার ভেতরের সীবনশিল্প খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতাম সারা রাত ধরে।

এখনও অবধি যাদের সাথেই আমরা এমন করেছি, তাদের প্রায় প্রত্যেকে

আমাদের ধন্যবাদ জানানোর ভাষা খুঁজে পাননি।

বরং আমরাই তাঁদের ধন্যবাদ জানিয়েছি বারবার। তাঁদের ভেতরের

এত তন্তু বিনা প্রশ্নে আমাদের ব্যবহার করতে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ...

 

ধ্রুব সত্যের মতো দেখতে যে-কোনও লোকের সমস্যা এই—

এমন মানুষরা সচরাচর ভেতরের কলকব্জা, তাঁত, মাকুচলাচল ইত্যাদি নিয়ে

খুব একটা ভাবেন না। ভাবার অবকাশ পান না বলা বেশি সমীচীন যদিও।

খুব একটা গুরুত্বও দেন না সচরাচর। কিন্তু আমরা, এই গুপ্ত সংস্থার লোকেরা,

যেই না তাদের অপহরণ করে এনে অপারেশন টেবিলে তাঁদের

শরীর, স্বাস্থ্য, চিন্তা, কাম প্রভৃতি নিপুণ নিষ্ঠার সাথে একটু একটু করে

খুলে ফেলি, তাঁরা অবাক হয়ে যান। নিজেদের তো তাঁরা কখনও

এভাবে দ্যাখেননি। শুরুতে প্রচণ্ড চমকান, তারপর কাঁদেন, তারপর

ধন্যবাদ বলার ভাষা খুঁজে পান না।

 

ধ্রুব সত্যের মতো দেখতে লোকজনের বউরা অবশ্য আমাদের

সংস্থার বিরুদ্ধে বহুবার জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছে। তাদের

অসহায় মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে কোর্টরুমের মধ্যেই আমাদের কয়েকজন

হাপুস চোখে কেঁদে ফেলেছে। কিন্তু কী আর করা যাবে! সরকারের

মদত ছাড়া যে এসব কিছু হচ্ছে না তা মহামান্য আদালত শুরু থেকেই জানেন।

তবে এখন অবশ্য সংস্থা বন্ধ হয়ে গেছে। নিজেদেরই দোষে।

কী কুক্ষণে যে আমরা একে অপরের দেহ অপহরণ করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে

ভেতরের সীবনশিল্প দেখতে গেলাম ভগবান জানে! যখন সংস্থার

প্রত্যেক কর্মচারীর ভেতরের কলকব্জা, তাঁত, মাকুচলাচল একে অপরের কাছে

স্পষ্ট হয়ে গেল তখন প্রায় যুদ্ধকালীন তৎপরতায় আমরা একে অপরের

চোখ খুবলে নিতে বাধ্য হয়েছিলাম। ধন্যবাদ জানানোর ভাষাও ততক্ষণে

সংস্থার সবার মুখ থেকে মুছে গেছে।

 

এখন ধ্রুব সত্যের মতো দেখতে যে-কোনও মানুষ রাস্তায়

আমাদের সংস্থার লোকজনকে দেখতে পেলে একটু ইতস্ততঃ করে

এগিয়ে এসে বলে যায়— “জানেন, আপনাকে না ধ্রুব সত্যের মতো দেখতে!”

 

এর উত্তরে “ভাল থাকবেন”-এর অধিক কী বলা যায়,

সে ব্যাপারে আমরা আজ অবধি কোনও সিদ্ধান্তে আসতে পারিনি।

 

৮. স্নেহ

 

বায়ু ঘেরা মদ্যপের দু’হাতে ধাতুর মাংস, শাঁখ।

শাঁখে ফুঁ গোঁজার পর শব্দ নয়, কিছু কিছু পাখি ওড়ে, পাখি...

মদ্যপের বায়ু কিংবা বায়ুর মদ্যপ যা-ই ভাবো,

ব্লেড হস্তে রমণীরা তার খুব কাছাকাছি যেইমাত্র এসেছে সোহাগে

নেশাঘোরে বেঁকে গিয়ে সে ভেবেছে ধাতুমাংস শাঁখ!

