ঋতুগন্ধ ও মৃত্যুঞ্জয় চাঁদ /
১)
যন্ত্রণার এক হাত নীচে শুয়ে আছ তুমি। উপরে তারাভরা আকাশ সঙ্গে অর্ধেক চাঁদ আর অর্ধেক কলঙ্ক। অপলক তাকিয়ে তুমি খুঁজছ খসে যাওয়া তারাদের গল্প। খানিক বাদেই ভোর হবে। মাটি চাপা দিয়ে দেওয়া হবে তোমার সমস্ত ব্যথা। তার উপর কেউ পুঁতে দেবে গাছ। বৃক্ষরোপন উৎসব চলবে দিনভর। তুমি নীচে শুয়ে টের পাবে সব। অপেক্ষা করবে কখন একটা শিকড় এসে ছোঁবে তোমায়। আর, তোমার সমস্ত আয়ু টেনে নিয়ে সে উঠে দাঁড়াবে আবার তোমারই সমস্ত কল্পলতা নিয়ে।
২)
কারা যেন নিঃশব্দে ঘোরে আমার চারপাশে। আমি হাত বাড়িয়ে ছুঁতে চাই। কিন্তু শুধুই বাতাসের শব্দ কানে আসে। পর্দা ওড়ে। ঘর ঠান্ডা হয়ে যায়। বৃষ্টির ছাঁট ভেসে আসে পালকের কোমলতায়। রাত বাড়ে। গাছ ও বৃষ্টি, অন্ধকারে জড়িয়ে ধরে একে অপরকে। আমার কান উৎকর্ণ হয় তখন। আমি একটা জাহাজের ভোঁ খুজি অনেক রাত্রে, সেই ১৯৮৬ সালের মতো কিংবা বিমর্ষ এক ফেলে আসা অন্ধকার দুপুরের মতো। গম্ভীর ও বিষণ্ণ, যেন শেষ যাত্রা। যেমন ভাবে একটা বন্দর ছেড়ে ধীরে ভেসে যায় জীবন, দূরত্ব বাড়ায়।
৩)
আষাঢ়ের প্রথম দিন, দূর থেকে দেখি তোমার ভিজে শাড়ি। দেখি নরম মাটিতে তোমার ফর্সা পায়ের আলসে ছাপ। লিরিল সাবানের সাথে তোমার বন্ধুত্ব মনে পড়ে। মনে পড়ে কচুপাতায় বিন্দু বিন্দু জলে তোমার অপরূপ লজ্জা। আমি গড়িয়ে পড়া দেখি। খোলা ছাদে তুমি, কবে থেকে,সবুজ হয়ে জমে আছো টগর গাছের গোড়ায়, অথচ টের পাই না আমি। ধূসর চিলেকোঠার দেওয়ালে শ্যাওলা রঙের কিছু নোনা স্বাদ ছেড়ে যেও তুমি। ছুঁয়ে দিও অজানা ভারতবর্ষকে, আর অবশ্যই, রবিঠাকুরের না বলা গোপন কথাকে।
৪)
হে চাঁদ, লম্বা প্রতিফলনের দুনিয়ায় তোমাকে স্বাগত। এই আলো মায়াসুন্দর। টলটলে। দুলিয়ে দেয় জল ও জীবন। পাশ দিয়ে ভেসে যায় উদাস রণতরী। অসম্ভব ঢেউয়ে ফুলে ওঠে গভীর রাত। আশ্চর্য রমণে ভরে ওঠে মাছেদের দেহ। এইতো অপার্থিব ডানা। মনের গভীরে খুঁচিয়ে দেওয়া প্রবল ক্ষত। এই পথেই দীর্ঘশ্বাস ভেসে ওঠে। যাত্রাকালীন সমস্ত বন্দরে তুমি নেচে ওঠো প্রেমময় দৃষ্টি নিয়ে
৫)
উজান রহস্য ভেদ করো, হে ঘড়ি, হে একাদশ শত্রু। মৃত্যুঞ্জয়ী হতে চাই না আমি। শুধু ফেরত চাই লাগাম আর অন্ধকার করে দিতে চাই ঘৌড় দৌড়ের মাঠ। এই যে হ্যাঁ তে হ্যাঁ মিলানো, নকল পতাকা উত্তোলন এ'সব, পাপসঞ্চারণ। হারকিউলেসের কাঁধ নিয়ে, ফাঁপা গোলক ও সৌরজগতের দোষ নিয়ে বহুদিন, দিনকে রাত আর রাতকে দিন বলেছি আমি। এবার ইঞ্জিনের মুখ ঘুরে যাক সহজের দিকে। আলসে নির্জনতায়, ঝাউবনের ভিতর আওয়াজ করুক, নীরব হাওয়া। শীতলপাটি ও তালপাখার জীবন শান্ত উঠোন জুড়ে ম-ম করে না কতদিন! এবার ঘুম নিশ্চিন্ত হোক আড়াআড়ি জীবনে। বিচ্ছেদকামী কোলবালিশের দুইপাশে দুটি দেশ, নদীমাতৃক স্মৃতি নিয়ে, এসো, মিলে যাও জল হয়ে।
৬)
বিবিধ রং ঝরে পড়ে। বেজে ওঠে আনন্দ- বেদন। জলতরঙ্গের উপর ঝুঁকে পড়া রামধনু সেতুর মতো জুড়ে দেয় রোদ ও মেঘের মায়াবিদ্যা। শিহরিত আকাশ হাত বুলায় তোমার মাথায়। বিলি কেটে দেয় চুলের মধ্যে জমতে থাকা, বিন্দু বিন্দু বিষণ্ণতার গায়ে। অপার্থিব সেই চঞ্চল আরাম। ক্ষণিকের সেই উজ্জ্বলতাই আসলে প্রাণ। সেটুকুই গিলে খাও তুমি ভাঙা এক গড়ের পাশে বসে।
-----

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন