হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বারোটি গদ্যকবিতা
-----------------------------------------
১ আলমাঠে হারিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ আগে
জ্বলতে জ্বলতে হঠাৎ নিভে যাওয়ার ভেতর থেকে একটা সুর পুরোপুরি ভেসে গেছে জেনেও তার দুয়ারঘরে দাঁড়িয়ে থেকে একটা কিছু উদ্ধারের চেষ্টায় রাতদিন এক করে কুয়াশা মেঘের হালহকিকত নয় শুধুমাত্র হাতনাড়ার মাহেন্দ্রক্ষণটির অপেক্ষায় চির-অস্থির ধুলোগান।
--------------------------------------
২ আকাশ-ঘর
এক একদিন শিশির পায়ে পায়ে আল ধরে সে হেঁটে যায়। দিগন্তের দিকে এমনভাবে তাকায় যেন চিরদিনের মতো ঘুমিয়ে গেছে জল। কেউ মুখ তোলে না। জল বাড়ি এক হয়ে গেলে যতদূর দৃষ্টি যায় চোখের সামনে শুধু এক আকাশ-ঘর। দাঁড়াবার জায়গা যেন একটা টোকা, মাথায় নিয়ে আকাশ-ঘরের এককোণে।
---------------------------------------
৩ বাড়ি
জমাট সন্ধেয় বাড়িটাকে খুঁজে পাওয়া যায়। কিছু একটা নাম ছিল, পছন্দ হওয়ায় কে যেন নিয়ে চলে গেছে। অথবা এমন নাম গড়াতে গড়াতে কোন অলিগলির মধ্যে ঢুকে পড়েছে। কেউ আর ফিরে আসেনি। মাঝে মাঝেই গল্পে একটা ঝড়ের কথা উঠে আসে। এমন নয় ঝড়ের সঙ্গে বাড়িটার কোনো সংযোগ আছে। আসলে সবাই বাড়িটার সঙ্গে ইচ্ছায় অনিচ্ছায় জড়িয়ে যেতে চেয়েছিল। ঝড়ের সঙ্গে অবধারিত ভাবে এসে গিয়েছিল বাড়ির নাম — তাও তো নয়। কিন্তু তবুও বাড়ির গায়ের পথটা একটা দুর্লভ রঙের চেহারায়, নদীর ভাঙনে যার অনেকটাই হারিয়ে গেছে।
---------------------------------------
৪ পাখিগান
চারদিকে সন্ধে নামবে আর সবক’টি লাঙলের বাড়ি ফেরার মতো করেই তো জল হাত পায়ে উঠে দাঁড়াতে হবে। দেখার জন্যে তো আলো লাগে না। আলো আসলে জলে জলে সারা শরীর ভিজে যাওয়ার অন্যতম শর্ত। কেউ দেখে না। দেখতেই হবে এমন আলোকিত জ্যোৎস্নার উপন্যাস তো নয়। তবুও পাশে পাশে থাকে। বেশকিছু শব্দধ্বনি একসঙ্গে নাড়া দেওয়ার মতো করে ডানায় ডানায় উড়ে যায়। অথচ কেউ কোথাও যায় না, শুধু জানলায় কান পাতলে পাখিগান কানে আসে।
------------------------------------------
৫ অনেকক্ষণের সন্ধে
গাছের পা ছড়িয়ে বসায় অনেকক্ষণের সন্ধে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। গল্প চলে না এমন কিছু দিনের সমষ্টির ভেতর কোলাহলে পা চালিয়ে গেলে দেখা হওয়ার সম্ভাবনা মাটি হয়ে যায়। কি আর বলা যায়! শুধু কিছু মাথা নাড়া। মনে হয় সবকিছু লেখা ছিল। তবুও দাঁড়িয়ে থাকা সন্ধের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে গিয়ে একটুও ভাবি না। মাঠ ছাড়িয়ে চোখ চলে গেলেও মনে হয় কোনোদিন কিছু চোখে ভাসবে।
---------------------------------------
৬ সূর্যের গন্ধ
ধরো তুমি মেরেই ফেললে অথবা পার হয়ে গেলে অথবা চারপাশে ঘুরে ঘুরে সামনে পিছনে সবটুকু দেখে নিলে। আর কী চাই? বরং সে তোমাকে ডাকুক। হেঁটে যাক তোমার উঠোন ঘর দিয়ে। দু চারবার বাঁশি বাজালেই বা তোমার কি যায় আসে! স্থির জলের মতো শুয়ে থাকা এক একটা সকালে কোনো রঙ দিও না। একটু অপেক্ষা করো, সূর্য উঠলে তাকে জিজ্ঞাসা করো। রঙ তো লাগে না। অভাব থেকেই রঙ। পুড়ে যাক পিঠ, আমৃত্যু সূর্যের গন্ধ থাকবে।
---------------------------------------
৭ পা
আদ্যন্ত ফুলে ঢাকা শরীরের পা -টুকু ছেড়ে দেয় একেবারে পাহাড় পর্যন্ত। অথবা আরও অনেক অনেক উঁচু অথবা আরও অনেক অনেক পথ পেরিয়ে আসা একটি টানটান মেরুদণ্ড। দুর্ভিক্ষের গল্প বললে সেখানে আগুন জ্বলে। অথবা পা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে ক’জন। তার আগেই তো উড়ে যায়, হাওয়া হয়ে যায় সবকিছু। পা তো সেই অঞ্চল যেখানে হাঁ করতে হয় না, তার আগেই ভস্ম হয়ে যায়। তাই পা খোলাই থাকে। তখনও পর্যন্ত হড়হড় করে বেরিয়ে যেতে থাকে আগুন। যেন সমস্বরে বলে ওঠে —— পা তো ধরিনি। শুধু শেষবেলায় একটু স্থির থেকো, বলে দিও জল আর কতদূর, পা দিয়ে হলেও।