 

অতএব ধাঁতুমাংস তার ঠোঁট ঘোরাফেরা করে।

যেন তা নিরীহ বউ, সয়ে নিচ্ছে বাধ্যতামূলক

ঠোঁটের নেশাদ্র দ্রুতি : ব্লেডমুগ্ধ মেয়ে নয়; ঘরকন্না পাকেচক্রে জানে।

কিন্তু এতে পাখি কই! জল ঊর্ধ্বে উঠে যাচ্ছে। জল।

ব্লেড ধরা রমণীরা মদ্যপের চামড়া বরাবর

তাদের প্রতিভা টানে। ঊর্ধ্বে জল। নীচে ফিনকি। লাল।

 

ধাতুপ্রার্থনায় এত মেয়ে জুটবে মদ্যপ ভাবেনি।

 

এখন সে চিত্তশুদ্ধি আকাঙ্ক্ষায় একে একে একে

রমণীপুঞ্জের মধ্যে লাফ মেরে ঢোকে, আর দ্যাখে কত ঝুলে পড়া বুক

দুধের পার্থিব উৎস হওয়া থেকে বিরত রয়েছে।

শাঁখ, ধাতুমাংস, বুক— যা পায় সে তাতে মুখ দেয়।

দেওয়া মাত্র ব্লেডগুলো জ্বলে যায়, জ্বলে যায় প্রতিভা, ধারণা...

 

“আরে! এ তো কচি বাচ্চা!” বলতে বলতে নারীপুঞ্জ রাতে

বুকের সমিতি খুলে মদ্যপের মুখে চেপে ধরে।

 

ধাতুর পৃথিবী থেকে নেশার সামগ্রী খসে যায়।

 

৯. পরম্পরা

 

উপাসনাকক্ষের ভেতর ঠান্ডা হাওয়া আসে ইদানীং। আগে আসত না।

ঠান্ডা হাওয়ার ভেতর উপাসনাকক্ষ আসে ইদানীং। আগে আসত না।

 

প্রার্থনায় বসার পর আমিষচিন্তা বারবার আমায় পেড়ে ফ্যালে,

আর আমি তার পিছু পিছু যেতে যেতে হঠাৎ দেখতে পাই

জঙ্গলের ঠিক মাঝখানে গুরু কী নিস্পৃহ মুখে সেই সেই মহিলাগুলির

সঙ্গে রমণ করছেন, যাদের সঙ্গে বিবাহের প্রস্তুতি নিতে নিতে

আমি বুড়ো হয়ে যাচ্ছি বছরের পর বছর।

 

উপাসনাকক্ষের ভেতর আমি আসি ইদানীং। আগে আসতাম না।

আমার ভেতর উপাসনাকক্ষ এখনও আসেনি।

 

নিষ্ঠার অধিক যে নগ্নাবস্থা, তার প্রাথমিক লজ্জাটুকু কাটতেই

আমি পোশাক খুলতে শুরু করেছি বিগ্রহের সামনে। গুরুর বারণ ছিল।

শুনিনি। ওই মহিলাগুলি থেকে তো গুরুকে বহুবার দূরে থাকতে বলেছিলাম।

থাকেননি। অতএব আমার কর্তব্য আমি করি। বিগ্রহ ঘৃণায় একটু একটু করে

সবুজ হয়ে যেতে থাকে আমার মেদ দর্শন করতে করতে,

আমি তার পাথর দেখতে দেখতে একটু একটু করে যথাযথ উত্থান টের পাই।

 

উপাসনাকক্ষের ভেতর উত্থান টিকিয়ে রাখা জরুরি।

উত্থানের ভেতর উপাসনাকক্ষ লুকিয়ে রাখা জরুরি।

 

রমণ শেষ করে গুরু ঘরে ফিরেছেন। উনি জানেন আরম্ভ হয়েছে

সেই রাত, যা আমায় গুরুহত্যার পুণ্য এবং শান্ত, সুন্দর থাকার পাপ দেবে।

মহিলাগুলির খামতি নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনার মধ্যিখানে

গুরু আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু মৃদু হাসছেন।

উনি আমার রাগের উৎস জানেন, উপশমও জানেন নিশ্চয়।

নাহলে বিগ্রহ ধর্ষণের পর মনের ওপর যে প্রকট কালো জঙ্গল

অসম্ভব দ্রুততায় গজিয়ে উঠছে, তার ওপর তিনি পরম যত্নে

হাত বোলাতে বোলাতে শিউরে উঠছেনই বা কেন!

 

উপাসনাকক্ষের ভেতর গুরুর মৃতদেহ।

গুরুর মৃতদেহের ভেতর উপাসনাকক্ষ।

 

বিগ্রহের পেটের খাঁজে নিজেরই বীজের চলাচল

দেখতে দেখতে আবার আমিষচিন্তায় ডুবে যাচ্ছি...

 

গরম হাওয়া আসছে। আগে আসত না।

 

 

১০. স্যাটার্ন ডিভাওরিং ওয়ান অফ হিজ় সনস্, ফ্রান্সিসকো গ্যয়া

 

তুমি তোমার মা-কে খেতে এসেছিলে।

আমি আপাতত তোমায় খাচ্ছি।

যথাসময়ে তুমি আমায় খাবে।

 

বিক্ষিপ্তভাবে প্রভুত্ব প্রত্যাশা করেছ, এমনটা হওয়ারই ছিল, আমি জানি। কিন্তু, সোনা আমার, এখানে সমস্তটাই সুতোয় বাঁধা। না চাইতেই অনেক কিছু হয়, আবার চেয়ে চেয়ে গলার শিরা মুচড়ে গেলেও অনেক কিছু হয় না। তোমায় ধন্যবাদ, তুমি না এলে আমার এতদিনের খিদে নিয়ে আমি এ-ঘর ও-ঘর করে মরতাম, এ-দেশ ও-দেশ করে মরতাম, এ-নারী ও-নারী করে মরতাম, আর তারপর তোমারই মতো আরও অনেক বিক্ষিপ্তভাবে প্রভুত্বপ্রত্যাশী জন্মে যেত, আর আমি তোমার মায়ের মুখের দিকে তাকাতে পারতাম না। লজ্জায় নাকি ভয়ে তাকাতে পারতাম না, সে সন্দেহ আপাতত থাক। এখন এই যে কী নির্বিরোধী উপায়ে তুমি তোমার সরল, কৌতূহলী মাথাটা আমার দাঁতের ধাক্কায় মড়মড় করে ভেঙে যেতে দিলে, আর তোমার প্রভুত্বচিন্তায় লাল হয়ে থাকা ঘিলু কী নির্বিবাদে আমার গলা দিয়ে নেমে গেল, এর জন্য আমার প্রণাম জেনো। তুমি সরকারি চাকরি নিয়ে খুশি হতে চাইলে আমি তোমায় যত্ন করে বড় করতাম, তুমি অস্ত্রকারখানার মালিক হতে চাইলে আপত্তির তো কোনও প্রশ্নই ছিল না, নিদেনপক্ষে যদি ভাতাভোগী ঔপন্যাসিকও হতে চাইতে, তাহলেও তোমার জন্য মদ, মেয়েছেলে, মনখারাপ, পারিপার্শ্বিক অন্ধকার, রাষ্ট্রব্যবস্থায় অরাজকতা প্রভৃতি যা কিছু প্রয়োজনীয়, সমস্ত’র ব্যবস্থা আমি হাসিমুখে করে দিতাম। কিন্তু যা তুমি চেয়েছ, তার জন্য আমাকে শুরুতেই নিজের চামড়া বিসর্জন দিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াতে হবে। তোমার মা আমার সর্বোৎকৃষ্ট যৌনসখী। তাকে তোমার জিম্মায় তুলে দিয়ে আত্মঘাতী হতে হবে। এত যদি পারতাম, তবে তো ভগবান আর আমাতে কোনও তফাত থাকত না। কিন্তু তা প্রকৃতিবিরুদ্ধ। আর প্রকৃতির ঊর্ধ্বে যে আমরা কেউই নই, তা তো তুমি জন্মের মুহূর্ত থেকে জানো!

 

তুমি তোমার মা-কে খেতে এসেছিলে।

আপাতত আমি তোমায় খাচ্ছি।

যথাসময়ে তুমি আমায় খাবে।

 

এখন অপেক্ষা করো। এই যে তোমায় আস্তে আস্তে আমি হজম করে ফেলব, এরপর তো তুমিই আমার ভেতর থেকে শাসনভার সামলাবে। বাইরে থেকে এই কাজ হত না। জনরোষ সামলানোর যে সহজাত দক্ষতা, আকাশবাণী অনুসারে, তা নিয়ে তুমি আসোনি। অতএব মড়মড় করে গুঁড়িয়ে যাওয়া মাথা, মূর্ধার মেঝেয় আটকে যাওয়া চোখ, মখমলের মতো নরম উষ্ণ ঘাড় চিবিয়ে ফেলার পর আমি যদি তোমার কবন্ধ হাতে ধরে রাখতে রাখতে আতঙ্কে সাদা হয়ে যাই, তুমি যেন আমায় উৎসাহ দিতে ভুলে যেয়ো না। আসলে সমস্ত কিছুই একটা অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। আমিও। তুমিও। যাকে খাচ্ছি তাকে ভালোর জন্যই খাচ্ছি, যার খাদ্য হব তার ভালোর জন্যই খাদ্য হব।

 

তুমি তোমার মা-কে খেতে এসেছিলে।

আপাতত আমি তোমায় খাচ্ছি।

যথাসময়ে তুমি আমায় খাবে।

 

ব্যত্যয় হবে না।

 

 

১১. সমকাল

 

জরাগঙ্গা ততদূর বয়ে যায় যতদূর জল যেতে পারে।

জলের দূরত্বে আমরা অস্ত্র ধুতে আসি, কিন্তু ধুয়ে যাই মুখ।

শিরশ্ছেদে হেসে ওঠা জনপিণ্ডে উপস্থিত ছিলাম কখনও।

এখন নৃশংস শুধু রতিক্রিয়া ভাল লাগে। ফেরাতে পারি না।

 

অস্ত্র ফেরানোর দিন জরাগঙ্গা গিলে নেবে। বন্যার ভেতর

ভেসে যেতে যেতে আমরা রতিশ্রমে ডুবে যাব। এবং নিকষ

জননমুহূর্তে আমরা অবাক স্ত্রী’দের মধ্যে দু’হাত ঢুকিয়ে

নিজেকে নিজেই টেন বের করে ধুতে থাকব ডানা বা কোমর।

 

কার শিরশ্ছেদ আমরা ভিড় করে দেখে এসে অপরাধে ভুগি?

দ্বিতীয় সন্তান যেন সে-ই হয়, এই ইচ্ছা কেন জেগে ওঠে?

জরাগঙ্গাজলে তার ভেসে যাওয়া শব দেখে চোখের ভেতর

বিশাল কুড়ুল নিয়ে কেউ যেন মায়া কাটছে— মনে হতে থাকে।

 

জরাগঙ্গা নির্বিকার। বয়ে যায়, যতদূর স্নায়ু যেতে পার।

ডানা বা কোমরে তার প্রকট জলের দাঁত গাঢ় বসে যায়।

ফলত ক্ষয়ের চিহ্নে ক্রমাগত ভরে যায় প্রতিষ্ঠা, শরীর...

স্নায়ুর গমনপথে কেবল পালক ওড়ে, পালকও তো স্নায়ু।

 

কিছুই থাকে না, শুধু অবাক স্ত্রী’দের হাতে ঢলে পড়ে থাকে।

আবার স্রোতের শব্দে ফিরে আসা সবান্ধব, এ স্রোত শ্মশান।

অস্ত্র ভেবে ধুয়ে যাওয়া মুখ থেকে আয়ু নয়, চিন্তা ঝরে আজ—

জরাগঙ্গা থেকে কেউ কোনদিন জল, জরা আলাদা করেনি।

 

 

 

১২. স্থানীয় সংবাদ

 

দুর্ঘটনা ঘটনার ছায়া।

 

লক্ষ করো এই মৃত্যু—

তাকাতে তাকাতে চোখ অনন্ত, বিহার...

 

 

 

 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন