ডিসেম্বর ২০২৩ চন্দ্রাণী গোস্বামীর একগুচ্ছ কবিতা

 



চন্দ্রাণী গোস্বামীর কবিতাগুচ্ছ

 

১) শাপমোচন

আর মুখ ফিরিয়ে থেকো না, হে বিদ্যেধরি। প্রেমপত্তর বা যাহোক কিছু লিখতে গেলে আমার ভোমরাটি চাই। স্বপ্নেরও অসুখ হয়, মধু ঝরে ইদানিং, জানো কি তা! প্লিজ, চুড়িপড়া হাতের মতো তরল হও। মনে মনে ছুঁয়ে দেওয়া তোমার স্পর্শগুলো বিন্দু বিন্দু করে আমাকে রোজ নিঃস্ব করছে। উপসংহারে শরীর পোড়ানোর আগে দহনের নিয়মটা বলে যাও।এবার মাথা টলে যাচ্ছে। এতো নৈঃশব্দের ভেতর যার মৃদু ওষ্ঠ সঞ্চালনে স্তব্ধ আমার দুই ঠোঁট, এই ঘোর লাগা আরণ্যক রাত, উজাড় করা বসন্তবয়স,  অগ্নি নিমন্ত্রণে সাড়া কি দেবে না পতঙ্গকুল...!

২) দাম্পত্য ও পরকীয়া

গড়িয়ে পড়ছে।


বাঁশরির শরীর থেকে টুকরো টুকরো হয়ে ঠোঁট, বুকের বাতাস

আমি আঙুলে করে জড়ো করে করে নাজেহাল

এই তো কালকেই কথা ছিল

মাতামুহুরী দেখতে যাব----  আগেই বাঁশরির কাঁচা বাঁশে একি হয়রান!

 

অবশ নালি বেয়ে রক্ত ঝরে

টিনচার আয়োডিন, শরীর জুড়ে ছেলেখেলা করে

 

বেহায়া নার্সারির গাছে আজ আবার দুই শালিখ----

 

উফফফ! এসব রক্তপাত মুছে নিয়ে

এবার কি রাতে তোমায় নতুন করে চিঠি লিখব?

 

৩) বেশ্যা ও মহিলা

 

যে কোনো বেশ্যা পাড়ার রাস্তা, অহেতুক মাছি ভনভন...

কেউ বেলফুলের মালার সাথে বাসী মাংস ফেলে চলে যায়

 

এভাবে তুমি প্রতিটা ঋতুকালে নিজেকে বিশ্রাম দিতে দিতে

বত্রিশ বছর বয়সে নিজের শরীরের যত্নে নিখুঁত হয়ে উঠবে

 

ছোটবেলায় শেখা যে'কটা রবীন্দ্র সংগীত,

এমন চটুল গানের পাশে গাইতে গিয়ে লজ্জা বোধ করবে

 

ধুমসো মাসিটার দোর্দন্ড প্রতাপ এড়িয়ে

একদিন খুব সকালে,

ধরে নাও চারটে সতেরোর বনগাঁ লোকালে

একা একাই বাড়ি ফেরার জন্য চেপে বসবে

 

৪) বিরহিনী

 

চাঁদ দেখেনি কখনো মাথা তুলে

 

জনান্তিকে নিবিড় চোখের মৃদু ইশারায়

স্থবির স্থাপত্যেও লোভ জমে--- অজানাই ছিল।

একদিন সহসা আদুল করা পূর্ণিমার জোয়ারে

বিরহী যক্ষের আদল খুঁজে পায়

 

সেই থেকে তার পাহাড় দেখার সাধ...

 

তার বন্দি কারাগারে এসে আজকাল

শ্রাবণও দিকচিহ্ন ভুল করে, ভাস্কর্য আঁকে

নরম পলিস্থানে।

 

একাকী পেলে তাকে জেনে নেব

 

চাঁদ-রাত পার হয়ে কবে গিয়েছিল জ্যোৎস্নার উলঙ্গ বুকে?

উত্তুঙ্গু পাহাড়ে কবে খুলে পড়েছিল অবাধ্য এক খোঁপা?

 

৫) খুন

 

এখনও রয়েছে বিষ, সেই কবে চৈত্র সন্ত্রাসের দিনে

গঞ্জিকা সেবন করে মুখের উপর মুখ চেপে ধরেছিলে,

শব্দহীন একটা খুন হয়ে যেত, কিন্তু তা হয়নি দৃশ্যত ;

 

সন্তানরা জানতেও পারেনি। ইদানীং বাজারে দেখা হয়,

আড় চোখে দেখি ঠোঁটের নীচে কালসিটে, দুজনেই হাসি

পুরোনো প্রতিবেশীর মতো, চৈত্র সন্ন্যাসের নিঃস্বতা

মাড়িয়ে হলুদ বসন্তের যাবতীয় গরল কণ্ঠনালীর ভাঁজে ঘুম

পাড়িয়ে পেরিয়ে যাই বিগত অশ্রু। শুধু গলার কাছটাতে এখনো

নীল রয়ে গেছে, অভিমান হয়েছিল, বিচ্ছেদও---

 

তাকিয়ে থাকা আর মুখ ফেরানোর সময়টুকুর মাঝে ওটুকুই...

 

৬) কবুলনামা

 

(ক)

 

তুমি চলে গেলে বড়ো নিঃসঙ্গ

হয়ে যাব জেনেই, বাচ্চা মেয়ে হয়ে যেতে চাই----

এতোটাই বাচ্চা, যাকে অবরণহীন তুমি

কোলে নিয়ে ঘুরতে পারো, কিংবা এতটাই বাচ্চা যে,

নিঃসঙ্কোচে তোমার বুকের গায়ে লেপ্টে বলতে পারি,

আমাকে দত্তক নাও, হে পিতৃ প্রতিম প্রেমিক।

 

(খ)

 

তুমি চলে গেলে কবিতা লিখব না, ঠিক করেছি।

 

বোবা কালা গৃহস্থ বৌটার মতো চিনি, আতপ চাল

অন্তর্বাসের ইলাস্টিক লুজ হওয়া ফিতে।

শুধু অতীতের দুটো শরীরের দাগ, যা কখনো দেখাইনি-----

আমার ভুলভ্রান্তি, স্বেচ্ছাচার গ্রাস করে আমার বর্তমান রাজ্যপাট।

 

আমার মনে পড়ে, আমার প্রেমিক শহর পার করেছে

আমি হা-ক্লান্ত কবিতা লিখে লিখে।

 

 

৭) প্রতিসরণ

 

প্রতারিত রাতের এলো চুল

ক্রমে আরো কালো

কালো নিরুদ্দেশে মিশে গেলে

টের পাই শয্যায় তুমি গভীর নিদ্রা মগ্ন

 

সাংসারিক বাহান্নতাসের গূঢ় প্ররোচনা অচিরেই বাতাসের

কোমল স্পর্শে স্তিতধী হয়ে আসে, রমণ-ধ্বস্ত গোলাপ

সরিয়ে ভোরের কোমল রেখাবের দিকে বরাবর চেয়ে থাকি

 

প্রগলভ চাঁদের আলোয় ভেসে যেতে থাকে এ'যাবৎ

আমার আলজিভের গোড়ায় লেগে থাকা অগণন

প্রতিরোধহীন ক্রূর অভিসন্ধি

 

মগ্ন চৈতন্য জুড়ে নিঃশব্দে বেজে ওঠে শৈশবের লালিত সূর্যস্তোত্র...

         ওঁ জবাকুসুমসঙ্কাশং কাশ্যাপেয়ং মহাদ্যুতিম

 

মাটি ছুঁয়ে প্রহর ছুঁয়ে রাত্রি জাগরণ ছুঁয়ে ক্রমে এক

ঋজু আলোর রেখা অঙ্কুরিত হয় আমার ব্যথার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ে

 

আমি ধীরে ধীরে হাঁটু মুড়ে অভাবী কিশোরের মতো

নতজানু হয়ে পুনরায় ভিক্ষা করি নিজেকে।

 

৮) স্নেহ

 

রাতের শরীর বেয়ে অলৌকিক সেতার বেজে উঠলে

দুয়ার ঠেলে মন্দ্র পায়ে বেরিয়ে আসি

সপ্তর্ষিমন্ডলের সবচেয়ে বরিষ্ঠ নক্ষত্র আমায় পথ দেখায়

 

ধীরে ধীরে পৌঁছে যাই জলের কিনারে

 

মৃদু বাতাসের আলিঙ্গনে জলজ দাম আর

সবুজ শ্যাওলারা লাজুক হেসে মাথা নাড়ায়

পায়ে জড়ায় অজানা হলুদ ফুলের রেশম বুটি

 

যেন এক অচিনপুরের বিষণ্ন রাজকন্যা খোঁপার

সোনার কাঁটা খুলে রেখে নেমে গেছে পাতালদেশে

 

হঠাৎ'ই মনে পড়ে যায় মায়ের মুখ...

বাতাস থেকে জল থেকে তিল তিল করে

জড়ো করি তার খোয়া যাওয়া মখমলি আঁচল

 

তখনই এক অপার্থিব কুহকী মায়ায় ভেসে যায় আদিগন্ত চরাচর।

 

৯) দাগ

 

সমুদ্র অনেকদিন বহুদূর সরে গেছে

যত্ন করে দেখলে নুনের দাগ অল্প বিস্তর ঠাওর হয়

কাঁকড়ারা বালি খুঁড়ে ইতস্তত গর্ত করে।

 

এককালে আমাদেরও বুকে মধুর মতন ঘন

                                      প্রেম জমেছিল----

 

শাল অরণ্যের ভিতর দিয়ে ঘন পথ। এবেলা অবেলা

যাতায়াত। হরিণের শিঙের মতো সুখ সেসব পথ জুড়ে।

 

এখন লবণে চোখ ঠোঁট জারিয়ে গেছে

খোলস খসে পড়লে কাঁকড়ার চেয়েও তীব্র

লাল কিছু ঘৃণা দেখা যায়।

 

কারা যেন সাইরেনের শব্দে সমুদ্র জঙ্গলকে খুব সতর্ক করে যায়।

 

১০) ডাকনাম

 

কুঁচ ফুলের তিরতিরে লজ্জার চেয়েও মৃদু ভোর।

 

সারেঙ্গার জঙ্গলে পাতার গায়ে আলোর ফোটন কণা

ভালোবাসার শরীর নিষ্কাম ছুঁয়ে আছে।

 

আদিবাসী রমণী হাঁটুর কাছে কাপড় তুলে

সাঁকো পার হয়ে যাচ্ছে,

                   ওর মুখে গত রাতের বাসী হাড়িয়ার সারল্য।

 

ওর স্তনে এখনও লেগে আছে বাছার কচি ঠোঁট...

 

সন্ধ্যা ঘনানোর আগেই ওর বুকে ঘনিয়ে আসবে

দুধের ওম----

                             এসব অপার্থিব দৃশ্য অভিনীত হলে

যদি ভুলে যাই আমার গানের শেষ কনসার্ট

 

তুমি কি ভুলে যাবে আমার ডাকনাম?

 

১১) কান্না

 

বুকে, ক্রমাগত উপুড় হতে দিই।

    কালো অন্ধকারে একদম উলঙ্গ, এই অজ্ঞাতবাসে নেই নূন্যতম আড়াল

                        সুতোটুকুও যেন বিচ্ছেদ বলে মনে হয়।

 

জোনাকিরা চোখ বুজে ফ্যালে; এসব ব্যর্থতার দিনে

নির্ভুল ভাবে সে আমার ওপরে ওঠে নামে ;

                          কান্না,  তাকে তরল হতে দিই-----

                           

১২) নক্ষত্র

 

নিয়ে গেছ, ছাতিম ফুলের মতন।

 

এসব অসুখেরা বড়ো গতিময়

চাঁদের চেয়েও নীরবে সংক্রমণ ছড়ায়

তারপর আলো ডুবে গেলে পিছু ডাকে...

 

"ঝর্ণার'ও নদী আছে

আমার আছো তুমি, শুধু..."

 

আছো?

 

আমি জানি এইসব গান গন্ধ নিয়ে

আমার ম্রিয়মাণ পথ চলা

 

তোমার সাথে...

 

 

১৩) রাত কাহিনী

 

 

ইদানীংকালে ছাই সংযোগে নষ্ট হয়ে গেছে

যে সব রাত...

আমি তাদের শোরগোল করতে বারণ করি,

 

তারপর দুহাতের পাশে পড়ে থাকে যেসব

টুকিটাকি কাজ

সেগুলোই আপন মনে করি , করতে থাকি।

 

হঠাৎ আনমনে

কাজের ফাঁক চেয়ে চেয়ে দেখি রাতের কুমারী স্বভাব ;

 

দেখতেই থাকি---

কেমন রাতের বুকে, রাতের চাঁদের বৃন্তে, নাভিতে, বিভাজিকার মুখে,

এমনকি শিউলিরঙা উরুতেও ফ্যাকাসে শ্যাওলা জমেছে ;

 

অনাবৃষ্টির কিছু শীৎকার পাথর হয়ে কেমন আছড়ে পড়ছে

এক অশরীরী

মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে ।

 

তখনও, আমি টুকিটাকি দুহাতের বাকি কাজ সারি,

অস্থির রাতকে বলি--- রোসো।

 

আসলে, কতোটা অবহেলা গাঢ় হলে শোরগোল হয়

তুমি তো আমায় কখনো শেখাও নি!

 

নভেম্বর ২০২৩ সুদেষ্ণা দত্ত সাহার ৫টি কবিতা

 

সুদেষ্ণা দত্ত সাহার ৫টি কবিতা

 

 

১ মেঘবেলা 

 

নীল শূন্যতায় মেঘোৎসব। বৃষ্টির তার বেয়ে নামছে বিষাদ জোনাকি।

ঘর ভর্তি অবসাদ জুড়ে নিরালার সম্মেলক সঙ্গীত 

 

যে মেয়েটি একাকী নির্জন

তার মাথার বালিশে মেঘ

বুকে একা দাঁড়িয়ে ভিজছে মেঘবেলা 

 

তুমি শুধু দূরত্বের সমীকরণ কষছ। ছায়াপথে ঢেকে যাচ্ছে চোখের শরীর।

মনের ভাঁজ খুলে ঢুকছে গুমোট হাওয়া।

মাইল মাইল এপিটাফ লিখছে ভালোবাসার রাত

সময়ের অর্বাচীন ফলক থেকে মুছে ফেলেছ প্রিয় ডাকনাম

 

মেয়েটির একলা চিলেকোঠায় আজানুলম্বিতব্যথার রাত, চোখে দুরন্ত  মেঘবেলা।

 

২ জ্বলেনি আলো

 

"আমার জ্বলেনি আলো, অন্ধকারে..."

মাঝেমাঝেই এ সুর শুনি

অদূরে খড়খড়ি দেওয়া জানালার ওপারে বিধবা বউটি গায়।

অশান্ত ঝড়ের রাতে দস্যু হাওয়া নিভিয়ে দেয় আলো।

 

রেলিং দেওয়া ছাদে দাঁড়িয়ে অপূর্বদের বাড়ির সেই পাগল ছেলেটা গায়।

মেধাবী ছাত্র ছিল, ভালোবেসে আঘাত পেয়েছিল।

তারাদের বুকে অস্ফুট ব্যথা,

পূর্ণ বসন্তেও জ্যোৎস্নার কান্না শোনা যায়।

 

এসে দাঁড়াই বসন্তের বারান্দায় দূরের দেশ থেকে

এস্রাজের আওয়াজ ভেসে আসে, "আমার জ্বলেনি আলো, অন্ধকারে। "

 

৩ একটি বসন্তের বিকেল ও আগুনরঙের শার্ট 

 

ছায়ার সিম্ফনি পেরিয়ে যখন তুমি দাঁড়ালে 

জীবন এগিয়ে গেছে এসক্যালেটরের মতো।

 

তেইশের বি লেনের ছাতিম গাছটার পাশে

পলেস্তারা খসা বাড়িগুলোর গায়ে আধফোটা রোদ।

বিকেলের আলোয় তোমার মুখে, ঠোঁটের পাশের স্বেদবিন্দু

পালস্ রেট বাড়িয়ে দিচ্ছে তিনগুণ।

বসন্তের বেজরঙা হাওয়া এলোমেলো করছে তোমার চুল

সাদা শার্ট ও ডেনিম ব্লু জিন্সে বিকেলটা আরও তীব্র, রক্তস্রোত তীব্রতর।

 

হঠাৎ দেখলাম তোমার সাদা শার্ট আগুনরঙা হয়ে উঠছে 

আর আমি সেই আগুনে আত্মাহূতি দিচ্ছি।

 

৪ মেঘাশ্রিতা

 

এ শহরে মেঘ করে এলে গীতবিতানের কথা মনে পড়ে।

সেদিন চব্বিশে বৈশাখের সন্ধ্যায় হঠাৎ কালবৈশাখী, 

রিহার্সাল রুমে লোডশেডিং

মোমবাতির আলোয় মহড়া শেষ হল 'চিত্রাঙ্গদা'র।

 

সেদিন সন্ধ্যায় চারিদিকে অতর্কিতে শ্রাবণ, জুঁইফুলগন্ধ

চিরকুটে লেখা 'তোমার চোখের ঘনকৃষ্ণ মেঘ হব, মেঘাশ্রিতা!'

 

পরের পাতার কথা লেখা আছে হাওয়ায় হাওয়ায়

এ শহর জানে, 

মেঘাশ্রিতা আর গীতবিতান খোলে না।

 

৫ সুখ ও শরশয্যা

 

সেসব জ্বরের ঘোরে সার্কাসের তাঁবু মনে পড়ে

ঝড়, জল আর জমজমাট রাশিয়ান সার্কাস!

 

জীবনে গানের দিন শেষ হলে সমান্তরাল লাগে আলো

আর তামাম দর্শক।

মার্চের শেষ থেকে মহড়া শুরু হয়

শেষ হয় অন্য এক দূরবর্তী ফেব্রুয়ারির হলুদ সন্ধ্যায় 

 

রঙিন মুখোশে সেজে মঞ্চায়ন শেষ হলে

জীবন সুযোগ দেয় সুখ ও শরশয্যার।

 



নভেম্বর ২০২৩ সোমা ঘোষের ৫টি কবিতা

 


সোমা ঘোষের ৫টি কবিতা

 

স্বীকারোক্তি

 

 

(১)

ডাকনামে হাই তোলে হেঁশেল ঘেঁষা বেড়াল।

বাড়তে থাকে ঋণ,

আজ আমাদের পাড়ায় নাবালিকাদের

দৌড় প্রতিযোগিতা।

 

(২)

সনাক্তকরণ সূত্রে গজিয়ে ওঠে চারা-

এখন তারা বৃক্ষ।

মৃগয়া ভ্রমণে মুরারি মোহন স্বয়ং

পথের ধারে শূন্য হাতে মেধাবী বিকলাঙ্গ।

 

(৩)

বাষ্পমোচনের জন্য মায়া ফেলে যায়              

পুটুসের ঝোপ।

নিজের চোখের মধ্যে মিল খুঁজে পাই                

দাবানল তখন কি ভীষণ বিপজ্জনক

রজনীগন্ধা আর অঙ্ক পারদর্শী কলম।

 

(৪)

অথচ কি অনায়াসে রঙীন জাদুকর                  

রূপান্তর ভঙ্গিমায় শিস দিতে দিতে -

চাঁদের ছায়ায় বিলি কেটে পা পা –

ফিরে তাকায় না তারা কেউ ই

জিতে যাবে না জেনেও...

 

(৫)

মশার ধুপ জ্বেলে সতর্কতা ছড়িয়ে বসে আছো —

কিশোরের মন থেকে তবু কিছুতেই সরছে না অগ্নিসত্র,

দ্ধগ্ধ ক্লাশরুম,

কগাছা কাঁচের চুড়ি স্নেহ হাত,

 

জনমত জনপথ...

মানুষ খেকো রোদের ইতিহাস।

হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বারোটি গদ্যকবিতা

 


হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বারোটি গদ্যকবিতা 

-----------------------------------------

১ আলমাঠে হারিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ আগে 

 

জ্বলতে জ্বলতে হঠাৎ নিভে যাওয়ার ভেতর থেকে একটা সুর পুরোপুরি ভেসে গেছে জেনেও তার দুয়ারঘরে দাঁড়িয়ে থেকে একটা কিছু উদ্ধারের চেষ্টায় রাতদিন এক করে কুয়াশা মেঘের হালহকিকত নয় শুধুমাত্র হাতনাড়ার মাহেন্দ্রক্ষণটির অপেক্ষায় চির-অস্থির ধুলোগান।

 

--------------------------------------


২ আকাশ-ঘর

 

এক একদিন শিশির পায়ে পায়ে আল ধরে সে হেঁটে যায়। দিগন্তের দিকে এমনভাবে তাকায় যেন চিরদিনের মতো ঘুমিয়ে গেছে জল। কেউ মুখ তোলে না। জল বাড়ি এক হয়ে গেলে যতদূর দৃষ্টি যায় চোখের সামনে শুধু এক আকাশ-ঘর। দাঁড়াবার জায়গা যেন একটা টোকা, মাথায় নিয়ে আকাশ-ঘরের এককোণে।

 

 

---------------------------------------

 

৩ বাড়ি

 

জমাট সন্ধেয় বাড়িটাকে খুঁজে পাওয়া যায়। কিছু একটা নাম ছিল, পছন্দ হওয়ায় কে যেন নিয়ে চলে গেছে। অথবা এমন নাম গড়াতে গড়াতে কোন অলিগলির মধ্যে ঢুকে পড়েছে। কেউ আর ফিরে আসেনি। মাঝে মাঝেই গল্পে একটা ঝড়ের কথা উঠে আসে। এমন নয় ঝড়ের সঙ্গে বাড়িটার কোনো সংযোগ আছে। আসলে সবাই বাড়িটার সঙ্গে ইচ্ছায় অনিচ্ছায় জড়িয়ে যেতে চেয়েছিল। ঝড়ের সঙ্গে অবধারিত ভাবে এসে গিয়েছিল বাড়ির নামতাও তো নয়। কিন্তু তবুও বাড়ির গায়ের পথটা একটা দুর্লভ রঙের চেহারায়, নদীর ভাঙনে যার অনেকটাই হারিয়ে গেছে। 

 

---------------------------------------

 

৪ পাখিগান

 

চারদিকে সন্ধে নামবে আর সবকটি লাঙলের বাড়ি ফেরার মতো করেই তো জল হাত পায়ে উঠে দাঁড়াতে হবে। দেখার জন্যে তো আলো লাগে না। আলো আসলে জলে জলে সারা শরীর ভিজে যাওয়ার অন্যতম শর্ত। কেউ দেখে না। দেখতেই হবে এমন আলোকিত জ্যোৎস্নার উপন্যাস তো নয়। তবুও পাশে পাশে থাকে। বেশকিছু শব্দধ্বনি একসঙ্গে নাড়া দেওয়ার মতো করে ডানায় ডানায় উড়ে যায়। অথচ কেউ কোথাও যায় না, শুধু জানলায় কান পাতলে পাখিগান কানে আসে।

 

 

------------------------------------------

 

৫ অনেকক্ষণের সন্ধে 

 

গাছের পা ছড়িয়ে বসায় অনেকক্ষণের সন্ধে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। গল্প চলে না এমন কিছু দিনের সমষ্টির ভেতর কোলাহলে পা চালিয়ে গেলে দেখা হওয়ার সম্ভাবনা মাটি হয়ে যায়। কি আর বলা যায়! শুধু কিছু মাথা নাড়া। মনে হয় সবকিছু লেখা ছিল। তবুও দাঁড়িয়ে থাকা সন্ধের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে গিয়ে একটুও ভাবি না। মাঠ ছাড়িয়ে চোখ চলে গেলেও মনে হয় কোনোদিন কিছু চোখে ভাসবে। 

 

---------------------------------------

 

৬ সূর্যের গন্ধ 

 

ধরো তুমি মেরেই ফেললে অথবা পার হয়ে গেলে অথবা চারপাশে ঘুরে ঘুরে সামনে পিছনে সবটুকু দেখে নিলে। আর কী চাই? বরং সে তোমাকে ডাকুক। হেঁটে যাক তোমার উঠোন ঘর দিয়ে। দু চারবার বাঁশি বাজালেই বা তোমার কি যায় আসে! স্থির জলের মতো শুয়ে থাকা এক একটা সকালে কোনো রঙ দিও না। একটু অপেক্ষা করো, সূর্য উঠলে তাকে জিজ্ঞাসা করো। রঙ তো লাগে না। অভাব থেকেই রঙ। পুড়ে যাক পিঠ, আমৃত্যু সূর্যের গন্ধ থাকবে। 

 

 

---------------------------------------

 

 

৭ পা

 

আদ্যন্ত ফুলে ঢাকা শরীরের পা -টুকু ছেড়ে দেয় একেবারে পাহাড় পর্যন্ত। অথবা আরও অনেক অনেক উঁচু অথবা আরও অনেক অনেক পথ পেরিয়ে আসা একটি টানটান মেরুদণ্ড। দুর্ভিক্ষের গল্প বললে সেখানে আগুন জ্বলে। অথবা পা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে জন। তার আগেই তো উড়ে যায়, হাওয়া হয়ে যায় সবকিছু। পা তো সেই অঞ্চল যেখানে হাঁ করতে হয় না, তার আগেই ভস্ম হয়ে যায়। তাই পা খোলাই থাকে। তখনও পর্যন্ত হড়হড় করে বেরিয়ে যেতে থাকে আগুন। যেন সমস্বরে বলে ওঠে —— পা তো ধরিনি। শুধু শেষবেলায় একটু স্থির থেকো, বলে দিও জল আর কতদূর, পা দিয়ে হলেও। 

 

-----------------------------------

 

 

৮ হাওয়ার গান

 

ঝড়ের ঠিক গায়ের বাড়িটায় অনেক বেলায় দুটো বক আসত। আসা বলতে যা বোঝায়, জল খাওয়ার পর গেলাসটাকে উপুড় করে রেখে রোদ্দুরে গিয়ে দাঁড়ানো নয়।গান তো ঠিক সেভাবে গাওয়া নেই। তাই মনখারাপের একটা মেঘলা গান গাছের মাথায় আলোর রেশটুকু মেখে দুই বকের মাঝে বসে অপরিচিত গলায় গান ধরত। তাদের গান কে বইবে! আসলে গান তো মাঠ পার হয়ে সোজা উড়ে যাওয়ার কাহিনী। কিন্তু এখানে ওড়া কোথায়! মেঘলা গান গা ঢেলেছে বলে হাওয়াটাই বন্ধ হয়ে গেল। এবার তো জল খেলেও কোনো সাড়া নেই। 

গানের রঙ হয় তো। মনখারাপ হলে তা কোথাও কোথাও একটু ক্ষতের সৃষ্টি করে। এমন ক্ষত তো হাওয়ার জানলা। সেই হাওয়ার জ্বর এলে একমুখী একটা গান বাজে। সেই হাওয়ায় পাতা উড়লেও বকের সামনে কোনো পথ রাখে না। 

 

------------------------------------

 

 

৯ ছেলেটা 

 

 

ছাঁচ গড়ানো জলের মতোই ছেলেটা আমাদের মাথার ভেতর এসে দাঁড়িয়েছিল। কোনো জোর নয়, রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে দুপাশের গাছপালা যেভাবে পিছনে আরও পিছনে সরে যায়, সেইভাবেই সে বইয়ের পাতা উল্টে সবুজ দেখিয়েছিলকোথাও চোখ লাগেনি, আমরা শুধু মনে মনে বলেছিলামএকদিন বৃষ্টি পড়েছিল বলে দীর্ঘ বাক্য লেখার কোনো অর্থ নেই। আজ যখন গরমের দুপুরে মাথার ভিজে গামছা ক্রমশঃ শুকিয়ে আসছে তখন বুঝতে পারছি প্রতিটা দীর্ঘ বাক্য অঙ্কনের সময় প্যালেটে সবুজ কতটা জরুরী। 

 

 

----------------------------------

 

 

১০ আলোচনার বাইরে 

 

 

খুলে গেছে বলেই আলোচনার বাইরে। আমাদের ছোটো ছোটো পায়ের দাগ এক একটা নক্ষত্রের মতো। জানলা দিয়ে উঁকি দিলেই এক একটা সাদা পাতায় আঁকা হয়ে যাচ্ছে হেঁটে আসা যাবতীয় পথের নদীকেন্দ্রিক রেখাচিত্র। শুধুমাত্র জলের গন্ধ থাকার জন্যেই আমাদের গায়ে ভেসে বেড়াচ্ছে পৃথিবীর পরিত্যক্ত মাছ। আলোচনার বাইরের বিষয়ের অগণন শব্দের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে চলাচলের পথঘাট। অনেক বছর আগে শহরের দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে গ্রামের উঠোনে খুলে দেওয়া রেচন পদার্থের নলগুলো দিয়ে আজ বেরিয়ে আসছে হাওয়া আর সেই হাওয়ায় ছড়িয়ে পড়ছে আলোচনার বাইরে থাকা শব্দের পাহাড়। 

 

 

------------------------------------

 

১১ সভ্যতার গোড়ার কথা 

 

 

বৃষ্টির ফোঁটাগুলো মাটিতে এসে ধুলো মেখে গোল বলের মতো গড়াগড়ি খাচ্ছিল আর তাদের দেখে মনে হচ্ছিল যেকোনো দিন সাতসকালে তারা পাহাড়ের মতো যাবতীয় হাওয়ার বিরুদ্ধে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে পৃথিবীর যেকোনো উঠোনে এবং তাদের ধূসর রঙ দেখে কোনো বিরুদ্ধ আন্দোলন দানা বাঁধার আগেই তারা ধসিয়ে দিতে পারে যেকোনো কানাকানি কারণ তাদের সোজা দৃষ্টিপথের মধ্যে পড়ে যাওয়া বাক্যবন্ধেরা আজও নিজ ভাষাপ্রকাশে অক্ষম তাই পাহাড়ের মতো গোল বলগুলোর ভেতর জলের যে অবিরাম প্রবাহ তা আসলে যেকোনো সভ্যতার গোড়ার কথা 

 

------------------------------------

 

 

১২ বাৎসরিক পায়চারি

 

 

পুকুরের পারের বটগাছটা অনেকদিন গল্প করল। মূলত হেঁটে যাওয়ার গল্প। বেশ কিছু কান হাত পা জমা পড়েছিল। আমি জানি না কারা এগুলো রেখে গিয়েছিল। গল্পের ঝোঁকে ভুলে যায় নি তো? জানি না। রাস্তা দিয়ে সোজা যতদূর যাওয়া যায় ----- এমন একটা দূরত্বের কল্পনার কিছু ছবিতে বটগাছের প্রভাব আছে বলে আজ কেউ কেউ মনে করে। আমি এসবের রঙ নিয়ে খুব উৎসাহিত, শুধু তাই নয় ঘনঘোর বর্ষায় মেঘের ভেতরে বটের ডালপালার যে প্রসারণ তার শরীরের উষ্ণতা আমার ছবিঘরের ক্যানভাসে মাঝে মাঝে খুঁজে পাই। কিন্তু তবুও বাৎসরিক পায়চারিতে সবুজের গন্তব্য থেকে কত দূরে।