তৈমুর খানের গুচ্ছ কবিতা

 


তৈমুর খানের গুচ্ছ কবিতা#

অনাবিষ্কৃত 

      🌱

পথের পাশেই এক পথ পড়ে থাকে 

তাকে কেউ আবিষ্কার করে না 

মানুষের ভেতর আর এক মানুষ 

তাকে কেউ চিনতে চায় না 


প্রতিদিন অনাবিষ্কৃত এবং অচেনা 

অন্ধকার সেখানে খেলা করে 

পাথর ও কাঁটাগাছ জন্মায় 

লাল টুকটুকে বন্য ফুল ফোটে 


আমরা শীতে আপেল খেতে খেতে 

একপাল পায়রার ওঠানামা দেখি 

কেউ কেউ নারী হয়ে যায় 

কেউ কেউ বেড়াল 


কারোরই পোশাক নেই 

কেউ কেউ নিতান্ত বাউল 

আলো-আঁধারির একতারায় সুর কেটে কেটে যায় 


 ২

আমার দুর্গা

🌱

এক পাশে আজও এসে দাঁড়াই 

আজও তুমি সংহারিণী দুর্গতিনাশিনী 

আজও তুমি বরাভয় আলো সঞ্চারিণী 

তবু আমার আকাশখানি কেন তবে ছোট? 

সারল্য হারাচ্ছে চারিপাশ 

হইচই আছে তবু নেই আনন্দের ডাক 

মানব-দিঘিতে রোজ কত পদ্ম ফোটে 

তোমার পূজার পদ্ম তুলে জমা করি 

অঞ্জলি দিতে আসি রোজ 

তুমি তো হৃদয়ে আছ 

তুমি এক সর্বব্যাপী মানবিক বোধ।


  ৩

মরীচিকা

🌱


এপাশে খুঁজে দেখি : কেউ নেই 

ওপাশে খুঁজে দেখি : কেউ নেই 

এপাশ ওপাশ জুড়ে শুধু মরীচিকা 

ঘরকন্না করে 


আমি তবে কার গর্ভে জন্মালাম? 


একখণ্ড আকাশ বৃষ্টির অক্ষরে চিঠি লেখে 

এক ঝলক বাতাস উড়িয়ে দেয় ধুলো 

আমি খুঁজে পাই ফাগুন মাস


আমার নিগূঢ় ধান, আমার নিগূঢ় চাষ 

মাঠ আর মহিমার সূর্য, নিগূঢ় পাখির গান 

রোজ ফিরে আসে মরীচিকার মেয়ে… 


সমস্ত শোকাঞ্জলির পর 

🌱

অনুশোচনার সূচনা হলে 

আমরা এখনও মরে যাইনি তো? 

অক্ষম প্রশ্নটি জেগে ওঠে 


সব দাবানল দূরে 

আমরা শুধু তাপটুকু পাই 

তবু হাওয়া কলঙ্কিত করে, উড়িয়ে আনে ছাই 


এ জীবন মেঘদূতের হোক 

আমরা সবাই ব্যর্থ কালিদাস 

শব্দের চন্দ্রযানে চলে যেতে চাই নষ্ট মহাকাশ 


সমস্ত শোকাঞ্জলির পর, হে জীবন 

বসতে চাইছ অনুকরণ-প্রিয়ার পাশে! 

প্রজাপতি ধরতে চাইছ নতুন বার্ধক্যে এসে


          💚

বিশ্বাসের ক্রম সন্ধ্যায় 

  ____________________

যন্ত্রণার কার্নিশে জ্যোৎস্না গড়ায় চাঁদ 

আমি কল্পনাদের উহ্য রাখি 

না বাজুক আজ তাদের হাতের চুড়ি 


ক্ষুধার্ত আত্মা জ্যোৎস্নার আমানি চেয়ে চেয়ে 

মধ্যযুগের কোনো অস্পষ্ট কাঠবেড়ালি 

যার শব্দে কোনো শস্য নেই 

নিষ্ফল মন্বন্তরে নিরুচ্চার কাতরানি 


কোন্ আলো আর কোন্ ধর্মোৎসবে যাবে সে  ? 

সবই নষ্ট ঈশ্বরের পদাবলী, ঘৃণিত আবেগ 

ঝড়ের দাপট সহ্য করে ঘনঘোর বর্ষণ ক্লেশে 

নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে অটুট সংবেদনায় 


ভিখিরি যুগের সংকটে আবিল ছায়ার দহন পাক খায় 

নিষিক্ত জ্বরের ঘামে ক্লান্ত উল্লাস 

কোথাও পৌরুষ নেই শুধু বিহ্বলতা কাঁপে 

মানুষের কাছে চূর্ণ মানব, ক্ষয়িষ্ণু বীর্য 

অযোগ্য আদিম প্রশ্রয় পড়ে আছে —

  এক তস্তরি উত্তরণ অথবা চুমুকে চুমুকে নিগূঢ় আত্মজোশ 

আজ বিশ্বাসের ক্রম সন্ধ্যায় যদি নামে  ! 

        💚

বিদ্যুতের দেশ 

 _________________

সে একটি বিদ্যুতের দেশ 

বিস্ময় চিহ্নের পরে আর কী চিহ্ন হতে পারে 

ভাবতে ভাবতে একটি বিশ্বস্ত হ্রদ পেরিয়ে যাই 


পুরোনো যুগের কোনো আয়নায় নিজেকে দেখি 

চেনা যায় না যদিও তবু পূর্ণচ্ছেদ বসিয়ে রাখি 

পূর্ণচ্ছেদের ইহজাগতিক করুণা বিলাস 

বিস্ময় চিহ্নের বিন্দুটি ঠিক সরে সরে যায় 

রাত্রির নক্ষত্রের মতো 


মনের মধ্যে উদার আকাশের আস্ফালন 

অন্ধকার হয়ে আসে আর গর্জন করতে থাকে 

বৃষ্টি আসে না যদিও, শুধু বৃষ্টির উপক্রম 


মনে মনে শান্ত হই  আর পূর্ব কালের অন্তরিত কিছু ঢেউ 

গুনে গুনে দেখি 

একটা ঢেউ আর একটা ঢেউয়ের পিছু পিছু আড়ালে চলে যায় 


কমা আর সেমিকোলন বসাবার আগেই মোহিনী বিদ্যুৎ আসে 

চোখ ছলছল করে — এইসব পার্থিব চোখ 

অন্ধকার ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট রাখে না

দীন হীন ক্লান্ত পথিক এক পার হই বিদ্যুতের দেশ... 

          💚

 ৭

শর্তগুলো আদিম, স্বার্থপর, প্রহেলিকাময় 

   ____________________________________

কতকগুলো শর্ত নেমে আসে শীতকালের রোদে

শর্তগুলো আদিম, স্বার্থপর, প্রহেলিকাময় 

ঘোরাফেরা করে আমাদের জটিল সংসারে 


আমি যৌবনের দূত , সব খাঁচা উল্টে ফেলি                                                     

পাখি উড়িয়ে দিই 

কালস্রোতে ভাসিয়ে দিই নিজের উন্মুখ পরিচয় 


শর্তরা তবু থাকে তাদের ধারাল ক্ষুর ও ব্লেড নিয়ে 

তাদের রক্তাক্ত পিপাসা নিয়ে 

পৃথিবীময় অসফল ঘুমের দরোজা দিয়ে প্রবেশ করে 

আর একটি নির্লজ্জ সাম্রাজ্যের অস্ত্রশালার উদ্বোধন করে 


অস্তিত্ব কিছুটা নুয়ে পড়ে —

শর্তদের তাঁবুর ভেতরে অন্ধকার, অন্ধকারে ধর্মের কোলাহল 

নিষ্ঠুর কদর্য আর বিকৃত উল্লাস ক্লান্ত করে দেয় 


নিজেকে নিজের পাশে রাখি, যতটুকু আড়াল করা যায় 

পৃথিবীর সমস্ত নোনা বাঁশি কিছুটা নিজস্ব সুর চেনে 

নিঃশর্তে যেতে পারে নিজস্ব কিছুটা পথ... 



                 💚

 ৮

গাছ হয়ে যাই 

 _____________

আমার জীবিতকালের শহর তীব্র ঘ্রাণ ছড়িয়ে দিচ্ছে 

রঙিন পোশাক উড়ছে সবাই চিহ্ন নিয়ে 

চিহ্নবিহীন কোথায় যাব   ? 

একলা পাগল, মোড়ের দোকান, দাঁড়িয়ে আছি বাউল হয়ে 


তেড়ে আসছে বিচিত্র যান 

হুংকার আসছে —  শাসন ভাষণ ত্রাস 

রাস্তা ছেড়ে দাঁড়িয়ে আছি 

হা হা রাস্তা —  রাস্তা তবু করছে গ্রাস 


কোন্ চোখে দেখব সত্য  ? 

দেখা যায় না  , শূন্য ঘরে অবাস্তব ঘুমাচ্ছে একা 

কে তাকে জাগাবে এসে  ? 

হোর্ডিং ফেস্টুন সবাই হাঁটছে —  পোশাকবিহীন মরীচিকা 


দেখতে দেখতে গাছ হয়ে যাই 

মনখারাপের পাখিগুলি বাসা বাঁধে 

অসহিষ্ণু উত্তেজনারা সাপ হয়ে যায় 

শিকার করে নষ্ট সময় —  বুকের মাঝে নীরবতা শুধুই কাঁদে   ! 




 💚

 ৯

বন্ধু 

 __________

ভ্রান্তর বন্ধুও বিভ্রান্ত 

হাত বাড়িয়ে দিলে হাত ধরি 

হাতে লেগে থাকে ঘ্রাণ 

ঘ্রাণে ছুটে আসে প্রজাপতি 


বজ্রগর্ভ আকাশের নীচে দাঁড়াই 

কারও ঘর নেই 

বিপদের সংকেতগুলি জ্বলে 

সংকেতে আলো হয় 

আমাদের কারও আলো নেই 


নষ্ট পালক কুড়িয়ে বালক হই 

তনু রেখে মনকে নিয়ে উড়ি 

আমাদের কারও ডানা নেই 


ধু ধু আকাশ , মরুতীর্থের গান 

ভ্রান্ত বিভ্রান্ত মিলে গাই.... 






        💚

১০

অস্তিত্ব পাথরের মতো

____________________

কাতুকুতু পাড়ায় হাসিরা জেগে উঠেছে 

ময়ূর ও সাপের খেলা দেখতে দেখতে 

ক্রমশ বার্ধক্য আসে 

দোকানগুলি সব বন্ধ হয়ে যায় একে একে 


কোথায় ফিরতে হবে আমাকে   ? 

অলৌকিক রশ্মি এসে সামনে দাঁড়ায় 

রমণী শরীর হয়ে রমণ গঙ্গায় ভাসে 

অথবা নিসর্গ বিদ্যুৎ হয়ে এঁকেবেঁকে চলে 


আমি আর মাথা উঁচু করতে পারি না 

অস্তিত্ব পাথরের মতো ভারী হয়ে 

একটা নিথর পৃথিবী হয়ে যায়..... 






কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন