ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এর কবি সোমা দত্তের একগুচ্ছ কবিতা




ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এর কবি সোমা দত্তের একগুচ্ছ কবিতা

 

নিঃস্ব

ফেলে রাখা মোড়াটির মতো দুপুরের রোদে পড়ে আছো

তোমার অসুখ নাই

বিছানা নাই

সবুজ ফুল পাতা আঁকা শোবার চাদর নাই

তোমার ঘরের পশু বশ মানে না। কামড়ায়, নখ তোলে

স্বামী সন্তান মিছিলে হাঁটে। মন্দিরে পুজো দেয়, মানত করে

জীবনের কলরোল শোনা যায় লোকায়তে

তুমি পিছিয়ে পড়ো

প্রতিবার পিছনের বেঞ্চিতে বসে ভাবো সেইসব কমলালেবুর দুপুরের কথা

কাঁথা কম্বলে জড়ানো আদরের কথা

কী চেয়েছিলে?       পাতা ঝরে যায়

তুমি নিষ্পত্র বুক নিয়ে তাকিয়ে থাকো ছাদের কিনারে

সংসার শুকাও দড়িতে

তোমার শুকনো শাড়ি থেকে পাখিরা একে একে উড়ে যায়


বিরহবিধুর

তার কথা বোলো না আমাকে। তার সোনালী রঙের সকাল মসৃণ হোক। চুল থেকে উড়ে যাক কাঞ্চন, করবী। তার সমুদ্র ভ্রমণ থেকে উড়ে যাক শিকারি পাখি। লাবণ্য নেমে আসুক স্থিরচিত্রে। বৈভবে ছোঁয়াও আবির। দুর্যোগ ঘন হয়ে উঠলেও দরোজার পিছনে চুমু খেও। আড়াল সরিয়ে যোগ দিও নিরাপদ শান্তি মিছিলে। আমাকে বোলো না সেইসব চোরাকুঠুরির কথা যেখানে নিন্দিত সরোবর জেগে থাকে জলহীনতার পাশে। আমাকে বোলো না স্মৃতি বিজড়িত কোনো ফসলের মাঠ চেয়ে আছে সোনালী সংসারে।একদিন ফিরে যেতে হবে বারুদের সমাগমে। বিরহকঠিন সন্ত্রাসে ভেঙে যাবে মায়াঘুম। এইসব চিরপরিচিত স্রোতে দ্বিচারিতা সকলেই জানে, এমনকি তুমিও। তবু তার কথা বোলো না আমাকে। তার নামে গান হোক বর্ষার মাঝরাতে–

ভালোবাসা নয়

ভালোবাসার কথা বললে কবি কূপিত হন। বলেন ভালোবাসা খর্বকায় স্থূল এক শরীরের নাম। বলেন সে শরীর গাছের মতো বাকল মোচন করে, সাপের মতন খোলস বদলায়, সূর্যাস্তের মতো প্রতিদিন ডোবে আর জোয়ারের মতো সাময়িক বাড়ে স্ফীত হয়। কবি বলেন নতুন কিছু বলো। এমন কোনো পঙক্তি আনো যার বাড়, বৃদ্ধি গড়ন সবই পুঞ্জিভূত সঞ্চয়ের মতো স্থির, যা একের পর এক জমিয়ে গেলে সুদ বাড়বে রক্তচাপের মতো, মধু ঢালবে মৌমাছির মতো, নীল হবে কৃষ্ণের মতো আর গভীর হবে স্ত্রীলোকের নাভির মতো। তবু ভালোবাসার কথা বলবে না। ভালোবাসাকে কবি বিসর্জন দিয়েছেন নিত্য জীবনে। যার উল্লেখ না করলে ভাতে ডালে আর মাছে দিন দিব্য গড়িয়ে যায়।

ছন্দ

তোমার পোশাক ভালো লাগে। তুমি হেঁটে আসো মুক্তছন্দে। আমি গদ্যে ছুঁয়ে থাকি তোমায়। প্রতিদিন ভেঙে যাও। তোমাকে গড়ে তোলার আনন্দে আমি ঘরে ফিরি। ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিই মোমবাতি। মশাল জ্বালি। তোমার পায়ে পা লেগে যায়। আমি ধরে রাখি সেই ধুলো। ধুলোপায়ে জলের উপর চলি। তরলে বিশ্বাস রাখি। ডুবে যাই। তলিয়ে যাওয়ার পরেও পাতালের সিংহদুয়ার খুলে যায়। আমি চলি। চটি ছিড়ে যায়। ক্ষয়ে যেতে আনন্দ হয়। তুমি ঢলে পড়ো। আমি দেখি সূর্যাস্ত কেমন মিশেছে সন্ধ্যায়।