-----------------------------------
৮ হাওয়ার গান
ঝড়ের ঠিক গায়ের বাড়িটায় অনেক বেলায় দুটো বক আসত। আসা বলতে যা বোঝায়, জল খাওয়ার পর গেলাসটাকে উপুড় করে রেখে রোদ্দুরে গিয়ে দাঁড়ানো নয়।গান তো ঠিক সেভাবে গাওয়া নেই। তাই মনখারাপের একটা মেঘলা গান গাছের মাথায় আলোর রেশটুকু মেখে দুই বকের মাঝে বসে অপরিচিত গলায় গান ধরত। তাদের গান কে বইবে! আসলে গান তো মাঠ পার হয়ে সোজা উড়ে যাওয়ার কাহিনী। কিন্তু এখানে ওড়া কোথায়! মেঘলা গান গা ঢেলেছে বলে হাওয়াটাই বন্ধ হয়ে গেল। এবার তো জল খেলেও কোনো সাড়া নেই।
গানের রঙ হয় তো। মনখারাপ হলে তা কোথাও কোথাও একটু ক্ষতের সৃষ্টি করে। এমন ক্ষত তো হাওয়ার জানলা। সেই হাওয়ার জ্বর এলে একমুখী একটা গান বাজে। সেই হাওয়ায় পাতা উড়লেও বকের সামনে কোনো পথ রাখে না।
------------------------------------
৯ ছেলেটা
ছাঁচ গড়ানো জলের মতোই ছেলেটা আমাদের মাথার ভেতর এসে দাঁড়িয়েছিল। কোনো জোর নয়, রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে দু’পাশের গাছপালা যেভাবে পিছনে আরও পিছনে সরে যায়, সেইভাবেই সে বইয়ের পাতা উল্টে সবুজ দেখিয়েছিল — কোথাও চোখ লাগেনি, আমরা শুধু মনে মনে বলেছিলাম — একদিন বৃষ্টি পড়েছিল বলে দীর্ঘ বাক্য লেখার কোনো অর্থ নেই। আজ যখন গরমের দুপুরে মাথার ভিজে গামছা ক্রমশঃ শুকিয়ে আসছে তখন বুঝতে পারছি প্রতিটা দীর্ঘ বাক্য অঙ্কনের সময় প্যালেটে সবুজ কতটা জরুরী।
----------------------------------
১০ আলোচনার বাইরে
খুলে গেছে বলেই আলোচনার বাইরে। আমাদের ছোটো ছোটো পায়ের দাগ এক একটা নক্ষত্রের মতো। জানলা দিয়ে উঁকি দিলেই এক একটা সাদা পাতায় আঁকা হয়ে যাচ্ছে হেঁটে আসা যাবতীয় পথের নদীকেন্দ্রিক রেখাচিত্র। শুধুমাত্র জলের গন্ধ থাকার জন্যেই আমাদের গায়ে ভেসে বেড়াচ্ছে পৃথিবীর পরিত্যক্ত মাছ। আলোচনার বাইরের বিষয়ের অগণন শব্দের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে চলাচলের পথঘাট। অনেক বছর আগে শহরের দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে গ্রামের উঠোনে খুলে দেওয়া রেচন পদার্থের নলগুলো দিয়ে আজ বেরিয়ে আসছে হাওয়া আর সেই হাওয়ায় ছড়িয়ে পড়ছে আলোচনার বাইরে থাকা শব্দের পাহাড়।
------------------------------------
১১ সভ্যতার গোড়ার কথা
বৃষ্টির ফোঁটাগুলো মাটিতে এসে ধুলো মেখে গোল বলের মতো গড়াগড়ি খাচ্ছিল আর তাদের দেখে মনে হচ্ছিল যেকোনো দিন সাতসকালে তারা পাহাড়ের মতো যাবতীয় হাওয়ার বিরুদ্ধে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে পৃথিবীর যেকোনো উঠোনে এবং তাদের ধূসর রঙ দেখে কোনো বিরুদ্ধ আন্দোলন দানা বাঁধার আগেই তারা ধসিয়ে দিতে পারে যেকোনো কানাকানি কারণ তাদের সোজা দৃষ্টিপথের মধ্যে পড়ে যাওয়া বাক্যবন্ধেরা আজও নিজ ভাষাপ্রকাশে অক্ষম তাই পাহাড়ের মতো গোল বলগুলোর ভেতর জলের যে অবিরাম প্রবাহ তা আসলে যেকোনো সভ্যতার গোড়ার কথা
------------------------------------
১২ বাৎসরিক পায়চারি
পুকুরের পারের বটগাছটা অনেকদিন গল্প করল। মূলত হেঁটে যাওয়ার গল্প। বেশ কিছু কান হাত পা জমা পড়েছিল। আমি জানি না কারা এগুলো রেখে গিয়েছিল। গল্পের ঝোঁকে ভুলে যায় নি তো? জানি না। রাস্তা দিয়ে সোজা যতদূর যাওয়া যায় ----- এমন একটা দূরত্বের কল্পনার কিছু ছবিতে বটগাছের প্রভাব আছে বলে আজ কেউ কেউ মনে করে। আমি এসবের রঙ নিয়ে খুব উৎসাহিত, শুধু তাই নয় ঘনঘোর বর্ষায় মেঘের ভেতরে বটের ডালপালার যে প্রসারণ তার শরীরের উষ্ণতা আমার ছবিঘরের ক্যানভাসে মাঝে মাঝে খুঁজে পাই। কিন্তু তবুও বাৎসরিক পায়চারিতে সবুজের গন্তব্য থেকে কত দূরে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন