হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়

 


কক্ষচ্যুত আসন ঐশ্বর্যের দিনলিপি 
------------------------------------



এক


বেশি আগুনের জন্যে গ্যাস বাড়ায়। মুখে ঠিক কতটুকু জোর লাগবে তা সে জানে না। জানলা দিয়েও গরম আসে। জানলায় আকাশ দেখতে দেখতে ভাবে গলে যাবে না তো? জল উঠে আসে। ভাত উঠে আসে। তবুও মুখে নেই ফ্যানের স্বাদ। শুধু আগুনের মুখ দেখে ভাবে এভাবেই উঠে আসতে হবে আমৃত্যু। 


দুই 


ভাত হয়ে গেছে কখন। এখন ভাত এসে পড়ছে সিলভারের থালায়। রান্নাঘর জুড়ে খিদের গান। সুরের গা থেকে মাঝে মাঝেই হড়কে যাচ্ছে কিছু কিছু শব্দ। কক্ষপথ চেনে না তা তো নয়। তবুও পা ফেলার ভুলে টাল খেতে খেতে গায়ে গায়ে জড়িয়ে যায় খিদের আঠা। 


তিন 


শুধুমাত্র দেওয়ালের রঙ, আর কিছুই নয়। আসলে আর সেভাবে চোখে পড়ার মতো কিছু ছিল না। আমি কি আদৌ চোখ দিয়েছিলাম! চোখে পড়ে গিয়েছিল, এতটাই গভীর থেকে সাজানো ছিল। দেওয়ালের পাশে ছিল না কেউ। গায়েও সেভাবে কাউকে দেখিনি। শুধু মনে হয়েছিল একটা দেওয়ালই জাতির পরিচয়ের জন্য যথেষ্ট। 


চার


খোলা আকাশের নীচে আগেও অনেক ঝড় সহ্য করেছি। সবাই বলে কত কতবার উড়ে গেছে চাল। কিন্তু সেসব তো বইয়ের পাতায়। তার সঙ্গে পাত্রপাত্রীর কোনো যোগ নেই। আমি শুধু জানি গভীর রাতে খোলা জানলায় যে হাওয়া এসে যোগ হয়েছিল আর তাতে এমন কিছু জিনিস উড়ে গিয়েছিল যার মূল ঘর সংসারে থাকলে গাছেদের শ্বাসকষ্ট হয়।


পাঁচ 


মেঘলা হলেই উড়ে যেতে ইচ্ছা করে। মনে হয় হঠাৎ করেই অচেনা কোনো স্টেশনে নেমে গিয়ে জমির আল ধরে অনেকটা হেঁটে যাই। আমার ঠিক পিছনেই সাইকেলের বেল বেজে ওঠে। আমি তাকে জায়গা দিয়ে বলি, কোনো গর্তে ঢুকে না পড়ে একদিন আরও কিছুটা গেলেই হয়। এক রাস্তায় তখন বৃষ্টি এলেও আসতে পারে। ভিজলে কি না ভিজলে সেটা বড় কথা নয় কিন্তু গভীর রাতে উড়ে যাওয়ার অঙ্ক মিলে গেলেও যেতে পারে। 


ছয়


তার সঙ্গে আমার খুব মিল ছিল। অথচ সে তো মেয়ে। মিল মানে শুধু মুখের ----- এই জায়গা থেকে আমাদের আজও উত্থান হল না। তাই আমরা মুখ দেখি আর সেই পথের দিকে তাকিয়ে থাকি যেখান থেকে সকালের প্রতিবেশী বলে কেউ একজন উঠে এসেছিল যার সঙ্গে আমাদের আজও একটা গল্প হল না।


সাত


আমার থাকবার জায়গার কোনো ছবিই আমার দেওয়ালে নেই। আমারও কোনো ছবি নেই। আমি কোনো চিঠি লিখি না। আমার কোনো বক্তব্যও নেই। আমি কোথাও জড়িয়ে নেই তাই ছাড়ার ভয়ও আমার নেই। যাই কিছু দেখাতে যাই আমার হাসি পায়। ছড়ানোর পর মনে হয় এক লক্ষ জনের পর এই অতি সাধারণ আমি নিজের মুখ তুলে ধরার  লজ্জায় কুঁকড়ে যাচ্ছি ভেতরে ভেতরে।


আট


তুমিও জানতে না, জানতাম না আমিও। একবেলাতেই ফোন নম্বর টোকাটুকি হয়েছিল। তারপর হাঁটি হাঁটি পা পা না প্রথম ঘন্টায় প্রথম শ্রেণীর দৌড় ----- ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি, যার ফলে প্রথম প্রথম বেশ কয়েকটা রাত আমরা একেবারেই না ঘুমিয়ে এমনভাবে চোখ নিয়ে উল্টে গেলাম যে আসল ধুলোগানের সময়েই চোখ বুজে থাকলাম।


নয়


পা পর্যন্ত কাপড়ে ঢেকে বসে আছো। অথচ ক্যানভাসে তোমার যে ছবি ধরা আছে সেখানে চারদিকের হাওয়া চারকোলের মতো তোমার শরীরে বুলিয়ে যায় খসখসে হাত। আসলে ডালপালার মতো অগ্রগামী কিছু রক্ত মাংস হাড় থাকলে পুরোপুরি বারো হাত লাগে না। 


দশ


সেসব কথায় পরে আসছি। আগে বলি চৌকাঠের বাঁধন আলগা হলো কেন? আমি তো বসেই ছিলাম।  কে যেন বলল, পার হলেই ঘোরাবে টিকি ধরে। ভালোই তো, শূন্যে দোল খেতে বেশ লাগবে। আমি ভাবছিলাম তোমার বাড়ির কথা। যাত্রাপথে হাঁটুধুলোর গান শোনা যাবে তো? হাঁটতে হাঁটতে কোথায় হারিয়ে গেছে? প্রশ্ন যখন দেখেছি, চৌকাঠের বাইরে সবটুকু জুড়েই তোমার সুরের অনুরণন।


এগারো 


তুমি বিশ্বাস হারিয়ে ফেললে আমার ভয় করে। এখনও অনেকটা পথ বাকি। আবার একটা অংশ তোমারই সামনে দিয়ে। চোখ নেই। হাওয়াও নেই তাই ঘোরার প্রশ্নই ওঠে না। অথচ একটা পরিপূর্ণ সমীকরণ। আমার সামনে দিয়ে মুখ ঢেকে কোথায় যেন চলে গেল। খুব দূরে কোথাও নয় কিন্তু কোথায় জানাও যাবে না আর ফিরেও  আসবে না। খাতা পেন নিয়ে অতক্ষণ বসে থাকব কিভাবে! 


বারো


ধরো কোনো মূল্যবান পাতায় ছাপা হয়েছি আমি। কত কত হাত উড়ে আসছে আমার দিকে। প্রশংসার বন্যা। দিনের শেষে ফিরে এসে দেখি অন্ধকার মাঠে শুয়ে আছে একা বেদে। ঘুম নেই, বড় বড় চোখ করে আমার দিকে তাকিয়ে।ভাত ফোটার শব্দেও তার ঘুম ভাঙে না। ডাকতে ডাকতেই রাত কাবার। সকালের জানলায় এসে দেখি বেদে পালিয়ে গেছে। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন