রবীন বসুর গুচ্ছকবিতা
১
হিরন্ময় জল
#########
কাহ্নপা নদীর জলে পা রাখি
হরিণার মাংস বেচি হাটে হাটে
প্রাচীন বল্কল থেকে দুঃখমঙ্গল
জেগে ওঠে ফুল্লরা বন্যসুন্দরী,
স্বামী কালকেতু কিরাত মানব
পশু নেই, জঙ্গল হাসিল করে
খেটে খায়, গতরের ঘাম ঝরে
রুখাশুখা মাটি সবুজ সতেজ
হবে, বর্ষাজলে বীজের পত্তন।
আগ্রহ অসীম হলে জন্মগান
বেজে ওঠে মাঠেমাঠে, আলপথে।
তবু আজ গ্রামদেশ কেঁপে ওঠে
কেঁদে ওঠে ধর্ষিতা ফুল্লরার দল!
বাংলা কবিতা কাঁদে, হিরন্ময় জল
সর্বাঙ্গে আগুন নিয়ে তীব্র অবিচল।
••
২
সমাধি অলীক
হৃৎপিণ্ড হাতে নিয়ে কাপালিক হাঁটে
নাভিগন্ধ উঠে আসে অরণ্য গভীর
মৌতাতে মৌতাতে রাত গাঢ় হয় খুব
ঘন সন্নিবিষ্ট এই সম্ভোগরাত্রি জাগে
বোষ্টমি অধরে আঁকে পিপাসার গান
আবুক তৃষ্ণায় ছোটে সাধনা সম্মুখ
তন্ত্রসহচরী, মন্ত্র-সিদ্ধ আমাদের
এই উপচারভূমি, নিষিদ্ধ প্রহর
পূর্বাপর গুপ্তঘাত সজ্জিত সংকেত
সব আজ মোক্ষলাভ, পূর্ণতার ফল
নাকি, অতৃপ্তি আঘাত, অনন্ত দুঃখ
সীমাহারা বঞ্চনার তাপিত অশেষ!
জানা নেই শেষ চিহ্ন, সমাধি অলীক
কাপালিক হাতে ধরে প্রত্যাশা অধিক।
••
৩
কবির মৃতদেহ
শীত এসে কাকে যেন নষ্ট করে দিল
জীর্ণপাতা, মরাঘাস, ইঁদুরের সপ্রতিভ চলা
ধ্বস্ত আলোর দিকে হেঁটে যাচ্ছেন তিনি
পাঁজরের ক্ষত লেপ্টে আছে
পরিত্যক্ত খড়ে; হয়তো বিবর্ণ হলুদ রঙ
ওই যে দূরে শুয়ে আছে মরাশালিক
তিনি ছুঁয়ে দিলেন, তুলে নিলেন হাতে
হয়তো নিজেরই মৃতদেহ।
সংক্রমণ ভারাক্রান্ত এই যে অসুখ সময়
কবির মৃতদেহ বহন করছে অবলীলায়।
••
৪
আসন্ন সন্ধ্যার দিন
এই যে থতমত হাওয়া
দারুণ উষ্ণতা নিয়ে দাঁড়িয়েছে খাড়া
মানুষের দীর্ঘশ্বাস তার সাথে মেশে…
অসহায় দিনযাপন অভাবের কাঁথা গায়ে
গুটিশুটি মেরে থাকে ফুটপাত কোণে;
ছিন্নমূল এইসব উৎপাটিত দুঃখ
করুণ মুখাবয়ব, সকালকে বিদীর্ণ করে
সিক্সলেন হাইওয়ের পাশে পড়ে থাকে;
মিথ্যাচার ঘিরে রাখে আমাদের উন্নয়ন
আগ্রাসী অর্থনীতি কর্পোরেট মুনাফা খোঁজে।
তবু দেখি শ্লথ পায়ে হেঁটেছে বিকেল
প্রান্তরের নামগান, চটকলের বাঁশি
নিভেছে সবই; আসন্ন সন্ধ্যার দিন
আরও অন্ধকার গায়ে মেখে লজ্জা ঢেকেছে।
••
৫
জীবন দাঁড়িয়েছে ঠায়
জীবন টলছে দেখ
দেখ ওই প্রত্নবাহিত অবশেষ
শিরার সুড়ঙ্গ ধরে টলমল টলমল...
পুরনো মদের মত বিষাক্ত জীবন
মানুষের সব প্রত্যাশা
উন্মুখ হিমঘরে জমা হয় আগামী বছর।
তবুও জীবন তুমি চলকে ওঠ
ফেনা সহ কানা অতিক্রম কর অনির্দেশ
রাতজাগা পার্টি অসমাপ্ত রেখে কারা চলে যায়?
যাওয়া তো নির্মাণ এক সহজাত
প্রবহমান আত্মপরিচয়ের অক্ষরহীন আঁচড়
বুকের গভীরে দ্যাখো জীবন দাঁড়িয়েছে ঠায়…
••
৬
শান্ত শীতলপাটি
অবশিষ্ট ক্ষোভ নিয়ে রাত্রি দাঁড়িয়েছে
হিম পড়ে শব্দহীন, তারারা তাকিয়ে
অসহায় মানুষেরা ঘুমিয়ে কাঁদছে
স্বপ্নে কেউ জেগে আছে? অধরা ইচ্ছারা
ফাঁকা মাঠে গোড় দেয়, বিষণ্ণ বাতাস
গ্রাম ছাড়ে, অহরহ আক্রান্ত পৃথিবী
দীর্ঘশ্বাস ঘাড়ে নিয়ে হেঁটেছে নীরবে;
তবু এই নীলবর্ণ আলোর উদ্ভাস
লুপ্তপ্রায় সভ্যতার জেগেওঠা গান
নির্বাক জাগিয়ে রাখে নিদ্রাহীন রাত
সব ক্ষোভ উপশম, নিবৃত্তির ডাক
আমাকে দিয়েছে এক শান্ত শীতলপাটি
••
৭
অরুন্ধতী
অরুন্ধতী নক্ষত্রের দিকে চেয়েছিল কেউ!
গাঢ় অন্ধকারে জেগে আছে নদী
আকাশগঙ্গা
রুগ্ন ক্ষীণ কটিদেশ নিয়ে
সপ্তর্ষিমণ্ডলী দ্বারা বেষ্টিত, ওই সেই
বশিষ্ঠমুনির পত্নী অরুন্ধতী চেয়ে আছে
নীল দুঃখের দিকে।
আবহমান ভেসে যাচ্ছে অনির্দিষ্ট স্রোতে
মগ্ন পরম্পরায় আশ্রিত এই অন্ধকার
এলিয়েন বেশে নেমে আসে পৃথিবীতে
আর জ্বলে ওঠে জাদুলন্ঠন
স্তিমিত ম্যাজিক নিয়ে অপ্রতিভ রহস্যময়…
অরুন্ধতী নক্ষত্রের দিকে চেয়েছিল কেউ
দৃষ্টি তার অনির্দেশ সময়বাহিত এক নিশ্চুপ!
••
৮
নিরাময় খুঁজি
এত রক্ত লেগে আছে হাতে
সহজে কি হাত ধোয়া যায়?
এত পাপ এই ক্ষতি, সেকি
মহার্ঘ প্রায়শ্চিত্তকে পায়?
হিংস্র হায়না মুখ, তীক্ষ্ণ দাঁত
কামড়ে যে লোলুপতা ঝরে
বিদ্বেষ মাখামাখি দংশন
কী দিয়ে যে প্রতিহত করে!
এত দ্বিচারিতা ধরা হাত
মিথ্যার অলজ্জ অভিমুখ
তার সাথে নিত্য ওঠাবসা
পরিণাম অসুস্থ অসুখ !
যত গুপ্ত ক্ষত নিয়ে বাঁচি
ততটাই নিরাময় খুঁজি
প্রাণ আজ উৎসাহ পাক
দু'হাতে আরোগ্যই পুঁজি।
••
৯
প্রলম্বিত গুপ্তকথা
নিজেকে লুকোতে গিয়ে রোজ ধরা পড়ি।
সুমসৃণ স্বার্থপর অবলোকনেই
যা কিছু সঞ্চিত তাপ
মৃদু তিরস্কার সহ
আমাকে বিদ্ধ করে সুচারু শলাকা;
সসম্মান আগ্রহে
ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে এই যে ভ্রমণ
আলোড়িত জিজ্ঞাসার অস্থির প্রশ্ন
সব আজ গোপন ঢাকনামুখে ঢাকা;
তবু, প্রলম্বিত গুপ্তকথা উঠে আসে ধীরে…
••
১০
পৃথিবী চেয়ে থাকে
একটা চিহ্ন থেকে পরবর্তী চিহ্নের মধ্যেকার যে
খোলা স্পেস, সেখানে অনেক কিছু থাকতে
পারে, যা অনুমাননির্ভর অথবা বিজ্ঞানসম্মত;
আমরা সেই অনুসন্ধান পর্বে না গিয়ে
সোজা হেঁটে যেতে পারি ইন্দ্রধনু মাঠ,
অবেলার আলোর আবেশ আর সান্ধ্যমহিমার
গ্রামীণ গেরস্থালি পার হয়ে তারাভরা আকাশের
নিচে; সেখানে যে নৈঃশব্দ্য, জাগতিক টান
হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার চন্দনগন্ধ,
তা গায়ে মেখে মানবিক উল্লাস হয়ে উঠি।
আদ্যোপান্ত নিভাঁজ পৃথিবী শুধু চেয়ে থাকে
কোন সমাপ্তির দিকে কিংবা নতুন উন্মেষ !
••
১১
যুদ্ধ শুরু হবে
সময় হয়েছে এবার, জাগবার পালা এলো;
সব গুপ্ত কোণ থেকে আলো ফেলো
শব্দ করো উজ্জ্বল ঝন্ ঝন্
তন্দ্রাঘোর কেটে গিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াক সবাই।
ওই দেখো অস্ত্রের সম্ভার, প্রশিক্ষিত প্রান্তর
এইবার যুদ্ধ শুরু হবে;
দগ্ধ মাটি থেকে কুড়িয়ে নাও হাড়
গলায় কঙ্কালগ্রন্থি, হাতে সুতীক্ষ্ণ অস্ত্র
ধাবিত প্রতিবাদ ছুটে যাক অমোঘ লক্ষ্যের দিকে
যেখানে শিশুরা শুয়েছে শান্ত,
দহনের ছাই নিয়ে হাতে
গ্রাম আবার পুনর্বার ফিরে আসবে গ্রামে।
••
১২
জন্মের ঋণ
রবীন বসু
গতজন্ম থেকে পেড়ে আনি ফল গতরের সোয়াদ
আমার নিষিদ্ধ জীবন তাতা-থৈ আর গূঢ় সাম্পান
স্রোতহীন জলে তবু অনায়াস ভেসে থাকা আহ্লাদ
পরমায়ু মেপে নেয় আক্ষরিক সংক্রান্তির ঝাঁপান।
অবশিষ্ট রাত্রি দ্যাখে তন্ত্র মতে পৈশাচিক সাধনা
শ্মশানের লোহিতশিখা উজ্জ্বল আকাঙ্ক্ষামথিত
চিতাভস্ম থেকে উঠে আসে প্রেম, পরাজয় প্রেরণা
প্রত্যাশা অধিক তবু বিনিময় হয় অসমর্থিত।
তান্ত্রিকের গতজন্ম ধরে রাখি অমসৃণ তালুতে
জীবাশ্ম তাকিয়ে আছে অহরহ পলকহীন চোখ
পদচিহ্ন পড়ে শুধু তপ্তখার এ কিশোরী বালুতে
ধর্ষণের রক্তস্রাব তুলে আনে করুণতম শোক।
ব্যথার বিষাদলিপি অন্ধকারে মুখ ঢেকে রাখে
আমার জন্মের ঋণ প্রতিবাদে রক্তস্রোত মাখ

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন