চিরকুট জানুয়ারি ২০২৩




এই সংখ্যার সঙ্গে উজ্জ্বলের এক বছর পূর্ণ হলো। আমরা আপ্লুত যে গত এক বছর ধরে আমরা উচ্চমানের কবিতা প্রকাশ করতে পেরেছি নিয়মিত এবং কবিদের সামান্য হলেও কিছু সাম্মানিক দিতে পেরেছি। এই বিষয়ে  আমি মেঘনা চট্টোপাধ্যায়ের অবদান বিশেষ ভাবে উল্লেখ করতে চাই। মেঘনার সাহায্য ছাড়া উজ্জ্বল এতদূর কিছুতেই আসতে পারতো না। 

জানুয়ারি ২০২৩ এ উজ্জ্বলের কবি দু’জন। কমলিকা দত্ত ও রাজেশ গঙ্গোপাধ্যায়। দু'জনেরই ৫টি করে কবিতা প্রকাশ পেল এই সংখ্যায়। পাঠকদের ভালো লাগবে বলে আমাদের ধারণা। 

জানুয়ারি ২০২৩ কমলিকা দত্ত ৫টি কবিতা

 





কমলিকা দত্ত  গুচ্ছকবিতা

 

 

 

খনন

 

শূন্যতার ভিতরে একটি ইচ্ছে পুঁতে এসেছি...

অজান্তে কেউ  জল দিয়ে যায় রোজ---

রোদ দেখলেই  ছায়ারা এগিয়ে আসে

কোথাও একটা গাছের জন্ম হচ্ছে

যা কিছু বাড়ছে আসলে মাটির তলায়

মৃত্যু না এলে, মাটি খুঁড়বার প্রসঙগগুলো ওঠে না 

 

মন খারাপের পাশ দিয়ে হেঁটে কবিতা খুঁজছে কেউ...

কবিতার পাশে কবিদের ঘরবাড়ি

চালের কাঁকর বাছতে বাছতে ভুলে যাওয়া ধানখেত ,

বোঝাতে পারে না  --কৃষকের চেয়ে বড় কবি আর নেই...

 

 

শতক পেরিয়ে

 

আমাদের আর

বইপত্তর, খাতা পেনসিল লাগে না

পায়ে পায়ে আর ভাঙতে হয় না সিঁড়ি

তালুতে তালুতে জাদু--

জাদুঘরে রাখা  ভীনদেশী কিছু আপেল

পাহারা দিচ্ছে পোষমানা দেশী কুকুর

মাথার ওপরে এপাইরাসের ছাদ

হাতে হাত ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে নিওলিথিক্যাল ঘর,

ঢালা হয়ে গেছে শেষ দোয়াতের কালি...

প্যাপিরাসে কেউ লিখে রেখে গেছে বিস্মিত কারাবাস!

দূরে আছে দাঁড়িয়ে,  গোলাপ হাতে-- দাঁত বের করা  ড্রপ আউট সভ্যতা

 

পাসওয়ার্ড

 

হাঁটতে হাঁটতে যারা পেয়েছিল আগুনের পাসওয়ার্ড, তারা  চলে গেছে ঘরবাড়ি খুলে রেখে তারপর থেকে  আগুনকে আর ভিক্ষা করতে হয়নি। খোঁজের যখন আগুন জন্ম হলো, তখন থেকেই অভাব, জোগাড়, বাড়ন্ত বলে কিছু নেই... লালার ভিতর  হ্যাক হয়ে গেছে খিদে ...

গোটা গোটা জিভ,উঁচু নীচু দাঁত, অথবা আস্ত চোয়াল

গা ঘষলেই... ,

আগুনের পেট পোয়াতি , মানুষের ঘরে এক এক করে  প্রতিটা খবরই সাধারণ।

 

আগুন বলছে, ওরা ভুলে গেছে গুপ্তমন্ত্র ছেটাতে...

মানুষেরা বলে, তো জানেনা কখন নিভতে হয়!

 

 

 "সেই লোকটির মত"

 

উচ্চতার প্রসঙগ উঠলে, সেই লোকটির কথা মনে পড়ে, যুদ্ধে গিয়ে যে উঁচু হয়ে হেঁটেছিল... অবশ্য  আর ফেরেনি। বেশি ঝুঁকে গেলে হাতগুলো সব পায়ের মতন লাগে। রোদ বৃষ্টিও ওঠা নামা করে ছাতা হারাবার জন্য।  যুদ্ধে তো  ছাতা লাগে না। মৃত্যু না এলে জামাও খোলে না কেউ। দাঁত--সাদা,কালো,নিরেট অথবা  ভাঙা - তফাত পড়ে না কিছু...  হাসতে হাসতে যুদ্ধ করাও যায় না... এই মুহূর্তে হামাগুড়ি দিলে সবাই  গড়িয়ে যাব।

যুদ্ধ বাঁধলে তখন না হয় উঁচু হব, নীচু হব।

উচ্চতা থেকে সরে, আসুন একটু সোজা হয়ে হাঁটি এখন...

 

"হাত তুলবেন প্লিজ "

 

জলের ওপর কে যেন বলছে মুক্ত খোঁজার গল্প!

জলের তলায় কান্না জমছে ডুবুরির...

অনেক কান্না, অনেক কান্না লাগে--

অনেক কান্না না হলে,

রাস্তা, শহর, জাহাজ, নাবিক সাঁতার কাটতে পারে না

 

শামুকজন্ম... এগোলে... পিছোতে জানে,

বাথটব আর সমুদ্র সবই এক স্যুটকেসে ঢুকে যায়

ডেবিট, ক্রেডিট, মর্টগেজ, লোন জলের ওপর ভাসছে..

ভাসতে ভাসতে  কে যেন বলছে মুক্ত খোঁজার গল্প!

হাত তুলবেন প্লিজ...

ডুবসাঁতারের সিলেবাস শেষ হলে,

আপনাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ব সাবমেরিনের খোঁজে...


জানুয়ারি ২০২৩ রাজেশ গঙ্গোপাধ্যায়ের ৫টি কবিতা

 





রাজেশ গঙ্গোপাধ্যায় কবিতাগুচ্ছ 


মাইগ্রেন

অন্য মহাদেশে থাকে মেয়ে...আয়ার সাথে প্রায়ই কথা হয়

কিছু প্রয়োজন হলে জানিয়ো। চিন্তা কোরোনা সব ব্যবস্থা করে রাখা আছে।

 বাবা শেষ বারের মত দেখতে চেয়েছেন একমাত্র সন্তানের মুখ।

 ভিডিওকল অগতির গতি।

 

ব্যালকনির কোণে দেখা যাচ্ছে আকাশ কালো হয়ে এল...

ছাতা ছাড়া বেরোস না পাপলান, অসময়ের বৃষ্টিতে মাথা না ভেজে, তোর মাইগ্রেন কেমন আছে?”

 সাঁকো মুছে যায়,

 মাইগ্রেন সহজে সারেনা...

 

অসুখ

 

যে অসুখ সারেনি সেভাবে, আজীবন আরোগ্যের স্বপ্ন অধরা থেকে গেছে

যে অসুখ আমাকে আমার থেকে দূরে নিয়ে যেতে যেতে ক্রমশঃ শূন্য একটা খাদ

যে অসুখ অন্তর্লীনের আয়ুধে আমাকে সশস্ত্র করেছে

যে অসুখে ডুবে যেতে যেতে আমি সলতের আঁশ থেকে শিখার অন্বয় চিনে নিই


সে অসুখ এক জীবনের মাপে ধরেছি মুঠোয়

ফয়েলের স্তুপে কোথায় হারিয়ে গেছে তুলতুলে আলো...খররোদ...

 কেউ আমার নিরাময় কামনা করেনি বলে -

 অসুখের সঙ্গে আমি মিতালি করেছি...

 

ঠাকুর

 

একটা মারকাটারি ধুন্ধুমার বাঁধিয়ে চলে গেল লোকটা

কিছুতেই ছাড়াতে পারছি না অযুত শাখাপ্রশাখার স্পর্শ

আধোবুলি থেকে খেলার নৌকো ভেসে গেছে...ভাসিয়েছে ঘাটও


কত শব্দে এক জন্ম উপছে ওঠে...বসুধা ব্যেপে দোলাচল জাগে মহীয়ান

সৃষ্টির জাদুঘোরে নিহিত জননী গর্বিত হয়ে ওঠে সন্তানের উন্মন খেলায়


যে আকাশ আলো রেখে যায়, সে আলোয় নিবিড় কদম্ববনে সুর খসে পড়ে

কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি আজি হতে শতবর্ষ পরে”...

 

অমরত্ব 

প্রাচীন গুম্ফার ভেতরে যে অন্ধকারে শ্রমনের সংযমও ভেসে যায় 

অনুচ্চারিত কথাদের ঢাল বেয়ে নেমে আসে কানীন আলোরা  

যেভাবে বোঝার কথা নয়, ধর, সেভাবেই বোঝাতে বসেছি এইসব

ধর, ভুল কিনারে ছপাট ছপ ধাক্কা দিয়ে গেছে চেনা ঢেউ

ধর, সে জটিল বার্তা রেখে যাওয়া আবর্তনের ভেতরে

অনিচ্ছুক দাঁড়িয়েছে এসে যত অবিকৃত ক্ষরণের ক্ষত ক্কাথ

 

ব্যর্থ প্রতিশ্রুতির রেলিংয়ে যে বিকেল খুঁজে দিয়েছিল অপূর্ণ ইশারা 

তার পুনশ্চতে রূপরসবর্ণগন্ধস্পর্শ ঘিরে অবতীর্ণ হয়েছে অমিয়... 

 

অর্জন


ওই জারুল পাতার কাছে ঠিকানা রেখে চলে যাচ্ছি

তুমি কি জানো পাতাদের বর্ণমালা থেকে উদ্ধার করতে হয়?

অলীক বিভাব থেকে চুঁইয়ে আসা আলোর শিরোস্ত্রাণ খুলে রেখে

যে সম্রাট নিঃসঙ্গ ঢেউয়ে ডুব দিতে ক্রমশঃ তলিয়ে চলেছেন

তার নিবে আর কোন শব্দ অবশিষ্ট নেই...এযাবৎ কৃতি ভুলে তিনি যেন

একজন নতুন মানুষ, জীবনের কাছে তার কোন ঋণ নেই

এই নিরাবয়বে, নিরাকারে বারবার আমি তোমাকেই খুঁজে পাই

 

উন্মত্ততা আমার অর্জন।