পন্থা

তারপর ওরা ফিরে গেছে ঘরে। যা কিছু রাখা ছিল দেবতার থানে কুড়িয়ে নিয়েছে। কতজনের চাওয়া পাওয়া সরিয়ে একটু জায়গা হলো। সেই পথে প্রসাদ এবং পুণ্য তুলে নিয়েছে প্রণামের দামে। ঈশ্বর পাথরের নন। তার হাত প্রশস্ত। হৃদয় গভীর। বিষ তুলে নেন গুনীনের মতো। ওরা জানত। মানুষের পরোয়া না করেই ওরা মাথা ঠুকেছিল মেঝেতে। ঈশ্বর জানতেন ওরা মানুষের দামে প্রতিশ্রুতি কেনে। তবু চরণামৃত দেন কল্যাণে। পাষন্ডের মতো নির্বাক থাকেন। না বলতে কেঁপে ওঠেন। আমি ওদের ফেরাতে পারব না। ঈশ্বরকে ভাসিয়ে দিতে পারব গাঙুরের জলে।

ফাঁকি

ফাঁকি। গোছগাছ ভালো হয় তাই ভাবো যত্নে রেখেছি থালা-বাটি। তোমার যা ভুল তার সবটা আমার-ই। মুখ নিচু করে বলি মিথ্যার যাবতীয় সংলাপ। কাদামাটি মেখে ঢাকি খড় আর বিচালির কাঠামোখানি। কঙ্কাল আছে জানি তবু হাড় গোড় দেখানো কি যায়! দরোজা বন্ধ করে ঢাকি অসময়। পর্দা টানি। তুমিও হয়তো জেনেছ এতদিনে, আড়াল কীভাবে হয়। কীভাবে ডিঙাতে  হয় ধারাবাহিক। চলমান জাহাজের ডেক থেকে দেখা যায় সবুজ দ্বীপের খোঁজ। কী জানি সবুজের আড়ালে তার কতটুকু বাদামি আর কতটা হলুদ। সবটাই ফাঁকি। তুমি জানো যতটুকু তার সবটাই জানি আমি। তবু লুকোচুরি চলে বিপন্ন অনুরাগে– খেলাধুলা ঘেঁটে ঘেঁটে এ জীবন সমুদ্র হোক–


মেয়েজন্ম

এত আলো জ্বলে তবু মেয়েজন্ম কালো       

শরীরে দ্যুতি নেই             আকাশ লজ্জিত হল                                                                     

সে আকাশ বুকে ডলে দেয় বাসনার গীতিকথা                                                                    

সে আকাশ কোমরে ঘুনসি বাঁধে, পায়ে দেয় ঝুমঝুমি                                                                               

শরীরে শরীরে ফুলঝুরি বাজে, তুমি গোনো ঢেউ, আমি সঙ্গীত শুনি                                                         

এ লজ্জা সে লজ্জা নয় যাকে তুমি লিখেছ কাগজে                                                                         

এ লজ্জা সে লজ্জা নয় যাকে তুমি ছেপেছ হরফে                                                                                 

এ লজ্জা শরীরের ফাঁকে ফাঁকে নদী হয়                                                                                      

এ লজ্জার কাছে মেয়েটির মাথা রোজ নত হয়                                                                      

এ লজ্জা নিজেকেই বারবার সুস্বাদু সুমিষ্ট ক'রে বেড়ে দেয় পাতে                                                       

আলুনি সবজি হলে দাঁতে ঠোঁট কাটে                                                                            

পড়শিকে বলে বেড়ি খুলে, বাঁধা খুলে বুকে আলো জ্বালো                                                            

এ লজ্জায় মেয়েজন্ম অবোধের মতো কালো–


সান্ত্বনা

অদেখাই ভালো। দেওয়া নেওয়া চোখ ছুঁয়ে কী ভাষায় কথা বলে কতটুকু জানো। বুকের বিজনে যত নিরিবিলি, কতটা মলিন হলে, থেকে  যায় তার ছায়া, কতটুকু বোঝো? যত ব্যথা জমে থাকে বর্ণে ও অক্ষরে শরীর শুকিয়ে গেলে সব ঝরে পড়ে। প্রেম নয়, পুজো নয় প্রতিবাদও নয়। তুমি যাকে তীক্ষ্ণ ধারালো বলো তার সবটুকু যেভাবে মাত্রা পেলো সে গড়ন চেনা নয়– তুমি জানো? আমিও কি বলেছি কখনো– তেমন হলেও ভালো– যদি শুধু ভাঙা ভাঙা বর্ণের মতো ধুলো আর পাথরের ঘষে যাওয়া জুড়ে নেয় শূন্য বালিকাবেলা– সহজেই বলা যায় মেনে নেব– নেবে কেন সে প্রশ্ন জেগে উঠে ঝড় তোলে যদি তবে অদেখাই ভালো।

আত্মধ্বংস

বেঁধে ফেলো। দুহাত উলঙ্গ হয়ে তোমাকে লজ্জা দেয়। পর্দা টানো। নিও না উলঙ্গ নাটকের প্রদাহ। তোমাকে নিরাপদ এক নদীতীর দিয়ে যাব। দিয়ে যাব বেতফল, হরিতকী, পূজার আয়োজন যত। খুশি থাকো নাগরিক জীবনের লঘুস্বরে, নির্মোক সজ্জায় নিয়মিত অঙ্গ বাঁধো। স্বামীর সোহাগে সাজাও ভরন্ত কুলো। দেখো না কাঁটাতারে বিঁধে গেছে যৌন অঙ্গ তার– শুনলেও মুছে দাও আর্ত শব্দ। সাবধানে ফেলে দাও ব্যাধি আর লোকাচার। ব্যথা খুন করো। যে মৃত্যুর জন্য রক্ত লাগে না হাতে তাকে বারবার মারো। ফেলে দাও বিপদ সঙ্কেত। সংসারে ফেরো। আনাজ শুকাও। আমিষ কাটো দাঁতে। টের পাও প্রাণীকুল চিবিয়ে চূর্ণ করে পুষ্টি পায় উচ্চতর শাখা। শুধু জন্ম দিও না মিছে অবকাশে– নষ্ট মেয়েছেলেদের মতো।

দহন

তোমাকে মনে করে ভীষণ যন্ত্রণা।

পুড়ে যায় বুক যেন এক প্রকাণ্ড মরুভূমি, জীবাণু-কঠিন চোখ

যেন এক পাখি, যার ডানা কাটা যায়।

কাঁটাতার পুঁতে রাখা যাত্রাসীমায়।

তোমাকে মনে ক'রে – তোমাকেই মনে ক’রে ব্যথা বাড়ে

ক্ষতস্থানে ঘুলিয়ে উঠতে থাকে পাঁক

তলিয়ে যেতে যেতে সান্দ্র জলীয় স্তরে দেখি সকলেই পোড়ে

 

যে পোড়ায় সেও-


শাসন

তিনি মেপে দেন জামার ঝুল। বড় হাতা। বুকের গভীর। পাতলা কী সরু। হালকা অথবা মোটা। হাঁটু ছেড়ে কিছুদূর, অথবা গোড়ালি ঢাকা। তিনি মেপে নেন বুক। দু চোখে অম্লশূল। তীক্ষ্ণ কামান। রোজ ধার দেন। সুচালো নিপুণ। চটুল শব্দ যত, ছুড়ে দেন–  লক্ষ্য নিখুঁত। চিবুকে ও গালে স্নেহ রেখে যান। তিনি শিরোমণি। মেধার অঙ্ক দিয়ে জিতে নেন– সামাজিক মুখ                                                                                                                                    

একদিন বান আসে-                                                                                                                একদিন ঝড় জল-                                                                                                         একদিন জড়ো হয় কচি কচি একরাশ বুক-                                                                                               

উড়ান জরুরি বলে– নিরাপদ পারে নিয়ে যায়, তাকে-তার– পশু ও মাহুত। তবু কিছু সময়ের ফাঁক, প্রতিশোধ নিয়ে এক হাত, নিপুণ-হস্তচালিত-তাঁত, চোখ দুটো খুবলে নেবেই। তারপর যা-কিছু-তাদের- যাক ভেসে যাক–  পোশাক আশাক– অমল আগুনে তারা জুড়িয়ে নেবেই দেহভার-    

অবহেলা

নির্লিপ্তি কী বিচিত্র তোমার। তোমাকে পিছনে ফেলে ছুটে চলে যায় পরের কম্বল কাঁথা। তুমি শীতে জেগে থাকো।  অস্বীকার করো কম্পন। আমিও এমন থাকি যেন বুঝিনি কখনো সহজ নিত্য ফাঁকি। বৃত্তের ভিতরে অন্য বৃত্ত যেমন  ক্রমশই সরে যায় পরিধির দিকে, ক্রমশ বিন্দু থেকে গোলাকার বৃত্ত হতে চেয়ে- ঠিক সেই মতো জ্যামিতির খাতা ভরি। দ্বিখণ্ডিত করি সরল বাস্তুরেখা। বহু পথ ঘুরে শেষমেষ অন্ধকারে হাতড়ে চলি দেওয়াল। কুঁজো থেকে গড়িয়ে নিই জল। রোদ পড়ে যায়। দিনের আবেশ যত ফিরে যায় ঘরে। রাত এলে ভাবি ফের সংকেত পাব- এই ভাবনাকে ছুঁয়ে থেকে এতদিন সাহসী বাক্য যত বলেছি তোমাকে তার সব   

                                               মিথ্যে    

                                                    মিথ্যে   

                                                         মিথ্যে                                                                            

অবহেলা ছুঁয়ে থাকি তবু কেন যেন থাকি। থেকে যাই ভাঙচুর হতে। রোজ ভেঙে যাই। আঘাত বাঁচিয়ে তুমি চলে যাও কাজে। আমি কি বুঝি না প্রিয় হারিয়েছি সব-…                                                                                                                 

 

 

 

 

 

 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন