ডিসেম্বর ২০২৪ এর কবি সুতপা চক্রবর্তীর একগুচ্ছ কবিতা

 



সুতপা চক্রবর্তীর একগুচ্ছ কবিতা 

 

 

.

 

পুকুরে ঝাঁপ দিয়েছি

আমরা অনেকেই একসাথে পুকুরে

ঝাঁপ দিয়েছি

জলের ভেতরে ডুবে যেতে যেতে

দেখছি জলের নীচের মালঞ্চ

সেখানে অজস্র নীল অপরাজিতার

ঝোপ

আমি সেই ঝোপকে নতমস্তকে

প্রদক্ষিণ করলাম

এসো বিষ, এসো অপমান

আমার সর্বাঙ্গে তোমার 

মরণছোবল দিয়ে যাও

 

 

 .

 

পিতা,  

আপনি মালঞ্চ ছেড়েছেন বহুকাল

হল

আমি আপনার পুত্রী ফুলের গন্ধে

নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে আছি

উপত্যকায়

আমার চারপাশে ফুল্লকীট

কিলবিল করে।

আমার গা বেয়ে ওঠে প্রজাপতির

গতজন্ম

আমার নাকেমুখে ফুলচোরেরা

এসে ঠুসে দেয় গাদা গাদা নীল অপরাজিতা 

পিতা, পিতা আমার,

আমার সুদীর্ঘ শ্মশানযাত্রায়

আপনিও এসে সামিল হোন

আমার প্রাণহীন মুখের ভেতর থেকে 

বাসি ফুল সরিয়ে তারপর

আমায় তুলে দিন চুল্লিতে

 

 

খেয়াল রাখবেন, চিতার আগুনের রঙ 

যেন ঘন নীল হয়ে দপদপিয়ে জ্বলে ওঠে

 

.

 

ভয় করছে

নীল অপরাজিতাকে ভয় করছে

ধানজমির মাঝখানে পৌষ মাসের 

শীতে দুটো যুবক মেড়ামেড়ির ঘর 

খুলেছে।

ধানজমির পাশে গোলমরিচ গাছ,

আকন্দ গাছের জঙ্গল

দূরে নরসিংহের মন্দির থেকে ক্ষীণ

ঘন্টার ধ্বনি ভেসে আসছে

ভয় করছে

মনে হচ্ছে সমস্ত পৃথিবী 

নীলঅপরাজিতায় ঢেকে দিয়েছে কেউ

 

 

.

 

এই বৃষ্টির দিনে 

এই শ্রাবণ মাসের ভরা জলে

তোমাকে খুব মনে পড়ছে।

আমার সমস্ত ঘর যেন 

নীল অপরাজিতার গন্ধে ভরে ওঠে;

আমি মনে মনে এখন বিষ কামনা 

করি,

যারা এতোদিন আমার দিকে ঘন 

নীল বিষ এগিয়ে দিয়েছেন তাদের

বিষধর একটি ছোবলও যেন 

লক্ষ্যভ্রষ্ট না হয়

আসুন, আহ্বান করছি আমি 

আপনাদের অন্তরের সবটুকু বিষ 

দিয়ে দিয়ে আমায় আপনারা ঘন

নীল অপরাজিতা করে দিন।

 

.

 

চলো স্নানে যাই

বুকের ভিতরে হু হু করে হাওয়া বয়

জন্ম বয়

নীল নীল বিষফুল লেপ্টে থাকে 

বুকের ভিতর

আমি কার কাছে দুঃখের কথা

কই?

আমি কার কাছে গিয়ে দুদণ্ড

অশ্রুপাত করি?

আমার বুকের ভিতর নীরবে জল

বয়

আমার চারপাশে গাঢ় নীল ছাড়া

কেউ নেই

আমার ভিতরে বৃক্ষ পুঁতে 

বসে আছে কেউ

 

.

 

খুব বেশি মানুষসঙ্গ করার পর

স্নান সেরে নিতে হয়।

এই এখানে খুলে দিলাম আমার

সমস্ত পোষাক

পাহাড় থেকে নেমে এল অদৃশ্য

ঝরনা

ধুয়ে নিচ্ছি মানুষের গন্ধ 

ঘষে ঘষে তুলে দিচ্ছি চামড়া থেকে

বেরোনো মানুষের দেওয়া 

বিষাক্ত ছোবল

এই স্নান আমায় একা করে দিক

এই স্নান আমায় নিঃসঙ্গ করে দিক

 

হে প্রিয় বিষফুল, আমায় তুমি

রমণ করো!

 

 

.

 

 

বিষফুলে মাথা রেখে শুয়ে আছি

উনানে লাকড়ি ঢুকিয়ে 

চাপানো হয়েছে সাদা ভাত

অনেকগুলো ছোটবড় পিঁড়ি

বসে আছে রান্নাঘরে 

তাদের পাশে নুনের বোয়েম

তেজপাতার ডাল, বনঢুলার আঁটি

 

 

তুমি একে একে ধরে আনছ

জীবিত মাছেদের

 

 

.

 

 

বত্রিশ বছরের পরমায়ু 

তোমার কাছে বন্ধক রেখেছি।

তুমি আমার সমস্ত বিষ মন্ত্রবলে

শুষে নিয়েছ,

তুমি আমার সমস্ত নীল ঘষে ঘষে

তুলে দিতে চেয়েছ,

হে প্রেম, পুরুষ আমার

তোমাকে ছেড়ে যেতে তীব্র কষ্ট হচ্ছে 

আমার বুকে ফুটে ওঠা সবকটি

অপরাজিতা আমি তোমায় দিলাম,

তুমি আমার মুখাগ্নি করে সেগুলো 

নিজের শরীরে মেখে নিও

 

.

 

 

চাঁদ উঠেছে 

আকাশে রম্ভাফলের মতো

তৃতীয়ার চাঁদ উঠেছে।

হাত ধরো ফুল, চলো চাঁদে যাই।

দুন্দুবুড়ির বাড়ি যাই।

ফুল, ফুল, আমি তোমার 

কে হই?

ফুল, তোমার চোখে ঘোর লাগে?

 

দ্বন্দ্ব লাগে? দ্বন্দ্ব?

 

ফুল, ফুল, হাত ধরো

বাইরে এসো,

দেখো আকাশে আজ রম্ভাফলের

মতো চাঁদ উঠেছে

১০.

 

আমার আয়ু খেয়ে বসে আছ যারা

নিজেদের শরীরে এবার জল ছিটাও

আরো আরো বেশি আমার আয়ু খাও 

তোমরা যারা বিষফুল ফলাও

তোমরা যারা অপরাজিতার ঘন নীল 

সংগ্রহ করে রাখ কৌটোয়

তার সবটুকু বিষ, তার সবটুকু নীল আমার চিতায় ঢেলে দিও

আগুন যেন দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে

শরীরের শেষ অংশ ছাই না-হওয়া পর্যন্ত

বিষাক্ত ভীমরুল ছুড়ে দিও আমার দেহে,

আমার আর বাঁচার ইচ্ছে নেই

এই ব্রহ্মাণ্ড, এই পৃথিবী কেউই আমায় 

সুগন্ধি ঘুম এনে দিতে পারেনি।

আমি তাই মৃত্যুকে আহ্বান করি

আমি তাই বিষকে আহ্বান করি 

 

এসো ফুল, গাঢ় নীল অপরাজিতা ফুল 

আমায় তোমার মরণ-আলিঙ্গন দাও 

 

 

১১.

 

 

নীল অপরাজিতার ঘরে কখন রোদ আসে

কখন বৃষ্টি এসে সব কিছু ভিজিয়ে দেয় 

বুঝতে পারি না।

আর কিছুক্ষণ পরে নীল অপরাজিতায় 

ভরে যাবে শরীর

মালঞ্চে এসে সমবেত হয়েছেন যারা 

তাদের আমার আভূমিনমস্কার। 

আয়ত চক্ষুর যুবক, শ্মশানে যাওয়ার পথটুকু 

তুমি আমায় তোমার কাঁধ দিও।

মালঞ্চে আর কোনোদিন কোনো ফুল ফুটবে না,

মালঞ্চ এরপর থেকে ভরে উঠবে গাছগাছালি লতাপাতায়,

 

 

মুখাগ্নি করার পূর্বে শুধু 

এইটুকু অভিশাপ তোমাদের আমি দিয়ে গেলাম

 

১২.

 

 

 

নীল বিষে, নীল ফুলে ঢেকে আছে 

আমার যুবতী ছবি।

তোমরা যারা ফুলের পরিচর্যা কর

তোমরা যারা মালী

সারারাত ধরে আমার ছবির জন্য

অসংখ্য মালা গেঁথে চলেছ,

তোমাদের চারপাশে 

শাস্ত্রীয় রাগ গুনগুন করছে আমার আরাধ্য পুরুষ।

তাকে তোমরা নীল ফুল ছুঁইয়ো না

ফুলে বিষ আছে

ফুল তার পঞ্চমুখী ফণা তুলে গোপনে

ছোবল দিতে জানে

আমি সেই ফুলের ছোবল খেতে খেতে 

কত দিন কত রাত বাংলা কবিতা লিখেছি।

আমার খেলার খাতা, আমার হাতের আঙুল তাই 

এখন নীল বিষ মেখে বসে আছে

 

তোমরা যারা মালী,তোমরা যারা ফুলের পরিচর্যা কর 

নীল অপরাজিতার মালা গাঁথার পর ভালো করে হাত ধুয়ে নিও।

 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন